গল্প: সুখ বার্তা


তীব্র গরমে শহরবাসী অতিষ্ঠ। আগামীকাল ঈদ হওয়াতে মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে দ্বিগুন। বিকেলে সূর্য আড়াল হলেও তাপমাত্রা কমেনি। তাকিয়ে আছি হলুদাভ আকাশের দিকে। নিউটনের ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স বলে এই পৃথিবীতে কার্যকারণ ছাড়া কোন কিছুই হয় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার কোন কারণ নেই। কোন কিছু নিয়ে হতাশাগ্রস্থও নই। নিলুকে নিয়ে চিন্তায় আছি। বোনটা অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। আপন কেউ অসুস্থ হলে কি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়?

এক্ষেত্রে অ্যানালাইটিক্যাল রিজনিং ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমি সুপ্ত কিছু ব্যাপারে হতাশাগ্রস্থ। কি নিয়ে হতাশাগ্রস্থ সেটা নিজেও জানি না। তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।

কিংবা আমার অবচেতন মন বৃষ্টির অপেক্ষায় বিভোর।
হঠাৎ মনে হলো আমার অ্যানালাইটিক্যাল রিজনিং ভুল। স্পষ্ট মনে পড়ছে দুপুরে ঘুমানোর সময় মা’কে স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে মা বললো, ‘প্রিয় খোকা, তুমি আমার সাথে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলো না। তারচেয়েও বড় কথা, তুমি লক্ষ করে দেখো তো কতদিন আকাশ দেখো না? যাইহোক, আজকে আমার সাথে অবশ্যই কথা বলবে’।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই মা’কে উচ্চস্বরে ডাক দিলাম,

  • শুনতে পাচ্ছো মা?
  • নৈশব্দ
  • আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছো?
    পাশের ছাদ থেকে মিষ্টি স্বরের মেয়েলী কন্ঠ ভেসে আসলো,
  • এই যে মিস্টার, কার সাথে কথা বলছেন?
    তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে পাশের ছাদে তাকালাম। কার্নিশে হেলান দিয়ে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির মুখ দেখতে পাচ্ছি না। ঝাপসা লাগছে।
    কিছু না বলে আবার আকাশের দিকে তাকালাম।
  • মা, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো না? তোমাকে আমার অনেক প্রয়োজন।
    ওপাশ থেকে মেয়েটি বললো,
  • কি কোন বার্তা এলো?
    আমি ক্লান্ত স্বরে বললাম,
  • না। আজকের ফ্রিকোয়েন্সি খুব খারাপ।
    মেয়েটি বললো,
  • শুনুন, আকাশে এখন মেঘ জমেছে। কিছুক্ষণ পরেই তুমুল বৃষ্টি হবে। এজন্য ফ্রিকোয়েন্সি পাচ্ছেন না।
    ভালোভাবে লক্ষ করে দেখলাম সত্যিই আকাশে মেঘ জমেছে।
    মেয়েটি আবার বললো,
  • মন খারাপ?
    বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
  • মা’র সাথে কথা বলাটা খুব জরুরী।
    মেয়েটি বললো,
  • কি কথা আমাকে বলুন?
  • নিলু খুব অসুস্থ। কি করবো বুঝতে পারছি না।
  • আপনার বোন নিলু?
  • হুম।
  • কি হয়েছে?
  • সকাল থেকে বমি করছে। দুইবার মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছে।
  • আপনার মা’র কাছে নিলুর অসুখের কথা বলতে চাচ্ছেন?
  • হুম।
  • আপনি এক কাজ করুন, নিলুকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যান। আমি আসছি।
  • আচ্ছা।
  • আচ্ছা কি? আমার নাম জানেন?
    -না।
    -তাহলে জিজ্ঞেস করুন?
  • কি?
  • আমার নাম!
  • আপনার নাম কি?
    মেয়েটি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো,
  • আমার নাম টিনা। আর হা করে এখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? তাড়াতাড়ি যান।
    .
    সিড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় খেয়াল হলো আমার চোখে চশমা নেই। এজন্যই টিনার মুখ ঝাপসা দেখছিলাম। আচ্ছা ও কি আমাকে চিনে? চেনার তো কথা নয়। কিন্তু একটি অপরিচিত ছেলের সাথে এতো স্বাভাবিক ভাবে কথা বললো কেন? তাছাড়া আমার বোন অসুস্থ! টিনা কেন যাবে?
    .
    রুমে এসেই নীলুর বমি করার শব্দ শুনলাম। একদিনেই বোনটার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে এসে পড়েছে। মা থাকলে নিলুর এই অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে উঠতেন।
    আমি নিলুকে বললাম,
  • লক্ষী বোন আমার, কষ্ট হচ্ছে খুব?
  • ভাইয়া আমি মনে হয় খুব শীঘ্রই মা’র কাছে চলে যাবো।
    আমি নির্বাক দৃষ্টিতে নিলুর দিকে তাকিয়ে আছি। ও কি সত্যিই মা’র কাছে চলে যাবে? বুকের বাম পাশটা মুচরে উঠলো। নীলুও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বোনটার চোখেমুখে এতো মায়া কেন? বমি করায় চোখের কোণে পানি জমে আছে। আমার ভিতরের যন্ত্রনাটা বুঝতে পেরে নিলু চোখ মুছলো। খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
  • ভাইয়া ঠান্ডা পানি খাবো।
    ফ্রিজ থেকে পানি এনে দিয়ে বললাম,
  • তোকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।
    নিলু পানি মুখে নিয়েই মাথা নেড়ে বললো, – আচ্ছা।

