অমাবস্যা কিংবা জোছনার গল্প

(নিছক গল্প। শিক্ষণীয় তেমন কিছু নেই। একটু আজেবাজে কথা আছে বলে অনেকের মনে হতে পারে, সেটুকু গল্পের খাতিরেই লেখা। আঠারো প্লাস এলার্ট দেয়ার মতো কিছু নয়। তবু ডিসক্লেইমার দিলাম।)

তখন আমার এগারো বছর চলে। এগারো চলে মানে- দশের জন্মদিন পেরিয়ে গেছে। বয়স চলা-চলির এই হিসাব আমাকে শিখিয়েছিলেন মনিফুপু। মনি ফুপুর পুরো নাম- মোসাম্মৎ মনিরা খাতুন। ছোট করে সবাই মনি ডাকে। ঐ সময়ে, মানে সেই নব্বই কি একানব্বই সালের কথা বলছি, অত বড় মেয়েরা বাপের ঘরে থাকত না। মনিফুপুরও বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু, স্বামীটা বিয়ের বছর না ঘুরতেই- মরে গেল। সেই থেকে মনিফুপু আমাদের সঙ্গেই থাকত। পিঠাপুলির দারুণ হাত ছিল মনিফুপুর। পাড়ার কেউ পিঠার আয়োজন করলেই ওকে টেনে নিয়ে যেত। মা-কাকী একদমই ভালোবাসত না ওকে। দু’টো ভাতকাপড় আর ভ্যাপসা-গরম পশ্চিমের ঘরের এক কোণায় মাথা গুঁজবার বিনিময়ে মনিফুপু আমাদের প্রায় সমস্ত কাজকর্ম করে দিত। বাবা-কাকা দু’জনেরই রেলের চাকরি। রোজ ভোরবেলা তাঁদের গরম গরম স্যাঁকা রুটি না হলে চলে না। তারপর বাড়িসুদ্ধ সকলের নাস্তা, দুপুরের রান্না, ঘরদোরের কাজ… কুশনের ছেঁড়াটা জোড়াও দাও রে, দরজার পর্দাটায় বাবু ঝোলের দাগ লাগিয়েছে রে, রুমকির জুতো জোড়া পলিশ করো রে… মনিফুপুর আর বিশ্রাম কই? আমাদের বিরাট বাড়ির পুরো দায়িত্ব কচ্ছপের মতন পিঠ পেতে নিয়েছিল যে মনিফুপু, এই গল্পটা তাঁরই। পৃথিবীতে কতশত ভালো ভালো গল্প আছে! তারমধ্যে এই গল্পটা নিতান্তই সামান্য। আজকে পড়লে কালকেই ভুলে যাবে- এমন। তবু, নিজের ভেতর কোথাও একটা প্রচণ্ড তাগিদ পাই এই গল্পটা লেখার।

সেদিন ভীষণ পূর্ণিমা। ইংরেজি বইতে পড়া সেই ‘আ মুনলিট নাইট’ প্যারাগ্রাফের মতন- ‘আ ড্রিমি নাইট, ফুল অফ বিউটি অ্যান্ড জয়’। সেরের ওপর সোয়া সের- আজ মাসের পঞ্চম শুক্রবার। অর্থাৎ, বিটিভিতে রাত আটটার খবরের পর ‘ইত্যাদি’র নতুন পর্ব আসবে। আমাদের গ্রামে মোটমাট আটখানা বাড়িতে টেলিভিশন আছে। সে বাড়িগুলোতে আজ উপচানো ভিড়। শোনা যায়, প্রাইমারি স্কুলের মেয়েদের কাছে সুমনা এক টাকা- দুই টাকা দরে ‘টিকিট’ বিক্রি করেছে। সুমনাদের বাড়িতে সতের ইঞ্চির একটা টেলিভিশন আছে। দুই টাকায় প্রথম সারি আর এক টাকায় পেছনের সারির জায়গা বন্টন করা হয়েছে। এই আসন-বন্টনজনিত খবর সুমনার আব্বা জানেন না। জানলে মেয়েকে মেরে তক্তা বানাবেন। আমি অবশ্য টিকিটের জন্য যাইনি। সুমনা যেচে পড়েই আমাকে বলেছে, “হ্যাঁ রে ঝুমু, তোর জন্য ভালো দেখে জায়গা রাখবখন। সাড়ে আটটা নাগাদ এসে পড়িস! দেরি করলে জায়গা রাখা মুশকিল- ”

