প্রেম অপ্রেম

নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল

১.
” তুমি কি ভার্জিন?”
” না ।”
কোন প্রকার বাক – প্রতিদ্বন্দ্বীতা কিংবা কোনো ইতঃস্ততবোধ ছাড়াই বৃদ্ধাঙ্গুলী, তর্জনী আর মধ্যমা দুই হাতের ছয় আঙ্গুলের ডগায় প্রেমফলগুলোর মাঝে একটা একটা করে তুলে নিয়ে পিষ্ট করে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সে হাস্যজ্বল মুখেই চোখে চোখ রেখে তার কথার জবাবে মুখে একটা শব্দই উচ্চারণ করে ।
ধপ করেই যেন অন্ধকার ঘরে যত্নে আগলে রাখা মাটির প্রদীপে জ্বলতে থাকা সলতে কেউ এক লাহমায় ফুঁ দিয়ে চোখের পলকে নিভিয়ে দিয়েছে । দমকা হাওয়ায় নিভে যাওয়া প্রদীপের কথা যেন হাজার বছরের জীবাশ্ম-জ্বালানির আড়ালে চাপা পড়ে । ভেতরে ভেতরে দম বন্ধ করা বড় একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে রেখে জোর করে ঠোঁটের কোণে মুখোশে আবৃত মিথ্যে হাসির রেখা ফুটিয়ে চোখে চোখ রেখেই তাকে উদ্দেশ্যে করে পাল্টা প্রশ্ন করার পরিবর্তে সে ছোট করেই বলে ,
” ওওও-হ্ … “
যথারীতি প্রেমফলের খোসা সে ছাড়িয়েই চলেছে । লাল – বাদামী বর্ণের ঠুনকো প্রলেপে আবৃত ছাড়ানো প্রেমফল তার ডান হাতের আদলে রাখছে । হাতের উপর উপচে জমতে থাকা প্রেমফল ব্যাস্ত হয়ে পরে নিজেদের সাজানো গোছানো ভালোবাসার ছোট্ট কুটির বুনন করতে । নিজেকে যথাসম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করে চলছে সে । ঘাড় ঘুড়িয়ে মুখ আড়ালে রাখার চেষ্টায় আশেপাশে তাকিয়ে প্রকৃতি দেখার বাহানা করছে ।
এর মাঝে প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা হঠাৎ করেই বেজে ওঠে । রিং হওয়ার সাথে সাথে ফোনের মৃদু কম্পনে সে চকচকিয়ে ওঠে । তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে । ক্ষুধার্ত চাতক পাখির মতো সে ফোনের উপর তাকায় সাদা রঙে জ্বলতে থাকা নামটার দিকে । শুভেন্দু ফোন করেছে ! মনে মনে এমন কিছুরই আশা করছিলো সে । সৃষ্টিকর্তা তার লুপ্ত মনের বাসনা এতো দ্রুত পূর্ণ করবে, ভাবতেও পারেনি । ভেতরে ভেতরে পুলকিত হয় সে । কিন্তু, খুশি হওয়ার অভিব্যাক্তি বাইরে প্রকাশ না করে মনের কথা মনেই লুকিয়ে রাখে । যথার্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিমা বজায় রেখে কানে ফোন চেপে ধরে খানিক জোর করেই টেনে টেনে উচ্চারণ করে ,
” হ্যা-লো… হ্যালো শু-ভে-ন্দু… হ্যাঁ, বল ।”
ওপাশ থেকে শুভেন্দু কি বললো? শোনতে পেল না মেয়েটা । উত্তেজিত হওয়ার ভঙ্গিতে সে হঠাৎ বসা থেকে হস্তদন্ত হয়ে ওঠে দাঁড়িয়ে বলে ,
” কি যাতা বলছিস! কখন? কিভাবে হলো এসব? আচ্ছা… আচ্ছা । হ্যাএএএ? হ্যা-এ্ আমি আসছি… এখনই আসছি ।”
বসা থেকে ওঠে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা ততোক্ষণে । হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যাওয়ায় সে এতোক্ষণ ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকেছে । চোখ – মুখের অভিব্যাক্তি দেখে বুঝতে পারে কিছু একটা ঘটেছে । থেমে থেমে গড়গড়ড় করে বলতে থাকা কথাগুলো শুনছে সে এতোক্ষণ চুপ করে । ফোন নামিয়ে রাখতেই তাকে উদ্দেশ্য করে জড়ানো গলায় জিগ্যেস করে ,
” কি হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
উত্তেজিত অভিব্যক্তি ধরে রেখেই সে তার নিজের মুখে বাম হাতে নাক থেকে চিবুক পর্যন্ত মোছার অনুকরণ করে আগের মতোই গলা টেনে টেনে বলে ,
” আ-রে… আর ব-লো না । তোমা-কে তো শুভেন-নদুর কথা বলছি ।”
” হ্যাঁ । তোমার খুব ভালো বন্ধু । কিন্তু, কি হয়েছে?”