আমি নিচে এসে খুব দ্রুত একটি সিএনজি ভাড়া করলাম। ড্রাইভারকে বাড়ির নিচে রেখে নিলুকে নিতে আবার রুমে আসলাম। নিলু আমাকে দেখেই হেসে দিল।

  • ভাইয়া, তুই দেখি একদম মা’র মতো। এতো অস্থির হচ্ছিস কেন? এই যে দেখ আমি একদম সুস্থ। হাসপাতালেও যেতে হবে না। ইফতার বানাচ্ছি তুই চুপ করে বসে থাক। আর আমার মেহেদী কই? কাল না ঈদ?

আমি নিলুর চুলের দিকে তাকিয়ে আছি। এলোমেলো হয়ে আছে। ওর চুল লম্বায় কোমড় ছাড়িয়ে পা পর্যন্ত। রাগী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললাম,

  • চিরুনি নিয়ে আয়।
  • চিরুনি দিয়ে কি করবি ভাইয়া?
  • তোর চুল আঁচড়িয়ে দিবো। তাড়াতাড়ি যা।

নিলুর মুখটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল। চিরুনি এনে আমার পাশে চুপ করে বসে পড়লো। আমি চিরুনি দিয়ে ওর চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছি। হঠাৎ হুহু করে লুকিয়ে কান্নার শব্দ পেলাম। ঘরে আমি আর নিলু ছাড়া কেউ নেই। থাকার কথাও না। তারমানে নিলু কান্না করছে?
আমি নিলুকে বললাম,

  • আমার দিকে তাকা তো?
    নীলু খুব দ্রুত চোখ মুছে আমার দিকে তাকালো।
    আমি খুব শান্ত গলায় বললাম,
  • আরে বোকা কান্না করছিস ক্যান?
    নিলু এবার আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো।
  • ভাইয়া তুই এতো ভাল কেন? আগের জন্মে খুব পুণ্য করেছি বলেই মনে হয় তোর মতো ভাই পেয়েছি।
    নিলুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়ে বললাম,
  • ভাই হিসেবে আমি যতটুকু ভালো, বোন হিসেবে তুই তারচেয়েও বেশি ভালো। বাদ দে এসব। নিচে সিএনজি দাঁড় করিয়ে রেখেছি। তাড়াতাড়ি আয়……

সিএনজিতে উঠার পর দুইবার বমি করলো নিলু। বাকী রাস্তা ঘুমে কাটালো। মেডিকেলের গেটে আমাদের সিএনজি থামলো। নিলুকে জিজ্ঞেস করলাম,

  • হেটে যেতে পারবি?
    পিছন থেকে টিনার কন্ঠ ভেসে আসলো।
  • এতক্ষণে আসার সময় হলো? আমি স্যারকে কখন বলে রেখেছি।

আমি টিনার দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার স্তম্ভিত হওয়ার প্রধান কারণ ওর রুপ। কিছু কিছু সৌন্দর্যে ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার থাকে। এই মেয়েটির রুপও সেরকমই। ডাক্তারী পোশাকে মানিয়েছেও বেশ।
টিনা বললো,

