নাটক সিনেমায় দেখা যায়…
২০ বছর পর…
নায়কের দু’দিকের জুলফিতে পাকা পাকা চুল আর চোখে কালো ফ্রেমের চশমা!
নায়িকার মাথার তুলনায় অনেক বড় খোঁপা,সিঁথির দু’পাশে চুল সব সাদা আর চোখে অযথাই বিশাল বড় চশমা!!
২০ বছর তো হয়ে গেলো …কোথায় আমাদের তো ওদের মতো লাগে না!!
ধূর!!
জীবনে কিছুই নাটক সিনেমার মতো হলো না!!
না না!!ভুল বললাম!!
ইংল্যান্ডে আসার কিছুদিন পর জানতে পারলাম
কিছু একটা ব্যাপার আছে যার জন্য আমার মা আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল।
আমাকে নাকি এলাকার কমিশনারের ছেলে বিয়ে করতে চেয়েছিল।আমার মা ‘না’ করে দেয়ায় বলেছিল,
-বেশি সাহস দেখাবেন না।মেয়ে কিন্তু ঘরেই আছে!!
আমি অবাক হয়ে ফোনে আম্মুকে বললাম,
-কমিশনারের আবার ছেলে আছে নাকি?কোন ছেলে ?
আম্মু বলল,
-ঐ যে রড সিমেন্টর দোকানে বসে থাকতো।
আমি বললাম,
-রড সিমেন্টের দোকান আবার কোথায়?
আম্মু মহা বিরক্ত হয়ে বলল,
-তোরা দু’ভাইবোন হয়েছিল তোর আব্বুর মতো!!
ঘর থেকে বের হয়ে নাক বরাবর যাস,নাক বরাবর ফেরত আসিস।আশেপাশে কি আছে কিছুই জানিস না!!
আম্মুর কথা ১০০ ভাগ সত্যি !!আশেপাশে দেখার দরকার কখনোই মনে করতাম না।
তারপরও অনেক কৌতুহল নিয়ে বললাম,
-কোন ছেলে?
আম্মু আরো বিরক্ত হয়ে বলল,
আরে !!ঘোলা চোখের ছেলেটা!!
পুরো ব্রেনের মেমোরি সার্চ দিয়েও কোন ঘোলা চোখের ছেলে খুঁজে পেলাম না!!
আমি হেসে ফেললাম।
বললাম,
-বেচারা ঘোলা চোখে কি দেখতে কি দেখেছে!!জরিনা কে দেখছে কারিনা!!বেচারার দোষ নাই,ঘোলা চোখের দোষ!!
এবার আম্মু সত্যিই রেগে গেলো।বলল,
-নিজের সম্পর্কে এতো খারাপ ধারনা কেন?
আমার মেয়ে কত সুন্দর !!সবকিছুতেই তোর ফাজলামি!!
আমি হাসলাম।
পৃথিবীতে এই একজন মানুষ,যার চোখে আমি বিশ্ব সুন্দরী !!
ব্যাপারটা আসলেই জটিল ছিল তখন।
ভাইয়া আমেরিকা যাবার সময় হয়ে আসছে,আব্বু নেই!আমার মা ভয় পেয়ে ছেলে দেখা শুরু করে দিল।
আমি এসব কিছুই জানতাম না।
আব্বু সব সময় বলতো,সাত সাগর তের নদী পার হয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমার জন্য রাজপুএ আসবে!!
রাজপুএ ঘোড়ায় চড়ে না এলেও একজন এলো প্লেনে করে ইংল্যান্ড থেকে,ছাএ মানুষ,বই খাতা ছাড়া কোন ঢাল তলোয়ার নাই!!
বেচারা বিয়ের পর যতবার এসেছে,একা আসে নাই।তার ছোট দুই ভাই একজন ডানদিকে আরেকজন বামদিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসতো।এই দুই ভাই হলো তার থেকেও ভীতু!!
আমার ভাইয়ার একটা পোষা কুকুর ছিল,ল্যাসি।
নতুন জামাই ভাইদের নিয়ে আসার পর তার কাজ ছিল ঘেউ ঘেউ করে বাড়ি মাথায় করা।নতুন জামাই তখন গেটের বাইরে থেকে চিকন গলায় ডাকত,
-ভাইয়া,ভাইয়া…..আমি শাহনূর!!
আর আমাদের বাসার ছেলেটা আমাকে হাসিমুখে খবর দিতো,
-আপা,ল্যাসি আবার নতুন দুলাভাই আর তার ভাইগো দৌড়ানি দিছে!!
আমার রাগে গা জ্বলে যেতো।তাকে বললাম,
-চোরের মতো সন্ধ্যায় আসো কেন?ল্যাসি যে তোমাকে কামড় দেয় নাই এখনো এটাই তো বড় ব্যাপার !!আর একা আসতে ভয় পাও কেন?