ক্লাসে আমার রোল নম্বর- এক। এরকম বাড়তি খাতিরে অভ্যাস হয়ে গেছে তাই। আমি জানি- সাড়ে নয়টায় গেলেও সবথেকে ভালো জায়গাটা সুমনা আমার জন্য বন্দোবস্ত করে দেবে। তবু সময়মতোই গেলাম। ‘ইত্যাদি’র জন্য অপেক্ষাতেও আনন্দ! রুমকি, মানিক আর ঝন্টু আমার সঙ্গে গেল। মা-কাকীরা এলেন পরের ব্যাচে, বাবা-কাকাদের সঙ্গে। আটটার খবর যখন শেষ হব-হব করছে, ঠিক তখনই বড় কাকীর খেয়াল হলো- ভুলে চশমা ফেলে এসেছেন! বাড়ির ছেলেমেয়েগুলির মধ্যে আমিই বরাবরের নির্বিবাদী। অতএব, ঐ চূড়ান্ত উত্তেজনাকর সময়টিতে প্রাণ হাতে করে বড় কাকীর চশমার খোঁজে আমাকেই ছুটতে হলো! খবর শেষ হতে বড়জোর পাঁচ মিনিট আর। মনে মনে ‘একশো এক’, ‘একশো দুই’ জপে সেকেন্ডের হিসেব করতে করতে ছুট লাগালাম।

বড় কাকীর ঘরটা পুব-দক্ষিণে। এ বাড়ির সবচেয়ে আরামের ঘর। গরমকালে হাওয়া খেলে। আর এইযে শীত শুরু হতে না হতেই- দিনভর রোদ। ছুটতে ছুটতে বুকের ভেতর হাঁপর পড়ছে। এই তো কাকীর ঘর… দরজা ঠেলে পাশের দেয়ালেই কাঠের সুইচবোর্ড। আলো জ্বাললেই চশমার হদিস… তারপর আবার ভোঁ দৌড়। ওমা! কাকীর ঘরে আলো জ্বলছে যে! ইশ, তাড়াহুড়োতে ভুলে বাতি জ্বেলেই বেরিয়ে গেছেন। কাকা দেখলে খবরই আছে… মাসকাবারি বিদ্যুৎবিল গুনতে গিয়ে যে নাচন-কুঁদনটা করেন! লোকে বড়কাকাকে কিপটে বলে। বলবে না-ই বা কেন? বাড়ির সেরা ঘরটা দখল করেছেন ঠিকই, কিন্তু ঘরের অবস্থাটা দেখ একবার? টিনের গায়ে কম না হলেও- শ’য়ের ঘরে ফুটো! কোনো কোনোটা এত বড়, উঁকি দিলে ঘরের ভেতরটা একেবারে স্পষ্টই দেখে নেয়া যায়!

কাকীর ঘরের দরজার কাছে দাঁড়াতেই… ভেতর থেকে কথা ভেসে এলো!

-“ইইহ! আমার কি সাজনের শখ হয় না? আরও তো এ-ক ঘন্টা! অত খ্যাপ কীয়ের?”

মনিফুপুর গলা না?

-“তাড়াটা যে কীসের, সে কথা তুমি-ইই যদি জানতে- ”, সুর করে জবাব দিল কেউ একজন।

এ গলাটাও আমার চেনা। মশিউর ভাই। পুলিশকাকুর ছেলে। ও এখানে কেন? মনিফুপুই বা এতক্ষণ বাড়িতে কেন? ‘ইত্যাদি’ দেখবে না? ডাকব ওকে? দরজাটা… ঠেলব?

