এক
বাদল ভাই তার দোকানের ঝাপ টা বন্ধ করে বললেন, “আপনেরা কি বইবেন আরও? নাইলে আমি বেঞ্চি কয়টা দোকানের ভিতরে ঢুকায় রাখতাছি।”
“এক্ষুনি বন্ধ করে ফেলবেন নাকি ভাই?” জিজ্ঞেস করল রাতুল।
“হো ভাইজান, শইলডা ভালা না। দুইদিন ধইরা জ্বর। বাড়ি গিয়া এহন একটা ঘুম দিমু। আপনেরা কি বইবেন আরও?” জিজ্ঞেস করে বাদল ভাই। রাতুল তাকায় আমার দিকে, “কি কস তোরা? থাকবি আরও?”
আমরা উঠে পড়ি। “ঐ চল যাইগা। মামায় দোকান বন্ধ করবো।”
আমরা তিনজন বন্ধু বাদল ভাইর দোকান থেকে বেরিয়ে আসলাম।
“কই যাবি এখন?” জিজ্ঞেস করে সায়েম। রাতুল সাত পাঁচ না ভেবেই জবাব দেয়, “চল শহীদ মিনারের ঐদিক যাই। জায়গাটা খালি আছে এখন।” রাতুলের প্রস্তাব পছন্দ হয় সবার। আমরা দ্রুত রাস্তাটা পার হলাম। শহীদ মিনারের সামনে আসতেই সায়েম চেঁচিয়ে উঠল, “দোস্ত দেখ তো ওইটা মারুফ না?”
“হো মারুফই তো।” সায় দিলাম আমি। “পোলায় এমনে দৌড়াইতাছে কেন?”
প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হল মারুফ।
“কিরে এমনে হাঁপাস কেন? কি হইছে?” মারুফকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম আমি। মারুফ জোরে জোরে কিছুক্ষণ শ্বাস নিয়ে বলল,
“আরে দোস্ত কাহিনী তো কইরা ফালাইছি।”
“কি কাহিনী? বিয়ে সাদি কিছু করে ফেললি নাকি?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“আরে নাহ, ঐসব না।” বলেই মানিব্যাগের ভেতর থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে বলল, “এই দেখ ব্যাটারা ফেসবুক থেকে আইজ জীবনের প্রথম পাঁচশ টাকা কামাইছি। একেবারে নগদ টাকা। চল তোগো সবটিরে আইজ বিরিয়ানি খাওয়ামু।”
“সিরিয়াসলি দোস্ত” চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। যদিও মারুফের এই অর্থ উপার্জন দেখে হিংসায় আমার ভেতরটা জ্বলে উঠল। পাশ থেকে সায়েম চেঁচিয়ে বলল, “কেমনে কি দোস্ত? সত্যি সত্যি তুই ফেসবুক থেকে পাঁচশ টাকা কামায় ফালাইছোস? কেমনে করলি, আমাগোরেও কো না দোস্ত।”
মারুফ তার টাকাটা আবারও মানিব্যাগে পুরে রাখল। গর্বে তখন তার চোখ মুখ ঝলমল করছে। সে বক্তৃতা দিবার ভঙ্গিতে বলল, “আরে আমার একটা ফেইক আইডি আছে না ফেসবুকে, ঐ যে মিথিলা নাম। তোরা তো জানোসই, জানোস না?”
