মকবুল সাহেব ঢাকায় সরকারি অফিসে ছোটখাটো একটা চাকরি করেন। শহরতলীতে একটি ছোট্ট বাসা ভাড়া নিয়ে পাঁচ পরিবারের সদস্য নিয়ে দিন যাপন করেন। স্বল্প বেতন, আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। কষ্টে সৃষ্টে চলে যাচ্ছে মকবুল সাহেবের দিনগুলো।
নিত্যদিনের বাজার-সদাই করার ব্যাপারে মকবুল সাহেবের একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে।
মকবুল সাহেব শিশুকাল, কৈশোর ও যৌবন গ্রামে কাটিয়েছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন। দেখেছেন চারিদিকে দারিদ্র্যের কষাঘাত। দেখেছেন বেঁচে থাকার জন্য মানুষের নিরন্তর জীবন সংগ্রাম।
সেদিনকার সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনে মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার কোনো শেষ ছিল না। এক একটি গ্রাম যেন মনে হতো এক একটি বড় পরিবার। কারো আপদ বিপদে, অভাব-অনটনে নিজেদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে ও মানুষ এগিয়ে আসত আপন জনের মত। সেই বেড়ে ওঠার স্মৃতি আজও ধারণ করেন মকবুল সাহেব তাঁর স্মৃতিপটে।
নিজের তেমন কোন আর্থিক সঙ্গতি নেই অন্যকে সাহায্য করার। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই বাজার-সদাইয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।
মকবুল সাহেব যখনই বাজার করতে যান খুঁজে বের করেন ছোট আর গরীব দোকানিদের। একই মানের একই জিনিস বড় বড় দোকানে সাধারনত খানিকটা বেশি দামে বিক্রি হয়। তারপরও মানুষজন সে সমস্ত দোকানগুলোতেই ভিড় করে কেনাকাটার জন্য। মকবুল সাহেবের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। বাজারে দেখেন পাশে একটি দুঃস্থ মহিলা কিছুটা সবজি সাজিয়েছেন বিক্রয়ের জন্য অথবা অন্য দিকে কোন একটি অভাবগ্রস্ত অল্প বয়সী কিশোর কিশোরী কিছুটা তরিতরকারি বা অন্য কোন পণ্য নিয়ে ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছেন। সাধারণত মানুষ এ সমস্ত দোকানগুলো থেকে কিছু কেনেন না। কারন তাদের ধারনা এই সমস্ত পণ্যগুলি সাধারণত হতদরিদ্ররাই ক্রয় করে। ঐ সমস্ত দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়াটাই অপমানের। কেনাকাটার তো প্রশ্নই আসেনা? মকবুল সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গিটা পুরোটাই অন্যরকম। তিনি এগিয়ে যান সে সমস্ত দোকানীর দিকে।পরম মমতায় তাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। আর বাড়ির প্রয়োজনীয় বাজারসদাই সেখান থেকেই সেরে নেন। ভাবেন যদি একই মানের জিনিস একই মূল্যে গরীব দোকানিদের কাছ থেকে পাওয়া যায় তাহলে এই তাহলে তাদের কাছ থেকে কিনতে অসুবিধা কোথায়? এখানে অপমানের আর লজ্জার তো কিছুই তিনি খুঁজে পান না।
এরকম কেনাকাটা করে মকবুল সাহেব এক পরম আত্মতুষ্টি পান। কিন্তু এতে সমস্যা ও কম নয়। আজকাল মকবুল সাহেবের সাহেবের বড় ছেলে আর বাবার সাথে বাজার করতে যেতে চায়না। কারণ এ সমস্ত ছোট দোকানিদের কাছ থেকে বাজার করতে গেলে ছেলের বড়ই লজ্জা লাগে। ছেলের কাছে এটা এক ধরনের ছোটলোকি বলেই মনে হয়।বাড়িতে এসে ছেলে তার বাবার এই চরিত্র নিয়ে মায়ের কাছে নালিশ করে। এক পর্যায়ে সে বাবার সাথে আর বাজারে যায় না। মকবুল সাহেব স্পষ্টতই বুঝতে পারেন অফিসে তার সহকর্মীরা ও তাঁর এই ব্যবহার নিয়ে আকার-ইঙ্গিতে অনেক কথাই বলেন। মকবুল সাহেব এগুলোর ধার ধারেন না। তিনি জানেন তাঁর এই কাজের পেছনে উদ্দেশ্যটা কি। কে কি বলল সেটা তিনি কখনোই গায়ে মাখেন না।
প্রতি রোজায় অন্তত দুবার মকবুল সাহেব গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে দেখা করার জন্য যান। ইফতারের জন্য রাস্তায় বাসগুলো কোন বাজারে দাঁড়ায়। বাস থেকে নেমে সবাই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে দোকানগুলোতে ইফতার করার জন্য।
