ষাটের দশক। বলছি আমাদের শৈশব আর কৈশোর সময়ের কথা। সে সময়টায় ছেলে বুড়ো কারোরই বিনোদনের তেমন কোন ভালো ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের শৈশব কৈশোরে একা বা দল বেঁধে আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া ছিল বিনোদনের আর আনন্দের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় মাধ্যম। যোগাযোগের তেমন কোন উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় ক্ষেত্রেই কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে আত্মীয়দের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে হতো তখন।
সে সময়টাতে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই হাঁস মুরগী পালার ব্যবস্থা ছিলো। বাড়ীতে কোনো মেহমান এলে সাধারণত বাড়ীর ঘরে পালা মুরগী জবাই করেই রান্না করা হতো মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য।
অত্যন্ত সাদাসিধে ছিল সে রান্না। সেই সময়টাতে পামওয়েল বা সয়াবিন তেলের প্রচলন শুরু হয়নি। রান্নাবান্না হতো সরিষার তেলে। তেলের পরিমাণ ছিল ছটাক, পোয়া ও সের হিসেবে। ৪ ছটাকে এক পোয়া আর ৪ পোয়ায় এক সের। গ্রামাঞ্চলে তখন সাধারণত আধা সেরের বেশী তেল কাউকে একসাথে কিনতে দেখা যেত না।
সাধারণত তেল আনা হতো কাঁচের বোতলে করে। তখনো প্লাস্টিকের বোতল চালু হয়নি। বোতলের উপরের দিকে মুখ বরাবর দড়ি দিয়ে একটা আংটার মত তৈরী করা হতো যার ভিতর দিয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বাজার থেকে তেল আনা হতো। দোকানীর কাছে কাচ্চা, ছটাক আর পোয়ার মাপে তেল পরিমাপের টিনের কৌটা থাকতো। তাতে তেল পরিমাপ করে টিনের চোঙ্গা দিয়ে দিয়ে তা বোতলে ঢুকিয়ে দেয়া হতো।
এবার মুরগী রান্নার প্রসঙ্গ। তখনকার গ্রামের মহিলারা অত্যন্ত অল্প তেল, মসলা দিয়ে রান্না করতেন মুরগী। শীল পাটায় বাটা মরিচ, হলুদ, জিরা, ধন্যা আর এর সাথে কিছুটা আদা বাটা, খানিকটা রসুন বাটা, দু একটা এলাচ আর ছোট কয়েক টুকরো দারুচিনি এগুলো ছিলো মূলত রান্নার মসলা। কোন কোন পরিবার আবার সাথে সাথে উঠোনের ছোট সবজি বাগান থেকে
তুলে আনা তাজা ধন্যাপাতা ও যোগ করতো এর সাথে। আর্থিক অনটনের কারণে অনেক পরিবারে আবার এর সবগুলো ও ব্যবহার করা হতো না বা পরিমাণে আরো কম ব্যবহার করা হতো।
সামান্য তেল আর অল্প মসলা দিয়েই রান্না করা হতো মুরগী। সাথে দেয়া হতো পিছ করে আলু। বর্তমানের বড় আলুর প্রচলন তখনও শুরু হয়নি। বড় আলুর প্রচলন শুরু হয় আরো পরে। বড় আলুকে তখন বলা হত ললিতা আলু। মুরগী রান্না হতো দেশী আলু দিয়ে। দেশী আলু গোটা বা ক্ষেত্র বিশেষে দুই পিস করে মাংসের সাথে দিয়ে রান্না হত মুরগী। রান্না হতো লাকড়ীর চুলায়। মুরগীর টুকরা গুলো ছোট ছোট পিচ করে কাটা হতো। মাংসে ঝোল থাকতো অনেক। সে সময়টায় পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা বেশী থাকায় সঙ্গত কারণেই ঝোলের পরিমাণ বেশী রাখতে হতো।
রান্না শেষ হলে রান্না ঘরেই পাটি বিছিয়ে খাবার আয়োজন করা হতো। বাড়িতে মেহেমানের সংখ্যা বেশী হলেও প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটা মুরগীই জবাই করা হতো। মেহমানের সংখ্যা বেশী হবার কারণে আমরা ছোটরা সাধারণত গলার হাড্ডি, মাথা, ডানা, চামড়া, পা ও ছোট ছোট টুকরা গুলো পেতাম। কিন্তু তাতেই আমরা থাকতাম প্রচন্ড খুশী। জানিনা কি যাদু বলে তখনকার মায়েরা একটা মুরগী দিয়েই এতজনকে সুন্দরভাবে খাওয়াতে পারতেন। গরম গরম ভাত, সাথে দু তিন টুকরা আলু, দু এক পিস মাংস আর ঝোল এগুলো দিয়েই মোটামুটি খাবার পর্ব শেষ হয়ে হতো। সাথে আরো কিছু কিছু আইটেম থাকতো। মুলত মুরগীর মাংসর আর ঝোল নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। তাই অন্যান্য আইটেম নিয়ে আলোচনা আজ নয়।
গরম গরম ভাতের সাথে অত্যন্ত সাদামাটা আর অল্প তেল মসলা দিয়ে রান্না করা মুরগীর মাংসের সাথে কয়েক টুকরা দেশী আলু আর ঝোলের স্বাদ কেন জানি মনে হয় এখনো মুখে লেগে আছে। এ যেন ছিলো এক অমৃত। শীতকালে যখন নতুন আলু উঠতো তখন এই নতুন আলু দিয়ে রান্না মাংস স্বাদে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করতো। তখনকার গ্রামীণ জনপদে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবারের মা, খালা, চাচী, নানী, দাদী আর গৃহবধূদের রান্না করা এ মুরগী আর ঝোলের স্বাদ এখন মনে পড়লে সেটা মনে হয় যেন এক সুদূর সোনালী অতীত।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
Md. Aowrangazeb Chowdhury.
Toronto, Canada.




এরকম জীবন ঘনিষ্ঠ লেখা আরও চাই। সুন্দর লেখাটির জন্যে অভিনন্দন