আমরা সায় দেই, “হো ওইটার সাথে অ্যাড আছি তো।”
“ঐ মিথিলা আইডি দিয়াই কাহিনী ঘটাইছি। কাইল রাইতে ভাত খাওয়ার পর ঐ আইডিতে ঢুকেই দেখি এক বলদ পোলায় প্রপোজ কইরা বসে আছে। আমিও সঙ্গে সঙ্গে তারে মজা করে হ্যাঁ বইলা দিছি। তারপর কি হইছে শুন। পোলায় আমারে তার ফোন নাম্বার দিছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তারে ফোন দিছি। আমার কণ্ঠ তো তোরা জানোসই মোবাইল ফোনে মাইয়াগো মত শুনায়। পোলার লগে ফোনে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা কইছি। বলদে একটা বারের জন্যেও টের পায়নি আমি মাইয়া না পোলা।”
“তারপর কি হইছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“ওইটাই কইতাছি শুন। পোলার লগে তো গুড নাইট কয়া ফোন রাইখা দিলাম। তারপর লম্বা করে একটা ঘুমও দিলাম। ঘুম থেকে উঠে সকাল বেলা দেখি বলদে আবারও ফোন দিছে। রিসিভ করেই আমি তার লগে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা কথা কইলাম। তারপর যখন ফোন রাখতে যামু সেই সময় তাঁরে আমি মিষ্টি করে কইলাম, বাবু জানো আমাদের বাসায় আজকে কি হইছে? আজকে না আমাদের বাসায় তিনজন লোক ওয়াইফাইর বিল চাইতে আসছে। ওরা বলছে আজকের মধ্যে বিল না দিলে নাকি ওরা আমাদের বাসার ওয়াইফাই লাইন কেটে দিবে। আমি তাদেরকে এত করে বললাম আমার আব্বু তো এক সপ্তাহের জন্য রাজশাহী গেছে। আব্বু আসার পরে বিল দিবে। ওরা আমার কথা শুনতেছেই না। আমার এখন খুব ভয় করতেছে, ওরা যদি সত্যি সত্যি এসে আমাদের বাসার ওয়াইফাইর লাইন কেটে দিয়ে যায় তখন আমার কি হবে? আমি তখন ফেসবুকে ঢুকব কিভাবে। আমার তো ভাবতেই কান্না পাচ্ছে। এই কথা বইলাই আমি একটু কান্নার এক্টিং করলাম। আর তাতেই কাজ হয়ে গেলো। পোলায় দেখি লগে লগে আমারে বিকাশে পাঁচশ টাকা পাঠায় দিছে। কয় এই টাকা দিয়া ওয়াইফাইর বিল দিতে। বুঝছোস দোস্ত এরকম বলদ পোলা আমি আমার জীবনেও দেখিনি। আমার তো ভাবতেই হাসি পাইতাছে। যাই হউক ঐসব আলাপ পরে করি এখন চল যাইগা বিরিয়ানি খাই।”
দুই
মারুফের সাথে সেদিন বিরিয়ানি খাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পরে একদিন সন্ধ্যা বেলায় বারান্দায় বসে ফেসবুক ব্রাউজ করছিলাম। নিউজফিড স্ক্রোল করতে গিয়ে মারুফের আইডি থেকে দেওয়া নতুন একটা পোস্ট চোখে পড়ল। একটা নতুন আইফোনের ছবি আপলোড দিয়েছে মারুফ। সাথে ক্যাপশন দিয়েছে, “আমার নতুন মোবাইল। গিফট পাইছি। থ্যাংক ইউ বাবু। উম্মমাহ।”
এই পোস্ট দেখেই তো আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে মারুফের কমেন্টে গিয়ে লিখলাম, “কিরে সালা তোরে আবার আইফোন গিফট করলো কেডায়?”
আমার ইনবক্সে এসে মারুফ রিপ্লাই দিলো, “আরে দোস্ত কইস না। তোগোরে সেইদিন কইছিলাম না একটা বলদরে ফেসবুকে বোকা বানায় পাঁচশ টেকা কামায় লইছি। ঐ যে তোগোরে সেইদিন বিরিয়ানি খাওয়াইলাম। ঐ বলদটারেই কাইলকা কইলাম, বাবু আমার মোবাইল ফোনটা না আমার আম্মু নিয়ে গেছে। ফোনটার জন্য আমার খুব কান্না পাচ্ছে। এইটা শুইনাই বলদে আমারে কি কয় জানোস?”
“কি কয়?”
“বলদে আমারে কয়, তুমি চিন্তা করোনা বাবু আমি এক্ষনি তোমার জন্য নতুন একটা মোবাইল ফোন পাঠিয়ে দিচ্ছি। বলদের কথা শুইনাই তো আমি অবাক। চিন্তা করছোস তুই? কত বড় বলদ হালায়। এই যুগে আইসাও মানুষ এত বলদ হয় কেমনে?”
মারুফ তার নতুন পাওয়া মোবাইলটার বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে তোলা কিছু ছবি আমাকে পাঠিয়ে দিলো। ওসব ছবি দেখে তীব্র হিংসায় আমার গলা ধরে এলো।
এর ঠিক দুইদিন পরেই মারুফ একটা দামী শার্ট গায়ে দিয়ে আমাদের আড্ডায় এসে বলল, “এই দেখ ব্যাটারা আজকে আমি নতুন একটা শার্ট গিফট পাইছি। ঐ বলদ পোলাটা আমারে ঈদের থ্রিপিছ কিনার জন্যে টাকা পাঠায় দিছে। ঐ টাকা দিয়া আমি এই শার্ট আর এই জুতা গুলা কিনছি।” আমরা হতাশা আর হিংসা মেশানো দৃষ্টি নিয়ে তার জামা জুতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তিন
যাই হোক, মারুফের দিন এভাবে ভালোই কাটছিল। ফেইক আইডি দিয়ে প্রেম করে আর সেই ছেলের কাছ থেকে নতুন নতুন সব গিফট এনে আমাদের দেখায়। এরকমই একদিন বিকেল বেলা আমরা বাদল মামার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি। এরকম সময় দেখি মারুফ কোথেকে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এলো। তার উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে সালা এমনে হাঁপাস কেন? আজকে আবার নতুন কি গিফট পাইলি?”
