ছাদের ভাব

ছাদে একা দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। রাত বাজে আড়াইটা। পেছনে ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে।

আমি এসেছি লালবাগ, খালার বাসায়। দোতলা বাড়ি, চারপাশটা ফাঁকা। খুব সুন্দর পরিবেশ। আকাশটা খুব পরিষ্কার দেখা যায়। রাতে চাঁদ না দেখলে আবার লেখার ভাব আসেনা।

তারাভরা আকাশ দেখতে হলে পাহাড়ে যেতে হবে।
অথবা নদীতে, সমুদ্রে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে। ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ফিল্টার করা আকাশ দেখে মন ভরে না। ভাবের বদহজম হয়।

আমিও সুযোগটা ছাড়িনি। খালার বাসায় এসেই রাতে ছাদে চলে এসেছি। সাথে শুধু একটা পানির বোতল ছাড়া কিছু নেই। মোবাইলও রেখে এসেছি নিচে। প্রযুক্তি ভাব হত্যাকারী।

আমি পায়চারি করছি। এভাবে কখন সময় কেটে গেছে কোন হিসাব নেই। হঠাৎ করে পেছনে শব্দ হল।
ধুপ-ধাপ, ধুপ-ধাপ, ধুপ। তালে তালে পা ফেলার শব্দ। সাথে কেমন একটা স্ক্রু টাইট দেয়ার কিঁচ কিঁচ শব্দ হচ্ছে।

আমি থমকে গেলাম। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা শিহরণ নেমে গেলো। জীবনে ভূত ব্যাপারটা কখনো সিরিয়াসলি নেইনি। চিৎকার করতে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। কোঁ কোঁ শব্দ হচ্ছে।

নিজেকে সামলাতে সময় লাগলো দুই মিনিট। নিজেকে বললাম ভূত বলে কিছু পৃথিবীতে থাকতে পারে না। সাথে সাথে ধুপ-ধাপ শব্দ ডাবল হয়ে গেলো। মানে দু জোড়া শব্দ। ধুপধুপ-ধাপধাপ, ধুপধুপ-ধাপধাপ এরকম।

হঠাৎ মনে হলো ভূত না হলেও জ্বীন তো থাকতে পারে। আবার ভয় ফিরে এলো। নিজেকে সহস্র গালি দিলাম মোবাইলটা না আনার জন্য। এদিকে পা যেন আটকে গেছে, টেনে সরানো যাচ্ছে না।

আমি একবার ভাবলাম আমি বোধহয় স্ট্রোক করবো। স্ট্রোকের কথা মাথায় আসতেই বুকে ব্যাথা শুরু হলো। আমি মনে মনে মাফ চাওয়া শুরু করলাম। মাফ চাইতে গিয়ে দেখি মাফ চাওয়ার লোকের নাম মনে আসছে না। আমার কান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নিরবিচ্ছিন্ন ঝিঁ ঝিঁ ডাকার মতো শব্দ পাচ্ছি।

এদিকে ধুপধাপ শব্দটা এগিয়ে আসছে। আমার হৃদপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস করে লাফাচ্ছে। ঠিক আমার পেছনে হচ্ছে এখন ধুপধাপ শব্দটা। আর কিছুই আমি তখন শুনি নি। শুনলে আরেকটা শব্দ শুনতে পেতাম।

কে যেন পায়ের কাছে আমার প্যান্ট ধরে পিছন থেকে টানলো। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে আমি শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করে চিৎকার করেই যাচ্ছি।

চিৎকার শুনে খালা চলে এলেন ছাদে৷ আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবা সোনা বলে একাকার অবস্থা। আমি দেখলাম ছাদে কেউ নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি তখনো কথা বলতে পারছি না।

হঠাৎ দেখি ছাদের পাশে গাছের ডালে দুটো বাঁদর বসে আছে।

মূহুর্তে সব পরিষ্কার হলো।
ধুপধাপ, কিঁচকিঁচ সব। খালা আগেই মানা করেছিলো এদিকটায় বাঁদর আছে, শুনিনি।
এখন পেছনে বাঁদরের পায়ের শব্দে ভয় পেয়ে গেছি, একথা কি বলা যায়!
বাঁদর প্যান্ট ধরে টান দিয়েছে দেখে চেঁচিয়ে উঠেছি এটাও বলা যায় না। ভাবের চৌদ্দটা বেজে যাবে।

আমি বললাম কয়েকজন ডাকাত ছাদ দিয়ে ঢুকতে চাইছিলো। আমার চিৎকার শুনে পালিয়েছে।

খালা বললেন, “তুই ঠিক আছিস তো?”
আমি বললাম, “হোয়াই নট?”
তিনি আবার বললেন, “আর থাকবি উপরে?”
আমি বললাম, “মোটেই না, এখন নেমে যাব নিচে।”

খালা নেমে যেতে যেতে বললেন, “নামার সময় দরজা লাগিয়ে আসিস, তোর ডাকাতেরা গাছের ডালে বসে কিঁচকিঁচ করছে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি গাছের দিকে তাকালাম।
আমার ভাবের চৌদ্দটা বাজিয়ে বাঁদর দুটো গাছের ডালে বসে আছে। তাদের দৃষ্টি এদিকে। দৃষ্টি খুব একটা সুবিধার না। বাঁদরের মতো দৃষ্টি।

ছাদের ভাব

-পিয়াস মাহবুব খান

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
1
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Piash Mahboob Khan
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!