মায়াবতী মেঘ-১

পরিচয়গল্প

: পৃথুলা? ….শুনছিস…..
: শুনছি। বল।
: প্রেম কি তোর কাছে এতই সস্তা মনে হয়? নাসিরের বিয়ের মতন?
আমি হাসলাম। আমি হাসতে জানি। ব্যাথা পাবার পর বেশী হাসি। ব্যথাটা আমি নিজেই আমদানী করেছি। একটা ব্যথাকে উপশম করতে নতুন করে ব্যথার আমদানীটা মোটেও আমার জন্য সুখকর নয়। ক্রিকেটার নাসির সুবাহর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। শেষ। তারপর বিয়ে করেছে তাম্মিকে। এগার বছরের সংসার, আট বছরের মেয়ে ফেলে এসে নাসিরের হাত ধরেছে। আর কি ভালবাসা! তবুত দুজন দুজনকে আকড়ে রেখেছে। আর আমি। আমি শুধু পদে পদে ভুল করেছি। ঠিক কাজ আমার দ্বারা হবে বলে মনে হয় না।
এমা বকবক করে যাচ্ছি। বলা হয়নি আমার পরিচয়টাই। আমি পৃথুলা আহমেদ। মোগলটুলি, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম, উকিল ভিলার সবচেয়ে ছোটমেয়ে। তিন ভাই আর দুইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। সেলিম, রাসেল আর তুহিন তিনজন আমার ভাই। আর স্বান্তনা হচ্ছে আমার বড়বোনের নাম। আমাকে সারাদিন স্বান্তনা দেয়াই তার সবচেয়ে বড় কাজ। নিজের স্বান্তনা মনে হয় আমাকে স্বান্তনা দিয়েই খুঁজে পায়। বুকের মধ্যে সে বড় এক পাথর চাপা দিয়ে হাসতে শিখেছে। আমার মতন নয়। আমি যেমন খিলখিল হাসি, সে হাসে পরিমিত হাসি।
চারতলা বাড়িতে আমি আর আমার বড়বোন একটা ফ্লাটে থাকি। সেটা তিনতলাতে। আর আমার বড়ভাই তার বউ আর বাচ্চা নিয়ে থাকে চারতলাতে। দোতলাতে আছে আমার অন্য দুইভাই আর তাদের বউ।
আর ছাদে আছে আমার ছেলেমেয়েরা। ওহহো, তাদের পরিচয়ইতো দেয়া হলনা। দুইটা সুন্দর খরগোশ। আমার ছেলে আর আমার মেয়ে। সু আর জন। সু আমার ফর্সা টকটক সাদা মেয়ে। লাল লাল চোখ। জন হলো কালো টুকটুক আর কপালে সাদা দাগ। ওর চোখ মায়াময় কালো। চোখে ভরা সমুদ্দুর। আর আছে একগাদা গাঁদা, কসমস, বেলী , রজনীগন্ধ্যার বাগান। সব আমার আত্মার খোরাক। আমার আজন্ম স্বপ্নবন্ধু। ২০১৫ তে আমার বাবা মানে উকিলসাহেব মারা যাবার পর আমার গল্প বলার সঙ্গী তারাই। এ আগে আমার বাবাই ছিল আমার গল্প শোনার একমাত্র মানুষ। আসলে মা মারা যাবার আগে বাবাও মানে উকিল সাহেবও আমার এতটা কাছের ছিলেন না। ২০১০ সালে যখন আমার মায়ের ক্যান্সার ধরা পরে তখন বেশ ক্রিটিক্যাল সময় ছিল আমার জন্য। আমার বোন তখনও আঘাত পায়নি। উড়ুউড়ু উড়ন্ত দুই পাখি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমরা দুইবোন মন দিয়ে সেবা করেছি। আমার মায়ের সেবা। কিন্তু ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমাদের সবার সেবাকে তুচ্ছ করে দিয়ে, উকিল সাহেবের ভালবাসাকে নগন্য করে দিয়ে সব শুনশান করে দিলেন।