মারুফ মুখ কালো করে বলে, “আরে হালায় কইস না। একটা বিপদে পড়ছি।”
আমরা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি বিপদ?”
“আরে ঐ মাদারচোদটা আছে না? ঐ যে ঐ বলদ পোলাটা যেইটার টাকা দিয়া তোগোরে সেইদিন বিরিয়ানি খাওয়াইছিলাম। ঐ পোলায় আজকে জেদ ধরছে আমার লগে দেখা করবার যায়। কয় এই শুক্রবারেই নাকি দেখা করবে। তাঁরে আমি অনেক করে বুঝায় কইলাম, দেখো বাবু আমরা তো সবে মাত্র নতুন রিলেশন শুরু করছি। আর কটা দিন যাক, আমরা একে অন্যকে ভালমতো চিনি তারপর নাহয় দেখা করবো। পোলারে এইসব কথা যতই বুঝাই হে নাছোড়বান্দা। আমার লগে দেখা না করলে নাকি সে রিলেশনই রাখবেনা। কি যে টেনশনে পড়ছি আমি। এইবার বুঝি আমার ইনকামের রাস্তাটা বন্ধ হইল। তোরা আমারে একটা পরামর্শ দে কি করা যায় এখন?”
আমি খানিকটা চিন্তা করে বললাম, “দোস্ত তুই এক কাজ কর। অনেক তো মজা নিছোস আর কত? এইবার নাহয় পোলারে সব সত্যি কথা বইলা দে। আমার মনে হয় এইটা ছাড়া আর কোন রাস্তা খুলা নাই তোর।”
মারুফ বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে ব্যাটা কালকে রাতেই তো আমি তারে সব সত্যি কথা খুইলা কইছি।”
“তারপর তারপর?” কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“তারপরেই তো লাগলো ভ্যাজালটা। সব কিছু শুনার পর ঐ লোক আমারে কয়, এতদিন প্রেম কইরা নাকি আমার প্রতি তার একটা মায়া জন্মায় গেছে। এই জন্যেই নাকি সে আমার লগে দেখা করবার চায়।”
আমরা আগ্রহ দেখিয়ে বললাম, “তাইলে যা না। দেখা করেই আয়, সমস্যা কি? ঐ লোক যেহেতু সব কিছু শুনার পরেও নিজে থেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে তাইলে আর দেখা করতে ভয় কি?”
“আরে বোকাচোদা এইখানেই তো মূল সমস্যাটা।” ধমকে উঠে মারুফ। “আমি যে ঐ পোলার লগে দেখা করতে যামু, কি গ্যারান্টি আছে আমারে সে ঠ্যাং ভাঙ্গে হাতে ধরায় দিবেনা? এতদিন তার লগে যে চিটিং করছি আমার তো মনে হইতাছে এই জন্যেই সে আমারে মাইর দেওয়ার জন্যে ডাকতাছে।”
আমরা গম্ভীর হলাম। ব্যাপারটা আসলেই চিন্তার। সত্যিই যদি লোকটা এই কাজ করে বসে, এভাবে তো আগে ভেবে দেখিনি। আমরা একজন আরেক জনের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছি এরকম সময় সায়েম ফট করে বলে বসলো, “আরে মারুফ তুই টেনশন নিতাছোস কেন? আমরা আছি না? তুই যেইদিন যাবি ঐ পোলার লগে দেখা করতে আমরাও যামু তোর লগে। আমরা গিয়া গাছের আড়ালে লুকায় থাকমু আর তোরে দূর থেইকা ফলো করমু। যদি দেখি ঐ লোক তোর লগে কোন ভেজাল করতাছে ওমনি আমরা গাছের আড়াল থেকে বাইর হয়ে তার ঠ্যাং ভাঙ্গে হাতে ধরায় দিমু। বুঝছস কি বলছি?”