বাতাসের ঘাড়ে চেপে ঘন নিশ্বাসের শব্দ আর অদ্ভুত রকমের গোঙানির আওয়াজ ভেসে এলো। কী বিচিত্র এক অস্বস্তি! কে জানে কেন, দরজা ঠেলতে হাত উঠল না। বিচ্ছিরি কৌতূহলে টিনের ফুটোয় চোখ পাতলাম।

মনিফুপু সাজছে। রুমকির নতুন কেনা কাজলটা ডলে ডলে মাখছে চোখের ওপর। ঠোঁটে গাঢ় লাল রং। পান খাওয়া লাল নয়, লিপস্টিকের লাল। উত্তরের উঠানে মা গাঁদা ফুলের ঝোপ উঠিয়েছিলেন। হলুদ ঝোপ, কমলা ঝোপ… মনিফুপুর মাথার খোঁপায় মিলেমিশে গেছে। সেই ঝোপের ভেতর বাসা করেছে বিষাক্ত সাপ। সাপের নাম- মশিউর উদ্দিন। সাপের বিষ মনিফুপু সর্বাঙ্গে মেখে বসে আছে। মনিফুপুর বিষজর্জর শরীর সুতোটি অবধি বিসর্জন দিয়েছে।

ছিঃ! কী গা ঘিনঘিনে দৃশ্য!ঘেন্নারও কি আকর্ষণ আছে? সে আকর্ষণ বুঝি সুন্দরের চেয়েও বেশি টানে? টানে নিশ্চয়ই। নয়ত ‘ইত্যাদি’ ভুলে গিয়ে টিনের ছিদ্রে চোখ গলিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম কেন?

-“ঝুমুবু! চশমা ছাড়া আম্মা দূরে দেখতে পায় না, জানো না? তুমি এইখানে দাঁড়ায়া আছো ক্যা?”, ঝন্টু এলো সারা বাড়ি মাথায় করে চেঁচাতে চেঁচাতে।

খোলসত্যাগী সাপেরা নড়েচড়ে বসল। ধেড়ে সাপ লুকিয়ে পড়ল খাটের তলায়। বড় কাকীর ঘরের আলো নিভে গেল ঝুপ করে।

ঝন্টু লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছিল। হাত টেনে লাগাম দিলাম।

-“শসস! যাইস না, ঝন্টু!”

-“ছাড়ো, ঝুমুবু! ইত্যাদি শুরু হইয়া যাইতেছে-“

-“তুই যা! আমি চশমা নিয়া আসতাছি।”

-“তাত্তারি আইসো! এত ঢিলা ক্যা তুমি? তুমার জন্য আমার আবার আসন লাগল-”

ঝন্টু চলে গেলে পরে খুট করে খুলে গেল দরজা। মনিফুপু খপ করে জাপটে ধরল আমার হাত।

-“তুই একাই আইছস?”

ভরা চাঁদের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম মনিফুপুর হাত। দুই আঙুলে মেজেন্টা রঙের নেইলপলিশ। বাকি তিন আঙুল সাদা চোখে চেয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। কাকীর বিছানার চাদর ওর গায়ে জড়ানো। আকাশ-নীল চাদরের গায়ে হামলে পড়েছে জ্যোৎস্না। কী ভীষণ পূর্ণিমা আজ! আ মুনলিট নাইট ফুল অফ বিউটি অ্যান্ড জয়!

মনিফুপু জানত, পেটে বোমা মারলেও আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না। বাড়ির সকলেই জানে, ছেলেবেলা থেকেই আমি শক্ত মেয়ে, সহজে ভড়কাই না। বড় কাকীর চশমাটা নিয়ে চলে আসবার সময় কেবল জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ইত্যাদি দেখবা না?”

পূর্ণিমার আকাশ সেজে দাঁড়ানো মনিফুপু কেবল হেসেছিলেন। হাসলে মনিফুপুর গালে গর্ত হয়, টোল পড়ে। ভরা চাঁদের রাতে সেই টোলের খাঁজে জোছনা জমে। মনিফুপুকে অপ্সরীদের মতন দেখায়। তেরো বছরের ঝুমু ভুলে যায়, একটু আগে এই অপ্সরীকেই সাপ বলে ভ্রম হয়েছে।

