ফাঁকা পিচ-ঢালা রাস্তা। দুজন হাত ধরে হাঁটছি। আমাদের থেকে কয়েক গজ দূরে সামনে-পিছনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ে। ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল সহসা। কোনো পূর্ব-সংকেত ছাড়াই। আকাশে একটুও মেঘ জমেনি, চারিদিকের কোথাও একটুকরো অন্ধকার জুড়ে বসেনি, হিম হিম বাতাসও বয়নি। তবুও বৃষ্টি। এ যেন হঠাৎ-বৃষ্টি। ও আমার হাত ছেড়ে দিয়ে উচ্ছ্বাস করতে লাগল উচ্ছল পাখির মতো ডানা মেলে। ওর চুল ভিজে বৃষ্টির ফোঁটা চোখে পড়ল। ফাঁকা রাস্তায় শুধু আমরা দুজনই ভিজছি। বাকি যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সবাই নিকটস্থ বিল্ডিংয়ের বারান্দায় গিয়ে উঠেছে।
দেবদারু গাছের মতো রিনকির ছিপছিপে সমস্ত শরীর ভিজে একাকার। ভেজা উচ্ছৃঙ্খলা চুলরাশি, কপালে কালো টিপ, লাল ওড়নাটা দু-স্তনের ওপর লেপ্টানো, সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরিহিত একটি মেয়ে এক-জোড়া পাতলা চটির ওপর ভর করে দু-বাহু প্রসারিত করে বৃষ্টিতে স্নান করছে। এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে এর চেয়ে ভালো দৃশ্য আর কী হতে পারে? টিপটিপ করে ঝরে পড়ছে ধারা ওর স্নিগ্ধ দুহাত বেয়ে। হঠাৎ রিনকি আমার দুবাহু ওর দুহাতে চেপে বু্কে মাথা নোয়ালো।
রিনকি, লোকে দেখছে।
বুক থেকে ঠেলে উঠে বলল, “দেখুক। একটা চুমু খাও।”
কী!
রিনকি সিলেবাল ভেঙে ভেঙে বলল, “এক-টা চু-মু খাও।”
কী বলছ তুমি কি বুঝতে পারছ? আশেপাশের লোকগুলো সব আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
থাকুক। তোমাকে চুমু খেতে বলেছি, ত খাবে। নাউ স্টার্ট, আমি চোখ বন্ধ করছি…
রিনকির এই মুহূর্তে ঠিক কীসে ধরল আমি বুঝতে পারছি না। এরকম বিহেইভিয়ার রিনকি আমাদের রিলেইশনশিপের দুবছরে কখনও করিনি। রিলেইশনশিপ মানে কিন্তু বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্ক নয়। রিলেইশনশিপ মানে একটা সম্পর্ক–(কী তা জানি না, কোনো স্পেশাল নাম নেই)শুধু অনেকটা জানাশোনা, একটু বোঝা, বেশ-খানিকটা পরিচয়। ব্যাস, এতটুকুই।
রিনকির সাথে পরিচয়ের এক বছর পর আমি ওকে প্রপোজ করেছিলাম যদিও। কেন জানি না, আমি আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। খুব সহজ ভাবে আমি ওকে বলে দিয়েছিলাম।
কিন্তু ও বলেছিল, “দ্যাখো আমরা খুব ভালো বন্ধু। আমরা একে অপরকে অনেক ভালো জানি বা বুঝিও। আর হ্যাঁ, আমাদের মতেরও অনেক মিল আছে ঠিকই, কিন্তু আমার মনে হয় না, আমাদের রিলেইশনশিপে যাওয়া উচিত হবে। বরং আমরা বন্ধু হয়ে দেখো অনেক বছর কাটিয়ে দিতে পারব। কিন্তু রিলেইশনশিপ এমন একটা প্যারা, যেটা তুমিও নিতে পারবে না, আমিও পারব না। আমরা দুজনই হাঁপিয়ে উঠব এবং শেষমেষ আমাদের সম্পর্কটাই বিলীন হয়ে যাবে। কী দরকার বলো!আর…” একটু নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি।”
আমি বলেছিলাম, “আচ্ছা। তোমার যেমন ইচ্ছে।” কিন্তু চোখের কোণে কেন জানি-না একফোঁটা জল ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল সেই মুহূর্তে। একটা ধমক দিয়ে ধারাকে আবার অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দিলাম। রিনকি বুঝতেও পারল না।
তুমি কি রাগ করেছ?