মারুফ মাথা নাড়ে, “হো বুঝছি।”
শুক্রবার বিকেলে যথা সময়ে আমরা চন্দ্রিমা উদ্যানে এসে গাছের আড়ালে অবস্থান নিলাম। আমাদের ঠিক সামনেই ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে মারুফ । বেচারাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে বোধহয় খানিকটা নার্ভাস। বার বার ঘড়িতে সময় দেখছে। তার থেকে খানিকটা দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরাও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পেলাম লোকটাকে। ধূসর রঙের একটা শার্ট আর কালো চশমায় বেশ সুদর্শন এক যুবক বলতে গেলে। লোকটা এগিয়ে এলো মারুফের দিকে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, কোন রকম ঝামেলা দেখলেই ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প নিয়ে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ব তার উপর।
আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে লোকটা একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসলো। মারুফও মনে হয় প্রস্তুত ছিলোনা এরকম কিছুর জন্য। লোকটা মারুফের ঠিক সামনে এসে আচমকা একটা হাঁটু গেড়ে বসে একগুচ্ছ গোলাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, “মারুফ, উইল ইউ ম্যারি মি?”
এই দৃশ্য দেখে আমরা চমকে উঠলাম। হতভম্ব মারুফ খানিকটা ইতস্তত করে ফুলগুলো হাতে নিল। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল মারুফকে। আমরা তখন রুদ্ধশ্বাসে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। চেষ্টা করছি ঘটনার মোড় কোন দিকে যায় তা অনুধাবন করতে। লোকটা তার এক হাত দিয়ে মারুফের কোমর জড়িয়ে ফুচকার দোকানের দিকে এগোতে লাগলো। আমরাও পিছু নিলাম তাদের। বলা তো যায়না, ফুচকার দোকানে গিয়েই যদি মাইর শুরু করে।
দোকানে ঢুকেই দুই বাটি ফুচকা অর্ডার দিলো লোকটা। মারুফ খানিকটা ইতস্তত করে বলল, “আমি ফুচকা খাইনা। আমি চটপটি খাই।” লোকটা সঙ্গে সঙ্গে ফুচকার বদলে চটপটি অর্ডার দিলো।
মারুফের মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে খানিকটা বিব্রত। ভদ্রতার খাতিরেই হয়ত পালিয়ে আসতে পারছেনা। আমরা দূর থেকে অভয় দেই, “ভয় পাইসনা তুই। আমরা আছি।” মারুফ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে খেতে থাকে চটপটিগুলো।
এর ঠিক তিন দিন পর বিকেল বেলায় আমি বাজার করে বাসার দিকে ফিরছিলাম। মারুফদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখি কোথেকে যেন আচমকা দৌড়ে এসে মারুফ আমার রিকশাটা থামাল।
“দোস্ত একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।” তড়িঘড়ি করে বলল মারুফ।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আবার কি ঝামেলা?”
“আর কইস না দোস্ত।” পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে বলে মারুফ। “ঐ লোকটা কি যে ঝামেলা শুরু করছে। সেইদিন দেখা করে আসার পর থেকেই অনবরত ম্যাসেজ দিয়া জালাইতাছে। আমারে নাকি সে ভালোবাসে, কয় আমাকে নাকি বিয়ে করবে। এই যে এই দেখ ম্যাসেজে কি কি সব অশ্লীল কথাবার্তা লিখছে। আজকে আবার ফোন দিয়া কইতাছে আমার লগে নাকি তার কেএফসি তে গিয়া খাবার খাইতে মন চাইতাছে। কি রকম বজ্জাতের বজ্জাত চিন্তা করছোস একবার? আরে ব্যাটা তোর কেএফসিতে খাইবার মন চাইছে তুই নিজে গিয়া খা। আমারে টানোস ক্যা?”
আমি উৎসাহ দিয়ে বলি, “এত করে যেহেতু কইতাছে যা না, সমস্যা কি? ফাও ফাও কেএফসি তে গিয়া খাইতে পারবি। নিজের টাকা দিয়া তো জীবনেও কেএফসিতে যাইতে পারবি না, এখন নাহয় প্রেমিকের টাকা দিয়াই যা।”
“হারামজাদা তোরাও আমার লগে মজা লস?” ক্ষেপে উঠে মারুফ। “আমারও দিন আইব। তখন তোগোরেও দেইখা নিমু।” বলেই হন হন করে হাঁটতে শুরু করে সে। আমি পেছন থেকে ডাকি, “ঐ মারুফ শুইনা যা।” মারুফ সাড়া দেয়না।
চার
সেদিন বিকেল বেলা রিকশায় চেপে চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিল। আকাশও কেমন যেন ঘন কালো হয়ে আসছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, এই অলস জ্যামে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে নির্ঘাত আজ কাক ভেজা হয়ে বাসায় ফিরতে হবে। আমি রিকশা থেকে নেমে পায়েই হাঁটা দিলাম। চন্দ্রিমা উদ্যানের গেটের সামনে আসতেই চমকে উঠতে হল। আমার ঠিক একশো গজ দূরেই দেখতে পেলাম মারুফকে। তাঁকে প্রায় প্রেমিকার মত জড়িয়ে ধরে চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বের হচ্ছে ঐ লোকটা। আমি মারুফকে দেখতে পেয়েই চেঁচিয়ে ডাকলাম, “ঐ মারুফ। ঐ শালা মারুফ।” দুবার ডাকতেই শুনতে পেলো সে। লোকটাকে বিদায় দিয়ে এদিকে এগিয়ে এলো।
“ঐ লোকের সাথে তুই চন্দ্রিমা উদ্যানে একা একা কি করোস?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। মারুফের মুখ তখন রক্তিম। সে লাজুক গলায় বলল, “আরে কইস না। ঐ লোকের আইজ শখ জাগছে আমারে চুমু খাবে। এই জন্যে চন্দ্রিম উদ্যানে চিপার মইদ্ধে নিয়া আইছে।”
আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম, “বলিস কি? খাইছে চুমু?”
