আমি যে বাসায় বুয়ার কাজ করি, হেই বাসার খালু ও খালা এক সপ্তা ধইরা একে অন্যের লগে কথা কয় না। কথা না-কওয়ার তেমন কোনো কারণ লাগে না। পান থেকে চুন খইস্যা পড়লেই হইলো; ব্যস, তাদের কথা কওয়া বন্ধ। হেইদিন খালুজান খালা মণিরে ফালাইয়া দুপুরের ভাত খাইয়া ফেলায় তাদের কথা কওয়া বন্ধ হইয়া যায় । কথা বন্ধ হওয়ার কত ঘটনা যে আছে, তা বইলা শেষ করা যাইব না। কত সুখের সংসার তাগো; একমাত্র ছেলে আমরিকা থাকে, খালুজান বড় বেতনের চাকরিও করে, বয়স ষাইট-বাষট্টি হইবো; তবুও কোনো কারণ ছাড়াই কথা বন্ধ কইরা দেয়। একটা কথা আছে না ‘সুখে থাকলে পোকে কামড়ায়’ তাদের বেলায় এই কথাটা এক্কেবারে হাছা।
আমি হইলাম তাদের বাসার কাজের বুয়া, তাই এইসব ব্যাপারে নাক গলাই না। কথা কওয়া বন্ধ হইলেও পরিবারের হকল কাজকাম নিয়মমাফিক চলে। কোনো কাজই আটকা থাকে না। তারা দুজনই সময়মত খাওয়া-দাওয়া করে, বাজারসদাই করে, একসাথে ঘুমায়- কিন্তু কথা কয় না।
তাদের একে অন্যের প্রয়োজন হইলে তারা আমারে ব্যবহার করে। যেমন ধরেন- আলমারির চাবি খুইজ্জা পাইতেছেনা। খালামণি আমারে ডাইকা কইবো, ‘কিরে সালেহা অালমারির চাবি রাখলে কই?’
অথচ আলমারির চাবি কিন্তু তারাই রাখে, তারাই দেখে।
চাবির কথা শুইন্যা খালুজান কইবো, ‘সালেহা, দুপুরে দেখলাম চাবির রিং খাটের নিচে পইরা আছে, খাটের নিচে কি চাবি রাখার জায়গা রে ? আমি পরে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকাই রাখছি।’
খালামণি তখন মুচকি হাসি গোপন কইরা ড্রয়ার থাইক্কা চাবি লইয়া আলমারি খুলে। আমি পর্দার ফাঁকে চোখ রাইখা তাদের কীর্তিকলাপ দেখি আর মিটিমিটি হাসি।
একবার খালামণির জ্বর উঠছিল। প্রচন্ড জ্বর। এর দুইদিন আগ থাইক্কা তাদের কথা কওয়া বন্ধ আছিল। খালামণি সারাক্ষণ বিছানায় শুইয়া থাকে। খালুজান অফিস থাইক্কা আইসা দেখে খালামণি শুইয়া আছে। আমারে কইলো, তোর খালামণি কি কিছু খাইছে রে সালেহা? আমি কইলাম না খালুজান, কিছু খায় নাই।’
খালুজান ফ্রিজ থাইক্কা আপেল বাইর কইরা আমার হাতে ধরাই দিয়া কইলো, ‘এগুলা তোর খালুমণিরে খাওয়াই দে’। আমি আপেল লইয়া খালুমণির কাছে যাইতেই ‘আমি আপেল খাইবো না’ কইয়া হে চিল্লাই উঠলো।
আমি ফিইরা আইসা খালুরে কইলাম, ‘আপনি লইয়া যাইতে পারেন না? খালি রাগ দেখান, খালি রাগ দেখান’। খালুজান কয়, ‘এসব রাগ নারে সালেহা, রাগ না; এসব অভিমান। এরকম অভিমান করলে সম্পর্ক আরো মজবুত হয় রে, মজবুত হয়। কয়েকদিন কথা বন্ধ থাকলে মনের টান দ্বিগুণ হয়রে সালেহা,দ্বিগুণ হয়; তুই এসব বুঝবি না’।
‘না, খালুজান। এতসব বুঝিনা। বেশি বুঝলে নাকি মাথায় গ্যাস্ট্রিক হয়।’
‘এ কী বলিস রে তুই, মাথায় আবার গ্যাস্ট্রিক হইবে কেমনে?’
