বাবার পছন্দ করা পাত্রের সাথে আমার বিয়ে হলো।ছেলের সাথে বিয়ের আগে একবার দেখা হয়েছে। নাইম একটু বোকা ধরনের ছেলে, ঠিক বোকা না, একটু সরল মনের মানুষ। মেয়েদের সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত না।বিয়ের আগে যেদিন দেখা করলাম কথায় জড়তা ছিল। নাইম কে আমার খারাপ লাগেনি আবার খুব ভালোও লাগেনি। বাবার পছন্দের কারনে বিয়েটা হয়েছে।
বাসর রাতে নাইম আমার পাশে এসে বসে রইল নীরব হয়ে, মনে হয় কথা খুঁজে পাচ্ছে না।বা কী ভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে আমার হাত ধরলো আবার দ্রুত সরে গিয়ে স্যরি বলল। ওর কান্ড দেখে আমার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল। মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লাগল! কেমন মায়া মায়া চোখে আমায় দেখছে আমি ঘোমটা না তুলে কাপড়ের ফাঁক দিয়ে ও কে দেখছি। আবার বলা শুরু করল “আপনাকে কিছু কথা বলা দরকার ” আমি ঘোমটা তুলে বললাম বলো, আর আপনি, আপনি করছ কেন! তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে কথা বলছ পাশের বাড়ির ভাবির সাথে না।আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। নতুন বউ এমন গরগর করে কথা বলবে বেচারা আশা করেনি। ঠিক আছে বলো, একটু আমতা আমতা করে বলা শুরু করল।
তোমাকে কিছু কথা বলি, “আমি সবেমাত্র ভার্সিটিতে পা দিয়েছি তখন বাবা মারা যায়। বুঝোইতো মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবারাই থাকে একমাত্র আয়ের উৎস। হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ায় আমরা গভীর খাদে পড়ে যাই।আমার ভাই-বোন দুজন অনেক ছোট। রুমি পড়ে ক্লাস ফাইভে আর রনি ক্লাস সেভেন। মা অনেক কষ্টে আমাদের কে বড় করেছে। এটা ঠিক আমিও টিউশনি করে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ছোট ভাই-বোন আর মা এরাই আমার সব। আমি জানি ওরা একটু দুষ্টু তোমাকে খুব জ্বালাবে। একটু মানিয়ে নিও।”
প্রথমে এমন রাগ হয়েছিল! এই বোকা মানুষগুলোর উপর রাগ করা যায় না। কেমন মায়া নিয়ে কথা বলে। সব রাগ এক নিমিষেই মাটি হয়ে যায়।বাসর রাতে মানুষ কত আনন্দ করে শুনেছি আমার কাটল কেঁদে! নাইমের সব কষ্টের কাহিনি শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। এ বোকা সরল মানুষটার প্রেমে পড়ে গেলাম বাসর রাতে। কী আশ্চর্য! মায়ার এমন টান তা ছাড়ানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। মেয়ে মানুষের তো ক্ষমতা আর কম। মেয়ে মানুষ একবার কারো মায়ায় পড়লে সারাজীবন ভুলতে পারে না। এ জন্য মেয়েরা প্রেমে পড়তে সময় নেয় কিন্তু একবার পড়লে তাকে আর ভুলে না।
নাইমের মায়ায় পড়ে সব কেমন মেনে নিতে শুরু করলাম। ওর মায়ের অন্যায়ভাবে হুকুমজারি,ভাই বোনের অবহেলা সব কেমন মানিয়ে নিতে শুরু করলাম! এখন আমি নিজেই নিজেকে চিনি না। আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছি। সব নাইমের মায়ায় পড়ে, সংসারের ভেরা জালে । বোকাটা সারাদিন শেষে রাতে এসে কেমন করে বলে, “জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমাকে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হচ্ছে! ” এসব শুনার পর সারাদিনে জমা থাকে কষ্টের মেঘ কেমন করে সরে আকাশটা পরিস্কার হয়ে যায়।আসলে মানুষটার মন খুব নরম! সবাই কে আপন করে থাকতে চায়। ওর পরিবারের অন্যরা ওর মতো করে ভাবে না। সব-কয়টা চরম স্বার্থপর!