মারুফ ঘাড় বাকিয়ে বলে, “হো।”
পাঁচ।
এরপর পেরিয়ে গেছে আরও অনেকগুলো মাস। মারুফ এখন অনেকটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছে লোকটার সাথে। নিয়মিতই তারা ডেটে যায়। তাদের দেখা মিলে রেস্টুরেন্টে, পার্কে কিংবা তুমুল বর্ষণে কখনো কখনো হুট তুলা রিকশায় প্লাস্টিকের আড়ালে। অবশ্য এতে মারুফের ইমকামটাও যে মন্দ হচ্ছিল তাও বলা চলেনা। নগদ টাকা তো আছেই সাথে উপরি হিসেবে আছে দামি দামি সব গিফট।
এরকমই এক সন্ধাবেলায় আমি রাতুল আর সায়েম শহীদ মিনারে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এরকম সময় আমার মোবাইল ফোনের এসএমএস টনটা বেজে উঠল। বের করতেই দেখি মারুফের নাম্বার থেকে একটা ম্যাসেজ এসেছে, “একটা বিরাট বিপদে পড়ছি দোস্ত। আমারে তুই বাঁচা।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে মারুফের নাম্বারে ডায়াল করলাম। ওপাশে রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরছেনা। আমরা তিন বন্ধু প্রায় লাফিয়ে উঠে রওনা দিলাম মারুফের বাসার উদ্দেশ্যে।
বাসার সামনে গিয়ে কয়েকবার ডাকাডাকি করতেই মারুফ বেরিয়ে এলো। তার ফ্যাঁকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে সায়েম চেঁচিয়ে উঠল, “কিরে হালা কান্দোস ক্যা? কি হইছে তোর, খুইলা কো তো? ঐ পোলার লগে ব্রেকআপ হইছে নাকি?”
মারুফ প্রায় ভেজা চোখে বলল, “জানোস দোস্ত আজকে কি হইছে?”
রাতুল চেঁচিয়ে বলল, “কি হইছে কো না?”
“ঐ হারামজাদাটা দুই দিন ধরে আমারে রুম ডেটে নিবার জন্যে ফোর্স করতাছে।”
“বলিস কি?” চমকে উঠে বললাম আমি “রুম ডেটে মানে তুই বলতে চাচ্ছিস তোর সাথে…”
মারুফ বাঁধা দিয়ে বলল, “হো দোস্ত, আমারে কইতাছে তার লগে ঐসব না করলে নাকি আমার আর তার অন্তরঙ্গ সব ছবি সে ইন্টারনেটে ছাড়ে দিবে।”
“এ তো ভয়ংকর কথা।” পাশ থেকে বলে উঠল সায়েম। “তুই কি রাজি হয়ে গেছিস নাকি?”
