dream

স্বপ্নের এক্সপায়ারি ডেট

ক্লাস এইটে থাকতে আমার খুব শখ হয়েছিল একটা ক্যামেরা কেনার। DSLR. এই বস্তু তখন যুবসমাজে অন্য লেভেলের হাইপ চালাচ্ছে। এন্ড্রয়েড ফোন সবে বাজারে ঢুকতে শুরু করেছে, ফেসবুক তরতর করে বেড়ে উঠছে, সাথে দৌড়াচ্ছে ফটোগ্রাফি গ্রুপগুলো। ২০১৪ সাল হবে।

যারা কখনো ক্যামেরা ব্যবহার করেনি, তাদের কাছে বস্তুটা খুব একটা মোহনীয় ছিল না। আমাদের মতো যারা পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ইউজ করেছিল, তাদের কাছে স্বপ্নের জিনিস ছিল ডস্লার। ম্যানুয়াল কন্ট্রোল, ইন্টারচেঞ্জেবল লেন্স, ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার, ব্যাপার স্যাপারই আলাদা। সাথে ক্যামেরা থাকলে প্রতি মাসে একটা করে নতুন গার্লফ্রেন্ড পাওয়া যায় বলে একটা ব্যাপার তো ছিলই।

তো নিকন আর ক্যানন তখন পুরোদমে বাজার কাঁপাচ্ছে। ৪০-৫০ হাজার টাকায় স্বপ্নের ক্যামেরা হয়। রোজ ১০ টাকা পকেটে নিয়ে স্কুলে যাই, পাঁচ টাকার হাফ চটপটি খাই, পাঁচ টাকা জমাই। একদিন পাঁচ পাঁচ করে জমে পঞ্চাশ হাজার নিশ্চয় হবে।

স্কুললাইফে বন্ধু বলতে দু’একজনের সাথে বেশ ভাল সখ্যতা ছিল। তার মধ্যে সামনের দিকে ছিল আরিফ। আমার বাপের বন্ধুর ভাগিনা ছিল আরিফ। সেই সূত্রে পারিবারিক হালকাপাতলা কানেকশনও ছিল। একদিন জানতে পারলাম আরিফের এক চাচাত/ফুপাত কেমন করে এক ভাই আছে যার ডসলার আছে।
ফেসবুকে ঢুকেই ভাইকে কষে রিকুয়েস্ট মেরে দিলাম। এক্সপ্ট হল। প্রফাইল ঘুরে ডসলার দিয়ে তোলা সব ছবি দেখে আমার পেটের ভেতর প্রজাপতি উড়া শুরু করে দিল। এই লোকের কাছ থেকেই আমার তালিম নিতে হবে।

সকালে উঠে ভাইকে মেসেজ দিয়ে টানা আধাঘন্টা তেল মেরে জিজ্ঞেস করলাম আমার লেজেন্ডারি প্রশ্ন – ভাই, ক্যানন ভাল নাকি নিকন?

নতুন শিষ্য পেয়ে তরুন ভাই আমার বেশ খুশি হয়ে, ঘন্টা ধরে আমাকে বুঝালেন, ক্যাননের কী ভাল, নিকনের কী খারাপ। কোনটা কীভাবে ইউজ করলে কোনটা নেয়া ভাল। তালিম নিয়ে ভাইকে খুশি করে বসলাম কম্পুটারে। তখন ইউতুব দেখার মতো এম্বি ছিল না, ভরসা ছিল রিভিউ ওয়েবসাইট। ঘণ্টার পর ঘন্টা ধরে রিভিউ পড়লাম। ভেরিফাই করলাম, ভাই যা বলেছে ঠিক কিনা। পরদিন সেইখান থেকে আবার আলোচনা শুরু।