না।
তুমি আবার উল্টোপাল্টা কিছু করে বসবে না ত। দ্যাখো আমার কিন্তু খুব ভয় হয় তোমাকে নিয়ে।
আরে না না। তোমার একটুও ভয় পেতে হবে না।
আমি জানি, তুমি অনেক ম্যাচিউর একটা ছেলে। —বলে আমার গাল দুটো টিপে দিল রিনকি।
বৃষ্টির মধ্যে কি কোনো এক-ধরনের মাদকতা আছে? কে বলতে পারে! তবে আজ কেন রিনকি এমন পাগলামি করছে? ও কি ভুলেই গেছে আমরা স্রেফ ভালো বন্ধু। আর ভালো-বন্ধুরা কখনো ওইসব করে না।
“না, আমি ভুলে যাচ্ছি না।” রিনকি আমাকে বিস্মিত করে চোখ মেলল।
তুমি কী-করে বুঝলে আমি কী ভাবছিলাম?
আই ক্যান রিড ইউ, বস!
আচ্ছা! তাহলে অমন পাগলের মতো চুমু খেতে কেন বলছিলে?
এমনি। চলো, ভিজতে ভিজতে বাসায় যাই।
আমার হাত ধরে রিনকি হাঁটা ধরল।
মেয়েদের মুখে ‘এমনি’ ‘জানি না’ এইসব ছোটো ছোটো বাক্য শুনলে ভারি আশ্চর্যবোধ হয় আমার। জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে মনটা। রিনকি কি সত্যিই চাইছিল আমি ওকে চুমু খাই? নাকি আমাকে পরীক্ষা করে দেখার একটা চেষ্টা মাত্র? এসব তবু অবসরে ভাববার কথা।
বৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে আমরা হাঁটছি। যেন আমরা রোদ-পড়ে-যাওয়া বসন্ত-বিকালে গায়ে বাতাস লাগাতে বের হয়েছি। হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল থাকলে ভালো হতো।
একটা কৃষ্ণচূড়ার নিচে এসে আমরা দাঁড়ালাম। দুজনই ভিজে চপচপ। এ-জায়গাটা বেশ ফাঁকা। আশেপাশের লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। সারি বেঁধে ইউক্যালিপটাস গাছগুলো ঠাঁই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে আমাদের মতো। কনক্রিটের একটা বেঞ্চ দেখে রিনকি সেখানে গিয়ে বসল।
আসো, এখানে এসে বোসো।
রিনকি, আর বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হবে না। চলো বাসার দিকে যাই।
আরে বোসোই না!
অগত্যা বসলাম রিনকির পাশে। কিছুক্ষণ কোনো কথা চলল না। তারপর রিনকির হঠাৎ প্রশ্ন—
তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
বাসি।
কতোখানি?
বলতে পারব না।
তার মানে তুমি আমাকে ভালো-বাসো না। ওটা তোমার ভালো-লাগা ছিল।
হয়ত, নয়ত।
ভাগ্যিস আমি ‘হ্যাঁ’ বলিনি। নাহলে খুব পস্তাতে হতো আমাকে।
হ্যাঁ, ভালোই করেছিলে। আমিও বেঁচেছি।
বেঁচেছি মানে? সত্যিই ভালোবাসো না আমাকে?
