জুতার কত রকম!

জুতা কাহিনী

লেখার কোন যুৎসই বিষয় পাচ্ছিনা বলে জুতা কাহিনী লিখতে বসেছি। জুতা নিয়ে আমার সমস্যা একেবারে ছোটকাল থেকে। ছোটবেলার ঘটনা বেশি বলা যাবেনা। সঙ্গী সাথীদের নাম চলে আসবে। তারা সকলে আমার মত নির্লজ্জ নন। ক্যাডেট কলেজে মাগরেবের নামাজ থেকে প্রেপে (প্রিপারেশনের সংক্ষিপ্ত রুপ, সন্ধ্যায় আমাদের পড়তে যেতে হত একাডেমিক ব্লকে, ক্লাশ রুমে) যাওয়া পর্যন্ত সময় কম থাকায়, দৌড়ের উপর থাকতে হত। অনেকেই অহেতুক দৌড়াদোড়িতে না গিয়ে কালো জুতার গোড়ালি কেটে জুতাকে টু ইন ওয়ান বানিয়ে ফেলত। মসজিদে গেলে চটি, আর ক্লাশে গেলে জুতা। সামনে থেকে দেখলে চটি না জুতা বোঝার সাধ্য কার।

খুবই অগোছালো ছিলাম আমি বিএমএ ( বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি) তে। সকালে পিটিতে যাবো তো জুতা খুঁজে পাচ্ছিনা। ক্লাশে যাবো মোজা নেই। বক্সিং কম্পিটিশনের পর বেশ কিছুদিন আমাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে ইংরেজি পরীক্ষা দিতে যাবো, মোজা খুঁজে পাচ্ছিনা, দেরি হয়ে যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত একটি মোজা পেয়ে সেটাই ডান পায়ে পরে ফেললাম। আমি বসতাম ক্লাশের বাম দিকে, কপাল ভালো থাকলে বাম পা দেখা যাবেনা। ডান পায়ে তো মোজা আছে। মেজর বশির নামে একজন জাঁদরেল শিক্ষক পরীক্ষার গার্ড। তাঁকে আমরা ভয় পেতাম তাঁর মেজাজের জন্যে। তিনি দুই তিনবার আমার পাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে একবার পেছনে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাক দিলেন। আমি কাছে গেলে বললেন, “তোমার পায়ে কোন সমস্যা আছে নাকি? আমার হঠাত মনে হলো, তোমার পায়ের মধ্যে কি যেন একটা অসামঞ্জাস্য আছে। দূর থেকে নিচু হয়ে দেখলাম তোমার দুই পায়ে দুই রঙ এনিথিং হ্যাপেন্ড ইন সিএমএইচ?”

মি বললাম, ” জি না, স্যার । আমি একটি মাত্র মোজা খুঁজে পেয়েছি”। বশির সাহেবের অধিক শোকে পাথর হবার অবস্থা।
মহাবিষ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, আমি তুমুল গালিবর্ষণের আশংকায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি তিনি শুধু বলতে পারলেন, “তাই বলে এক পায়ে মোজা.….”.। আমার মনে হল বশির স্যারের ঘোর সহজে কাটবে না। ঘোর কাটুক না কাটুক আমার উপর তাঁর কিঞ্চিৎ স্নেহ জন্মেছিল। এরপর তিনি আমার অনেক লঘু পাপ উপেক্ষা করেছেন। তবে বশির স্যারদের নিয়েই তো পৃথিবী নয়। জুতোর সাথে আমার দ্বৈরথ চলতেই থাকল।

বিয়ের রাতে শালারা বানিজ্যের আসায় জুতা লুকিয়ে রেখেছিল, সেদিক ভ্রুক্ষেপ না করে খালি পায়ে গাড়িতে উঠে গিয়েছিলাম। কাফরুলের এক মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে খালি পায়ে বাসায় আসতে হল। মক্কায় গিয়েছি ওমরাহ করতে, ক্বাবা ঘরের সামনে থেকে জুতা উধাও, অভিজ্ঞরা জানালো কিছু ক্ষণ পর পর পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজে আসেন, তাদের দায়িত্ব পূর্ণ এলাকেয় লাওয়ারিশ জুতা পাওয়া গেলে তারা সেগুলি ফেলে দেয়। কয়েক বছর পর ডিওএইচএস মসজিদ থেকে নগ্নপদে প্রত্যাবর্তন করতে হল।

র্বশেষ ঘটনাটা ঘটল দেশ ছেড়ে আসার দিন কয়েক আগে। দেশ ছেড়ে আসা সহজ কাজ নয়। নানান ধান্দায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, নিজের দিকে তাকানোর সময় পাচ্ছিলাম না l একদিন রাত সাড়ে এগারোটায় বাসায় ফিরে জুতো খুলতে গিয়ে মনে হল জুতোটা আমার নয় l হওয়ার কথা চকোলেট রঙের জুতো, অথচ পায়ের জোড়া কালো l আমি মধ্যবিত্ত, পায়ে বড়লোকি জুতো, মনে অস্বস্তি l

প্তাহ খানেক আগে ভাইয়ের বাসায় উঠেছি ভাবলাম জুতো জোড়া তার, তাহলে আমার গুলি, ওর জুতোর তাকে হবার কথা l তাকে তাদের পাওয়া গেলোনা l অন্য যেসব জায়গায় গিয়েছিলাম, কোনখানেই খবর পাওয়া গেলোনা l একেবারে শেষে গিয়েছিলাম দাঁতের দোকানে । স্ত্রীকে বললাম, ” ওখানে, রিসেপশনে থাকেন রুনা আপা, তাকে ফোন কর”, পাশ থেকে শুনে মা বললেন, “এক্ষনি ফেরত দিয়ে আয়”। স্ত্রী বললেন, “রাত প্রায় বারোটা বাজে, এখন রুণা আপাকে ফোন দেই কিভাবে!”

সকালে দৗপার ফোন পেয়ে রুনা আপা জানালেন, জুতো নিয়ে ধুন্ধুমার ঘটে গেছে কাল l এক ভিআইপি পেশেন্ট তিন চারজন বডিগার্ড নিয়ে আসেন, তাদের এক জুন জুতো হারিয়ে মাতম করেছেন কাল l অনেক দামৗ জুতো, যেনো তেন জুতো নিয়ে কৗ স্যারের সাথে ডিঊটি করা যায়? স্যারের একটা স্ট্যাটাস আছেনা! জুতো ফেরত না পেলে তিনি হ্যান এবং ত্যান করবেন l

শেষপর্যন্ত জুতো ফেরত পাঠালাম সন্ধ্যায়, বিয়ের দিন থেকে জুতো হারাচ্ছি, জুতো হারানোর যাতনা আমি বুঝি 

সাইদুল ইসলাম ( Saidul Islam)

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
1
3
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
সাইদুল ইসলাম
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!