ছেলেঃতুমি বড় অসহায়
ছোটবেলায় যখন ফ্লু ফিভার হতো, আমি আর ভাইয়া ছোট থাকায় আমাদের প্রথমে হতো, এরপর হতো আম্মুর, তারপর আব্বুর। আমরা কখনো অসুস্থ হয়ে গেলে আব্বু পাগলের মতো হয়ে যান। সেবা শুশ্রূষা, ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি , ঘড়ি ধরে ওষুধ খাওয়ানো, মাথায় পানি ঢালা,স্পঞ্জ করা সব আব্বু এক হাতে করেন।
দেখা যেতো, তখন আব্বুও অসুস্থ থাকতেন। অথচ এই অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি আম্মু সহ আমাদের সবার সেবা করতেন।
আমার তখন একটা কথাই মনে হতো, আমাদের অসুখ হলে আমরা আম্মুর কাছে যাই, আব্বুর কাছে যাই। আবার আম্মু অসুস্থ হলেও আব্বুর কাছে যায়। কিন্তু আব্বু? আব্বুর তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ততদিনে দাদুও মারা গেছেন।
ইদে যখন বাড়িতে যেতাম, ইদের নামাজে যাওয়ার আগে আম্মুকে প্রায় ই একটা কথা বলতে শুনতাম, “তোমাদের ভাই তো তোমাদের সব আব্দার পূরণ করে সবার জন্য ইদের জামা কাপড় কিনে এনেছে। কিন্তু তোমার ভাই যে একটা পুরোনো, ময়লা টুপি পরে নামাজে যাচ্ছে, সেটা তোমাদের কারো চোখে পড়লো না। “
আমি ভাবতাম, তাই তো, আব্বু কার কাছে আব্দার করবে। আব্বু তো ছেলেমানুষ, তার উপর সবার বড়।
আমরা ২ ভাইবোন একসাথে প্রাইভেট মেডিকেল আর ভার্সিটিতে পড়তাম। আব্বু আম্মু কলেজে অধ্যাপনা ছাড়া আর কিছু করতেন না। আম্মুর সাব্জেক্ট জেনারেল হওয়ায় আম্মু বেশ কিছু এক্সট্রা ক্লাস পেতেন, টিচার্স ট্রেইনিং কলেজগুলোতে পার্টটাইম জব করতে পারতেন। সারা বছর প্রচুর খাতা দেখতেন আম্মু। কিন্তু আব্বু রসায়নের অধ্যাপক হওয়ায় এসব কিছু পেতেন না। আর টিউশনি করাকে আব্বু ভালো চোখে দেখতেন না। আত্মসম্মানবোধ প্রবল তো,তাই। যার ফলে, আমাদের পরিবারের ইনকাম ছিলো খুব লিমিটেড। আম্মু তো আম্মুর পুরো বেতন চেকে সাইন করেই নিশ্চিন্ত হয়ে যেতেন। কিন্তু আব্বু দিন রাত ২৪ ঘন্টা হিসাব করে মেলাতেন কিভাবে চলতে হবে আমাদের। এমনকি আম্মু খাতা দেখেই রেখে দিতেন। বাকি সব কাজ আব্বু একা হাতে করতেন। কখনো দেখতাম সারারাত জেগে ক্লাস রুটিন করছেন, পরীক্ষার সময় বেশি বেশি পরীক্ষার ডিউটি করছেন, একবেলা, দুবেলা। সম্মানীর কত পাবেন, শুনে খুব মন খারাপ হতো, এই কটা টাকার জন্য এতো কষ্ট? ৭-৮ ঘন্টা বাইরে থাকলেও কিছুই মুখে দিতেন না। রাগ করতাম, ৫ টাকার সিঙারা খেলে কি হয়। কিন্তু ওই যে… হিসাব মেলাতে হবে। বাবা তো উনি।
আমি শুধু ভাবতাম, আব্বুর অনুপস্থিতিতে আম্মু কি আদৌ এই কাজগুলো করতে পারতেন। আর আব্বু তো আম্মুকে হেল্প করছেন। আব্বু কার কাছ থেকে হেল্প পাচ্ছেন??
আম্মুর শরীর টা ভালো নেই। আব্বু রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সব কিছুতে ৮০% কাজ এগিয়ে রাখেন। আব্বুর শরীরটা কেমন আছে, খুব একটা জিজ্ঞেস করা হয় না। কারণ সঠিক উত্তর কখনো পাবো না।
আম্মু অনেক ওয়েট লুজ করেছেন। আব্বু সারাক্ষণ সেটা নিয়েই কথা বলেন। খাওয়ার সময় আম্মুর মুখের দিকে চেয়ে থাকেন,নিজের খাওয়া বাদ দিয়ে। অথচ এককালের ৯০% সুঠাম দেহের অধিকারী আব্বুর ও যে মাসল ওয়াস্টিং হয়েছে, খুব একটা চোখে পড়ে না। আব্বু নিজে তো দেখেন ই না। আমরাও বললে, রাগ করেই বলি, আপনার শরীরের কি অবস্থা হইছে, দেখছেন?