“না দোস্ত এখনও হইনাই। কিন্তু যেমনে ফোর্স করতাছে মনে হয়না তারে বেশিদিন থামায় রাখতে পারব।”
“আরে তুই টেনশন লইসনা ।” মারুফকে সাহস যুগিয়ে বলি আমি। “তোরে একটা পরামর্শ দেই। ঐ লোকরে তুই এক্ষনি একটা ফোন দিয়া কো, আপনার সাথে আমার আজকে থেকে ব্রেকআপ। বুঝছিস এইটা বলেই তুই ফোন রাখে দে। তারপর কয়দিনের জন্যে মোবাইল ফোনটা বন্ধ করে রাখ। ফেসবুক আইডিটাও পারলে ডিয়েক্টিভ করে দে। মানে এক কথায় ঐ লোকের সাথে আর কোনভাবেই যোগাযোগ রাখবিনা। বাড়ি থেকেও এই কয়দিন বাইর হবার দরকার নাই। দেখবি কয়েকদিন তোরে না পাইলে এমনিতেই ঐ লোক তোর পিছু লাগা ছাড়ে দিবে।
“কিন্তু……”
আমরা ধমকে উঠি, “কোনও কিন্তু না। লোকটারে যত ভয় পাবি তত সে তোরে ধরে বসবে। তাঁরে প্রশ্রয় দেওয়াই যাবেনা, তাইলেই দেখবি সে নিজে থেকেই এক সময় তোর পিছু লাগা ছাড়ে দিছে।”
মারুফ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে। আমাদের দেওয়া পরামর্শ তার পছন্দ হয় কিনা বোঝা যায়না। সে উদাস হয়ে পড়ে।
ছয়
আমাদের দেওয়া পরামর্শই মেনে নিয়েছে মারুফ। দুইদিন ধরে তার ফোন অফ। ফেসবুক আইডিটাও কালো হয়ে গেছে। বাইরেও আর বের হয়না। আমরা হাঁফ ছাড়ি। এইবার বুঝি ঝামেলাটা দূর হল। এরকমই একদিন রাতুল আর সায়েমের সাথে আমি বাদল মামার দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। রাতুল কোন যেন এক ক্রিকেটারের স্ত্রীর নামে কি কি সব অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিল। আমরা আগ্রহ নিয়ে সেসব শুনছিলাম । এরকম সময় আচমকা একটা ঘটনা ঘটে গেলো। আমিই আবিষ্কার করলাম ব্যাপারটা। চমকে উঠে দেখলাম আমাদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মারুফের সেই কথিত প্রেমিক ভদ্রলোক। আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালাম তার দিকে, “কিছু বলবেন?”
ভদ্রলোক খানিকটা হেসে বলল, “ইয়ে মানে তোমরা কি মারুফের বন্ধু?”
লোকটাকে দেখেই আমার গা জ্বলে উঠছিল। আমি রোবটের মত গলায় জবাব দিলাম, “হ্যাঁ। কেন কি প্রয়োজন?”
লোকটা খানিকটা ইতস্তত করে জবাব দিলো, আসলে হয়েছে কি কদিন ধরে মারুফকে ফেসবুকে পাচ্ছিনা। ওর ফোন নাম্বারও দেখি বন্ধ। ওর সাথে কোন উপায়েই যোগাযোগ করতে পারছিনা। তোমরা কি ওর কোন খবর বলতে পারো?”
পাশ থেকে সায়েম ঐ লোকটার মুখের উপর বলে দিলো, “না আমরা মারুফের কোন খবর জানিনা। দয়া করে আপনি অন্য কোথাও গিয়ে খোঁজ করুন। আমরা আপনাকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারছিনা বলে দুঃখিত।”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হতাশ দৃষ্টিতে তাকাল আমাদের দিকে। আমরা তখন তাঁকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে আবারও নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মেতে উঠেছি।
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতেই দেখি সায়েম আর রাতুল দুজনই এসে আমাদের বাসায় উপস্থিত। আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিরে শালারা, এত সকালে ব্যাপার কি?”
সায়েম ব্যস্ত হয়ে বলল, “ঘটনা শুনছোস দোস্ত?”
আমি আতংক জোড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কি হইছে?”
“আরে ব্যাটা ঐ লোকটা, ঐ যে মারুফের প্রেমিক। ঐ হারামজাদায় তো মারুফের বাড়ির সামনে গিয়া চেঁচামেচি শুরু করছে। গোটা পাড়ার লোক আসে জড় হইছে ঐখানে। কি যে বিশ্রী কাণ্ড। আয় দেখবি চল।”
আমি দ্রুত শার্টটা গায়ে দিলাম। ঝড়ের বেগে বললাম, “চল”।
মারুফদের বাসার সামনে যেতেই দেখতে পেলাম লোকটাকে। পাড়ার তাবৎ অকালকুষ্মাণ্ড লোকগুলো কৌতূহলী হয়ে দেখছে তাঁকে। আর ঐ লোকটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, “প্লিজ মারুফ, তুমি একটা বার নিচে নেমে এসো। আমাকে এভাবে ধোকা দিতে পারোনা তুমি। প্লিজ মারুফ একটা বার নিচে নেমে এসো তুমি। ফিরে এসো আমার হৃদয়ের মাঝে।”
আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসলাম। সায়েম বিড়বিড় করে বলল, “হারামজাদাটা মারুফের মান সম্মান সব ধুলায় মিশায় দিবে। তাঁরে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। কি বলিস তোরা?”
আমরাও সায় দিলাম, “হু”।
বাসায় ফিরে খাওয়া দাওয়া করে একটা সিনেমা দেখতে বসলাম। পুরো সিনেমাটা শেষ করতে পারিনি। তার আগেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি মারুফের নাম্বার। রিসিভ করতেই মারুফ চেঁচিয়ে বলল, “ঐ তোরা কই আছোস?”
