‘বল্টুর বাবা, আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই!’
মাঝরাতে বল্টুর আম্মার এমন এসএমএস দেখে চমকে গেলাম।! ঘুম ফেলে উনি আমার সাথে প্রেম করতে চান- এতো বেসম্ভব কথা! ঘড়িতে তখন ১ টা ৩৫ মিনিট। ব্যাপার কি? যে Sleeping beauty’r ১০০ বছরের ঘুম ভাংগানো গেছে, আমার বউয়ের ক্ষেত্রে তো তাও সম্ভব না! মাঝে মাঝে সত্যি সিরিয়াস হয়ে যাই আমার বউকে দেখেই মনে হয় লেখা হয়েছিল -“early to bed, and early to rise…”
ওনার একঘুমে সকাল। এর মাঝে কি হইল, না হইল, কি আসলো কি গেলো এটা নিয়ে মাথা ব্যাথা নাই! চোর ডাকাতের জন্য স্বপ্নের ক্যারেক্টর। যাইহোক বউয়ের মেসেজ এসেছে এটাই বড় কথা! অবাক হলো ও খুশি খুশি মনে রিপ্লাই দিলাম
‘কি হলো? ঘুমাও নি এখনো?’
‘ না গো, ঘুম আসছেনা!”
বাপরে! পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য কথা! জিজ্ঞেস করলাম
“কেন গো?!”
“স্বামীকে মনে পড়ে!”
বউ যেভাবে বললো, আমার “পদ্মানদীর মাঝি”-র কপিলার কথা মনে পড়ে গেলো! কপিলা তো দুলাভাইয়ের সাথে ইটিসপিটিস করতে যেয়ে স্বামীকে মনে করেছে, আমার বউ কি করতে যেয়ে স্বামীকে মনে করলো একমাত্র আল্লাহই জানে!
” আহা!!! বল্টু কি ঘুমায়?”
“হ্যাঁ ঘুমিয়েছে সেই কখন।”
“তুমি এত রাতে কি কর?”
” জানিনা গো, ভাল লাগেনা”
বাপের বাড়ি বেড়াতে যেয়ে কোন মেয়ের ভালো লাগেনা এমন কখনো শুনেছেন ? আজ ১০ দিন হলো বউ তার মা’র বাড়িতে গেছে। আরো সপ্তাহখানেক পর ফিরবে। এরইমধ্যে ভাল লাগেনা, ভালোই লাগছে শুনতে!
“যাও ঘুমাও, শরীর খারাপ করবে”
“তুমিও তো জেগে আছ। কি করো?”
“এই তো অফিসের কিছু কাজ করি”
“হম…রাতে কি খেলে?”
“ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল।”
“একটা ডিম ভাজি করে নিতে পারতে গো”
“অনেক ক্ষুধা লেগেছিল। অফিস থেকে এসে আর কিছু করার শক্তি ছিল না। তুমি যাও বাবু, ঘুমাও।
যারা ভাবছেন আমি আদর করে বউকে বাবু বলেছি তাদের ধারণা ভুল। আমার বউয়ের ভালো নাম ফারজানা শবনম আর ডাক নাম ” বাবু”। এই বাবু নাম নিয়ে যে কত ইতিহাস হলো! আমার বিয়ের পর বড় ফুপু এসেছিলেন নতুন বউ দেখতে। অসুস্থ ছিলেন তাই বিয়েতে আসতে পারেননি। আমাদের বাসায় ৭ দিন ছিলেন। ফিরে যেয়ে সবাইকে নাকি বলে বেড়িয়েছেন আমি নাকি বিয়ের পর ন্যাকামি শিখেছি, বউকে ‘বাবু খাইছ?” ছাড়া কথাই বলিনা! আমার মাকেও ফোন করে বলেছেন ‘তোমার ছেলেকে একটু বাবু বাবু কম করতে বলবে। লজ্জার মাথা খেলো! বুড়া বয়সে বিয়ে করেছো তো তাই এত ভীমরতি ! “
ফুপুর কোন এংগেল থেকে মনে হলো আমি বুড়ো বয়সে বিয়ে করেছি তাও বুঝলাম না। আমার বিয়েতে ফুপু একটু কষ্টই পেয়েছেন। মনে মনে ইচ্ছা ছিল আমার ফুপাতো বোনের সাথে আমার বিয়ে দিবেন কিন্তু তার আগেই ফুপাতো বোন ক্লাসমেটের সাথে প্রেম করে একা একাই বিয়ে সেরে ফেলেছে!