ভয়ার্ত দৃষ্টিতেই সে তার চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করে । চোখে চোখ রেখে অনর্গল মিথ্যে কথা বলায় অভ্যস্ত নয় সে । তাই মুখে অস্থিরতার অভিব্যক্তি ফুটিয়েই আশেপাশে তাকিয়েই আবারও আমতা আমতা করে বলে ওঠে ,
” আ-রে ঐ যে… কি যেন নামটা? হ্যাঁ … শুভেন্দুর ছোট ভাইয়ের । আরে ঐ যে… হ্যাঁ! দে-বা-ংশু… দেবাংশু অ্যাকসিডেন্ট করেছে !”
” সেকি! কিভাবে?”
” আ-রে… আর বলো না । প্রচন্ড চন-ঞ্চ-ল ছেলেটা । সাইকেল চালাতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট
করেছে ।”
” ই-সস-স… খুব লেগেছে না?”
” হ্যাঁ… হ্যাঁ, খুব লেগেছে । তাই তো বললো শুভেন্দু । হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে । কিন্তু, শুভেন্দু ওখানে এখনই যেতে বললো ।”
এর মাঝে শুভেন্দু আবার কল করে । কারণ শুভেন্দুর কলটা তখন সে রিসিভ করেনি , বরং কেটে দিয়েছে । আর এটা ওদের দুই বন্ধুর মাঝে একটা
কোড । যা ওরা দু’জন ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তি জানে না । সে ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে দেখিয়ে বলে ,
” এই দেখো বার বার ফোন করছে । মনে হয় কেসটা ইমার্জেন্সিতে চলে গেছে বুঝলে । আমাকে এখনই একবার হাসপাতালে যেতে হবে ।”
” হ্যাঁ, তুমি যাও ।”
” সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । আচ্ছা, চলো… তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তারপর ওখান থেকেই সরাসরি হাসপাতালে চলে যাবো ।”
” না… না । আমি একাই চলে যেতে পারবো । তুমি বরং হাসপাতালে চলে যাও ।”
” শিওর?”
” হ্যাঁ, বা-বা … পাক্কা আমি একাই যেতে পারবো ।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সে খানিকটা কপাল কুঁচকে নাক মুখে খিঁচে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে হুট করেই বলে বসে ,
” আমি তোর বাপ লাগি ! আসলেই?”
কথার আকষ্মিকতার ধাক্কায় তাল মেলাতে না পেরে বিষ্ময়ের অষ্টম আশ্চর্যের চূড়া ছুঁয়ে বোকার মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে বসে সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে ,
” মানে?”
সে আহত গলায় তার দিকে চোরা – চোখে তাকিয়ে বলে ,
” ভাই বলে ডাকলেও মেনে নিতাম । আগুন সুন্দরীরা আদর করে ভাইয়া বলে ডাকলেও পরে টুক্কুর টুক্কুর প্রেম বাসা-বাসি হয় । তাই বলে ভাই না ডেকে ডিরেক্ট বাপে চলে যাবি !”
এটা ওর বিশেষ একটা গুণ ! যে কোনো পরিস্থিতিতে বা কঠিন সময়েও একজন মানুষকে হাসাতে পারে যে কোনভাবে । হুট করেই তার মুখে এমন কথা শুনে সে অট্ট হেসে দিয়ে বলে ,
” যাহ্! দুষ্টু … তুমি না ! সত্যি পারোও বটে … “
” দেখতে হবে না! কে বলেছে?”
কথাটা সে কুল মুডের ভঙ্গি করে বলে । তাকে উদ্দেশ্য করে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ,
” তাই না?”
চোখে চোখ রেখে সে চোখের ভ্রু-জোড়া কপালে তুলে টান টান কপাল করে বলে ,
” আলবাত !”
” তা টুক্কুর টুক্কুর প্রেম ভাইয়ারা বুঝি বাসায় থাকে? প্রেম যে পাখির বাসা হয় সেটা তো বাপের জন্মেও ঘুণাক্ষরে শুনিনি বাপু? তা টুক্-কুর ভাইয়াদের প্রেম বুঝি বাসার খোঁপে বসে বাসার বাসিদের জন্য আন্ডা পাড়ে আর তাতে তা দেয়?”
” কিহ্!”
” ঐ যে টুক্কুর ভাইয়াদের প্রেম বাসা-বাসি! স্ত্রী লিঙ্গ – পুং লিঙ্গের ভেদাভেদ এই যা ।”
সে-ও তার কথায় অট্টহাসি দিয়ে বলে ,
” হা হা হা … তুমিও ! আচ্ছা, চলো এবার দেরী হয়ে যাচ্ছে । অন্তত তোমাকে রিক্সায় তুলে দিই তাহলে?”
” আচ্ছা, চলো ।”

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
1
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!