  • আপনি ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসুন। আমি নিলুকে নিয়ে স্যারের কাছে যাচ্ছি।
    .
    ওয়েটিং রুমে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। টিনা এসে বললো,
  • এমন মন খারাপ করে বসে আছেন কেন?
    আমি খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
    -নিলু কোথায়? ওর কিছু হয়নি তো?
    টিনা মৃদু হেসে দিয়ে বললো,
    -নিলুর কিছুই হয়নি। রক্তশূন্যতা। স্যার বলেছে দুই ব্যাগ রক্ত দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর ওষুধ যা লিখে দিয়েছে সেটা নিয়মিত খেলেই নিলু সুস্থ।
  • কিন্তু নিলুর রক্তের গ্রুপ তো খুব রেয়ার। তাছাড়া আমি কিছুদিন হলো রক্ত দিয়েছি।
  • রক্ত নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমার সাথে আসুন। নিলুকে দেখে যান।
    আমি টিনার দিকে তাকিয়ে আবার স্তম্ভিত হলাম। হালকা আসমানী রঙের শাড়ির সাথে সাদা এপ্রোন! মনে হচ্ছে মেয়েটির রুপের জন্য এই আসমানী শাড়ি আর সাদা এপ্রোন ধন্য। এককথায় ভয়ংকর রূপবতী।

নিলুকে রক্ত দেয়া হচ্ছে। আমি নিলুর পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। নিলু খুব চাপা স্বরে বললো,

  • ভাইয়া আপুটা কে রে?
    আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
  • কোন আপু?
    নিলু হেসে দিয়ে বললো,
  • খুব সুন্দরী কিন্তু!
    আমিও হেসে দিয়ে বললাম,
  • আরে তুই যা ভাবছিস তা না। আমি চিনিই না। আজকে বিকেলে ছাদে টুকটাক কথা হলো। এর আগে আমি ওকে দেখিই নি।
    নিলু খিলখিল করে হাসছে।
  • ভাইয়া তুই এতো লাজুক? হিহিহি……
  • নিলুর দায়িত্বে থাকা নার্স আমার দিকে কঠিন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি সুবোধ বালকের মতো মাথা নিচু করে চুপ হয়ে গেলাম।
  • কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি খেয়াল নেই। মাথায় হাত দিয়ে বিলি করে কে যেন আমাকে ডাকছে। এমন করে আমার মা ঘুম থেকে উঠাতো। তাহলে কি এটা স্বপ্ন? মা আমাকে আদর করছে?
    পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করে জেগে উঠলাম। তাকিয়ে দেখলাম এক বৃদ্ধ রুগি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
  • বাজান কি ব্যথা পাইছেন? হালকা একটা পাড়া লাগছে। লক্ষ করি নাই। ক্ষমা করবেন।
    আমি কিছু না বলে নিলুর দিকে তাকালাম। নিলু ঘুমাচ্ছে।ওর পাশেই টিনা বসে আছে। এতো রাত পর্যন্ত মেয়েটি এখানে বসে আছে কেন? আমি খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
  • আপনি বাসায় যান নি?
  • না।
  • কেন?
  • আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
  • আমার জন্য?
  • হু। চলুন। আমাকে বাসায় দিয়ে আসবেন।

আমি উঠে দাড়ালাম। নিলুর দিকে তাকিয়ে বললাম,

  • নিলুর কয়দিন থাকতে হবে এখানে?
    টিনা বললো,
  • আরো দুইদিন। আপনার এতো কিছু ভাবতে হবে না। নিলুর জন্য চব্বিশ ঘন্টা নার্স আছেন।
  • কিন্তু কাল তো ঈদ!
  • কাল আমি আপনি আর নিলু একসাথে ঈদ করবো। এখন চলুন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। টিনা বললো,

  • রিক্সা দিয়ে যাবো।
    অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ও কি আমার সাথে রিক্সা দিয়ে যেতে চাচ্ছে নাকি একলা যাবে ভেবে রিক্সার কথা বললো? আমি দ্বিধায় পড়ে দুটো রিকশা ডাক দিলাম।
    টিনা খুব তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
  • দুটো রিক্সা কেন?
  • একটায় আপনি, অন্যটায় আমি।
    টিনা চোখ বড় করে রাগী স্বরে বললো,
  • আপনি নিজেকে কি মনে করেন? সাধু পুরুষ? এই কথা শুনে এক রিক্সা উধাও……
    .
    রিক্সায় জবুথবু হয়ে বসে আছি। টিনা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
  • আকাশ তো একদম পরিষ্কার। আপনার মা’র সাথে কথা বলবেন না?
  • হু।
  • আমার দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছেন?
  • না।
  • আমার দিকে তাকান তো দেখি?

