গল্পকার

আসেন আসেন ভাইসাব। নয়া নয়া গল্প শুইনা যান। হরেক রকমের মজার গল্প। হাসির গল্প, প্রেমের গল্প, ভুতের গল্প, জীবনের গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি হাশেম গল্পওয়ালা, বসে আছি আপনাদের অপেক্ষায়। যত আগে টিকিট কাটবেন, তত সামনে বইতে পারবেন।  আসেন আসেন ভাইজান, টিকিট কাইটা লইয়া যান।

এভাবেই হাঁক ছেড়ে টিকেট বেচতে থাকে সামাদ গল্পকার। সামাদ গল্পকার, বয়স ৪৫। পেশা – গল্প বলা। শারিরীক গঠন- পাতলে লিকলিকে, মনে হয় ঝড়ের বাতাসে এখনই উড়ে যাবে। কিন্ত যারা এই ধারনা করে থাকে, তাদের এই ধারণা যে নেহায়ৎ-ই যে ভুল হবে যদি তারা সামাদকে পাঞ্জা লড়তে না দেখে। কে বলবে এই লিকলিকে গঠনের মানু্যটা পাঞ্জা খেলার বাজীতে কখনোই হারে না। গল্প বলা আর বাজিতে পাঞ্জা খেলে যা আয় করে তাই দিয়ে কোনরকমে সামাদ আর তার পরিবারের দিন কেটে যায়। সামাদের পরিবার বলতে তার ২ বাচ্চা আর বৌ।  তার মা-বাবা অনেক আগে গত হয়েছে। কিশোর বয়সেই সামাদ সার্কাসের দলে যোগ দেয় গল্পকার হিসেবে। ঐ সময় সে দর্শকদের ছোট ছোট চুটকি শুনিয়ে দর্শক মাতিয়ে রাখতো। তখনকার সময় সার্কাস দলে গল্প বা চুটকি শোনানো অনেকটা নতুন আইডিয়াই ছিলো। দেখা যেতো একসময় দর্শকরা শুধু তার গল্প বা চুটকি শুনবার জন্যই সার্কাসের টিকিট কিনতো। কিন্তু সে দর্শকদের যে পরিমাণ আনন্দ দিতো, তার বদলে খুব কমই পারিশ্রমিক পেতো। কিন্তু সবকিছুরই একটা মেয়াদ থাকে। ঠিক তেমনি, সামাদ গল্পকারের গল্পেও একসময় ভাটা পড়লো। সে প্রায়শই একি কেচ্ছা কাহিনী পুনরাবৃত্তি করতে থাকলো। ফলে যা হবার তাই, দর্শকরাও তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে আরম্ভ করলো। পরে দেখা যেত এমনও সার্কাস শো হত, যেখানে সে কিছুই করতো না। যখনই তার প্রতি অবহেলা অনেক বেশী বেড়ে যেত, তখনই সে এক সার্কাস দল থেকে আরেক সার্কাস দলে নাম ভিড়াতো।

Artist: Albert Anker; Title: Grandfather Telling a Story

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে কোন সার্কাস দলেই আর টিকতে পারে না। তাই সে নিজেই নিজের একটা স্টল খুলে বসে, যেখানে সেই টিকিট বেচবে আবার সেই গল্প বলবে। বেশীর ভাগ মেলাতেই সে তার স্টল বসাতো। খালি স্টল বানানোর জন্য কিছু লোক কমদামে ভাড়ায় খাটাতো। আবার কয়েকটা প্রোগ্রাম করেই সে হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে যেত কিছুদিনের জন্য। তবে প্রতিবারই সে যখন গল্পের আসর বসাতো, প্রতিবারই নতুন কোন কেচ্ছা কাহিনী শোনাতো। এর মাধ্যমে সে কিছুটা জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছিলো তার পরিচিত গ্রাম-গঞ্জ গুলোতে। সে অনেক ধরণের গল্পই বলতো। কিন্তু খুন খারাপি, মারামারি কেচ্ছা গুলো গ্রামের মানুষগুলো যেন বেশী শুনতে চাইতো। সামাদ গল্পকার তার শেষ শো করেছিলো প্রায় দেড় মাস আগে। এরপর সে জানি কোন শহরে গিয়েছিলো। দুই দিন আগে সে গ্রামে ফিরে এসেছে। আজকে সে আবার শো করবে মেলা উপলক্ষে। সকাল থেকেই সামাদ টিকেট বিক্রি করে যাচ্ছে, যাতে বিকেলের আগেই সব টিকিট বেচা হয়ে যায়।