আমার কাছে মনিফুপুর বদ্ধ অর্গল খুলবার সেই ছিল শুরু। এ বাড়িতে ওর সমবয়সী কেউ ছিল না। আমি গুনে গুনে দশ বছরের ছোট। তবু বৈশাখের মেলা কি ভোরের শিউলিতলা, বার-বাড়িতে লাকড়ি কুড়াতে যাওয়া কি সেতুদের পাতকুয়োয় পানি তুলতে যাওয়া- মনিফুপুর সঙ্গী হয়ে গেলাম আমি। মনিফুপুই আমায় টেনে নিয়ে যেতেন। শিউলি কুড়ানোর নাম করে আমি হতাম পাহারাদার। মশিউর ভাই আর মনিফুপু চলে যেতেন ভাঙা মন্দিরটার আড়ালে।লোকে বলে এই মন্দিরের ভেতর গোখরো আছে। আছে বোধহয়!কোনো কোনো দিন মশিভাই আমার জন্য উপহার আনতেন। লম্বা গলাটাকে জিরাফের মতো নুইয়ে আঁকাবাঁকা দাঁত ঝলকে হেসে বলতেন, “কী? আমারে ফুবা ডাকবা না? অ?”

মশিভাইয়ের গলার তলায় সর পড়া ময়লা দাগ। আমার গা গোলাত।

মনিফুপু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসতেন।

-“অরে জ্বালাইও না তো! ছোট মানুষ!”

আমার মনে হতো, আমি নই, মনিফুপুই যেন ছোট মানুষ। মশিভাই কত মন-ভিজানো কথা বলতেন! আমার বিশ্বাস হতো না একদমই। পুলিশকাকুর জায়গা-জমির অভাব নেই, ঐ একটিমাত্র ছেলে। পুলিশকাকু জীবনেও মনিফুপুকে ছেলের বউ করবেন না। আর মশিভাই জীবনেও বাপের কথার অবাধ্য হবে না। আমি তো বুঝি এসব। মনিফুপু বোঝে না কেন? জিজ্ঞেস করলে বলে, “ইইহ! পুলার বউ করব না মানে? এই গ্রামে আমার চে সুন্দরী আর কেউ আছে? মইশ্যা কালার নাডা, আর কত ভালা মেয়্যা পাইব?”

মনিফুপুর এই ভালোবাসা আমি বুঝি না। দিনরাত সে মশিভাইকে গাল পাড়ে। আবার একদিন না দেখা হলে, কাতলা মাছের মতো ছটফটায়। আমি জানি, শুক্রবারের দুপুর তিনটায়, সবাই যখন ছবি দেখতে যায়- মশিভাই এ বাড়িতে আসে। মঙ্গলবার রাতে ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’ আর ‘মৃত্যুক্ষুধা’ পাল্টাপাল্টি করে দেখায়, পুরো গ্রাম ভিড় করে আট-বাড়ির উঠানে… মনিফুপু কেবল পড়ে রয় বাড়ির মধ্যে। প্রেম কি এতখানিই আকর্ষিক? নাকি মনিফুপুই কেবল সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিয়ে ডুবল?

ইন্টারপাশ দিয়েই মশিভাই ঢাকায় চলে গেলেন। বড় ক্লাসে পড়বেন।সাতটার গাড়ি। ভোরবেলা মনিফুপু বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত দৌড়ে গেল। পুলিশকাকু ছেলের সাথে ছিলেন বলে ওদের কেবল চোখের দেখাটুকুই হলো। বাড়ি ফিরে এসে মনিফুপু জ্বরে পড়ল। কাঁথা মুড়ি দিয়ে মিনমিন করে বলল, “বড় ভাবী, মাইঝা ভাবী, দেহ আমার গা গরম। আইজকা রানতে পারুম না।”

মা-কাকী গাল পেড়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। বড় কাকী বললেন, সব নাকি ওর অভিনয়। মনিফুপুর কপালে হাত দিয়ে দেখলাম, শীতের রাতের পেতলের থালের মতন ঠাণ্ডা কপাল!

বিজলিবাতি হাসি হেসে মনিফুপু বলল, “অন্তরের মধ্যে জ্বর আইছে। কপাল ধরলে বুঝবি?”

-“মশিভাই যদি আর না আহে? ঢাকায় যাইয়্যা যদি বিয়া কইরা ফালায়?”

-“ইহ! অত্ত সোজা? জানস, আমারে কী কইয়া গেছে? ঢাকায় বড় কলেজে ভর্তি হইয়া, আগামী বছরেই বাসা নিব। তারপর আমারে নিয়া যাইব। সারা জীবন তগো লাকড়ির ঘরে পইচা মরুম নাকি? অরে কইয়া দিছি, দক্ষিণমুখের বাসা দেখতে। দক্ষিণের ঘর ঠাণ্ডা থাকে। বড় ভাবীর ঘরটা দেখস না?”