মকবুল সাহেব দেখেন দোকানগুলোর বাইরে ভাঙ্গা একটি টেবিলের উপর কিছু ইফতার নিয়ে বসে আছেন দু:স্থ কিছু কিশোর-কিশোরী ক্রেতার আশায়। জীর্ণ শীর্ণ দেহ আর অপরিচ্ছন্ন জামা কাপড় গায়ে। কেউ এগিয়ে যায় না সেদিকে।
নানান চিন্তা ভর করে মকবুল সাহেবের স্মৃতিতে। ভাবেন কোন এক অভাবগ্রস্ত মা পরম যত্নে এইগুলো তৈরি করে ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে পাঠিয়েছেন বিক্রি করার জন্য। এটা বিক্রি করেই হয়তো ছেলে এক কেজি চাল আর খানিকটা তরকারি আর ডাল কিনে নিয়ে যাবে বাড়িতে এবং সেটাই রান্না হবে আজকে খাবার জন্য। কল্পনায় দেখতে পান রান্নাঘরে চুলার পাশে বসে আছে কয়েকটি অভুক্ত শিশু কিশোর। অপেক্ষা কখন ইফতার বিক্রি করে বাজার থেকে ফিরে আসবে তার ভাই বোনেরা। মকবুল সাহেব এটা ও ভাবেন হয়তো সেই অভাবগ্রস্ত মা সারাদিন রোজা রেখে নিজের জন্য কোন রকম ইফতার না রেখেই সবটাই পাঠিয়ে দিয়েছেন বিক্রয়ের জন্য। কারণ এটা বিক্রি করেই জুটবে তাদের আজকের রাতের আহার। এক অব্যক্ত ভাবনা পেয়ে বসে মকবুল সাহেবকে। ভাবেন হয়তোবা এই পরিবার আজ অভুক্তই থাকবে যদি ইফতার গুলো বিক্রি না হয়। চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল ভিড় করে মকবুল সাহেবের। টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। এগিয়ে যান এরকম একটি দোকানের দিকে। কুশলাদি বিনিময় করেন একেবারে আপন জনের মত। কিনে নেন তাঁর প্রয়োজনীয় ইফতার। বাসের অন্য যাত্রীরা মকবুল সাহেবের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকেন। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁর। তাঁর মনে এক বিরাট প্রশান্তির ছোঁয়া। কিরকম এক অন্যরকম অব্যক্ত ভালোবাসা আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাকে।
বাড়িতে যান। ২/৩ দিন কাটান বাবা-মায়ের সাথে। বিকালে বাজার করতে যান গ্রামের হাটে। সেখানে ও সেই একই দৃশ্য। হয়তো দেখেন বাজারের এক কোনায় একটি মিষ্টি কুমড়া, একটি লাউ বা কয়েকটা ঝিঙ্গা নিয়ে তেমনি কোন অতিদরিদ্র্য পরিবারের কোনো কিশোর বা কিশোরী ক্রেতার জন্য অপেক্ষমান। চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কোনো ক্রেতা পাওয়া যায় কিনা। সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। কেউ এগিয়ে আসে না সে পণ্য কিনতে। মকবুল সাহেব ভাবেন এক অসহায় মা তার এক চিলতে ঘরের উঠোনে বা সামন্য খালি জায়গায় পরম যত্নে কিছু শাক-সবজির আবাদ করেছেন। এগুলো বিক্রি করেই হয়তো অর্ধাহারে-অনাহারে কষ্টেসৃষ্টে চলে যায় তাদের দিনগুলো। তিনি এও দেখেন মাঝে মাঝে এসব পণ্য বিক্রি করার জন্য ওরা কোনো ক্রেতা খুঁজে পায়না। খুবই কষ্ট পান মকবুল সাহেব।
জীবনে অনেক কষ্ট করে আজ এ পর্যায়ে এসেছেন। দারুন কষ্টে পার করেছেন জীবনের শৈশব, কৈশোর আর যৌবন কাল। মানুষের কষ্ট দেখেছেন নিজের চোখে। এমনও দিন গেছে কোন দিন কোন খাবার ও জোটেনি মকবুল সাহেবের।
এ জীবনতো তিনি পেরিয়ে এসেছেন। তাঁর উপলব্ধি তাই অনেকের চাইতে ভিন্ন। জানেন তার আশেপাশের লোকজন, অফিসের সহকর্মী আর তার পরিবারের সদস্যরা তার এই স্বভাবকে ভালো চোখে দেখেন না। কিন্তু মকবুল সাহেব তাঁর এই কেনাকাটায় এক পরম আত্মতুষ্টি লাভ করেন। আর ভাবেন হয়তোবা তাঁর এই ভাবনার সাথে আরো অনেকেই যুক্ত হবেন ধীরে ধীরে।
সেই আশায়ই মকবুল সাহেব পার করে দিতে চান নিজের বাকি জীবনটা।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী
Md. Aowrangazeb Chowdhury
Send private message to author



