সেদিন নিমন্ত্রণে

ত্রয়ী,হ্যা,আমি সেই ত্রয়ী।আজ আমার হলুদ,
সেমাই রান্না করছেন আম্মু,আমি জানি না হলুদে সেমাই
রান্না হচ্ছে কেন?
অর্কিড ফুলের গয়না আনতে গিয়েছেন আমজাদ ভাই।
গত সপ্তাহে আমি আর আমজাদ ভাই নিজে গিয়েঅর্ডার করে আসলাম।আমজাদ ভাই রিক্সায় আমার পাশে,এই প্রথম কেন জানি আমজাদ ভাইকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে,সকাল বিকেল শেষ করার মতো চুমু।আমজাদ ভাই আমাকে পছন্দ
করেন,সেটা কখনো মুখে বলবে না।আজো বলবে না জানি।আমি এতো বোকা নই,চাল চুলো নেই এমনএকটা ছেলের গলায় ঝুলে পড়বো ফুলের মালা নিয়ে।
তবে মাঝে মাঝে উনার জন্য খুব মায়া হয়,উনি খুব
দু:খী একটা মানুষ, কেউ নেই তার।

২০০৮ যখন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে তখনতিনি ছাত্রদল করতেন,ডজনখানেক মামলা।সেই ভয়ে বগুড়া থেকে ঢাকা আমাদের ধানমন্ডির এই বাসাতে এসেছিল।
আজ অবদি আছেন।আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।আগে উনার সামনে পড়লেই ভয় করতো,এখন আর করে না।

গতবার যখন আমি সুপ্তির বিয়েতে গেলাম,আব্বু আমার সাথে আমজাদ ভাইকেও দিয়ে দিলেন আমার
চরমদার হিসেবে।আমি তখন খুব হ্যাপি,সুপ্তিকে কতদিন দেখি না।আমি আর সুপ্তি স্কুল থেকে কলেজ
অবদি একসাথে পড়েছি।
তারপর ওরা একদিন পরিবারসহ সিলেট চলে গেল।আমিও সিলেট অনেকদিন যায়নি, ঢাকার মতো সুরু রাস্তা না হওয়ায় নিজেকে খুব মুক্ত লাগছিল।আমি ড্রাইভার কে বললাম গাড়ি থামান,আমজাদ ভাই আপনি কি আমাকে এক প্যাকেট
সিগারেট এনে দিতে পারবেন?সিগারেট দিয়ে কি হবে পাল্টা প্রশ্ন করলো আমজাদ ভাই।আমি একটু হেসে বললাম “খাবো আমি।””ত্রয়ী তুমি এতো অসভ্য কেন?”কথাটা বলেই আমজাদ ভাই সিগারেট আনতে গেলেন।
আমি তখন ইডেনে পড়ি,আমার বন্ধু বলতে সুপ্তি আর
হাসান ছিল।হাসান ঢাকা ইউনিভারসিটি তে পড়ে,হাসান
হচ্ছে সুপ্তির মামাতো ভাই।সেই সুবাদেই আমার সাথে পরিচয়।হাসান যখন হাসতো মনে হতো মরে যাই,প্রেমে পড়ে যাইছেলেটার।
হাসান আমার প্রেমে পড়েছিল সেটা আমি বুঝি ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষার সময়।পরীক্ষা থেকে বের হতেই আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল,আমি বলি কি এটা?হাসান বলে প্রেম পত্র,বাসায় নিয়ে খুলবি।
প্রিয় ত্রয়ী,আমি বিয়ে করবো তোকে,আমাকে বিয়ে করলে সারাজীবন বিনা খরচায় বিড়ি সরবরাহ করবো।
কথা দিলাম।ভলা উই বীবে।
হাসান।

বাসায় এসে চিঠি পড়ে আমি হাসতে হাসতে শেষ।
আমি ফোন করে বলি”হাসান তোর আর আমার প্রেম
মনে হয় কোন দিন হবে না,যদি হয় তবে সেটা ই
হবে অবিশ্বাস্য,তবে কোন দিন যদি ডাকি তবে আসিস”
সে দিনের পর থেকে হাসান আর আমার
সামনে আসেনি, আমিও আর যোগাযোগ রাখিনি।
আমার আর সুপ্তির সিগারেট খাওয়ার হাতেখড়ি হাসানের হাত ধরে।টিএসসিতে বসে দিনের পর দিন, চা,সিগারেট সবই পুরোপুরি চলতো।
একদিন হলে গেলাম ছবি দেখতে, সেখানে হুট করে হাসান চুমো খেল আমায়।কিচ্ছু বলিনি সেদিন।
আমারও সম্মতি ছিল হয়তো।
পরে আবার সরি বললো, আমি মাফ করে দিলাম।
অনেক দিন সিগারেট খাই না,আজ আমার হলুদ।
সিগারেট খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।

আমজাদ ভাই কে ডাকলাম,আমজাদ ভাই ফুল
নিয়ে চলে আসছে। উনাকে অনেক ব্যস্ত দেখাচ্ছে,প্রচুর
খাটতে হচ্ছে উনাকে।আমজাদ ভাই একটু আসেন তো এই দিকে,আমজাদ ভাই চুপ করে আমার পাশে আসলো।
আমজাদ ভাই আমার চোখের দিকে তাকান।তাকান বলছি।আপনার চোখে জল কেন?

আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য জায়গায়, আপনার কষ্ট হচ্ছে?আমাকে বিয়ে করবেন?কি সাহস হচ্ছে না?আচ্ছা আমাকে চুমু খাবেন?কি সাহস হচ্ছে না?বিয়ের পর কিন্তু এই সুযোগ পাবেন না।আমজাদ ভাই চুপ করে রইলো, চোখ দিয়ে জল পড়ছে,আমি হাত দিয়ে চোখ মুছে দিলাম।একজীবনে সব পাওয়া সম্ভব না।আপনি আমার চেয়ে অনেক ভালো মেয়ে বিয়ে করবেন।
আপনি কি আমাকে এক প্যাকেট সিগারেট
এনে দিতে পারবেন? প্লিজ শেষ সিগারেট, বিয়ের পর আর খাবো না।

আমি সিগারেট ফুঁকছি, হাতে কলম কাগজ।আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাচ্ছি,পালিয়ে গিয়ে আমার মনের মানুষ কে বিয়ে করবো।

প্রিয় আম্মু,
আম্মু,আম্মু,আম্মু।আমি চিরদিনের জন্য পালিয়ে যাচ্ছি।আমার পছন্দের ছেলে কে বিয়ে করবো।তুমি ভুল ভাবছো, আমজাদ ভাইয়ের সাথে আমার কোন প্রেমের রিলেশন নেই।

আমার পাত্র আমি নিজেই ঠিক করেছি,পাকিস্তানি ছেলে,মীর সোয়াব।দেখতে মাশাল্লা, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।ওর নিমন্ত্রণেই যাচ্ছি,রাতে ফ্লাইট আমার।কিছু টাকা আর তোমার বিয়ের শাড়ি টা নিয়ে যাচ্ছি।

যুদ্ধ আমাদের সাথে ওদের বিরোধ অই গুলো আমি ভাবতে পারবো না,আমি শুধু জানি ওকে আমি ভালোবাসি।কখন কবে যুদ্ধ হয়েছিল সেগুলো আমার দেখার বিষয় না।শুধু উর্দুটা আমার অপছন্দ,ও বলেছে বিয়ের পর আমাকে শিখিয়ে দিবে।করাচি বিমান বন্দর থেকে ও আমাকে নিতে আসবে।
ফেসবুকে সোয়াবের সাথে পরিচয়, প্রণয়।ও আমাকে খুব ভালো বুঝতে জানে।আম্মু মাফ করে দিও,প্লিজ।
ইতি
ত্রয়ী।

আমি রাত আটটায় বাসা থেকে বের হলাম,সবার চোখ
ফাঁকি দিয়ে।হাতে নীল কাঁচের চুড়ি,আর চোখে মোটা করে কাজল দিলাম।সোয়াবের খুব পছন্দ।টেক্সি নিলাম,ধানমন্ডি ৩২ আসার পর প্রচুর জ্যামে গাড়ি থেমে আছে।বঙ্গবন্ধুর ভাষন চলছে; ৭ই মার্চের সেই ভাষন।
এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম…..আজ ১৬ই ডিসেম্বর।
গাড়ি চলতে শুরু করলো, আমি থেমে আছি ভরাট
গলার সেই ভাষনে।আমার কপালে বিন্দু বিন্দুঘাম,আমি কি অন্যায় করছি জাতির সাথে,নাকি যুদ্ধে সব
হারানো বিরঙ্গনাদের অসম্মান করছি।আমি ভাবতে পারছি না কিছু।আমি কেন সবার জন্য আমার ভালোবাসা বিসর্জন
দিব?আমি সোয়াব কে ছাড়া কিছু ভাবতে পারছি না।
ইমিগ্রেশনে আমি অপেক্ষায়, পাসপোর্ট টা নিলাম হাতে।
“আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায়
ভালোবাসি”
লেখাটা পড়ে চোখে জল এসে গেল।পাকস্পর্শ পাবো কয়েক ঘন্টা পর,ভাবতেই ঘেন্নায় গা গুলিয়ে গেল।বমি করলাম কিছুক্ষণ।
“মা তোর বদনখানি মলিন হলে,আমি নয়ন
জলে ভাসি”
আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

হাসান কে ফোন দিলাম।হাসান তুই এয়ারপোর্ট আয়,আমি তোর অপেক্ষায়।বলেই ফোনটা রেখে দিলাম।ঘন্টা দুই পর হাসান আসলো।আমি হাসানের পাশে বসলাম রিক্সায়,নিজেকে খুব পাখি মনে হচ্ছিল।
ত্রয়ী আমরা কই যাচ্ছি,হাসান বললো!
আমি হেসে বললাম,আজ তোর আর আমার বিয়ে।
আশপাশে কোন কাজী অফিস থাকলেআমাকেসেখানে নিয়ে চল অথবা কোন মৌলবির কাছে।

হাসান বললো” মহারাণী তাই হবে। “হাসান তোর কাছে একটা সিগারেট হবে,একটা?
প্লিজ।

হাসান পকেটে হাত দিল….

সৈয়দ সাদী আয়াত উল্লাহ (syed sadi ayat ullah)

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
3
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Sadi Ayat
4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!