মাটির বাসন

সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে দুই বাহুতে আগলে ধরে হাসপাতালের বেডে হেলান দিয়ে বসে আছে আদিবা আনজুম। পাশেই তার স্বামী শাহনেওয়াজ হোসেন হাস্যোজ্জ্বল চোখে ছেলেকে দেখছেন। কিছুক্ষণ বাদে দরজার দিকে তাকায় আদিবা। সাথে সাথেই তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। হাসি মিশ্রিত মুখটা মূহুর্তেই গোমড়া করে বসে। শাহনেওয়াজ হোসেন তার স্ত্রীর চেহারায় হঠাৎ পরিবর্তন দেখে দরজার দিকে তাকালেন। তার মা বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলছেন।

“উনি এখানে এসেছেন কেন?”- আদিবা ফিসফিসিয়ে তার স্বামীকে প্রশ্ন করে।

“কেন আবার? নাতিকে দেখতে এসেছে।”- শাহনেওয়াজ উত্তর দিলেন।

“তো আমরা কি বাসায় যেতাম না? এখানে আসার কী দরকার?”

আদিবার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই তার শাশুড়ি কেবিনে প্রবেশ করলেন। বয়সের ভারে কুঁচকে যাওয়া মুখে হাসির ছাপ ফুটিয়ে সোজা নাতির দিকে পা বাড়ালেন।

“আপনি এখানে কেন আসতে গেলেন?”- তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছুড়ে আদিবা। তার স্বামী ইশারায় বুঝালেন যে এসব প্রশ্ন করার জায়গা নয় এটা। সেও চোখের ভাষা দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়- তুমি চুপ থাকো দয়া করে।

তাদের মুখের দিকে লক্ষ্য না করে নাতির দিকে তাকিয়েই তার শাশুড়ি বললেন, “ওমা! নাতি হয়েছে তাকে দেখতে আসবো না?”

“আমরা বাসায় গেলে সেখানে তো দেখতে পেতেন নাকি?”

আদিবার কড়া কণ্ঠের প্রশ্নে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শান্ত গলায় জবাব দেন, “আমি বুড়ি মানুষ! অতো সময় ধৈর্য্যে কুলাবে বলো?”

“ভালো। দেখলেন তো নাতিকে। এবার বাড়িতে যান দয়া করে। পুরো বাড়ি তো একা ফেলে এসেছেন।”

“কেবলই না আসলাম! এখনও তো নাতিকে কোলেও করলাম না তার আগে ফিরি কী করে?”

চোখের ভ্রু কুঁচকিয়ে ছেলেকে তার কোলে তুলে দেয় আদিবা। ফিরোজা বেগম দু’চোখ ভরে তার নাতিকে দেখছেন।
“আচ্ছা কী নাম দেবে তার?”- প্রশ্ন করলেন তিনি।

“এ বিষয়ে ভাবতে হবে না আপনার। ছেলের বাবা-মা তো আছে এখনও তাই না?”

“আচ্ছা মা, তুমি বাড়িতে যাও এখন। একদম ফাঁকা বাড়ি ফেলে আসা উচিত হয়নি৷ চোর-ডাকাতের হামলাও তো হতে পারে।”- বললেন শাহনেওয়াজ।

“আচ্ছা বাবা, তুইও আছিস এখানে! আমার তো মনেই হচ্ছিল না এখানে আর কেউ আছে।”- উপহাসের স্বরে বললেন ফিরোজা বেগম। “আর দিনের বেলাতে চোর-ডাকাতের হামলা হবে কীভাবে? পাড়া-প্রতিবেশীরা তো মরার ঘুম ঘুমাচ্ছে না।”

বেরিয়ে আসলেন তিনি। তার সেখানে উপস্থিত হওয়াকে আদিবা পছন্দ করেনি মোটেও- তিনি বুঝতে পারেন। আর তার ছেলের কথা কী বলবেন তিনি, বউ যা বলবে সেটাই তার কাছে সঠিক।

তিনি চলে আসলে আদিবা তার স্বামীর দিকে রাগে বড় হয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “তোমার মা কী বলে গেল? তিনি কি ভাবছেন যে আমিই তোমাকে ভুলভাল বুঝাই?”