না।
তাহলে সেদিন ওরম বাচ্চাদের মতো চোখে জল এনেছিলে কেন? ভালোই লাগছিল কিন্তু তোমাকে। একদম ছোট্ট শিশুর মতো। যে শিশুটা পাঠশালা থেকে ছুটতে ছুটতে বাড়িতে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে মা মা ডাকত। তারপর যখন দেখত দরজা তালাবন্ধ, মায়ের উত্তর নেই। সে ভ্যাক করে কেঁদে দিত। আমি গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে দেখতাম। খুব ভালো লাগত ওর কান্না। দেখে আমার খুব হাসি পেত, জানো? সেদিন তোমাকে দেখেও আমার সেই শিশুটার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।
বলতে বলতে রিনকি উদাস হয়ে সামনে তাকিয়ে রইল। এই এক মেয়ে যার থেকে আমি কোনোদিন কোন কিছু লুকোতে পারি না। পারিনি আজও। ওর চোখ দুটো ঠিক মনুষ্য-চোখের মতো নয়–একটু আলাদা। গাঢ় কালো মনিকোঠরের ঠিক পাশে একটা ক্ষুদ্র কালো তিল, আশেপাশের লাল-সবুজ শিরাগুলো জাগ্রত; কেমন অদ্ভুত সরল, কোনো জটিলতা নাই; জটিলতা নাই বলেই বোধহয় কোনো জটিল অদৃশ্য ওর চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “তুমি কি সেই শিশুটা, ঋদ্ধ?”
কোন শিশুটা?
তুমি চিনবে না। থাক, বাদ দাও।
থেমে তারপর আবার নিজেই বলতে আরম্ভ করল। “এতোদিনে ওর তোমার মতোই বড়ো হয়ে যাওয়ার কথা।
আমাদের বাসার সামনে ছিল ওদের বাসা। দুটো ঘর ছিল ওদের। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি। একটা ছিল ওদের শোয়া-থাকার ঘর, অন্যটা ছিল রান্না-খাওয়ার ঘর। ছেলেটা আমার উপর খুব রেগে থাকত। আমি বুঝতে পারতাম। ওকে স্যারের বাসায় পড়তে যেতে হতো আর সেই স্যার আমার বাসায় এসে আমাকে পড়িয়ে যেত। বোধহয় এটাই ছিল ওর রাগের প্রধান হেতু। ওই পাড়ার ছেলে-মেয়ে কেউই আমার সাথে কেমন যেন মিশতে চাইত না। আর ও তো নয়ই। কিন্তু আমার খারাপ লাগত না। আমার প্রতি ওর এই ঈর্ষাই আমার বেশ লাগত। একদিন আমি টের পেলাম, ওকে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। তারপর একদিন…”
রিনকি থেমে গেল। “কী তারপর একদিন?”
কিছু না। তখন আমাদের বয়স কতো জানো?
জানি না।
আনরোমান্টিক ছেলে! প্রলুব্ধ চোখে বলতে হয় “কত!”
আমি একটু চেষ্টা করলাম। বললাম, “কতো?”