এবার সত্যিই লজ্জা লাগছে। তাকাতে পারছি না। বুকের ভিতর তীব্র সাহস জুগিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

  • আপনি কে? আমাকে কিভাবে চিনেন?
    টিনা বাচ্চা মেয়েদের মতো খিলখিল করে হেসে দিল। মানুষের হাসিও এতো সুন্দর হতে পারে? সোডিয়ামের আলোয় মেয়েটিকে কি অসম্ভব রূপবতী লাগছে!

সবথেকে বড় কথা টিনার মধ্যে আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি।

  • এই যে মিস্টার, আমি আপনার নাড়ি নক্ষত্রের খবর সব জানি।

শত চেষ্টা করেও টিনার সাথে স্বাভাবিক হতে পারছি না। আমার কাছে পুরোটাই স্বপ্ন মনে হচ্ছে। তবুও স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,

  • কি কি জানেন শুনি?
  • আপনার মা আত্মহত্যা করার পর আপনার বাবার সাথে কোনপ্রকার সম্পর্ক রাখেন নি। সম্পর্ক না রাখার কারণ, আপনি আর নীলু মনে করেন আপনার বাবার জন্যই আপনার মা আত্মহত্যা করেছে। মা’কে প্রচুর ভালবাসার কারণে উনার মৃত্যুর পর আপনি মেন্টালি সিক হয়ে পড়েছিলেন। এখন কিছুটা সুস্থ। মাঝে মাঝে ছাদে উঠে এখনো পাগলামি করেন। বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কাছে আপনার নামটি খুব পরিচিত। আপনার আইডিয়া নিয়ে এ পর্যন্ত ছাব্বিশটি বিজ্ঞাপন করা হয়েছে। নতুন একটি আইডিয়া আপনি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে দিয়েছিলেন। আইডিয়াটি পছন্দ হওয়ায় আপনাকে বড়সড় একটি এমাউন্ট দেয়া হয়েছে।

টিনা এক নিঃশ্বাসে সব বলে ফেললো। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে খুব নিচু স্বরে বললাম,

  • আমি কখনই মেন্টালি সিক হই নি। আকাশের দিকে তাকালে সত্যিই মা’র সাথে কথা বলা যায়। যাই হোক, আমার সম্পর্কে এতো কিছু জানার কারণ কি জানতে পারি?
  • আমি না আসলে কোন কিছুই লুকিয়ে রাখতে পারি না। সত্যি কথা বলতে, আমি আপনাকে খুব ভালবাসি।

টিনার কথায় হকচকিয়ে উঠলাম। এত সুন্দর করেও কেউ ভালবাসি বলতে পারে! বাসার সামনে এসে পড়েছে রিকশা।
তবুও সোজাসাপ্টা ভাবে বললাম,

  • আমাকে ভালবাসার কোন কারণ দেখছি না।
    টিনা খুব লাজুক ভঙ্গিমায় বললো,
  • অনেক কারণ। ছাদে উঠে তোমার পাগলামি দেখতে খুব ভাল লাগে। তোমার মোটা ফ্রেমের চশমা, আউলা চুল, ডিলেডালা শার্ট সবকিছুর প্রেমে পড়েছি সেই কবে! কথা বলার সুযোগ পাই নি বলে বলা হয় নি। যাই হোক, তুমি আমাকে ভালবাসো কি না সেটা জানতে চাই না। কাল দেখা হবে। যাই।

শরীর ক্লান্ত হওয়ায় বাসায় এসে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভাঙ্গলো। অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে টিনা বললো,

  • কতক্ষণ ধরে ফোন করছি ধরছো না কেন? দরজা খুলো।
    আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
  • তুমি কি আমার ফ্ল্যাটের সামনে?
  • জ্বি জনাব। এখন দয়া করে দরজাটা খুলুন।