“কিসব বলছো তুমি? তিনি এগুলো কখন বললেন।”

“তুমি কি তার কথা কিছুই বুঝো না? তিনি বলেননি যে- ‘আমার তো মনে হচ্ছিল না এখানে আর কেউ আছে’? এ কথার মানে বুঝো না?”- একের পর এক প্রশ্নের গোলা নিক্ষেপ করে সে।

“আস্তে, হাসপাতালের মধ্যেও শুরু করলে তুমি। আর বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়েও চিল্লাচ্ছো, কবে বুদ্ধি হবে তোমার?”

“আমার কথাগুলোকে চিল্লানো মনে হয় তোমার? বেশ তো, মা তার ছেলের কানভারী করে তুলেছে দেখছি।”

“চুপ করো। মা আমার কানভারী করবে কেন?”

“তা না হলে আজ আমার উপর মেজাজ দেখানো আসতো না।”

শাহনেওয়াজ কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলেন। সেখানে থাকলে আদিবার চিল্লাপাল্লা থামবে না।


ফিরোজা বেগম আজকাল খুব বেশি হাসিখুশি থাকেন। সবসময় নাতির পাশে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। এটিকে আবার আদিবা ভালো চোখে দেখতে পারে না। ছেলের পাশে তার শাশুড়িকে মোটেও ঘেষতে দিতে চায় না সে। কিন্তু সেটা সম্ভব না বিধায় সবসময় মনেমনে দাঁত কিটমিট করতে থাকে। একদিন হুট করে তার স্বামীকে বলেও ফেলে, “এমন ভাব যেন মনে হচ্ছে প্রথমবার দাদী হয়েছে, তার আগের দুই সন্তানের ছেলেপুলেদের ভালোবাসা দেখাতে পারে না নাকি?”

“সবসময় বাজে বকবকানি করে যাও কেন? আমি ভাইবোনদের মাঝে সবার ছোট। আমার ছেলেকে নিয়ে তো তার বেশি খুশিই থাকার কথা।”

“হ্যাঁ যত দায়ভার সব যেন ছোটজনের উপর।”

“মানে?”

“তোমার মা কি তার বড় ছেলেকে চোখে দেখেন না? আমাদের ফ্যামিলিতেই গদি মেলে বসেছেন কেন?”

“বড় ভাইয়ের আলাদা ফ্যামিলি আছে। দু’জন সন্তানকে সামলানোর সাথে মা-কেও সামলানো তার উপর বেশি চাপ হয়ে পড়তো।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন আবার নীতিকথা শুনানো শুরু করবে। যত্তসব।”


ছেলেটি বড় হচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে কোনো গল্প শুনে আসলে দাদীর কোলে বসে বায়না ধরবে গল্প শোনাতে। তার কথা হলো, “আমার বন্ধুরা তার দাদুদের থেকে গল্প শুনে ক্লাসের সবাইকে শোনায়, আমাকেও তুমি গল্প শুনাবে যেন আমিও তাদের সেগুলো শোনাতে পারি। আমার থেকে বেশি গল্প যেন কেউ শোনাতে না পারে, বুঝেছ?”

ফিরোজা বেগম মুচকি হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে যান শুধু। নাতিকে যে তার মা তার দাদীর কাছে আসতে দিতে চায় না এটা তাকে কে বুঝাবে?
সেদিন এশার নামাজ শেষ করতেই জায়নামাজে এসে বসে পড়ে গল্প শোনার বায়না ধরে। ফিরোজা বেগম তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে গল্প শুরু করতে যাবেন এমন সময় তার মা ডাক ছাড়ে, “আয়ান, খেতে আসো।”

আয়ান বাধ্য ছেলের মতো উঠে যায়, কিঞ্চিৎ মন খারাপ করে। তার মায়ের বিরুদ্ধে তার হাজারো অনুযোগ তার দাদীকে ঘিরে। খাবার টেবিলে বসে মা’কে প্রশ্ন করে বসে, “আম্মু, দাদু আমাদের সাথে বসে কেন খায় না?”