পশ্চিমের ঘরটা রান্নার লাকড়িতে বোঝাই। এ ঘরের জানালা বেয়ে দিনভর রোদ আসে। রোদে লাকড়ি ভালো শুকায়। শুকনা লাকড়ি জ্বলে ভালো। মনিফুপু প্রায়ই আফসোস করে বলে, “লাকড়ির সাথে সাথে আমিও শুকায়া কালা হয়া গেলাম! তালের শাঁসের মতন চামড়া ছিল আমার, জানস?”

মানুষের চামড়া তালের শাঁসের মতো কেমন করে হয়, কে জানে!

তবে, মানুষের মনের অনেক রকমফের হয়। কারো বরফের মতো সাদা, কারো যমুনার জলের মতো কালো। কারো রঙধনুর মতো নানা বর্ণে রঙিন। কারো আবার গিরগিটির মতো- সময়ের সাথে সাথে বদলায়। মশিভাই প্রথম প্রথম খুব আসতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতেই দৌড়ে আসতেন, রবিবার ভোরের গাড়ি ধরে আবার ছুটতেন। মাঝে শুক্রবার দুপুরটুকু বরাদ্দ রাখতেন মনিফুপুর জন্য। গ্রামের পথঘাটে তখন একটা মানুষও থাকে না। সবাই ছায়াছবি দেখতে ভিড় করে আট-বাড়ির উঠানে। নোয়াবাজারের বড় দোকান দুটোতেও পুরুষদের উপচানো ভিড়। মনিফুপু আর মশিভাই এই সুযোগটুকুর অপেক্ষায় থাকে। মানুষের খোলস ঝেড়ে ফেলে নাগ-নাগিনী হয়ে যাওয়ার সুযোগ!

এক শুক্রবারে ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ ছায়াছবিটা দেখাল। হিট ছবি। লখ্যাপাড়ের বেদেনী জ্যোৎস্নার কাছে শাহজাদা মন খুইয়ে বসে আছেন। জ্যোৎস্না হাত নেড়ে নেচে নেচে বলল, “এসো, এসো! শাহাজাদা গো!”

শাহজাদা গানের সুরে উত্তর করলেন, “তুমি যদি বলো কন্যা, যাইব তোমার বাড়ি গো-”

মনিফুপুর গায়ের রঙ দুধে-আলতা। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, বিছার মতো ঘন ভ্রূ, ঠোঁটজোড়া পাপড়ের মতো পাতলা। বেদেনী জ্যোৎস্নাকে আমার মনিফুপু বলে ভুল হলো বারবার। কিন্তু, শত চেষ্টাতেও মশিভাইকে শাহজাদার জায়গায় বসাতে পারলাম না। ছায়াছবির শেষ দৃশ্যে বেদের মেয়ের সাথে শাহজাদার মিল হলো।

জীবন ছায়াছবি নয়। বছর তিন বাদে মশিভাই বিয়ে করে ফেললেন। কনের নাম সোহেলী। ঢাকায় থাকে। মশিভাই বাড়ি গিয়ে ওকে পড়াত, সেই সূত্রে প্রেম। মশিভাই একই সাথে দু’টো প্রেম চালিয়ে গেছে-একটা শহরে, অন্যটা গ্রামে।

একটা মানুষের বেশে, আরেকটা সাপের।

মনিফুপুর চমৎকার পিঠা-পুলির হাত, বলেছিলাম কি একবার? পুলিশকাকীর একমাত্র ছেলের বিয়ে- সাত পদের পিঠার আয়োজন। সর পড়া দুধে ঘন দুধপুলি আর সেওই, খাঁজকাঁটা মুগপাকন, নারকেলের বরফি-জজি, নকশি পিঠা… মনিফুপু হাসতে হাসতে সবটা করে দিয়ে ভর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল। দোরগোড়ে দাঁড়িয়ে মা’কে বলল, “মেজভাবী, ঝুমুরে আইজকা রাইতে আমার সাথে শুইতে দিবা? আসমানে চাঁন নাই, রাইতে ডর করে!”