আমি আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কেন আবার কি হইছে?”
মারুফ ঝড়ের বেগে বলল, “তুই এক্ষনি সবাইকে নিয়ে আমার বাসার সামনে আয়। ঐ হারামজাদাটা ঝামেলা শুরু করছে। ব্লেড দিয়ে হাত পা কাটে কি যে বিশ্রী অবস্থা। তোরা দোস্ত প্লিজ এক্ষনি কিছু একটা ব্যবস্থা কর। আমি পাড়া পড়শিদের সামনে মুখ দেখাইতে পারবোনা।”
রাতুল আর সায়েমকে একটা ফোন করে আমি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মারুফের বাসার সামনেগিয়ে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি আমার আগেই সায়েম আর রাতুল পৌঁছে গেছে ওখানে। লোকটা তখন ইটের টুকরো দিয়ে রাস্তার মধ্যে মারুফের নাম লিখছে। তার হাত কেটে বিশ্রীভাবে রক্ত ঝরছে। দেখেই আমাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। আমরা তিনজন মিলে লোকটাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিলাম। নিয়ে গেলাম পাড়ার শেষ মাথায় নির্মাণাধীন দশ তালা বিল্ডিংটার ছাদে। ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পগুলো আগে থেকেই এনে রেখেছিলাম ওখানে। ওগুলো বের করে এনে ঝাড়া আধ ঘণ্টা এলোপাথাড়ি ভাবে পেটালাম লোকটাকে। এরপর প্রায় আধমরা অবস্থায় তাঁকে নিয়ে ফেলে আসলাম স্থানীয় হাসপাতালের বারান্দায়।
সাত।
এর পরের কয়েকটা দিন বেশ ভালোই কাটল আমাদের। মারুফও বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে প্রফুল্ল ছিল। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন কপালে সইলো না। সেদিন রাতে সালমান খানের একটা সিনেমা দেখে সবে ঘুমানোর জন্য শুয়েছি এরকম সময় দেখি মারুফের ফোন। সে ভয়ার্ত গলায় বলল, “দোস্ত ঐ হারামজাদাটা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাইছে। আমারে ফোন দিয়া হুমকি দিতাছে। কয় আমারে না পাইলে নাকি সে সুইসাইড করবে।”
“আরে ধুর ঐ পাগলের কথায় কান দিস না।” মারুফকে অভয় দিয়ে বলি আমি। “তোরে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করতাছে সে। তুই চুপ চাপ বাসায় বইসা থাক। দেখবি এক সময় সাড়া না পাইলে সে নিজে থেকেই চলে যাবে।”
মারুফকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফোন রাখলাম। আরও একটা মুভির অর্ধেকটা দেখে ঘুমাতে গেলাম। সকাল বেলা যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘড়িতে বাজছে প্রায় আটটার কাছাকাছি। স্মার্টফোনটা পাশেই রাখা ছিল। অভ্যাস মত ওটা টেনে নিলাম। স্ক্রিনের বাতি জ্বালাতেই অবাক হয়ে দেখলাম মারুফের নাম্বার থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশটা মিসড কল এসেছে। সায়েমের নাম্বার থেকেও এসেছে কুড়িটার মত মিসড কল। আমি সঙ্গে সঙ্গে মারুফের নাম্বারে ফোন ব্যাক করলাম। ওর নাম্বার বন্ধ। সায়েমকে কল দিলাম। রিসিভ করতেই সে উত্তেজিত গলায় বলল, “ঐ তুই কই আছোস? এক্ষনি মারুফের বাসার সামনে আয়। তাড়াতাড়ি।” আমি “কি হয়েছে” জিজ্ঞেস করার আগেই সে ফোনটা কেটে দিলো। অগত্যা শার্টটা গায়ে দিয়েই রওনা দিলাম মারুফদের বাসার উদ্দেশ্যে।
.