“আসলে তোমার দাদুর বয়স হয়েছে তো, তাই চেয়ারে বসে খেতে পারেন না।”- ভাতের লোকমা মুখে তুলে দিতে দিতে বললো আদিবা।

“তাহলে আমরা সবাই দাদুর মতো নিচে মাদুর বিছিয়ে বসে তো খেতে পারি যাতে দাদুও আমাদের সাথে খেতে পারে।”

আদিবা ফুসলে ওঠে। ছোট্ট ছেলেটির কথাও তার মধ্যে মৃদু রাগের উদ্ভব ঘটায়। বলে, “তোমার দাদুর হাত কাঁপে। খাওয়ার সময় অনেক ভাত ফেলে নিচে নোংরা করে। এখন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যাও।”

“কিন্তু দাদুকে মাটির বাসনে খেতে দাও কেন?”

“এতো বেশি বুঝবে না সবকিছুতে।”- একপ্রকার ধমক দেয় আদিবা।

আয়ান কোনো কথা বলে না আর। সেদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। পরের সন্ধ্যায় আগেভাগেই দাদীর কাছে গিয়ে গল্পের বায়না ধরে। নাতিকে বুকে জাপটে ধরে সামান্য দোল খেতে খেতে রূপকথার গল্প শোনাতে থাকেন তিনি। কিছুসময় বাদে শাহনেওয়াজ হোসেন এসে তার মা’কে ধমকায়, “এখন তাকে গল্প শোনানোর সময়? একটু পরেই তো ঘুমাতে চলে যাবে। তাহলে সে পড়বে কখন?”

আয়ান চুপিসারে দাদীর কোল ছেড়ে উঠে যায়। ফিরোজা বেগম শাহনেওয়াজের চোখদু’টোকে দেখছে। ছোটবেলায় সে খুব আবদার করতো বৃষ্টিতে বাইরে ফুটবল খেলতে যাওয়ার। তিনি কখনওই ছাড়েননি তাকে। অজানা ভয় কাজ করতো তার মধ্যে। সবসময় আগলে রেখেছেন ছেলেকে। খেলতে না পেরে সে ঐ চোখদু’টো দিয়েই কান্নার সাগর বইয়ে দিতো। আর আজ সেই চোখ জুড়েই চাপা ক্রোধ জ্বলজ্বল করছে। “সময় পরিবর্তনশীল..”- ভাবেন ফিরোজা বেগম। “নাকি সময়ের ভাজে ভাজে মানুষ পরিবর্তনশীল?”- পরমূহুর্তে নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি।


“ছেলেমেয়ে বড় হলে মা-বাবা পর হয়ে যায় তাই না দাদী?”

“কে বলেছে? মা-বাবা কখনওই পর হয় না। বুঝলে দাদুভাই?”

“কিন্তু আমি তো দেখি আব্বু আম্মু কখনও তোমার সাথে ভালো করে কথা বলে না, একসাথে বসে খায়ও না, বেড়াতেও নিয়ে যায় না।”

“আমার কি আর এখন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার বয়স আছে?”- আয়ানের প্রথম দুটি কথাকে এড়িয়ে তৃতীয়টির উত্তরে বললেন ফিরোজা বেগম। আয়ান পুনরায় কোনো প্রশ্ন করার আগে তিনি বললেন, “তোমাকে একটা গল্প শোনাই তাহলে।”

আয়ান গল্প শোনার জন্য নড়েচড়ে বসলো। ফিরোজা বেগম শুরু করলেন, “এক ভরদুপুরে কড়া রোদের মাঝে এক লোক তার ঘরের চালে উঠে চাল মেরামত করছে। এমন সময় তার মা এসে বারবার তাকে বলছেন দুপুরের এই রোদের মধ্যে কাজ না করতে। কিন্তু লোকটি কিছুতেই তার মায়ের কথা শুনছে না। বলছে কাজ শেষ করে তবেই নামবে। এরপর তার মা ঘরে ঢুকে লোকটির বাচ্চা ছেলেকে এনে রোদে শুইয়ে দিলেন। তখনই লোকটি বলতে শুরু করে- ‘ওরে মা আমি এখনই নাইমা আইতেছি, তুমি দয়া কইরা আমার পোলারে রোদের থেইকা সরাও।’ এখন বলো দাদুভাই, লোকটি হঠাৎ নেমে আসতে চাইলো কেন?”