“ আসেন আসেন ভাইসাব। নয়া নয়া গল্প শুইনা যান। হরেক রকমের মজার গল্প। হাসির গল্প, প্রেমের গল্প, ভুতের গল্প, জীবনের গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি হাশেম গল্পওয়ালা, বসে আছি আপনাদের অপেক্ষায়। যত আগে টিকিট কাটবেন, তত সামনে বইতে পারবেন।  আসেন আসেন ভাইজান, টিকিট কাইটা লইয়া যান। টিকিটের দাম ৩০ টাকা। মাত্র ৩০ টাকা। আইজকা আসে ভূতের গল্প, বাচ্চাগোর লাইগা হাসির গল্প।” – এভাবেই হাঁক ছেড়ে টিকেট বেচতে থাকে সামাদ গল্পকার।

“ও সামাদ ভাই। আমারে দশখান টিকিট দেও সে। বড়গোর গল্পের টিকিট।”- সামাদকে টিকেট দিবার অনুরোধ জানায় জব্বার মিয়াঁ।

“দশখান টিকেট? কিছুটা বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞাসা করে সামাদ। এরপর আবার বলে- কেডা কেডা আইবো ? দাও ৩০০ টাকা দাও দশখান টিকিটের লাইগা।”

জব্বার মিয়াঁ কিছুটা বিরক্ত স্বরেই বললো- “আর কইয়ো না সামাদ ভাই, শ্বশুর বাড়ি থেইকা লোক আইসে। আইজকা সকালে হুনছে যে তুমি বলে আইজকা কিচ্ছা শুনাইবা তাই হেরা বায়না ধরসে তোমার গল্প শুনবার। তাই দশখান টিকিট কিনতাসি। এই লও ৩০০ টাকা।”

“তাইলে তো ভালাই খরচা-পাতি হইলো তোমার। এই লও ৫০ টাকা কম রাখলাম তোমার কাছ থেইকা। তুমি তো কাছের মানুষ।“- কথাগুলো বলেই সামাদ ৫০ টাকা বাড়িয়ে দিলো জব্বার মিয়াঁর দিকে। ৫০ টাকা ফিরত পেয়ে নিমিষেই জব্বার মিয়াঁর মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো। অবশ্য গ্রাম-গঞ্জের মানুষদের কাছে ৫০ টাকাই অনেক বেশী। জব্বার মিয়াঁ মেলার চারপাশের দিকে চোখ মেলে তাকালো। বেশ আয়োজন চলছে। সবাই নিজ নিজ স্টল নিয়ে ব্যাস্ত। কারোর ই কারোর দিকে তাকাবার ফুরসত নেই। অনেকদিন পর গ্রামে বেশ বড় একটা মেলা হবে। আর বেশ ভালোই জমবে। তার উপর শোনা যাচ্ছে খোদ চেয়ারম্যান সাহেবও আসবে মেলা ঘুরে দেখতে। চারদিক একনজর বুলিয়ে জব্বার সামাদের দিয়ে চেয়ে বললো, “ভালাই মেলা জমবো আইজকা। তার উপর আইজকা তুমি শো করতাসো। তা কই মিয়াঁ এমনে এতদিন পরপর শো না কইরা মাঝে মাঝে করলেই তো পারো। তাইলেই তো আরো দুই-চাইরটা পয়সা বেশী কামাইবার পারো। আর ভাবীরেও তো তাইলে মাঝে মাঝে মাইনষের বাড়িতে কাম কইরা বেড়াইতে হয় না। কই যাও তুমি? আর গিয়া করডাই বা কি?” জব্বারের প্রশ্ন শুনে হালকা করে হাসে সামাদ। তারপর বলে- “সন্ধ্যার দিকে আইসা পইড়ো কিন্তু জব্বার ভাই।” জব্বার চলে যাওয়ার পর সামাদ আবারো টিকিট বেচাতেই মনোযোগ দেয়। কিছু লোক আসে টিকেট কিনে নিয়ে যায়। আর কেউ কেউ টিকিটের দাম নিয়ে দরাদরি করার চেষ্টা করে কমদামে কিনবার জন্য। কিন্তু টিকিটের দামের ক্ষেত্রে সামাদ একদমই অনড়। এক পয়সাও সে ছাড় দেয় না সে। এভাবে একসময় তার সব টিকেট বেচা শেষ হয়ে যায়। সে বাড়ি ফিরে যায় শো’য়ের প্রস্তুতি নিবার জন্য। যথারীতি  বিকেল ঘনিয়ে আসে। গ্রামের সবাই মেলার দিকে পা বাড়ায়। শুধু এই গ্রামের লোকজন না, আশে পাশের গ্রামের লোকজনও এসেছে, মেলা দেখবার জন্য। সবাই বিভিন্ন ভাবে মেলায় চলাফেরা করছে। কেউ সার্কাস দেখছে। কেউ নাগরদোলায় চড়ে বেড়াচ্ছে। কেউবা হাওয়াই মিঠাই বা জিলাপী খাচ্ছে। গ্রামের মহিলারা চুড়ি কিংবা সাজগোজের জিনিষপত্র কিনছে। বাচ্চারা খেলনাপাতি কিনার জন্য বায়না করছে বাবাদের কাছে। আর গ্রামের উঠতি বয়সের জোয়ান ছেলেরা মাথের একধারে বিড়ি ফুঁকছে আর তাস পেটাচ্ছে। সব মিলিয়ে আনন্দ মুখ অবস্থা মেলার পরিবেশে।

