শেষ যেইবার আমাদের কথা হইলো তুমি তখন ইন্ডিয়া ট্যুরে। আমি নিজেরে খোঁজার চেষ্টা করতেছিলাম। বিশ্বাস করো আমি যতো নিজেরে ধরতে চাইতেছিলাম ততো আমি আরো বেশি দূরে হারায় যাইতেছিলাম রায়হান। সেইবারের কিছুদিন আগে তুমি সাজেক ট্যুর প্ল্যান করছো। যাওয়ার আগের দিনও আমি বললাম যাইয়ো না রায়হান। ততোদিনে আমি এই যান্ত্রিকতার শহরে হারায় গেছি। তুমি বলছিলা তুমি একলা থাকতে চাও। তাও ফোন করে জানতে চাইলা কেন মানা করতেছি যাইতে। তুমি তো নতুন সময়ে পা বাড়ায়লা। কেবল আমি তোমায় ছুঁইতে পারলাম না। তারপর ঈদ আসলো। তোমরা ইন্ডিয়া ট্যুর প্ল্যান করলা। আমি তখনো তোমারে দেখি। সাজেকে বিশাল মেঘ তোমারে ঢেকে রাখছে। নতুন নতুন মানুষ তোমার চারপাশে। হঠাৎ খেয়াল করলাম উল্টা টি শার্ট পরা, চুল এলোমেলো ছেলেটা টি- শার্ট ভাজ করা শিখে গেছে। তোমার কি মনে আছে রায়হান? সেবার তুমি দুদিন ধরে না খেয়ে আছো আন্টির সাথে রাগ করে। আমি ছুটে গেছি তোমার বাসায়। হাত ধুয়ে মুরগির গোশ দিয়ে ভাত মেখে মুখের সামনে ধরলাম। প্লেটে থাকা শেষ লুকমাটুকু তুমি খাবানা বললা। আমি এঁটো ভাতটুকু খেয়ে শেষ করে তোমার মুখ ধুঁয়ে ওড়না দিয়ে মুছে দিলাম। আম্মা এখনো আমায় বলে জানো কারণ আমি কারো এঁটো ভাত খেতে পারিনা। আমার জন্মদিনে মনে আছে সারাদিন ঝগড়া হলো আমাদের তাও সামান্য বই নিয়ে। আমি রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়ায় ছিলাম দেখে তুমি রেগে গেছিলে। জন্মদিনে লিখা চিঠিটাও ছিড়ে ফেলে দিলে। তোমায় বন্ধুরা ফোন দিয়ে বললো এমন করিস না তো। দেখবি সময় ফুরায় যাবে। সেদিন সন্ধ্যায় ছাদে গেলাম তোমার। কাকার দোকান থেকে দুটো চায়ের কাপ আর বিস্কিট নিয়ে ছাদে আসলে তুমি। ছাদে জোৎস্নার আলো ভরা। গাছের ফাঁকে চাঁদের আলো আমাদের মুখে এসে পরছিলো। সেবার তোমার পয়ের উপর ভর দিয়ে আমায় হাঁটিয়েছিলে। আমি ভরসা করে নিশ্চিন্তে পুরু ভারটুকু তোমার উপর রেখে হাঁটতে শুরু করলাম। তুমি তখন প্রায় বলতে সময় চলে যাচ্ছে এই বীভৎস ব্যাপারটা দেখতে তোমার ভাল লাগেনা। আসলে সময় চলে যাচ্ছিলো রায়হান। আমাদের সময়টুকু সমাপ্তি টানতে যাচ্ছিলো।
তারপর তুমি বলে উঠলে তোমার নিজস্ব সময় চাই। তোমার নিজেকে চাই। তুমি কোথাও নিজেকে খোঁজে পাচ্ছ না। আমি কোথায় ছিলাম তুমি কি একবার ও জানতে চেয়েছ রায়হান!! আবারো আমার জন্মদিন চলে আসলো। তুমি ইচ্ছে করে ভুলে থাকলে। আর আমি চুপ করে অপেক্ষা করছি। আমি তখনো ভেবে গেছি তোমায় বাড়ি ফিরতে হবে। আমরা হঠাৎ করে কেমন বড় হয়ে গেলাম নিমিষে।
শেষবার আমাদের যখন দেখা হলো আমি তোমার হাতটা ধরে জিজ্ঞেস করলাম আর কি সম্ভব না!! থেকে যাও রায়হায়। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে বললে ‘না’। হাতটা ছেড়ে দিলাম। বের হয়ে তোমার বন্ধুরা ধরলো তোমায়। আমি রিকশায় উঠেছি। তোমার দিকে আর তাকাইনি। সেই প্রথম আমি ফিরে তাকাইনি।তবু দরজা ঠেলে বের হবার সময় তুমি কাঁদছিলে রায়হান। তোমার পাগুলো কাঁপছিলো। তুমি চোখে জল কেনো লুকাবার চেষ্টা করলে বলোতো!! আমরা সেদিন সময়টাকে উপেক্ষা করতে পারিনি। কেনো রায়হান! আমি তো আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পাইনি। তুমি সময় চাইলে নিজের জন্য। আমি দিলাম। তারপর ও সেদিনের পরে আবার আমাদের লুকোচুরি শুরু হয়। আমরা কথা বলতে চেয়েও আর পারিনা। তুমি নিজের পুরোটা ফেলে নতুন সময় খোঁজতে শুরু করলে। সেবারই শেষ কথা। তুমি ইন্ডিয়া ট্যুরে। আমি অপেক্ষা করে আছি। সব শেষ হবার পর ও সেবার আমার কলেজ বন্ধুর নাম শুনেই অস্হির হয়ে পরলে। তখন তোমাকে তোমার মতো করে থাকতে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমি। আবারো ঝগড়া হলো। কেনো কনভারসেশন ডিলিট করছিনা!সেদিন গভীর রাতে ইন্ডিয়ার নাম্বার থেকে কল আসলো। ব্ল্যাঙ্ক কল।তুমি বললে ওটা তুমি না। এতোটাই কো-ইনসিডেন্ট কি আদৌ হয় রায়হান! তুমি শেষ ২ মিনিট সময় চাইলে। আমি ফোন ধরলাম। কিচ্ছুটি বললেনা। কেটে গেলো কল। ব্লক করে দিলে আমায়। আমি জানি তুমি তখনো কাঁদছিলে রায়হান। আজ তিনটে বছর। আমরা বড় হয়ে গেলাম কতো বলো। আমরা দূরে সরে গেলাম নিমিষে। অন্ধকার আঁকড়ে ধরলো। সময়সল্পতা আমাদের সময়টুকু কেড়ে নিলো। সময়! সময়! এবং সময়!
What’s your Reaction?