“কারণ লোকটির মা তার ছেলেকে রোদে শুইয়ে দিয়েছিলেন যেটা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না।”

“আর তার মা তার ছেলেকে রোদে শুইয়ে দিলেন কেন?”

“কারণ তিনি তার ছেলেকে বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তারও যেমন তার ছেলেকে রোদে দেখতে কষ্ট লাগছিলো তেমনিই তাকেও রোদে কাজ করতে দেখে তার মায়ের কষ্ট লাগছিলো।”

“এইতো বুদ্ধিমান দাদুভাই আমার। তাহলে বলো, সন্তান বড় হলে কি মা-বাবার ভালোবাসা কমে যায়?”

“মা-বাবার ভালোবাসা তো কমে না। কিন্তু সন্তান তো মা-বাবাকে পর করে দেয়।”

নাতির কথার উত্তর নেই ফিরোজা বেগমের কাছে। ছোটবেলা থেকে সে যেমনটা দেখে আসছে তেমনই তো ধারণা করবে সে। এতে তার দোষ কোথায়? আয়ান বড় হয়েছে, ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছে। তাকে আর কী বলেই বা বুঝ দেওয়া যেতে পারে!
তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ফিরোজা বেগম বলেন, “তোমার মা খেতে ডাকবে এখনই, যাও। আর আমারও ক্ষুদা লেগেছে। পরে আবার গল্প শোনাবো। ঠিক আছে?”

আয়ান মাথা নাড়ে। উঠে দরজা পর্যন্ত গিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। বলে, “তোমাকে এই মাটির বাসনে খেতে দেখতে আমার মোটেও ভালো লাগে না দাদু।”
আর কিছু না বলেই আয়ান চলে আসে।


দিন চলে যায় নিজস্ব নিয়মে। ফিরোজা বেগম গত হয়েছেন। সেদিন খুব কেঁদেছিল আয়ান। ফিরে এসে তার দাদীর মাটির বাসনটিকে ছোট এক টুকরো কাপড়ে পেঁচিয়ে শোকেজে তুলে রাখে সে। তার মা প্রথমে সোজা না করে দিলেও পরে ছেলের জেদের কাছে হার মানে। এরপর বেশ কয়েকটা বছর কেটেছে। একদিন আদিবা শোকেজের সব জিনিসপত্র পরিষ্কার করতে গিয়ে অসাবধানতায় মাটির বাসনটি ভেঙ্গে ফেলেন।
আয়ান শব্দ শুনে দ্রুত ছুটে আসে। আর এসেই দেখতে পায় তার মা বাসনটির উপর পেঁচানো কাপড় খুলছে। বেশ কয়েকভাগ হয়ে গিয়েছে ওটা। আয়ানের চোখ টলমল করে ওঠে। আদিবা ছেলের চোখে পানি দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, “কী হয়েছে? বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদছিস কেন?”

আয়ান উত্তর দেয় না। তার মা আবারও বলে, “সামান্য একটা মাটির বাসনের জন্য কাঁদতে হবে? এতো দামী নয় এটা। এরকম বাসন তো আবারও কিনতে পাওয়া যাবে।”

“বাসনটি দামী হোক বা সস্তা সেজন্য কাঁদছি না আমি।”

“তাহলে কেন কাঁদছিস?”

“তোমরা এই বাসনে দাদীকে ভাত খাইয়েছ। ভেবেছিলাম আমিও একদিন তোমাকে এই বাসনেই খাওয়াবো। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো কই? এজন্য কাঁদছি।”- বড় এক নিশ্বাস ছেড়ে আয়ান ফের বলে ওঠে, “আফসোস রয়ে গেল।”

লেখাঃ সায়ান আহমেদ (Sayan Ahmed)

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
3
0
0
1
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Sayan
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!