ছাড় দিলে মানুষ বাড়তে থাকে। আমি যত ওদের সাথে মিশার চেষ্টা করতে লাগলাম সব ভুলে ততই ওরা আমার নানা ভুল ধরতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।
আমার ছোট দেবর সে তো মহা পুরুষ! আমার সব কাজের খুঁত বের করে।
শাশুড়ির কাছে গিয়ে বলে, “মা আগেই বলেছিলাম এমন মেয়ে বিয়ে করাইয়ো না, এখন বুঝ কেমন লাগে! ” এসব যে আমার আড়ালে বলে, তা না এমনভাবে বলে যেন আমি শুনতে পাই। আমার আদরের ননদ সেতো এক কাঠি সরস! কথায়, কথায় বলে, “মা ভাইয়া বিয়ের করে পর হয়ে গেছে আগের মতো আমাদের দিকে নজর দেয় না।ভাবী ভাইয়ের মাথাটা খেয়েছে! “
নাইম কে এ সব বলে লাভ নেই, বোকাটা মায়ের অন্ধ ভক্ত। ভাই-বোন ওর কাছে খুবই ছোট! এরা এখনো কিছুই বুঝে না। এটা ঠিক নাইম আমাকে ওদের কোন নালিশ শুনে সেটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে না। শুধু বলদের মতো বলবে “জানি তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে! ” এমন বোকার সাথে না কিছু বলা যায় না রাগ করা যায়। ও বুঝতেই চায় না। একটু একটু ক্ষোভ, রাগ, জমছে মনের মাঝে। সব ফেলে চলে যেতে ইচ্ছে করে। আবার বোকাটার কথা মনে পড়লে কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে যাই!
বাঘ দীর্ঘদিন বিড়ালের সাথে বাস করলে বিড়াল বনে যায়। আমিও সংসারে এসে কেমন গ্রাম্য মেয়েদের মতো মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। এখন আর গোপন কষ্টে বুক ভিজে না। এক আধটু জ্বলে দিয়াশলাই জ্বালানোর সময় আচমকা লাগার মতো। বয়সে কত ছোট ননদের আবদার বলবো, না হুকুম বলবো বুঝে উঠতে পারি না। আজকাল তুখোড় মাথাটা ভোতা হয়ে গেছে। এখন হুটহাট কাজ করে না। কলেজ দাপড়িয়ে একগাদা কাগজ জুগিয়েছিলাম তা এখন পুরোনো খবরের কাগজের মতো জায়গা দখল করে আছে। সব ভুলে একমনে সবার আবদার মিটাতে সময় কেটে যায়। বান্ধবিদের সাথে আলাপে মনে হয় আমিই ভালো আছি। ওরা দুঃখ করে বলে,” তোর কপাল ভালো ভাই তো অত্যন্ত তোকে একটু বুঝে।আমাদের ওরা তো উল্টো কথা শুনায়,একটু যদি বুঝতো!” এসব শুনলে মনে হয় আমি ভালোই আছি। মেয়ে মানুষের এ এক জীবন!
আমি সকালে উঠে সবার নাস্ত বানাই, শাশুড়ী ভোরে উঠে নামাজ পড়ে, জায়নামাজ বসে থাকে অনেকটা সময়। এটাই এখন আমার নিত্যদিনের রুটিন।
সেদিন মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেছে। উঠে দেখি নাইম অফিসে চলে গেছে নাস্তা না করে। আমি আবার শুয়ে পড়লাম।মাথা ব্যথাটা তখনও আছে। এসময় দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা মারছে আর ডাকছে ভাবী, ভাবী বলে, আমার ননদ রুমি। ডাকের স্বরে রাগ, বিরক্তি মিশানো! একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলে রুক্ষ কন্ঠে বললাম,” কী হয়েছে? “
“তুমি এখনও পড়ে ঘুমাচ্ছো ওদিকে সবাই না খেয়ে আছে,খালাম্মা আসছে, মা বলছে তাড়াতাড়ি নাস্তা বানাতে। “
শরীরে আগুন ধরে গেল, ধমক দিয়ে বললাম,” যাও এখানে থেকে, গিয়ো বলো আমার মাথা ধরেছে। নাস্তা বানাতে পারবো না।” ধরাম করে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম,সারা শরীরটা জ্বলছে!
এ নিয়ে আমার বিচার বসানো হয়েছে, আমার দেবর বাবা কে খবর দিয়েছে। খালা শুশুর, মামা শশুর সবাই উপস্থিত। নাইম অফিসে এখনো আসেনি। বাবা মুখ গোমড়া করে বসে আছে। আমার শাশুড়ি বাবার সাথে এখনও পর্যন্ত একটা কথা বলেনি,এমনকি কুশল বিনিময় পর্যন্ত করেনি।আমার ভিতরে একটা জেদ কাজ করছে দেখি এরা কী করে? জানি নাইম বলদটা কিছুই বলবে না এদের বিপক্ষে। হয়তো বলবে, একটু মানিয়ে নিতে পারলে না!
