-তুই বাদাম বিক্রি করিস! ক্লাসের শেষের দিকের ছাত্র ছিলি, টেনেটুনে পাস করতি, কিন্তু তাই বলে বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাতে হচ্ছে তোর!
-বাদাম লাগলে বলেন, দেই। ওইদিকে আরো অনেক কাস্টমার আছে।
-আচ্ছা দাঁড়া, কিছুক্ষণ কথা বলি। কতদিন পর দেখা, আয় বসি।
- এটা আমার রোজগারের সময়, তিন ঘন্টা বাদাম বেচতে পারলে চারশো টাকার মত লাভ থাকে। গল্প করার সময় নাই। আর তাছাড়া বাদামওয়ালার সাথে গল্প করলে আপনাদের মান-সন্মান থাকবে? অন্য কোন দিন কথা হবে, আসি।
কথাগুলো বলেই হনহন করে হেঁটে অন্যদিকে চলে গেল পিয়াস। অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই কথাগুলো বললো সে।
ক্লাসের শেষের দিকেরই ছাত্র ছিল সে বটে। একে তো সবার মেধা যেমন সমান হয়না, তেমনি কারো কারো প্রতিবন্ধকতাও থাকে। তাই হয়তো কেউ কেউ পিছিয়ে পড়ে অন্যদের তুলনায়।
হটাৎ দশম শ্রেণীতে থাকতে পিয়াসের থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়ে। মূলত এই রোগের কারণেই পড়ালেখায় ঠিকমতো মনোনিবেশ করতে পারতো না। অথচ রোগ ধরা পড়ার আগে এমনকি পরেও খারাপ রেজাল্টের জন্য কত মার খেয়েছে। যদিও চেষ্টায় ত্রুটি ছিল না তার।
এসএসসির রেজাল্ট কোনরকম টেনেটুনে ‘এ’ মাইনাস। যেখানে স্কুলের বেশিরভাগেরই রেজাল্ট ‘এ’, ‘এ’ প্লাস।
তুলনামূলক খারাপ রেজাল্টের কারণে পছন্দের প্রথম সারির কলেজেও ভর্তি হতে পারেনা বেচারা।
সেই থেকেই এইসব পুরনো বন্ধুদের থেকে আলাদা।
ওষুধ খাওয়া শুরু করার পর থেকে ধীরে ধীরে পিয়াসের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হতে থাকে। আগের মত ক্লান্তি , অন্যমনস্ক ভাব কিছুটা দূর হয় ঠিকই, তবে পরীক্ষার রেজাল্টে খুব একটা পরিবর্তন আসেনা। এবার এইচএসসিতে টেনেটুনে ‘এ’ গ্রেড, যা তুলনামূলক এসএসসির থেকে ভালো। ওই যে বললাম, সবার মেধা তো একসমান নয়, তবে এবার প্রচেষ্টা একটু বেশিই ছিল।
কিন্তু ভার্সিটির এডমিশন টেস্টে ছেলেটা এবারো পরিবার, আত্মীয়-স্বজনকে খুশি করতে পারলো না। পাবলিক কোন ভার্সিটিতে চান্স পায়নি, আর পরিবারের এমন সামর্থ্যও নেই যে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়াবে। তাই ন্যাশনাল ভার্সিটিতে মোটামুটি একটা ভালো সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে নিল। এদিকে আগের বন্ধুমহল তো এখন রাস্তাঘাটে দেখলেও তাকে এড়িয়ে চলে। তাদের বেশিরভাগ এখন বুয়েট, মেডিকেল, পাবলিক কিংবা নামকরা কোন প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে। স্কুলের রিইউনিয়ন থেকে শুরু করে পাড়ার আড্ডা সবখানেই তাকে হেয় করে কথা। তারপর ধীরে ধীরে সে নিজেকেই সবার থেকে গুটিয়ে নিলো। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও সেই পরিচিত বন্ধুরা আর নেই, নিজ থেকেই আনফ্রেন্ড করেছে সে সবাইকে। আজ প্রায় তিন বছর পর হঠাৎ আবার সেই পুরনো বন্ধুদের একজনের সাথে দেখা, তাও আবার এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই তাদের মেসেঞ্জার গ্রুপে পিয়াসকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠে গেছে। যাক, তাতে পিয়াসের কিচ্ছু যায় আসেনা। এরা কখনো প্রকৃত বন্ধু ছিলোই না। আর এই তিন বছরে ওর জীবনে কি উত্থান-পতন গিয়েছে, তা শুধু ও নিজেই জানে। অনার্স শেষ করে কত চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে, দুইটা বিসিএস ও দিয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই পিয়াসের ফোনটা আচমকা বেজে ওঠে….
-ওয়েল ডান সাব-ইন্সপেক্টর পিয়াস, আপনার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আসামিকে ধরতে সক্ষম হয়েছি৷ আপনার দুই সপ্তাহের টানা পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। গুড জব, তবে আপনাকে আরও কিছুদিন আন্ডারকভার থাকতে হবে।
না, পিয়াস তার বন্ধুমহলের মত সার্থক হতে পেরেছে কিনা তা জানেনা, তবে সে নিজের জীবনের পরীক্ষায় আজ নিজেকে সফল মনে করে। কচ্ছপের মত ধীরেগতিতে হলেও সে এগিয়ে যাচ্ছে তার লক্ষ্যের দিকে। অন্য কারো সাথে নয়, বরং প্রতিযোগিতাটা ছিল তার নিজের সাথে, নিজের অসুস্থতার সাথে।
দৌড় প্রতিযোগিতায় সবাইকে প্রথম, দ্বিতীয় হতে হবে এমনটা নয়,তবে শেষ লাইনটা অতিক্রম করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে সাধ্যমত।
-সমাপ্ত।
-Salmina Mousume







