আমাদের কাজের মেয়ে সালামের মা। আমি তাকে খালা বলেই ডাকি।সারাদিন পান চিবানো তার স্বভাব।হ্যা সারাদিনই পান চিবায়।এমনকি এই রোজার মাসেও।
মা মাঝে মাঝেই বকাঝকা করেন,
-লজ্জা করেনা তোর।রোজা তো থাকিসই না আবার মানুষের সামনে গিয়ে পান চিবাস।
সালামের মা হাসে।
-মানস্যেরে লজ্জা কি আফা। শাস্তি তো দ্যাবেন আল্লাহ। ঘরে বইস্যা খাইলেও সে দ্যাখবো বাইরে খাইলেও দ্যাখবো।
-তা এতো বুঝিস তো রোজা রাখিস না কি জন্য শুনি?
-আফা কাম করন লাগে পাঁচ বাড়ি, শরীলে কুলায় না। পোলার বাপ আর পোলা রোজা রাহে, তারাই আমার লাইগা দোয়া করে।
-তা পোলার বাপ যদি কাজ করে রোজা রাখতে পারে তুই পারবিনা কেন?
-পোলার বাপের কাম তো অহন বন্দ আফা। সে হইল পীর বংশের পোলা তার কি রোজা না রাখলে চলব? তারা বাপ-বেটা রোজা রাহে।আমি কাম করি।
সালামের মার কথা শুনে মা আর কিছু বলেনা। সারাদিন কাজ নাই শুধুমাত্র বিকেলে ইফতার বানানো। তাও বলতে গেলে সব কাজ সালামের মাই করে,তবুও হাপিয়ে ওঠে মা।আর পাঁচ বাড়ি কাজ করে রোজা রাখা সত্যিই কষ্টকর।
ঠিক আছে ঠিক আছে বেগুনি গুলো ভেজে ফেল তাড়াতাড়ি।আর শোন কয়েকদিন থেকে লক্ষ করছি ইফতার করার সময় ইফতারি কম পড়ছে।ঘটনা কি! তুই কি বানানোর সময় খাস নাকি।
-ছি ছি! কি বলেন আফা। রোজা রাখিনা জন্য ইফতারি চুরি কইরা খামু। তওবা তওবা!
-আমার চোখে যদি পড়েছে তাহলে কিন্তু তোর খবর আছে মনে রাখিস।
মায়ের কথা সত্যি, মাঝেই মাঝেই ইফতারি কম পড়ছে।যদিও ইফতার বেশিই বানানো হয়, কিন্তু বাবা প্রতিদিন দুই একজন করে লোক খাওয়ায়।
প্রতিদিনের মতো সেদিন ও ইফতারি কম পড়ল।বাবা মাকে বললেন তোমাকে না বলেছি বেশি করে ইফতারি বানাতে।
তারপর দিন পুটলিতে খাবার সরানোর সময়, সালামের মাকে হাতেনাতে ধরে ফেলল মা।
-হারামজাদি আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল। তোর ওপর আল্লাহর গজব পড়বে, রোজা তো রাখিসনা আবার ইফতার চুরি করে নিয়ে যাস প্রতিদিন।
-আফা আমারে মাফ কইরা দেন আর জীবনে চুরি করবনা। ভুল হইছে আফা মাফ করেন।
-তুই কাল থেকে আমার বাড়িতে আর আসবিনা।এ মাসের টাকা দিয়ে দিলাম চলে যা।
-না আফা এই কাজ কইরেননা।পোলার বাপের কাম নাই।
-তুই এখনি বের হবি আমার বাড়ি থেকে।
সালামের মা আসেনি দুইদিন। রোজা থেকে একা একা সব কাজ করা মায়ের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা।এর আগেও মা সালামের মাকে বকাঝকা করেছে, কিন্তু তারপর দিনই সে আবার হাসিমুখে ফিরে এসেছে। এসেই সে মায়ের পা জড়িয়ে ধরেছে।আমারে মাফ করেন আফা আর এমন হইবনা। মা ও আর তেমন কিছু বলেনি, হয়েছে যা এখন কাজ কর।
মা আমাকে ডেকে বলল, বাবা তুই একটু সালামের মায়ের খোজ নিয়ে আসতে পারবি।
-মা তুমিকি আমাকে বস্তিতে যেতে বলছ?