মাত্র সাত বছরে আমি। ওরও মেইবি সাত-আটই হবে। আমি রোজ বারান্দায় অথবা ছাদে গিয়ে ওকে দেখতাম। ও রাত জেগে জেগে পড়ত।
গরমের সময়। সেদিন হঠাৎ লোডশেডিং। রাত প্রায় বারোটা হবে। কিছুক্ষণ বসে থাকতেই গা ঘেমে উঠল। ভাবলাম দেখি ত ও জেগে আছে কি না। মা-বাবা ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি নৈশব্দে ছাদে উঠলাম। অর্ধচন্দ্রের জোছনা ঠিকরে পড়েছে ছাদে। ছাদের কোণ থেকে বাতাবীলেবুর ঘ্রাণ ভেসে আসছে নাকে। ফিরফির বাতাসে ঘেমো-গা শিরশির করে উঠল আমার। দেখলাম একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে পড়ছে ছেলেটা। খুব ডাকতে ইচ্ছে করল ওকে ওর নাম ধরে। কিন্তু মুশকিল কী জানো-তো কখনও ওর নামই জানা হয়ে ওঠেনি। এবং অজানা এক ভয়ে ডাকা হলো না আর। ও একবার ছাদের দিকে তাকিয়েছিল, তারপর আমাকে দেখেই সটান মোমবাতি নিভিয়ে দিল। সেইদিন আমার খুব খারাপ লাগছিল ভেবে কেন ও আমাকে এতো ঘেন্না করে। পাশাপাশি ভালোবাসা-বোধটাও জাগ্রত হচ্ছিল। কিন্তু আমি চমকে গেলাম…
দেখলাম ও রেলিঙ ধরে ঝুলছে আমার সামনে। আমি কিছু না ভেবেই হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমি কিছু করে জিজ্ঞেস করতে যাব..আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ও আমাকে আবার চমকে দিল..
রিনকির চোখমুখ জ্বলজ্বল করতে লাগল বৃষ্টির মধ্যে। ও একটুও না-থেমে বলতে থাকল। বৃষ্টিও থামছে না, রিনকিও থামতে চাচ্ছে না। আমিও যেন শুনতে চাচ্ছি না বুঝতে পেরে রিনকি বললো, “চলো উঠি। সর্দি লেগে যাবে।”
প্রধান সড়কে উঠে আমরা একটা রিকশা নিলাম। হুড নামানো ছিল। রিনকি হুড উঠিয়ে দিল। বলল, “এরকম বৃষ্টি আগে কখনও আমার লাইফে আসেনি। আরেকটু ভিজি।”
আমি বললাম, “বৃষ্টি সবসময়ই একই। মেয়েরা একটু বেশি সংবেদনশীল কিনা এইজন্য। প্রত্যেক বৃষ্টিকেই ওদের আলাদা মনে হয়। আসলে ত জল!”
ধ্যাত, তুমি একটুও রোমান্টিক না!
ওই ছেলেটা বুঝি খুব রোমান্টিক ছিল?
অন্তত তোমার মতো খাইস্ট্যা ছিল না। বৃষ্টিকেই ভালোবাসতে পারে না যে, সে আবার আমাকেই ভালোবাসবে!
এবার আমি ওকে চমকে দিলাম। ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ঠোঁটে চুমু খেলাম। রিনকি একটুও সংকুচিত হলো না, শিহরিত হলো না। আমারও কেন মনে হলো ঠোঁট দুটো আমার বহু বছরের চেনা।
রিনকি আমাকে ঠেলে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। তারপর কিছুক্ষণ আনমনে কী-যেন ভাবল। বলল, “তুমি কি সেই শিশুটা, ঋদ্ধ?”
তুমি ত আমাকে পড়তে পার। ওই ছেলেটাকে পড়তে পারতে না?
কেউ আর কিছু বলল না। রিকশা চলছে ঢুলে ঢুলে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আমরা তিনজন ভিজছি। রিনকি পড়ার চেষ্টা করছে কিছু। এই প্রথম রিনকির চোখকে কিছু ফাঁকি দিল? ওর চোখ দুটো জ্বলছে রাতের আকাশের তারার মতন দিনের আলোয়। হঠাৎ রিনকি হেসে উঠল। কিন্তু চোখের কোণে সামান্য জল। এ-জল জল নয়।
–সৌমেন মণ্ডল (Saumen Mondal)
Send private message to author






বৃষ্টির মাঝে একধরণের সৌন্দর্য আছে, ঠিক তেমন সৌন্দর্যই খুঁজে পাই আপনার লেখার মাঝেও।
ধন্যবাদ। এমন মন্তব্য লেখার অনুপ্রেরণা জোগায়।