আমার মা ছোটোখাটো একজন মহিলা। গায়ের রং কালো। সারাক্ষণ পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে ঘুরে বেড়ায়। আমার মা সহজ সরল। সব জটিল জিনিসকে সহজ করে ভাবে। বেশি কিছু পাওয়ার আশা করে না বা প্রত্যাশাও রাখে না।
একমাত্র ছেলে লেখাপড়া শেষ করে ঘরে বসে আছে। একমাত্র মেয়ের লেখাপড়াটা শেষের পথে এসে থেমে আছে৷ মেয়ের বিয়ে হয়নি বলে পাড়ার লোকের খোঁটা শুনেও মা বিরক্ত হয় না। হাসি মুখে সবটা অগ্রাহ্য করে দেয়। সবসময় বলে, “এত ভেবে কী হবে? আল্লাহ যা ভালো বুঝেন তাই করবেন।”
লকডাউনের মাঝেই ভাইয়ার অনার্স ফাইনাল শেষ হলো। বেশ কিছু জায়গাতে চাকরির পরীক্ষার আবেদন করে রেখেছে৷ এখনও কোথাও পরীক্ষার সুযোগ হয়নি। টিউশনির টাকাতে সংসার চালাচ্ছে। অল্প টাকাতে পুরো সংসার কীভাবে চলে এসব আমি বুঝি না। মা কেমন করে যেন হিসেব করে চালিয়ে দেন। আমরাও এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
গত রমজানে দেশে প্রথম লকডাউন চলছিল। ভাইয়ার সবগুলো ছাত্র পড়া বাদ দিয়ে দিলো। ভাইয়া কেমন পাগল পাগল হয়ে গিয়েছিল সেই সময়। আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। আমার মায়ের কোনো ভাবান্তর হলো না। সব সময়ের মতোই স্বাভাবিক ছিল। ভাইকে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দিলো। আমি অবাক হলাম সেদিন৷ মা বললো, ” সংসারের খরচ থেকে অল্প অল্প করে বাঁচিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। দুর্দিনের জন্য সঞ্চয় করে রাখা ভালো। “
আমার মায়ের এই স্বভাব আমার ভালো লাগে৷ ছোটোবেলা দেখতাম মা রান্নার সময় অল্প একটু ভাতের চাল, ডাল, তেল, মসলা, এগুলো আলাদা করে তুলে রাখতেন। বাজার শেষ হলে এসব দিয়ে চলে যেতো। আমার মা খুব সাশ্রয়ী একজন মহিলাও বটে।
লেখার উপযোগী কোনো কাগজ পেলে মা সেগুলো যত্ন করে রাখতো। আমাদের লেখাপড়ার খসড়া হিসেবে ব্যবহার করতে পারতাম। পুরাতন খাতার অব্যবহৃত কাগজ গুছিয়ে একসাথে সেঁটে দিয়ে নতুন খাতা বানিয়ে দিতো। মায়ের বড়ো ওড়না কেটে আমার জামা বানানো হতো৷ জামা কাপড় ছিঁড়ে গেলে সেগুলো সেলাই করেই পরতাম আমরা। নতুন কাপড় কেনার জন্য মায়ের কাছে আবদার করার সাহস হতো না আমাদের।
মায়েরা ভীষণ বোকা হয়ে থাকে। বাজারের ব্যাগ নিয়ে সারাটা রাস্তা হেঁটে এসে সেই টাকাটা বাঁচিয়ে আমাদের পছন্দের কোনো খাবার কিনে আনে। বাজারের ব্যাগটা গুছাতে গেলে আমরাও খুশি হয়। আমাদের মুখ দেখে মা ভুলে যায় অনেক কিছু। রাতের বেলা মায়ের খিদে লাগে না। বিস্কুট বা মুড়ি কিছু একটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ আমাদের জোর করে খাওয়িয়ে দেয়। মায়েদের এত বোকা হতে কে বলে দিলো?