সে মিনমিন করে বলল,
-আব্বা আমাকে ঢাকায় আসলে একা কোথায়ও যেতে দেন না।আর ভাইয়ার কুকুর পোষার কি দরকার?
বিড়াল পুষলেই তো পারতো!!
এই নিরীহ ভদ্রলোক যদি ঘোলা চোখের কথা জানতো,আমাকে বিয়ে করা দূরের কথা !!আমাদের বাড়ির আশেপাশে ভিড়তো না!!
যাই হোক,এই ঘটনা জানার পর নিজেকে বেশ নায়িকা নায়িকা মনে হলো!!উনি কাজ থেকে ফেরার পর খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম।সব শুনে সে খুবই নিরাসক্ত গলায় বলল ,তাই নাকি!!
হায়রে কপাল!!
বেচারা বুঝলই না যে ,সে আমাকে যতই সাধারন জরিনা মনে করে,আসলে আমি কারো ঘোলা চোখে কারিনা!!
আফসোস!!
কি এক আনরোমান্টিক মানুষ রে বাবা!!
আমার ছেলের যখন এক বছর বয়স,তখন আমি সপ্তাহে ২ দিন কাজে যাওয়া শুরু করলাম।যেতে হতো বহুদূর।ট্রেনে যেতে এক ঘন্টা ,আসতে এক ঘন্টা !!সত্যি বলতে কি যাওয়া আসার সময় টাই বেশি উপভোগ করতাম কাজের থেকে!
একদিন ট্রেনে এক এশিয়ান ছেলে আমার পাশে বসল।কিছুক্ষন পর আমাকে জিজ্ঞেস করল,
-Hi,where are you from?
আমি বললাম,
-from Bangladesh
সে মহাখুশি হয়ে বলল,
-আমিও বাংলাদেশী।
আমি ও আনন্দিত হলাম।ট্রেনে অন্তত একজন বাংগালি আছে ভেবে।তবে এরপরের প্রশ্নে আমি ভিমরি খেলাম!!সে জিজ্ঞেস করল,
-আপনি কি সিংগেল না ডাবল?
আমি বললাম,
-ভাই আমি বিবাহিত।আমার এক বছরের একটা ছেলে আছে।
সে কি বুঝল জানি না!খাঁটি বাংলায় বলল,
-ফথের মাঝে খত মানুষ দেহি,আফনার লাহান খাউরে দেহি না।আমি আফনারে বালা ফাই!!
আমি কি বলব বুঝে উঠতে পারলাম না।
কথা ওখানেই শেষ!!
বাসায় এসে বলতেই সে খুবই বিরক্ত হয়ে বলল,
-তোমাকে এজন্যই বলি চশমা পর !!এমনি তোমাকে দেখতে ছোট লাগে।
আমি বললাম,
-চোখে তো সমস্যা নাই।চশমা পরব কেন ?আজব তো!!
পরের দিন স্টেশনে যেয়ে দেখি সেই ছেলে তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে।কি মুসিবত!!
কোন রকমে লুকিয়ে বাসায় এসে বললাম,
-তুমি কালকে আমাকে নিতে আসবে।তাহলে ওই ছেলে আর ঝামেলা করবে না।
পরদিন আমার কাজ শেষ করে বের হয়ে দেখি কেউ নিতে আসে নাই।ফোনে দেখি অনেক গুলো মিস কল।ফোন দেবার পর উনি অস্থির কন্ঠে বলল,
-ট্রেন চলছে না।আগের স্টেশনে এসে বন্ধ হয়ে গেছে।আমি আটকে গেছি।তুমি এই স্টেশনে নাম।
হায়রে!!
আমাকে উদ্ধার করতে যেয়ে নিজেই আটক!!
কি আর করা।
এর পরের সপ্তাহে আমরা বাংলাদেশে বেড়াতে যাই।আসার পর সেই ছেলেকে আর দেখি নাই!!
ভাগ্যিস!!
যাই হোক,এখন আমি সিংগেল কিংবা ডাবল নেই,আমি মাল্টিপল!!
চোখে এখন পড়ালেখার জন্য চশমা দিতে হয়।
আমাকে পাহারা দিতে আমি নিজেই যথেস্ট ,সাথে আ্যাকাউনটেন্ট সাহেবেকেও পাহারা দেই!
তবে মনে বড় আশা ছিল, যদি আমার হিরো ঐ ‘ঘোলা চোখ ‘আর ‘সিংগেল ভিলেন ‘কে নায়ক জসিমের মতো ঢিসুম ঢিসুম ঘুষি দিতে পারতো!!
জীবনের একটা দৃশ্য অন্তত সিনেমাটিক হতো!!
আহা!!
– Shaila Sharmin
Send private message to author