আমি বলতেও চাই না। কারণ আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে পারফেক্ট মানুষটাকে দূর্বল ভাবতে রাজি না আমি।
আম্মু মন খারাপ হলেই, আমাদের কাছে শেয়ার করেন। আব্বুর কাছে শেয়ার করেন। কাঁদতে ইচ্ছে হলে কাঁদেন। মন হালকা করেন। আব্বুর মন খারাপ তো বুঝিই না। বুঝলেও স্বান্তনা দিতে যাই না। বরং দোষারোপ করি, আপনার মহানুভবতার কারণেই আজ আপনি কষ্ট পাচ্ছেন।
আব্বু রিটায়ারমেন্টের পর খুব ভেঙে পড়েছিলেন। আম্মুর বেতনের টাকায় চলতে হবে, ভেবে। ২/১ মাস আম্মুকে বলতেন, তোমার টাকা, তোমার যেভাবে ইচ্ছে খরচ করো। আমি একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, “চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্ট করেছেন, পিতৃত্ব থেকে না। আর আম্মুকে এতোগুলা বছর সাঁতার না শিখিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দিচ্ছেন। আম্মু পারে কোনো হিসাব।” আলহামদুলিল্লাহ কাজ হয়েছিল কথায়। একজনের বেতনে কষ্ট করে চলে, ছোট মেয়েটাকেও প্রাইভেট ডেন্টালে ভর্তি করালেন। শুধুই আব্বুর ম্যানেজমেন্ট এর মাধ্যমে।
এতো গেলো আব্বুর কথা। ভাইয়া আর আমি সমবয়সী প্রায়। আমি একা একা সবজায়গায় যেতাম। আর ভাইয়াকে কোথাও পাঠিয়ে আব্বু আম্মু স্পাই এর মতো পিছু নিতেন, খারাপ সঙ্গে যেনো না পড়ে।
আমার একটা/২টা প্রাইভেট টিউশনি মাগরিবের পর পর্যন্ত হলে প্রবলেম ছিলো না। ভাইয়ার মাগরিবের আগে বাসায় ফেরা বাধ্যতামূলক ছিলো।
২ ভাইবোন ঝগড়া করলে দোষটা ভাইয়ার উপর ই যেতো। শুধু ছেলে হওয়ায় না, বড় হওয়ায়। আজ যখন নিজে সন্তানের মা হয়েছি, আম্মুকে বারবার বলি, “প্রথম সন্তান পুরাই আলাদা হয়, তাই না আম্মু।” অথচ ভাইয়াকে একটু বেশি আদর করলে বলতাম, আড়াই বছর তো ওকে একাই আদর করেছো। এই আড়াই বছরের হিসাব নিকাশ আজ ও শেষ হয় নি।
বিবাহ সংক্রান্ত জটিলতা কার না থাকে? নতুন বিবাহিত জীবনে একটু খাপছাড়া ভাব সবার ই থাকে।
ভাইয়ার কোনো ভুল বা সমস্যায় আব্বু আম্মুকে মানা করি ভাইয়াকে দোষারোপ করতে। সে যদি সবদিক থেকেই আশ্রয়হারা হয়, তাহলে যাবে কোথায়। ২ টা ফেমিলিকে এক সুতায় তো তাকে একা হাতেই বাঁধতে হচ্ছে। যেখানে আমি মেয়ে হয়েও বিবাহিত জীবনে খুব পরনির্ভরশীল আর নিশ্চিন্ত।
নানা নানুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ছেলেদের সাথে কত দূরত্ব। জীবনের শেষ ১০ টা অসুস্থতার বছর শুধুমাত্র মেয়েদের কেই ভরসা করলেন। মেয়েদের বাসাতেই কাটালেন। ভুলেও কখনো ছেলেদের সাথে কাটাতে চাইতেন না। আর না ছেলেদের সেই বলিষ্ঠতা ছিলো, বাবা মা কে নিজ হাতে সেবাযত্ন করবেন। ২ এ ২ এ ৪ মিলে মেয়েদের পরম বন্ধু বাবা মা, মেয়েদের সাথেই শেষ সময় টা কাটালেন।
নানু মারা যাওয়ার পর কেউ ভাবতেও পারে নি, নানা অন্য কোথাও যাবেন মেয়েদেরকে ছেড়ে।
ছেলেরা পারে নাকি বাবা মায়ের এতো কাছে আসতে? চাইলেও পারে না। পারলেও সব ত্যাগ করে সন্যাস নিতে হয় তাদের।
সবার ঘরে তো আর আমার বাবার মতো মেয়ে জামাই আর মায়ের মতো বুদ্ধিমতী ছেলের বউ থাকেন না।
Positive parenting- পজিটিভ প্যারেন্টিং
Dr. Fatama tus Sauda
Send private message to author



আপনার এই কথিকাটি পড়ে আমার হৃদয়টা ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো।
আপনি এই কথিকায় একজন পিতাকে যে রকম আদর্শ মানুষ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, আমার বাবাও ঠিক এমনই একজন আদর্শ মানুষ। আমার বাবা আমাদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি জানিনা, পিতা হিসেবে আমি কেমন হবো।
তবে আপনার এই কথিকাটি পড়ে পিতা ও সন্তানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখালো আমাকে।