আমাদের তেমন আত্মীয়ও নেই। গরিবদের যা আত্মীয় থাকে তারাও এই একই শ্রেণিরই হয়ে থাকে৷ বড়োলোক আত্মীয়রা খুব দূরের হয়। যোগাযোগ করলে যদি সাহায্য করতে হয় এই ভেবেই কেউ যোগাযোগ রাখে না। গত লকডাউনেই আমার এক চাচাতো ভাই যোগাযোগ করলেন। কলেজে পড়ান।
আমার ভাইকে ফোন দিয়ে বললেন, ” লকডাউনে হয়তো তোমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছো। আমি কি কিছু সাহায্য করতে পারি? আমি কিছু টাকা আলাদা করে রেখেছি তোমাদেরকে দেওয়ার জন্য।”
পাশ থেকে মা না বলে দিলেন। আমার মায়ের এই স্বভাবও আমার ভালো লাগে। বিপদে পড়লেও কারো কাছে হাত পেতে সাহায্য নিতে রাজি হয় না। আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আমরা ততটুকুতেই সন্তুষ্ট।
আমি আহামরি কোনো সুন্দরী নই। আমাকে দেখলে যে-কোন পুরুষ প্রেমে পড়ে যাবে এমনটাও নয়৷ মোটামুটি দেখতে আমি। প্রতিবার বিয়ের সম্বন্ধ এসেও ভেঙে যায়। গায়ের রং নিয়ে কথা বলার থাকে না তবুও অযুহাত হিসেবে এটা মন্দ নয়৷ ” মেয়ের গায়ের রং ময়লা। মেয়ের উচ্চতা কম৷ মেয়ের বয়সটাও তো কম না” – এই বাক্যগুলো শুনতে শুনতে আজকাল আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি৷ তবুও আয়নার সামনে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে খারাপ লাগে না। চোখের নিচে কাজল দিলে আমার মনে হয় এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ আমার। লোকের কথা শুনে নিজেকে অসুন্দর বলতে আমি মোটেও রাজি নই।
পাত্রপক্ষের চোখ ভোলানোর মতো কৃত্রিম সাজসজ্জায় তাদের সামনে যাইনি কখনও। আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তাদের নজর থাকে আমার গায়ে পরা শাড়িটার দাম কত হবে, আমার পায়ের জুতার দাম, আমার কানে পরার দুলটা সোনার না-কি, গলায় যেটা পরেছি সেটা কত ভরির হবে। আমার চেয়ে বেশভূষার দামটাই তাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পায়। তাদের চাহিদার কাছে আমার সবকিছুর দাম নগন্য। আমিও পছন্দের তালিকায় একদমই অযোগ্য, বাতিল।
বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসার আগে পারিবারিক সব বিষয়েই মোটামুটি খোঁজ নিয়ে আসা হয়। আমার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়ে থাকে। তবুও পাত্রপক্ষের মানুষের জানার থাকে অনেক কিছু৷ এই যেমন, তোমার চাচাদের কি একটা বউ? চাচাদের এক বউ হলে তোমার বাবার দুইটা কেন? শুনেছি, তোমার জন্মের আগে আগে তোমার বাবা আরেকটা বিয়ে করে চলে গেছে৷ তোমার মায়েরও দেমাক বেশি। দুই বউ একসাথে সংসার করলে কী হতো!
বিয়ের ক্ষেত্রে সবসময় সবাই শুধু বাবার পরিচয়টাই জানতে চায়। আমি একটা স্বতন্ত্র মানুষ। একটা নিজের পরিচয় আছে, নিজের স্বভাব আছে, আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে। পাত্রপক্ষ এসব শুনতে চায় না। কী কারণে বাবা মায়ের সম্পর্ক নেই, বাবা কেন চলে গেল এসব ব্যক্তিগত কথা শুনতে বোধহয় তাদের ভালোই লাগে। আমিও জেদ করেছি কেউ যদি কেবল আমার পরিচয় জেনে বিয়ে করতে রাজি হয় তবেই বিয়ে করব। আপাতত পরিচয় দেওয়ার মতো পরিচয় আমার হয়নি। লকডাউনের জন্য অনার্স ফাইনাল ইয়ারে এসে লেখাপড়াটা শেষ হয়েও শেষ হয়নি। বিয়ে নাহলেও আমার মায়ের বিশেষ ভাবনা নেই। আমি যদি সারাজীবন তার কাছেই থাকি এতেই যেন সে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে।