মারুফদের বাসার সামনের জায়গাটা তখন লোকে লোকারণ্য। পুরো পাড়ার মানুষ ভেঙে এসেছে মনে হয়। সায়েম আর রাতুলকে দেখতে পেলাম ভিড় থেকে খানিকটা দূরে। একটা ভাঙ্গা রেলিঙয়ের উপর বসে আছে তারা। পাশে মারুফকেও দেখতে পেলাম। তার মুখটা হতভম্ব।
“ঘটনা কখন ঘটছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“মনে হয় ভোর বেলা।” জবাব দিলো রাতুল। “ছাপরা পাড়া মসজিদের মুয়াজ্জিম ভোরবেলা মসজিদে যাবার সময় প্রথম দেখতে পায় আমগাছের ডালের সাথে ঝুলতেছে ঐ লোকটা।”
“সুইসাইড?” জিজ্ঞেস করি আমি। মারুফ তার পকেট থেকে চিরকুটটা বের করে এগিয়ে দেয়।
“ঐ লোকটার পকেটের মধ্যে পাওয়া গেছে এইটা।”
আমি চিরকুটটা হাতে নেই। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা, “ভালোবাসি মারুফ, ভালো থেকো……”
আট
এরপর পেরিয়ে গেছে আরও অনেকগুলো মাস। শীত পেরিয়ে বর্ষা এসেছে। বর্ষা পেরিয়ে আবারও শীত এলো। মারুফের ঐ প্রেমিকের কথা আমরা ততদিনে প্রায় ভুলেই গিয়েছি। মারুফও তার পুরনো জঞ্জাল ঝেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এরকমই একদিন সন্ধ্যা বেলা বাদল মামার দোকানে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এরকম সময় দেখি মারুফ হনহন করে কোথা থেকে যেন ছুটে এলো। তাঁকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করলাম,
“কিরে এত খুশি খুশি লাগতেছে, কাহিনী কি?”
মারুফ চোখ বড় বড় করে বলল, “মাম্মা কাম তো কইরা ফালাইছি।”
“কি কাম করছোস?” অবাক হয়ে বলি আমি।
মারুফ তার স্মার্টফোনটা এগিয়ে দেয়। “এই দেখ ব্যাটা, তোগো ভাবিরে তো পটায় ফালাইছি।”
“সিরিয়াসলি? দেখি দেখি।” বলেই আমি স্মার্টফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই বড় ধরণের একটা ধাক্কা খেলাম। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালাম মারুফের দিকে। তার চোখে মুখে তখন খেলা করছে গর্বের হাসি। আমি আবারও তাকালাম ছবিটার দিকে। আমার হিসাবে গড়মিল লেগে যাচ্ছে। এরকম একটা রূপবতীকে কিনা শেষ পর্যন্ত মারুফের মত আলাভোলা একটা লোক পটিয়ে ফেললো? এও কি সম্ভব? আমি নিশ্চিত এই মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে। আমি তীব্র হিংসা নিয়ে মারুফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেমনে কি দোস্ত?”
মারুফ তার হাসিটা আরও প্রশস্ত করলো। “তোর ভাবির নাম হইতাছে টগর। বুঝলি দোস্ত ফেসবুকে তিন দিন তিন রাত কঠোর পরিশ্রম করে তারপর পটাইছি এইটারে। সামনের শুক্রবারে আমরা দেখা করতে যাব। আমার যে কি নার্ভাস লাগতেছে দোস্ত। বুঝিসই তো, জীবনের প্রথম কোন মাইয়ার সাথে দেখা করতে যাইতাছি। তোরা কিন্তু ঐদিন আমার পাশে থাকিস কয়া দিলাম। নাইলে আমি লজ্জায় মরে যাব।”
আমরা গোমরা মুখে আশ্বাস দিলাম, “হো দোস্ত, থাকব।”
এরপর অনেকগুলো সন্ধ্যা, অনেকগুলো সূর্যোদয়ের পর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত বিকেল। মারুফ একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া হাতে দেখা করতে গেলো তার প্রেয়সীর সাথে। আর আমরা তাঁকে সাহস যোগাতে দূর থেকে লুকালাম গাছের আড়ালে । আমাদের ঠিক সামনেই মাঠটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মারুফ। আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনছি, কখন আসবে সেই মুহূর্ত।
মারুফকে দেখে খানিকটা নার্ভাস মনে হচ্ছে। বারবার ঘড়িতে সময় দেখছে সে। ঠিক এরকম সময় দূরে একটা সুদর্শন যুবককে দেখতে পেলাম। যুবকটা এগিয়ে আসছে মারুফের দিকেই। তার হাতেও একগুচ্ছ গোলাপ। মারুফের ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালো যুবক। অনেকটা মেয়েলি গলায় বলল, “তুমিই নিশ্চয় মারুফ? আমি টগর। প্রোফাইলের ঐ ছবিটা আমারই। তখন চুল বড় ছিল। এখন কেটে ছোট করেছি। ছেলেদের চুল বড় রাখতে হয়না তো তাই। বলেই ছেলেটা তার এক হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসলো। গোলাপ গুলো এগিয়ে দিলো মারুফের দিকে । মারুফের চোখে চোখ রেখে বলল, “ মারুফ, উইল ইউ ম্যারি মি?”
অনীক রশিদ (Aneek Rashid)
Send private message to author