সেদিন মাঝরাত অবধি মনিফুপু বকবক করল। এলোমেলো অর্থহীন কথা। একবার বলল, “মইশ্যা কালার নাডা, বউটা ভালোই পাইছে, বুঝসস ঝুমু? কিন্তু, আমার চে ভালো না। নাকটা থ্যাবড়া। জানস, আমারে কী কইত? কইত চীনদেশে এক দেয়াল আছে, বিরা-ট বড়… চান্দে দাঁড়ায়াও নাকি দেখা যায়! আমার নাক দেখলে অর নাকি ঐ দেয়ালের কথা মনে পড়ে! এই যে আমার পেটের তলায়… এই দেখ ঝুমু, এইখানে মাথা রাইখা কইত- ‘আমিও চান্দে মাথা রাইখা চীনদেশের দেয়াল দেখতাছি’… ”আবার বলল, “একটা জিনিস শিখ্যা রাখ, ঝুমু। এই জগতে প্রেম-ভালোবাসা বইলা কিছু নাই। ‘দুইদিন পরে বিয়া করুম’ কইয়া যে বেটা ছুঁইতে আইব, তার গায়ে থুঃ দিবি… থুঃ!”

মনিফুপু মেঝেতে একদলা থুথু ফেলল। ওর কথা কেমন যেন জড়িয়ে গেছে। তবু বলতে থাকল, “আমিও কেমন বেবুঝ রে ঝুমু! মইশ্যা শয়তানটারে কেমনে বিশ্বাস করলাম! জানস ঝুমু? শেষের দিকে যখন বাড়িতে আসা কমায়া দিল, কথায় কথায় ছ্যাং ছ্যাং কইরা উঠত আর গাইল পাড়ত… আমার মনে মনে কু ডাকছিল রে। তখন আমি কী করলাম জানস?”, আমার ডানহাত চেপে ধরে নিজের পেটের ওপর রাখল মনিফুপু। “তখন আমি প্যাট বান্ধাইলাম! হি হি! মইশ্যা জানত না। মেয়্যামানুষের মস্ত সুবিধা কী জানস? তারা চাইলেই প্যাট খুইলা রাখতে পারে আবার চাইলেই বানতে পারে। আর পুরুষলোকের সুবিধা কী- সেইটা শুনবি, ঝুমু? অরা চাইলেই সব অস্বীকার যাইতে পারে! আমি ত বেবুঝ, এইটা আমার মাথাতেই আসে নাই! তুই ছাড়া আর কেউ ত কিচ্ছু জানে না রে ঝুমু। মইশ্যা স্বীকার না গেলে দুনিয়ার কোন লোকে আমারে বিশ্বাস করব, ক’? ঝুমুরে, দুনিয়াতে কত্ত কিছু আছে… বাপ প্রমাণের কিছু নাই রে?”

ভীষণ অস্বস্তিতে আমি কুঁকড়ে গেলাম। সেদিন ঘোর অমাবস্যা। পশ্চিমের ঘরের ভ্যাপসা গরমে কুলকুলিয়ে ঘামছি। মনিফুপু কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “শুন্‌ ঝুমু, আমার মতন ভুল করিস না। তুই যেমন শক্ত, সারাজীবন অমনই থাকিস। প্রেমের গাঙে ভাইস্যা আইঠ্যামাটি-ভিজামাটি হইস না। মাইনষে সুযোগ পাইলেই পাড়া দিব! বাপের ঘাড়, ভাইয়ের ঘাড়, স্বামীর ঘাড়…প্রেমের ঘাড়- নিজের স্বপ্ন কারো ঘাড়ে চড়াইস না কোনোদিন। দক্ষিনের একটা ঘরের আমার বহুত শখ ছিল রে, ঝুম! বিরাট একটা জানলা…পুন্নিমার রাইতে জানলা বাইয়া চাঁন্দে ঝাঁপ দিব। জানলায় একটা আসমানী রঙের মশারি লাগায়া দিমু মাঝে মইধ্যে। মশারির ফাঁক দিয়া ঝুরিঝুরি চাঁন আইব ঘরের ভিত্রে… সুজির দানার মতন ঝুরঝুরি জোছনা আমি সারা শরীরে মাখামু… সেই আমার কপালডা দেখ? পশ্চিমের ঘরে, ঘুটঘুইটা আন্ধারের মধ্যে মইরা যাইতেছি! শুন্‌ ঝুমু, সন্ধ্যারাইতে বিষ খাইছিলাম। ইন্দুরের বিষ। প্যাটের ইন্দুরটা… ইন্দুরের সমানই হইব এখন… মইরা গ্যাছে এতক্ষণে। আমি টের পাই। বিষ আমার গলায় উঠছে রে ঝুমু… কথা কইতে কষ্ট… আর বেশি কথা কমু না। যতক্ষণ দম থাকে খালি একটা কথাই কমু। জীবনে যদি একটা ভালো কাম কইরা থাকি, তাইলে মইশ্যারে আমি অভিশাপ দিয়া গেলাম… কোনোদিন বাপ হইতে পারব না।”