আমার মায়ের আত্মমর্যাদাবোধটা সত্যিই প্রশংসনীয়। থাকাটাই স্বাভাবিক। যে স্বামী গর্ভবতী স্ত্রীকে ফেলে অন্য একটা বিয়ে করে আলাদা সংসারের চিন্তা করতে পারে সেই স্বামীর সংসারে ফিরে যাওয়ার মতো কাজটা আমার মা করেনি। আমার জন্মের মাত্র বিশ দিন আগে আমার বাবা আরেকটা বিয়ে করে। আমার মা বিয়ের কথাটা জানতো না। মায়ের সাথে বাবা আর যোগাযোগ রাখেনি। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। সবার মতো করে আমার মাও ভেবে নিয়েছিল আমার বাবা হয়তো মারা গেছেন কিংবা এমন কোথাও হারিয়ে গেছেন আর কখনও ফিরে আসবে না। ছোটোবেলা তাই জানতাম আমার বাবা মারা গেছে।
দশ বছর পর বাবা ফিরে আসলো। আমার মাকে জানালো তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা। নতুন সংসারে দুই কন্যার পিতা সে, দায়িত্ববান পিতা। আমার মা নির্বাক। আমার পিতা অভিনয়ে পারদর্শী। এক পরিবারে সন্তানদের কাছে একজন কাপুরষ, দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়া পিতা। আরেক পরিবারে দায়িত্ববান, আদর্শ পিতা। একই পুরুষ, ভিন্ন রূপ। বাবা আর মায়ের মাঝে দশ বছরে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। মা আর বাবার সংসারে ফিরলো না। বাবাও জোর করেনি। বাবা এখন বছরে দু একবার ফোন দিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখে। অনেক কঠিন সময় পাড় করেছি আমরা। ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করেছি। তবুও আমার মা কখনও বাবার কাছ থেকে এক পয়সাও সাহায্য নেয়নি।
বাঙালি নারীরা বোকা হয়৷ প্রেমে পড়লে বা কাউকে ভালোবাসলে সবচেয়ে বেশি বোকামিটা করে। আমার মা যে বাবাকে ভালোবাসে এটা আমাদের না বললেও বুঝি৷ সারাটা জীবন বাবার জন্য একটা কষ্ট অনুভব করে। বাবাকে অভিসম্পাত করতে শুনিনি কখনও। আমরা কিছু বললে মা প্রতিবাদ করে৷ বাবাকে সম্মান করার শিক্ষাটাও মা দিয়ে থাকে।
এই যেমন সেদিন রাতে ডেকে বললো, ” তোর বাবা অনেকদিন ফোন দেয় না। তোরাও তো একটু দিতে পারিস। চারদিকে মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। খবর নিয়ে জানতে পারিস তো তোর বাবা কেমন আছে। “
ভীষণ মায়া হয় মায়ের জন্য। এইটুকু খবর পাবার জন্য বাবাকে ফোন দিলে ফোনের লাউড স্পিকারে বাবার গলার আওয়াজটা শুনার জন্যেই দাঁড়িয়ে থাকবে।
একটা সময় মা বাবাকে হ্যালুসিনেট করতো। তার মনে হতো বাবা ফিরে এসেছে। রাতে ঘুম থেকে উঠে একাই দরজা খুলতে যেতো কিংবা আমাদেরকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বলতো, “তোদের বাবা এসেছে দরজাটা খুলে দে।” কোনো কোনো দিন ফজরের পর মা দরজাটা খুলেই রাখে৷
বাবার সম্পর্কে মা একটা গল্প প্রায়ই বলে, ” জানিস ইমা, তোর বাবার সাহস কিন্তু প্রচুর। একবার রাতের বেলা ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে৷ গ্রামের রাস্তায় রাতে মাছ কিনে আনা কিন্তু বিরাট সাহসের কাজ। রাতে মাছ কিনলে রাস্তায় সেটা ভূত-প্রেতেরা রেখে দেয়। তোর বড়ো খালুর একটা মাছ একদিন রেখে দিয়েছিল। তোর বাবা কিন্তু সাহসের সাথেই মাছটা কিনে এনেছিল। “
মা এখনও সেই গল্পের ভেতরেই আছে। মা ভাবে কোনো এক রাতে আবার বাবা ফিরে আসবে। মা দরজা খুলে দেখবে বাবা একটা মাছ হাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ মা নতুন বউদের মতো মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াবে, ভীষণ লজ্জা পাবে বাবাকে দেখে। বাবা বলবে, ” ইমনের মা, মাছটা ভেজে ফেল। অনেকদিন তোমার হাতের রান্না খাই না।”
মা খুব সতর্কতার সাথে কাজ করবে। রান্নাঘরের বাসন চামচের শব্দে যেন আমাদের ঘুম ভেঙে না যায় সেদিকে নজর রাখবে। তবুও মাছ ভাজার গন্ধে আমাদের ঘুম ভেঙে যাবে। ঘুমঘুম চোখে দেখবো মা খুব যত্ন নিয়ে বাবার থালাতে ভাত বেড়ে দিচ্ছে৷ সেই সময় মায়ের কালো মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে থাকবে…।
লেখা: Esrat Emu.






