পুণ্যা-দি একবার আমারে জড়ায় ধরে কাঁদতে কাঁদতে কইসিলো, ‘যেদিন বড় হবি, সেদিন কাউরে কান্দাইস না। কারো মন ভাঙ্গিস না, মন ভাঙ্গা আর মসজিদ ভাঙ্গা সমান কথা’। অতোখানি বয়সে আমি মন কিংবা মসজিদ কোনটাই বুঝি নাই। আমি কেবল পড়তাম, অ-তে অজগর; অজগরটি আসছে তেড়ে, আ-তে আম; আমটি আমি খাব পেরে।
তয় আমি বিশ্বাস করছিলাম পূণ্যা-দিরে। আর যাই হোক, পূণ্যা-দি মিছা কইবো না আমারে। তার সাথে আমার মিছামিছির সম্পর্ক নাই।
সেবার শাহরুখ খান আর কাজল এর সিনেমা দেইখা পূণ্যা-দিরে সিনেমার নায়িকা মনে হইছিলো। এরপর থেকে আমি আর পূণ্যা-দিরে ছুঁই নাই শরমে। ভাবসিলাম, যেদিন আমার মনের মসজিদে পূণ্যা-দি আইসা দাঁড়াইবো সেদিন, সেইখানে জায়নামাজ বিছানো হইবো। এর আগে না। মরে গেলেও না। পশ্চিম দিক মুখ কইরা কসমও কাটছিলাম।
একদিন পূণ্যা-দির পড়ার টেবিলের সামনে গিয়া দেখি পূণ্যা-দি শব্দ করে করে বই পড়তেছে। আমাকে ডাইকা বলছিলো, ‘একটা ব্যাঙ ধরে এনে দিতে পারবি?’ আমি কইলাম, ‘ব্যাঙ কেন, তুমি চাইলে বাঘও আনবার পারমু’। তুমি যে মনের মসজিদের একমাত্র মুক্তাদি। তুমি এক পৃষ্ঠা পড়া শেষ করার আগেই আমি ব্যাঙ আনতেছি। পূণ্যা-দি পড়তেছে, আর আমি একটা ব্যাঙ এর পেছনে ছুটতেছি। ঙ-তে ব্যাঙ, ব্যাঙ ডাকে ঘ্যাংর ঘ্যাং।
ব্যাঙ নিয়ে পূণ্যা-দির হাতে দিয়ে বলছিলাম, ‘এই নাও ব্যাঙ’। মানুষ কত কী পোষ মানায়। কেউ টিয়া পোষে, কেউ পোষে হরিণ, কেউবা আবার আস্ত মানুষ পোষে। আর আমার পূণ্যা-দি পোষে ব্যাঙ। এর জন্যেই পূণ্যা-দিরে আমার ভালোবাসতে ইচ্ছে করে খুব। যে ব্যাঙ ভালবাসে, মানুষ তার কাছে পরমেশ্বর।
এরপর একদিন শুনলাম, ব্যাঙ দিয়ে প্র্যাক্টিক্যাল করে। আমি অনেক চেষ্টা করেও প্র্যাক্টিক্যাল বানান করতে পারি নাই সেদিন। খালি বুঝছিলাম, ব্যাঙটা বাঁচে নাই। কাঁদতে কাঁদতে পূণ্যা-দির কাছে জানতে চাইছিলাম, ‘ব্যাঙের মনে কী মসজিদ নাই?’ পূণ্যা-দি আমার হাত ধইরা কইসিলো, ‘আরে পাগল, ওইটা তো কথার কথা’। আমি চোখ মুছি নাই সেদিন একবারো। কেবল কইসিলাম, ‘আমারে কোনদিন আর কথার কথা কইয়ো না। আমি কথার কথা বুঝি না’।
পূণ্যাদি পড়তে বসলে আমি আর কোনদিন তার জানালার সামনে যাই নাই।
এখন পূণ্যা-দির মাথার কাছে একটা শিউলি ফুলের গাছ জন্মিছে। মৈয়মনসিংহে পূণ্যাদির নানার বাড়ি। ঐখানেই নাকি উনি উত্তর দক্ষিণে শুয়ে থাকে সেই শিউলি গাছের তলায়। শরৎ আসলে পূণ্যাদির চুলে শিউলি আটকে থাকে, বর্ষায় কানের কাছে পাগল সুরে ডাকে ব্যাঙ- ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।
আইজ এতো বৎসর পর, পূণ্যা-দির সুর কইরা কইরা গার্হস্থ্য পড়ার শব্দ শুনি আমার জানালার পাশে দাঁড়ায়া। আমার মনের মসজিদে তাকায়ে দেখি সেখানের জায়নামাজে একটা শিউলি গাছ জন্মাইছে। পূণ্যা-দি তার নিচে বইসা আছে। মাথায় সাদা জরজেটের ওড়না প্যাচানো।হাতের মাঝে একটা পোষা ব্যাঙ ঘুমায় রইছে। পূণ্যা-দি আমারে কইতেছে, ‘এই দ্যাখ, ব্যাঙটা বাঁইচা আছে এখনো, কেমনে ঘুমায়’। আমি কইতেসি, ‘ তোমারে আর বিশ্বাস করতেছি না আমি। যেদিন মৈয়মনসিংহ গেলা আমারে ছাইড়া, সেদিন তো তোমার কোন মায়া হয় নাই’। পূণ্যাদি হাসতেছে। তারপর কইতেছে, ‘যারে মানুষ একবার মনের ভেতরে জায়নামাজ পাইতা দেয়, তারে যে কোনদিন ছাড়া যায় না রে, পাগল’।
Send private message to author







good story
তোমার লিখা আমার খুব ভাল লাগে।তোমার বইও পড়েছি ভাল লেগেছে।আরও গল্প পড়তে চাই।