প্রাণপণ চিৎকার করছি, অথচ গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। দুঃস্বপ্নে এমন হয়… অথচ আমি তো স্বপ্নে নেই এখন! মনিফুপুর ঠোঁটের কিনারে ধবধবে সাদা গ্যাঁজলা… এই অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যায়। দৌড়ে নামতে গেলাম… আমার হাত মনিফুপুর হাতে আটকা পড়া। মনিফুপু খিলখিলিয়ে হাসছে, বিকারগ্রস্তের হাসি। আর বলছে, “মইশ্যারে আমি অভিশাপ দিয়া গেলাম… মইশ্যারে আমি অভিশাপ দিয়া গেলাম…”

মা-কাকীর কানে যতক্ষণে আমার চিৎকারের শব্দ পৌঁছল, মনিফুপুর সমস্ত কথা তখন থেমে গেছে।

আমি ছেলেবেলা থেকেই শক্তপোক্ত ধাঁচের, বলেছিলাম কি এটা? নিজেকে আমি নাম দিয়েছি- “পাথরকন্যা”। মনিফুপুর ঐ ঘটনাটা… অমাবস্যার বীভৎস অন্ধকারের মতো… আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে একটা ট্রমা হয়ে থাকত আজীবন। আমার হলো না। নরম কাদামাটির মতো যারা, ট্রমা শব্দটা তাদের জন্য। আমি তো পাথর… মনিফুপুকে গোরস্থানে নিয়ে গেল পরে আমি চোখ মুছতে মুছতে মা’কে বলেছিলাম, “মা! আমি ডাক্তারি পড়ুম!”ঐটুকু বয়সে আমার কেন মনে হয়েছিল ডাক্তার হতে পারলে মনিফুপুর এই অকারণ চলে যাওয়ার আফসোসটুকু ঘুচবে- বলতে পারি না! নসুকাকু আমাদের গ্রামের ডাক্তার। বাজারের ডিসপেন্সারিতে বসেন। মনিফুপুর জন্য ঐ রাতদুপুরে তাঁকে ডেকে আনা হয়েছিল। ওই অত লোকের ভিড়ের মধ্যেও নসুকাকু এক ফাঁকে আমাকে পাকড়াও করলেন। গলাটাকে খাদে নামিয়ে বললেন, “ঝুমু, তুই কিছু জানস? জানলেও কাউরে কইবি না, ক’? আমারে কথা দে?”

আমি কথা দিলাম।মনিফুপুর সেই ‘ইন্দুরের সমান’ বাচ্চাটার কথা পৃথিবীতে কেবল চারজন জানল।

এক- মনিফুপু। সে তো চলেই গেছে!

দুই- নসুকাকু। যিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, কী অদ্ভুত জাদুবিদ্যায় ডাক্তারেরা সমস্ত গোপন কথা জেনে যান!

তিন- আমি, ফাতিমা আক্তার (ঝুমু)। আমার কথা বলতে গেলে দিন ফুরিয়ে রাত হয়ে যাবে, সেসবে আর না যাই।

আর চার- মশিভাই। সেই নাকবোঁচা-শহুরে বউটি যাকে সন্তান দিতে পারেনি। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান মশিউর আরেক দফা বিয়ে করেছিল তারপর। সে ঘরেও বাতি জ্বলল না। অমাবস্যার অন্ধকার পুলিশকাকুর একমাত্র ছেলেটির ঘরে বুকচিতিয়ে রাজ করতে লাগল।