আমার বোন একদম চুপ হয়ে গেল। আমি হঠাৎ করেই উকিল সাহেবের খুব কাছে এসে পড়লাম। মায়ের সেবা করতে গিয়েই জানলাম লোকটা বড় নরোম একজন মানুষ। এতদিন শক্ত খোলসে যে লোকটাকে দেখতাম, সেটা মানুষটার মুখোশ মাত্র।
আর আমার বড়ভাই সেলিম। মা বেঁচে থাকতেই বড় ধুমধাম করে তার বিয়েটা দিয়েছিলেন। বউটা, মানে আমার বড়ভাবী সোহেলী বড় মিষ্টিমেয়ে। ভাল বললে কম বলা হবে। কারণ অসুস্থ অবস্থায় আমার মায়ের বড় সেবা করেছে মেয়েটা। তার এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে আলভীর। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। আমার স্কুলেই পড়ে। বলা হয় নি আমি একটা বেসরকারী কিন্টারগার্টেনের শিক্ষকও বটে। মা মারা যাবার পর আমার সময়টা কাটছিল না। পাড়ার এক বড়ভাইকে বলে তার স্কুলে একটা গতি করে নিয়েছি। ভাবনা সময় কেটে যাবে। আসলে যাচ্ছেও তাই। আলভীরও সে স্কুলেই পড়ে। আর দুপুরে আমার কাছেই তার টিউশন চলে। মাঝেমাঝে আমি রাগ করি।
: এমন বেয়াদপ ছাত্র আমি পড়াবনে।
: আর আমি এমন ভাল টিচার ছাড়া পড়বওনে….।
: এক কাজ কর, তোকে আরেকটা ভাল টিচার যোগার করে দি…।
: না…আমি পৃথুলা টিচার ছাড়া পড়বনে।
সোহেলী নামের ভালমেয়েটা মানে আমার বড়ভাবীও ভালমানুষী মুখ করে বলবে, হাগো…পৃথুলা…তোমার নাকি ছাত্র পছন্দ হচ্ছেনে….বেতন কি ঠিক হচ্ছেনে? আমার কোথায় যেন আতে ঘাঁ লাগে। আমি দাঁতে জিভ কাটি।
: সে কি কথা ভাবী!
আর আলভীরের বোন সোহানা। এ বয়সেই পাকামীর ডিব্বা।
: ফুপী তোমার কবে বিয়ে হবে?
: কেন?
: সবাই বলে তোমার বয়েস চলে যাচ্ছে।
আমি মুখ ঘুরিয়ে জোর করে হাসি। বুকের ভেতর এক জ্বালময়ী ক্ষত লুকিয়ে রাখি। যে ক্ষত আমি কাউকে দেখাতে চাইনা। যার বড়বোন ডিভোর্সের তকমা লাগিয়ে ঘরে বসে থাকে তাকে কে বিয়ে করবে? যার বড়বোন সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেনি, ছোটবোন হয়ে আমি কতটা সংসার করতে পারি!
মেঝ। মানে মেঝ ভাইয়ের কথা বলছি। রাসেল সাহেব। মা মারা যাবার পর একদিন নিজেই বিয়ে করে বসল। সবাইকে ঘোষণা দিল তার পছন্দ আছে। সে বিয়ে করতে চায়। বাড়ির লোকজন গিয়ে বউ নিয়ে এল।
আর ছোটজন তুহিন। বহুবছর প্রেমের পর দিনাজপুরের এক মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এল। তার বিয়ের সময় আমি অবশ্য বিদ্রোহ করেছিলাম। বেকার। তবু সে ছেলে বলেই বিয়ে করে নিয়ে আসতে পেরেছে। আমাদের বাড়িতে তুহিনের কথাই যেন আইন। সে অন্যায় বললেও সেটাই সত্যি। কেউ যেন কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। আর বাবা মারা যাবার পর সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে।