সামাদ গল্পকারও যথারীতি তার গল্প বলার প্রথম পর্ব শেষ করে ফেলেছে। এই পর্বে তার দর্শক শুধু বাচ্চা পোলাপাইন। এরপর সে দ্বিতীয় পর্বের প্রস্তুতি নিবে। অবশ্য সেটা বেশ পরে হবে। এশার আজানের পর শুরু করবার ইচ্ছা তার। তার আগে সে নিজে কিছুক্ষন মেলায় হালকা ঘুরে বেড়ালো। বরাবরের মতো  সে এবারো পাঞ্জা খেলার বাজীতে বেশ কিছু টাকা জিতে নিলো। ধীরে ধীরে এশার নামাজ শেষ। অনেকেই বাড়িতে চলে গিয়েছে। আর বাকি যারা রয়ে গেছে। তাদের বেশীর ভাগই সামাদের স্টলে হাজির হয়েছে তার গল্প শুনার উদ্দ্যেশ্য নিয়ে। সামাদও প্রস্তুত গল্প বলবার জন্য। সে স্টলের দিকে চেয়ে দেখে অনেক মানুষ হাজির। এসব যখন সে দেখে তখন তার মন একদম ভরে যায়। ছোট থেকে এই একটি কাজই সে ঠিকভাবে করতে পারতো। এরপর সে যখন সেই গল্প বলাতেও সে যখন ব্যর্থ হচ্ছিলো। তারপর সে একপ্রকার গা-ঢাকা দিয়ে আড়ালেই হাড়িয়ে গিয়েছিলো। বিভিন্ন জায়গায় ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতো। যেখানেই সে গল্প শুনতে পেতো সেখানেই সে মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনতো। এভাবে গল্প শুনতে শুনতে তা মাথায় বুদ্ধি আসে যে, সে এই শোনা গল্পগুলোকেই আবার শোনাবে এবং তা অবশ্যই তার আশেপাশের অঞ্চলে। সে তার আশেপাশের অঞ্চলে যেসব গল্প শুনতে পেতো তা নিজের পরিচিত জায়গায় হুবুহু শোনা গল্পের মতো করে বলতো না পাছে যদি ধরা পরে যায়। অবশ্য ধরা যে পড়বার মতো অবস্থা হয় নি এমনও কিন্তু নয়। কিছুটা ভাগ্যের জোরে আবার কিছুটা নিজের তাৎক্ষণিক বুদ্ধির জন্য বেঁচে গিয়েছিলো। কিন্তু এরপর থেকে সে সর্বদাই সতর্ক থাকতো। আজকের গল্পটাও অনেক আকর্ষণীয়। অনেক খুন খারাপী আর রহস্য আছে। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে এই কেচ্ছাটা বানানোর জন্য।

ধীরে ধীরে সামাদ গল্পকার গল্প বলা শুরু করলো। সে গল্প বলার সময় সবাই দেখলো সবাই তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। যথারীতি গল্প বলা শেষ হলো। সবাই তালি দিচ্ছে। কেউ তো আবার জোরে জোরে সিটিও বাজাচ্ছে। চেয়ারম্যান সাহেব তো খুশি হয়ে ৩ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে গেলো। সব কিছু দেখে সামাদের চোখে পানি এসে গিয়েছিলো। অবশেষে তার লক্ষ্য সফল, তার পরিশ্রম সফল। এর গল্প বলবার জন্য গল্পের আসল মালিককে খুন করতে তার একদমই হাত কাঁপে নি। কারন সামাদ গল্পকার বিশ্বাস করে, সেই একমাত্র গল্পকার আর গল্প বলার অধিকার কেবল তারই রয়েছে।

– Noor Sayeed Trishan

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Trishan
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ishmam Nur
Member
5 years ago

সুন্দর হয়েছে লিখাটা।

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!