ওদিকে মশিভাইয়ের ‘ছেড়ে দেওয়া’ সেই নাকবোঁচা সোহেলী তালাকের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আড়াইমাসের পুত্রসমেত গ্রামে ঘুরানি দিতে এলো। শহরে ফিরে গিয়েই ঝটপট দ্বিতীয় বিয়েটা সেরে নিয়েছিল সে।

পাড়ার লোকেরা গুজগুজ, ফিসফাস শেষে জোরেসোরেই বলতে শুরু করল- “অহ! দোষ তো তাইলে মশিউরেরই! বেহুদা পয়লা বউডারে তালাক দিল।”

তখন আমি মেডিকেল দ্বিতীয় বর্ষে। ঈদের বন্ধে গ্রামে গেছি। এক বিকেলে মশিভাইয়ের সাথে দেখা হলো। উস্কোখুস্কো চুল, গায়ের জামাটা আধময়লা। নদীর ধারে ঘাড় গোঁজ করে বসে আছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এলেন।

“তুই তো জানস ঝুমু, আমার ‘দোষ’ নাই কোনো? জানস না? মনি তরে কইছে না সব? ক’?”

“না মশিভাই, মনিফুপু আমারে কিছু বলে নাই।”

মিথ্যে বললাম। সকলে সত্যের যোগ্য নয়।

মিথ্যুকেরা আর কিছু না চিনুক, মিথ্যে ঠিক চেনে। মশিভাই মরিয়া হয়ে বললেন, “মিছা কথা কইস না, ঝুমু! অস্বীকার যাইস না-”

“পৃথিবীর কত লোকে কতকিছু অস্বীকার যায় মশিভাই… সেই হিসাব কে রাখে বলেন?”

মশিভাই খিস্তি দিতে দিতে চলে যান। হার-জিতের খেলায় হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া আমি দাঁড়িয়ে রই মূর্তির মতন।

কোনো কোনো রাতে আমার মনিফুপুর কথা মনে পড়ে ভীষণ। হোস্টেলে আমার বেডটা দক্ষিণ-দেয়াল লাগোয়া। ট্রাঙ্কে একটা ফুলতোলা নীল মশারি কিনে রাখা আছে। উথাল-পাথাল পূর্ণিমার রাতে মাথার ধারের জানালাটায় আমি সেই মশারি তুলে দিই। ঝুরিঝুরি সুজিদানার মতো জোছনার হাত ধরে মনিফুপু আসে জানালা বেয়ে। আমি ফিসফিস করে তাকে বলি, “জানো মনিফুপু? ডিএনএ টেস্ট বইলা এক পরীক্ষা আছে… ঐ দিয়া বাপ-প্রমাণ করা যায়! পুরুষলোকের সুবিধাতে কেমন টান পড়ল, কও দেখি?”

মনিফুপু উত্তর দেয় না।আমার সচেতন মনটা জানে, কোনোকালেই এ উত্তর পাবার নয়। তবু অচেতন মনে দীর্ঘ-তৃষিতের মতো আমি উত্তরের অপেক্ষা করি। আমি কি অসুস্থ? ট্রমাটাইজড? হলে হোক!

আমাদের গ্রামে আমিই প্রথম মেয়ে- যে ডাক্তারি পড়েছে। আমার এই ভরা পূর্ণিমার মতো জীবন, সে জীবনে অসংখ্য-অগণিত প্রাপ্তি। পূর্ণিমার উলটো পিঠেই তো অমাবস্যা থাকে। মনিফুপু আমার সেই অমাবস্যা। গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাবার আগে যে আমাকে ঝুরঝুরি-পূর্ণিমা চিনিয়ে গিয়েছিল! আমার এঁটেলমাটি-জীবনটাকে আছড়ে-পিছড়ে ইট করে গড়ে দিয়েছিল যে!এইটুকু ‘ট্রমা’ তাই আমার আজীবন থাকুক!

-সন্ধি স্বাধীনতা

Send private message to author
What’s your Reaction?
4
10
0
0
1
1
2
Share:FacebookX
3.3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Mahi An Nur
Member
Mahi An Nur
4 years ago

অসাধারন লাগলো

Sakib Mahbub
Member
4 years ago

চমৎকার লিখেছেন। ভালো লেগেছে

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!