-হু বলছি।
আমার ভালো লাগছেনা।গরিব মানুষ খাবারের উপরই তো একটু লোভ করেছিল। ওভাবে ওকে গালি দেওয়া আমার ঠিক হয়নি। কতদিন এবাড়িতে কাজ করছে।
-ঠিক আছে মা আমি যাবো।তোমার চিন্তা করতে হবেনা।
সেদিনই বিকেলে আমি গেলাম বস্তিতে খোজ নিতে। একটা ছেলেকে সালামের মা কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করায় ওই চিনিয়ে দিল।
আমাকে বলল বেডি মনে হয় বাঁঁচবনা স্যার।বড়লোকের বাড়িতে ট্যাহা চুড়ি করতে গিয়া ধরা খাইছে।মাইরা মাথা ফাটায়া দেছে। ডাক্তারের কাছে নেওয়ার লোক ও নাই টাহা পয়সা ও নাই।গরিব মানুষ এমনেই তো মরে।
লোকটার কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। মাথা খারাপ নাকি! কি বলে এই লোক। সামান্য ইফতার চুরি থেকে টাকা চুরির কথা আবার মাথা ফাটানো।
সালামের মার বাড়িতে গিয়ে তার ছেলে সালামের কাছ থেকেই শুনলাম পুরো ঘটনা।
মা প্রতিদিন আমার আর আব্বার লাইগা ইফতার নিয়া আসতো। আমরা দুইজনই ভাবছিলাম আফনেরাই দেন।কিন্তু কাইল মা খালি আতে ফিরা আইছে। আমি আর আব্বা ওজু কইরা ইফতার করার জন্য মার লাইগা বইসা আছি।
আব্বা কইল কই ইফতারি কি কি আনছোস দে। মা কয় ইফতারি নাই পানি দিয়া রোজা ভাঙেন।ভাত রান্ধি তারপর খাইয়েন।
তারপর আফনাগোর বাড়ি কি কি অইছে মা সব কইল। সব শুইনা আব্বা খুব রাইগা গিছিল।
-কি কইলি তুই প্রতিদিন ইফতারি চুরি কইরা আনোস?
-আমি নিজে রোজা থাহিনা, আমি ক্যামনে চামু তাই চুরি কইরা তোমাগোরে লাইগা আনি।
-শালি আমরা এতো কষ্ট কইরা না খাইয়া রোজা থাহি। আর তুই আমাগো চোরের ভাগিদার বানাইছোস।আজ তর একদিন কি আমার একদিন।
রান্নাঘরের পাশে কয়েকটা ইট ছিল রাস্তায় কাজ করার সময় তার বাপ চুরি করেই এনেছিল। সেখান থেকে একটা ইট তুলে ছুড়ে মেরেছিল মায়ের মাথায়। সাথে সাথে অচেতন হয়ে পড়ে গিয়েছিল সালামের মা।
তারপর থেকে সালামের বাপের খবর নেই। সে যাওয়ার সময় পাড়ায় বলে গেছে, এক বড়লোকের বাড়িতে টাকা চুড়ি করে ধরা পড়ে মার খেয়ে ফিরে এসেছে সালামের মা।
সালামের মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালোনা।আমি সালামের মাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বাড়ি ফিরছি।
আর ভাবছি মানুষ এতো অদ্ভুত কেন!
অথচ ঐ মানুষটার জন্যই তো চুরি করেছিল সালামের মা।
লেখাঃ ইশরাত ইশা(Eshrat Esha)
Send private message to author