মাসখানেক এভাবে চলার পর আমার প্রশ্ন হয়ে গেল শেষ। অবস্থা এমন যে ক্যানন আর নিকনের ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সব ক্যামেরার সব জীবনবৃত্তান্ত, ফাংশন, সুবিধা, অসুবিধা আমার মুখস্থ।

কি করা যায়, ভাইয়ের সাথে আলোচনা তো চালাতে হবে! ক্যামেরা কিনার টাকা যে নাই, সেটা আমি জানি, ভাই ত জানেনা। আবার আগের প্রশ্নই ঘুরেফিরে করা শুরু করলাম। ভাইও অটুট আগ্রহে শিখাতে লাগলেন। মাঝেমাঝে বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য বলতাম, এইত ভাই টাকা রেডি, মাসখানেকের মধ্যেই কিনলাম বলে।

এভাবে টানতে টানতে দেড় বছর চলে গেল। একদিন সকালে উঠে সপ্তম বারের মতো প্রশ্ন করলাম, ভাই, ক্যানন ভাল না নিকন? অনেক্ষনেও রিপ্লাই এল না। মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখি, ভাইয়ের মেসেজের নিচে লেখা, You can’t reply to this conversation.

সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। শালা দিনে যদি ৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা জমাতে পারতাম, নিশ্চয় এতদিনে একটা ক্যামেরা কিনে ফেলতাম।

সাত বছর পর সেদিন ঢাকা থেকে আমার ফুপাত ভাই এসেছিলেন। গলায় একটা ক্যানন M50 ঝুলানো। ক্যামেরাটা টেবিলে রাখা দেখে হাতে তুলে নিলাম। সেই সাত বছর আগের কাহিনীটা মনে পড়ে গেল। ক্যামেরাটার দিকে তাকিয়ে কেন জানি কোন ফিলিং হল না, একটা তাচ্ছিল্যের হাসি পেল শুধু। হায়রে স্বপ্ন মানুষের!


স্বপ্ন পূরন করবার যদি ন্যুনতম সুযোগও থাকে, করে ফেলুন। একসময় দশগুন টাকা থাকবে, একগাদা সময় থাকবে, কিন্তু স্বপ্নটা আর বেঁচে থাকবে না। থাকবে শুধু পার হয়ে যাওয়া একটা এক্সপায়ারি ডেট আর একটা তাচ্ছিল্যের দীর্ঘশ্বাস।

Niaj Morshed

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
3
1
0
2
0
1
Share:FacebookX
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ishmam Nur
Member
4 years ago

নিয়াজ ভাই, আপনার এই গল্পের সাথে আমারও একটা গল্পের খুবই মিল আছে। আমি বয়স্ক মানুষ, আমার সময়ে DSLR ছিল না, ছিল ডিজিটাল ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা দিয়ে প্রকৃতির ছবি তোলার কত শখ। কিন্তু ২০ হাজার টাকা দাম। তাই তা কেনার সাধ্যি ছিল না।

ক্লাস ৮ এ বৃত্তি পাওয়ার সুবাধে হাজার খানেক টাকা পেলাম। মা-ও এই খুশীতে বাকি টাকা মিলিয়ে একটা ক্যামেরা কিনে দিবে বললো। আমার চাই সবচেয়ে সেরা ক্যামেরা। তাই কোনটা আনাবো, কীভাবে আনাবো চিন্তা করে বিদেশে থাকা এক কাজিনকে ধরলার। পেলামও সেরা ক্যামেরাটাই। কিন্তু তা আসলো প্রায় ১.৫ বছর পরে। যখন হাতে পেলাম তখন আর সেটা দিয়ে প্রকৃতির ছবি তোলার শখ রইলো না।

এই লিখা পড়ে আবার সেই পুরনো ক্যামেরা-খানা বের করলাম। শখ/স্বপ্নের আসলেই একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে বোধহয়। লালন হয়তো তাই বলে গেছেন “সময় গেলে সাধন হবে না”

180052783_814790685787554_2548286763437509964_n.jpg

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!