নাইম এসে সবাইকে দেখে অবাক হয়ে বলল, বাহ! আজ এত মেহমান উপস্থিত। কোন আয়োজন হয়েছে? আমি কোন জবাব দিলাম না।একটু মুখ গোমড়া সরে আসলাম। তার মানে নাইম কিছুই জানে না! ওকে কিছুই বলেনি উনারা। কী অদ্ভুত!
সবাই একে একে আমার বিপক্ষে নানা অভিযোগ করছে। আমার শাশুড়ী, ননদ,দেবর সবাই তাদের নালিশ পেশ করল,আমি হতবাক হয়ে শুনছি আমার বিরুদ্ধে এদের এত অভিযোগ! কাদের জন্য এতদিন এত ছাড় দিলাম। নাইম দেখি নিশ্চুপ শুনছে! একটাও কথা বলছে না। আমার বাবা আমার দিকে তাকাচ্ছে না লজ্জায়। মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
সবার বলা শেষে আমার বাবা বলতে,শুরু করবেন এমন সময় হঠাৎ নাইম উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাবা আপনি বসেন আমার কিছু কথা আছে। “প্রথমে জিজ্ঞেস করল,” বাবা কে খবর দিয়েছে কে? ” আমার দেবর গর্বিত হয়ে বললো,” আমি। ” আমাদের সবাই কে বিস্মিত করে নাইম আমার দেবর কে কষে এক চড় মারল! “আমার স্ত্রীর বিচার বসানো হয়েছে অথচ আমিই জানি না। এতদিন যাবৎ আমি শুধু ও কে মানিয়ে চলার জন্য বলে এসেছি।
আমি দেখতাছি বেচারি কী পরিমান কষ্ট সহ্য করছে! ওর কী দরকার আমার ভাই-বোনের যত্ন করা? মায়ের সেবা করা? এ সব তো আমার জন্য করেছে। আসলে বাবা আপনার উচিৎ ছিল আমাকে এরকম করে চড় মারা। আমি আপনার মেয়ে কে এ বাড়িতে এনে ওর যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি। না হলে আমার ছোট ভাই, বোন ঠিক করবে আমার স্ত্রী কী করবে! আমার আত্মীয় স্বজন এসে বিচার করবে! ভুলটা আমারই হয়েছে। আমি সম্পর্কের ব্যালেন্স করতে পারিনি। প্রতিটা জিনিসের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে তার কম দিলে যেমন ভালো হয় না বেশি দিলেও নষ্ট হয়। এটা আমি এতদিন বুঝিনি। তাই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ভুল হলে সুধরাতে একটু ক্ষতিপূরন দিতেই হয়। সেটাই এখন করবো।”
আমি পুরোটা সময় বিমুগ্ধ হয়ে বোকাটার কান্ড দেখলাম। চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে! সত্যি আমি বোকাটা কে সম্পূর্ণ বুঝতে পারিনি। বাবা চলে যাওয়ার সময় বললেন, “মা রে আমি প্রথমে একটু লজ্জিত হয়ে ছিলাম। আমি মানুষ চিনতে ভুল করলাম! এখন বুঝতে পারছি আমি নাইম কে চিনতে ভুল করিনি।”
সেদিনের পর নাইম আলাদা বাসা নিয়েছে, আমি নিষেধ করেছি শুনেনি।নাইম বলে, “দেখ মা,ভাই,বোন কে দেখভাল করা আমার দায়িত্ব। সেটা আমি অবশ্য পালন করবো। সেখানে একটুও কমতি রাখবো না।আমি এতদিন যেটা বুঝিনি। তাদের হক পালন করতে গিয়ে তোমার অধিকার নষ্ট কেন করবো! সম্পর্কে সমভাগ রাখাটা জরুরী। “
এখন আমরা আলাদা থাকি সত্যি, কিন্তু প্রায় প্রতিদিন নাইম মায়ের বাসায় যায়, অনেকটা সময় কাটিয়ে আসে। সপ্তাহ একদিন আমি ওর সাথে যাই সারাদিন থাকি। আমি আমার সংসার নিয়ে আছি আর আমার শাশুড়ি তার সংসার নিয়ে আছে।বোকাটা যে এত বুঝবে আমার কল্পনাতেও ছিল না। সেই প্রথম রাতেই তো বোকাটার মায়ায় পড়েছিলাম। এখন তো হাবুডুবু খাচ্ছি। বাকী জীবনে আর এই মায়ার সাগর থেকে উঠতে পারবো বলে মনে হয় না।
® নাবিল মাহমুদ ( Nabil Mahmud)
Send private message to author






গল্পটা খুবই চমৎকার হয়েছে।