আমি দরজা খুলে এবার খাম্বিত হয়ে গেলাম (খাম্বার মতো)। খাম্বিত হওয়ার কারণ ওর কপালের টিপ আর চোখের কাজল। ভ্রু নাচিয়ে লাজুক ভঙ্গিমায় হাসছে। এ তো সাক্ষাত পরি। আমি আমতা আমতা করে বললাম,

  • এত সকালে তুমি?
    টিনা মুখ বাঁকিয়ে বললো,
    -চুপ! কিসের এতো সকাল? নয়টা বাজে। ঈদের নামাজ সাড়ে নয়টায়। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে ঈদ্গায়ে যাও। তারপর আমরা নিলুর কাছে যাবো।

খুব দ্রুত শাওয়ার নিতে গেলাম। মা মারা যাওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক হতে পারি নি। কিন্তু আজ মন ফুরফুরে লাগছে। সম্ভবত মন ফুরফুরে লাগার কারণ টিনা। মেয়েটার ভিতর মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা প্রবল।

নামাজ পড়ে এসে টিনাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রিকশায় আগের মতোই জবুথবু হয়ে বসে রইলাম। টিনা রিকশার হুড তুলে দিয়ে বললো,

  • জগতে সাধু পুরুষ দরকার। কিন্তু সেটা সবসময় নয়।
    টিনা লাজুক ভঙ্গিমায় হাসছে। আমি খুব নরম গলায় বললাম,
  • টিনা তুমি কি জানো, আইডিয়াবাজদের ভবিষ্যৎ নেই।
  • কে বলেছে নেই? একটা সুন্দর ফ্যামিলি প্ল্যানিং করো তো। হিহিহি।

কি মনে করে যেন আমিও হেসে দিলাম। টিনা বললো,

  • তোমার হাসি কত সুন্দর! অথচ সবসময় মুখ ভার করে রাখো কেন?
  • কারণ আমি হাসতে ভুলে গেছি।
  • সে যাই হোক এখন থেকে হাসবে। আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি?
  • হুম।
  • আমি কে তুমি জানো?
  • না।
  • জানতে ইচ্ছে করছে?
  • হুম।
  • তোমার মায়ের পছন্দের একজন ছাত্রী ছিলাম। এবার বল তো আমি কে?
    বুকটা ধক করে উঠলো। মা ছিলেন কলেজ শিক্ষক। প্রতিদিনই কলেজ থেকে ফিরে এসে বলতো,
  • বাবা, কোন মেয়েটেয়ের দিকে তাকাবি না। তোর জন্য মেয়ে দেখা শেষ। সময় হলে বিয়ে দিয়ে দিবো।

আমি অবাক হয়ে টিনার দিকে তাকিয়ে বললাম,

  • তারমানে তুমিই মায়ের পছন্দের মেয়ে?
    টিনা মৃদু হেসে বললো,
  • হুম জনাব। আপনার মা আমাকে বউমা বলে ডাকতেন।

ইচ্ছে করছে, টিনাকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘তুমি আগে বলো নি কেন?’


নীলুর মাথা আঁচড়িয়ে দিচ্ছে টিনা। এই নশ্বর জীবনে খুব কমই সুন্দর দৃশ্য আমার চোখে পড়েছে। আজকে সংখ্যাটা বাড়লো। আমি নীলু আর টিনাকে নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে পড়লাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে মহানন্দে মা’কে ডাক দিলাম,

  • মা তুমি শুনতে পাচ্ছো? আজকে আমি অনেক সুখী।
    প্রত্যুত্তর না পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। টিনা কাছে এসে বললো,
  • শুনতে পাও নি মা কি বলেছে?
  • কই? কি বলেছে?
  • আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি মা বললো, – ‘ওরে বোকা খোকা, টিনাকে আই লাভ ইউ বল’
    টিনা নীলুর দিকে তাকিয়ে বললো, – তুমি শুনতে পাও নি?
    নীলু ফিক করে হেসে দিয়ে বললো,
  • হ্যা ভাইয়া। মা তোকে বলেছে, টিনা আপুকে যেন আই লাভ ইউ বলিস।

নীলু আর টিনা মুখটিপে হাসছে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ওদের দিকে। হঠাত আকাশ থেকে বার্তা আসলো,
”তোরা সুখে থাকিস”

সমাপ্ত
.
– আসিফ হোসাইন ( Asif Hossain)

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
6
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Asif Hossain
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!