‘এই যে ধরেন আপনারা দুদিন যাইতে না যাইতে কথা কওয়া বন্ধ কইরা দেন, একসময় দেখবেন বিষয়টা নরমাল হইয়াগেছে; কথা না-কওয়ার মাঝে একটা স্বাদ পাইয়া গেছেন; তখন আর কথা কইতে ইচ্ছা হইবো না।’
‘না রে সালেহা। এমন হবে না। ত্রিশ বছর ধইরা সংসার করতেছি। কতবারই তো কথা বন্ধ হইছে; কই! এমন তো মনে হয় নাই। যতবারই কথা শুরু করি ততবারই মনেহয় তারে নতুন কইরা পাইলাম, নতুন কইরা চিনলাম।’
‘কী যে কন খালুজান, মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না।’
খালুজানের কথা শুনে সালেহার জীবনের পেছনের কাহিনী মনে পড়ে যায়, তার স্বামীর কথা মনে পড়ে যায়। বিয়ের পর প্রথম তিন-চার মাস কী আনন্দেই না কাটছিল তাদের জীবন। কী হাসিখুশি! কিন্তু পরবর্তীতে কী থেকে কী হয়ে গেল। স্বামীর সাথে কথায় কথায় ঝগড়া হয়, হাতাহাতি হয়। একদিন গভীর রাতে তুমুল ঝগড়ার পর সালেহার স্বামী রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। একদিন পার হলেও সে আর বাড়ি ফিরে না। সালেহা এখানে খুঁজে, সেখানে খুঁজে। একাএকা কেঁদে কেঁদে রাত কাটে তার। পরের দিন গ্রামের দুষ্টু ছেলেটা- যে সারাক্ষণ বনেবাদরে ঘুরে বেড়ায়, সে খবর নিয়ে আসে সালেহার কাছে; ‘আফা, আফা, ভাইজানরে পাইছি, পাইছি, চলেন আমার লগে’।
সালেহা ছুঁটতে থাকে ছেলেটার পেছন পেছন। গ্রামের পশ্চিম দিকে যে বড়ো জংলাটা আছে সেখানে একটা বড়ো করচ গাছের নিচে এসে থামে তারা। ছেলেটা সালেহাকে আঙ্গুল দিয়ে গাছের উপর দিকে তাকানোর ইশারা দেয়। গাছের মগডালের দিকে তাকাতেই সালেহার পা থেকে শুরু করে পুরা শরীর কাঁপতে থাকে। ‘এ কী হইলো গো’, ‘এ কী হইলো গো’ বলে চিৎকার করতে থাকে সে। গ্রামের মানুষ ছুটে আসে জংলার দিকে। সবাই এসে থমকে দাঁড়ায় করচ গাছের নিচে। হা করে তাকিয়ে থাকে তারা করচ গাছের ডালের দিকে; যেখানে ঝুলে আছে সালেহার স্বামীর নিথর দেহ!
জীবন যে কত কষ্টের, কত যে বেদনার, তা হাড়েহাড়ে টের পায় সালেহা। এখনো স্বামী হারানোর দগদগে জ্বালা তার হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। তাই কোনো সংসারে কেউ মান-অভিমান করলেই তার বড় ভয় লাগে। ভীষণ ভয়। কারণ ডাকের একটা কথা আছে না, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়’। তাই সালেহার এত ভয়!
– পার্থ তালুকদার
Send private message to author




বড়োলোক এবং দরিদ্র কাজের লোকের জীবনে সাদৃশ্য খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে গল্পে।
গল্পটি থেকে এটাই বোঝার বিষয় যে, বড়োলোকদের কাছে যেটা স্বাভাবিক মামুলি বিষয়, গরীবের কাছে সেটা সিরিয়াস ব্যাপার।
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।