মাস্টারমাইন্ড

কলেজ জীবন থেকেই দুজনের প্রেম ছিলো।

পরবর্তী ছয় বছরে আর প্রেমে ভাটা পড়েনি কখনো।
একইসাথে দুজন ভার্সিটি থেকে বেরিয়েছিলো।

তারপর শান্তা আর পড়ালেখা করলো না। ওর বাসা থেকেই আর করতে দিলো না। সিয়াম জয়েন করলো চাকরিতে। বেশ ভালো বেতনের বড় চাকরি।

দুজনের প্ল্যান কিন্তু ঠিক ছিলো। সিয়াম ওর বাসায় সেই কলেজ থেকেই বলে রেখেছিলো। সিয়ামের মা ও রাজি ছিলো। শুধু সিয়ামের বাসা থেকে প্রস্তাবটা যাওয়ার অপেক্ষা ছিলো। শুধু শান্তার ফ্যামিলি একটু কনজারভেটিভ ছিলো, ওর বাবা একটু শক্ত মানুষ ছিলেন। আর সবকিছুই ঠিক ছিলো।

এরমধ্যেই একদিন হঠাৎ করে সিয়ামের চাকরিটা চলে গেলো।

সিয়াম কথা সহ্য করতে পারে না। ওর বস ওকে খুব অন্যায় গালি দিয়েছিলো। ওর মৃত বাবাকে নিয়ে খারাপ কথা বলেছিলো। সহ্য করতে না পেরে সিয়াম ফিরতি জবাব দিয়ে দিলো। বিনিময়ে চাকরিটা চলে গেলো।

খুব খারাপ অবস্থায় পড়ে গেলো সিয়াম। ছোটবোন আর মা কে নিয়ে শক্ত থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। বাসাটা ছাড়তে হলো। দেশে চাকরির বাজার মন্দ।
প্রতিদিন চাকরির খোঁজে দিন চলে যাচ্ছিলো।

এর মধ্যেই শান্তার বাসা থেকে ওর বিয়েটা ঠিক করে দিলো।

শান্তা বললো বাসায় সিয়ামের কথা।
শান্তার বাবা রাজি হলেন না। সিয়াম একদিন গেলো তার সাথে দেখা করতে। তিনি সিয়ামের কথা শুনলেন না। সিয়ামের মা গেলেন প্রস্তাব নিয়ে। তিনি তাকে সম্মান করলেন, কিন্তু প্রস্তাব মেনে নিলেন না।

দুজনের দেখা হতো। একজন আরেকজনের হাত ধরে চুপ করে বসে থাকতো। নিঃশব্দে কাঁদতো।

এদের দুজনের কাহিনী দেখে আমার নিজেরই আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করতো।
আমিই বুদ্ধি দিলাম সিয়ামকে, তুই শান্তাকে নিয়ে পালিয়ে যা। আমি সব ব্যাবস্থা করে দিবো।
তোরা কাজী অফিসে বিয়ে করবি,
আমার গ্রামের বাড়িতে কেউ নাই, তোরা সেখানে থাকবি কয়েক মাস। তারপর ফিরে আসবি, সবাই মেনে নিতে বাধ্য হবে। আর তোদেরকে আমি পৌঁছে দেবো গ্রামে আমার মামার গাড়ি দিয়ে।

আমিই ছিলাম মাস্টারমাইন্ড, সেই গাড়ির ড্রাইভার।

নির্দিষ্ট সময়ে সিয়ামকে গাড়িতে নিয়ে আমি শান্তার বাড়ির সামনে বসে আছি। শান্তা ব্যাগ নিয়ে এলো।
আমি ওদের নিয়ে রওনা দিলাম। সারা রাস্তা বোঝালাম, বিয়ে করে কয়েক মাস চুপচাপ থাকবি।
তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।

ওদের সেট করে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এলাম।
আমি আমার বাসায় ঢোকামাত্র পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেলো।

শান্তার বাবা অপহরণের মামলা করে দিয়েছিলো।
পুলিশ সিয়ামের কাছের বন্ধু হিসাবে আমাকেই ধরলো। অনেক মারলো, অনেক।
আমার কাছে দুটো রাস্তা ছিলো, এক ওদের ঠিকানা বলে দেওয়া।
আর দুই ওদের আরেকটু সময় দেওয়া, নিজের মুখ বন্ধ রাখা।

আমি কিছুই বললাম না। পুলিশ ধারণা করলো আমি দুজনকেই খুন করেছি। আমার বাবা মা ছিলো না। আমার মামা আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আমাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হলো। অনিয়মে-অত্যাচারে আমার শরীর ভেঙে গেলো।

তারপর ছয় মাসের মতো কেটে গেলো। কেস চলতে থাকলো, আমি জেলে থাকলাম। তারপর একদিন,
একদিন আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।

আমি জানলাম শান্তার বাবা কেস তুলে নিয়েছেন।
শান্তা আর সিয়াম দুজনেই বাড়ি ফিরে এসেছে।
দুজনের পরিবার থেকেই মেনে নিয়েছে দুজনকে।
শান্তার নাকি গুডনিউজও আছে। ওরা দুজনেই আমাকে খুঁজছে।

আমার খুব ভালো লাগলো। আমি নিজের মনেই হাসলাম। খুব আনন্দ হচ্ছিলো। সফল হলো আমার এতো কষ্ট।

তারপর আমি আর দেখা করলাম না ওদের সাথে।
আমার ভাই বাইরে থাকতো, ওর সাথে যোগাযোগ করলাম। কয়েকদিন লুকিয়ে থেকে চলে এলাম ওর কাছে। দেশ ছেড়ে, আমাকে পাল্টে দেয়া জেলের স্মৃতিগুলো ছেড়ে, অনেকের ভালেবাসা ছেড়ে।

আমি এখন বাইরে থাকি। আমার নিজেরও ফ্যামিলি আছে। সিয়াম শত চেষ্টা করেও আমার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে নি। অযৌক্তিক এই অভিমানের কারণও জানতে পারেনি। তবে সিয়াম আর শান্তা ভালো আছে। ওদের দুটো ছেলে আছে।

সিয়াম আর শান্তা দুই ছেলে নিয়ে একসাথে সুখে আছে,
এটা ভাবতেই আমার এখনো খুব ভালো লাগে।
সেই ভালোলাগাটুকু নিয়ে,
আমি ফিরে যাই আমার সন্তানদের কাছে।

বন্ধুমহলে রটে গিয়েছিলো যে জেলে আমার উপর এত অত্যাচার হয়েছে যে আমি রাগ করে ওদের সাথে দেখা করিনি।
ওদেরকে সাহায্য করতে গিয়ে আমাকে এত কিছু সহ্য করতে হয়েছে যে আমি আর ওদের সহ্যই করতে পারি নি।

ব্যাপারটা মোটেও সেটা না।

আমি মাস্টারমাইন্ড,
জীবন বদলে দেয়ার পর,
যাই আমাকে সহ্য করতে হোক না কেন,
আমি অতীতে ফিরে যাই না, যাই নি কখনো।

অতীত ভুলে আমি প্রাধান্য দেই বর্তমানকে,
অপেক্ষা করি নতুন কারো জীবন বদলে দেয়ার জন্য।

-মাস্টারমাইন্ড
Piash Mahboob Khan

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Piash Mahboob Khan
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!