বাবা মারা যাবার পর সবাই ভুলে গেছে আমরাও দুটো বোন আছি। যারা মানুষ। যাদের সাধ আহলাদ থাকতে পারে। ভুলে গেছে সবাই আমাদের পাত্রস্থ করতে হবে। সে চেষ্টাটা এ বাড়ির সবাই একপ্রকার বাদই দিয়েছে যেন। মা মারা যাবার আগে মা কিছুটা ভাবতেন। বাবা ভেবেছেন। ভাবনাটুকুই সারা। আর এখন যেন এমন হয়েছে, ওদের নিয়ে বাপ-মাই ভাবেনি, আমরা ভেবে কি করব? ভাবীরা মুখেমুখে চুহ চুহ শব্দ করেন। কারো বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরোয় কিনা আমি ভেবে কুল পাইনা। একদিন তাদের বুকে মাথা রেখে শ্বাস টানাটা পরীক্ষা করতে হবে। সেটা করেও কোন লাভ আছে কিনা কে জানে। সত্যটাতো চোখের সামনে।
ওহ…আমার গল্পই বলছিলাম। ২০০১ সালে আমার এস এস সি দেবার কথা কিন্তু একবছর গ্যাপ দিয়েছিলাম আমি। ২০০২ সালে এস এস সি দিয়েছি আমি। সে সূত্র ধরেই আমি ০২০৪ নামের একটা গ্রুপে এডও হয়েছিলাম। সেখান হতেই আবিদের সাথে পরিচয়। পরিচয় হতে প্রণয়। আবেগে মোড়া এক সম্পর্ক। যদিও গ্রুপের সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক ছিল না। কারণ গ্রুপের নিয়ম অনুযায়ী যারা ২০০২ এর রেজিস্ট্রেশন তারাই গ্রুপের সদস্য থাকতে পারবে। আমিও নিয়মের বাইরে ছিলামনা। সঙ্গত কারণেই গ্রুপ থেকে লিভ নিয়েছিলাম। কিন্তু সম্পর্ক জুড়ে ছিল আবিদের সাথে। সে আবিদ আমার হৃদয়ের সঙ্গী হয়ে উঠল। আয়মানের সংগেও আমার চারবছরের সম্পর্ক ছিল। আমরা বিয়ে করব বলেও ভেবেছিলাম। আয়মানের জন্য আমি অপেক্ষাও করেছি। বাবা মারা যাবার পর ভাইদের সাথে বিদ্রোহও করেছিলাম। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আবিদ আমার মনের মানুষ হয়ে উঠেছিল। আয়মানের সংগে সম্পর্কটাকে কেমন করে ফিকে করে দিয়ে আবিদ রামধনুর মতন আমার কাছে রঙীণ হয়ে ওঠে।
: ভুলে যাও। তোমার আমি আছি না।
: একদিন তুমি নাই হয়ে যাবে।
: মোটেও না….তোমার সবাই চলে যাবে। রইব শুধু আমি।
আজ কেমন যেন নিজেকে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনে হয় আবিদের সাথে কেন জড়িয়েছিলাম? এমন মায়ার বাঁধনে না জড়ালেও চলত। আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে…তুষের আগুন। পুড়ে পুড়ে ছাই হয়। ছাইচাপা পড়া সে আগুন ভেতর হতে শব্দ তোলে।…..আবিদ…..আবিদ….। একটুক্ষণের জন্য আমি নামটা ভুলতে চাই। কেন যেন ভুলতে পারি না। আয়মানকে কত সহজে ভুলিয়ে দিয়েছে আবিদ নামের মানুষটা! আর আজ আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। আমি এমন নিঃস্বতো কোন কালে ছিলাম না। তবে কেন? কেন?

চলবে…..

মায়াবতী_মেঘ

১ম পর্ব
-অহনা কিঙ্বতী

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
2
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!