বল্টুর মার সাথে ‘মেসেজ গেইম’ খেলতে খেলতে ফজরের আজান দিয়ে দিল। বিয়ের পর এই প্রথম বাবু এত রাত পর্যন্ত জেগেছে!
তারপরের দিন সেই একই মেসেজ শুধু এবার যুক্ত হয়েছে ৩ টা ‘অনেক’…
“বল্টুর বাবা! আমি তোমার সাথে অনেক অনেক অনেক প্রেম করতে চাই!”
ঘড়ির দিকে তাকালাম। ১২টা বাজে। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে। বল্টুর মা না ঘুমিয়ে আমাকে মনে করছে! হাউ রোমান্টিক!
“ও গো! এবার বাসায় আসলে আমরা রাত জেগে মুভি দেখবো আর পপকর্ন খাবো, কেমন? “
“আচ্ছা! তোমার ঘুম ধরবে না?”
“না তো! এই কয়দিন রাত জেগে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে!”
“ঠিক আছে”
” আমি তুমি আমরা দুইজন চাঁদনী রাতে ছাঁদে যেয়ে জোসনা দেখবো, আর আচার খাবো, আচ্ছা?”
সিনেমা দেখতে দেখতে মানুষ পপকর্ন খায় কিন্তু জোসনা দেখতে দেখতে বল্টুর মা কোন যুক্তিতে আচার খাবে- না বুঝেই আচ্ছা বললাম।
আমি মুখ টিপে হাসছি আর লিখছি “আচ্ছা। ও, তুমি তো বললে না কি সিনেমা দেখবে? হরর মুভি?”
“আরেহ না! রোমান্টিক সিনেমা। কাজল আর শাহরুখ খানের”
“ওকে বাবু!”
“বল্টুর বাবা তুমি মাঝে মাঝে আমার চুলটা আচড়িয়ে একটু তেলও তো দিয়ে দিতে পারো?!”
“আচ্ছা, এবার আসো, চুল আচড়িয়ে তেল দিয়ে তোমাকে বেনিও করে দিবো”
” মনে আছে বিয়ের পর কয়েকদিন তুমি আমাকে ভাত খাইয়ে দিয়েছিলে? এখন আর দাও না!’ বাবুর কন্ঠে এবার অভিমানের সুর।
“ওহো! হুম…. ভাত, পোলাও, বিরিয়ানির সব খাওয়ায় দিবো, বেবি!”
হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। এবার আদর করে ‘বেবি’ বলে ফেললাম!
এভাবেই আমরা প্রতিদিন প্রেম প্রেম খেলে যাচ্ছি। আমি অনেক নস্টালজিক হয়ে পড়েছি।বাবুর সাথে বিয়ে, বিয়ের আগের কথা খুব মনে পড়ছে। আমাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ।আনুষ্ঠানিকভাবে আমি কোন পাত্রী দেখতে যাইনি। পুরো ব্যাপারটা সাজানো হয়েছিল এভাবে বাবু, বাবুর খালাতো বোনের সাথে শপিং এ যাবো আর আমি আমার বোন যেয়ে বাবুকে দেখে আসবো। বাসায় যেয়ে, মেয়ে বিরাট ঘোমটা মাথায় ট্রেতে করে চা নিয়ে আসবে এমনভাবে পাত্রী দেখার পক্ষে আমি কোনদিনও ছিলাম না। যাইহোক, বাবুর মধ্যে অতিরঞ্জিত কিছু দেখিনি সেদিন, সাদাসিধে ড্রেসাপ আর লিপ্সটিক দেখে মনে হচ্ছিল কেউ জোর করে দিয়ে দিয়েছে বরং বাবুর খালাতো বোনের সাজগোজ এমনই ঝিলিক মারছিল যেন তাকেই পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে!
দ্বিতীয়বার বাবুর সাথে দেখা করেছি একটা রেস্টুরেন্টে। সেটা সবাই জানতো, বাবুও জানতো। তেমন কোন কথাই হয়নি। টেনশনে জড়সড় হয়েছিল মেয়েটা। আমার অনেক খারাপ লেগেছিল। পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম
“আমার সাথে দেখা করতে হয়েছে তার মানে এই নয় আমাকে আপনার বিয়ে করতে হবে।”
বেশি ভদ্রতা করতে যেয়ে বাবু তাড়াহুড়া করে বোকার মতন উত্তর দিয়েছিল “না না, তা কেন হবে!? আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে!!!”
সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়ে গেলো!
সেদিনই রাতে বাবুকে ফোন দিয়েছিলাম। রাত তখন স্টিল ইয়াং ১০ টা সাড়ে ১০ টা হবে। হাই /হ্যালো করার পর যখন আমাদের আসল গল্প শুরু হবে ঐপাশের পৃথিবী যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো! আমি বার বার বলেই যাচ্ছিলাম আপনার যদি অস্বস্তি লাগে ফোনটা রেখে দিতে পারেন। তাতেও কোন হ্যাঁ /না নাই। ‘এত লজ্জা আপনার?!’ তাও বাবু চুপ! আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমাকে সে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু বলতে পারছেনা। হঠাৎ মনে হলো বাবু মেয়েটা কাঁদছে! কান্নার ফুসফুস শব্দ। মেয়েটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে কেন!? কি এত কষ্ট তার?! আমার হৃদয় এবার কিন্তু সত্যি ভেংগে খান খান হয়ে যাচ্ছে…. সকল জল্পনা কল্পনাকে মিথ্যা করে আমি মনোযোগ দিয়ে যা বুঝলাম বাবু ফোস ফোস করে নাক ডাকছে! মানে বাবু ঘুমিয়ে পরেছে!? হায় হায়! এই মেয়ে তো ইউনিক! কই এক্সাইটমেন্টে ঘুম আসবেনা, সারা রাত জেগে কথা বলবে, বিয়ের পর কি করবে, কয়টা বাচ্চা হবে, বাচ্চাগুলার নাম কি হবে, বাচ্চাগুলারে কই বিয়ে এসব গল্প করবে তা না -আর এই মেয়ে দেখি এক অচেনা অজানা মানুষকে ফোনে রেখে ঘুমাচ্ছে তাও আবার যার সাথে বিয়ের কথা চলছে!!! সবকিছুতেই চমক! বড়ই বিচিত্র পৃথিবী! এটা হাসির কথা হলেও আমার কিন্তু একটুও হাসি আসেনি, বরং মেয়েটার প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ জন্মেছিল। কৃত্রিমতাহীন সরল মেয়েটার অদৃশ্য জালে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। যাকে ভালোবাসলে কোনদিনও শেষ হবেনা…
আজ সাড়ে ৪ বছর পর আবার আমাদের প্রথম সেই ফোন প্রেমালাপের(!) কথা মনে পড়ে গেলো। সেইদিনের সেই অসমাপ্ত গল্পগুলোই যেন আজ বাবু করতে চাইছে! আমরা ক্রমে ক্রমে ভালোবাসার সাগরে হারিয়ে যাচ্ছি… বাবু অনেক বদলে গেছে, অবশ্যই পজিটিভ চেঞ্জ! আগের থেকে আমাকে অনেক বেশি পেতে চায়, ভালোবাসতে চায়…. চোখের পলকে ৭ দিন কিভাবে চলে গেলো বুঝলামই না!
পুনশ্চঃ আজ ৫ দিন হলো আমার বউ বাসায় এসেছে। বউয়ের আগমন উপলক্ষে আমি খুবই এক্সাইটেড! আগে বউ আমার যেখানে রাত সাড়ে দশটার মধ্যে ছেলেকে নিয়ে বিছানায় চলে যেতো এখন ঘড়ির কাটা ১০ টা বাজার সাথে সাথে ছেলে ঘুমাক বা না ঘুমাক, বাবু আমার দিকে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে, হারিয়ে যায় ঘুমের রাজ্যে! তার প্রোমোশনে আমি ব্যাথিত না আনন্দিত তা জানিনা কিন্তু শুধু এটাই বলতে পারি আমাকে এমন মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে কেউ একজন যে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে, পরমশান্তিতে ঘুমাতে পারছে – এটাও ভালোবাসার একটা ধরণ! সেটাই আমার পরম প্রাপ্তি! তবে ভাবছি এখন থেকে প্রতিমাসে একবার হলেও বউকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবো ততদিন ঘুমাক আমার ঘুমকুমারী!
Send private message to author






