——–স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে——–
রান্নাঘরের আলো জ্বালাতেই যথারীতি হতাশ হয়ে পড়লো রুমা।
সেই একই দৃশ্য। মেঝে, সিঙ্ক, চুলার উপরে চারদিকে অনেকগুলো তেলাপোকা। যেন বিশাল পিকনিকের আয়োজন হচ্ছে। কেউ খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ অহেতুক হাঁটাহাঁটি করছে। এই যে জলজ্যান্ত একটা মানুষ নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকে যেন কোন ভ্রুক্ষেপই নেই এদের!
অথচ দিনের আলোয় কিংবা বাতি জ্বালানো থাকলে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। যেন এসবের অস্তিত্বই নেই। কি অদ্ভুত!
আজকাল মশা, পিঁপড়া, তেলাপোকা কেউই মানুষকে বিশেষ পাত্তা দিতে চায় না। খাবার নিয়ে বসলেই দেখা যায় সারি সারি পিঁপড়া দল বেঁধে টেবিলে উঠে আসছে কিংবা এরোসল স্প্রে করে দিলেও মশারা মরছে না। রুমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই এরোসলে বা মশার কয়েলে বা পোকা মারার ঔষুধে পোকা মরে এটি একটা মিথ। এসবের কোন ভিত্তি নেই। পোকা শুধু হাত, ঝাড়ু এসব দিয়েই মারা যায়।
তবুও মানসিক সান্ত্বনার আশায় পরদিন রুমা বাজারে গেল তেলাপোকা মারার চক বা পাউডার যা পায় কিছু একটা নিয়ে আসতে।
কাঁচাবাজারের বিরাট এলাকায় শুকনো অর্থ্যাৎ প্যাকেটজাত দ্রব্যাদির কিছু দোকান থাকে। ওখানে খোঁজ করে ফিনিশ পাউডার (“তেলাপোকার যম, তেলাপোকা মরে শেষ” যাদের স্লোগান) পেয়ে গেল রুমা। ওটা কেনার পর দোকানদার তার দিকে আরেকটা পাউডারের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আপা, এটাও নিয়া যান। দুইটাই টেরাই মারেন। নতুন জিনিস। “
রুমা দেখলো এই পাউডারটার নাম “তেইল্লাখাদক” এরপর নিচে লেখা-
“পাচ্ছে অনেক, খাচ্ছে ভীষণ
ফুরায় না তো আর
একটা ছেড়ে একটা ধরে
পুরো রাত কাবার”
রুমার হাসি পেল একটু। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় পাউডারের এসব চটকদার বিজ্ঞাপনের দৌঁড় সম্পর্কে এতো ভালো করে জানে যে , সে মনে মনে বলল-
“নামে গগণ ফাটে, হাঁড়ি-পাতিল কুকুরে চাটে।”
রুমা তারপরও কি মনে করে ফিনিশ পাউডারটা ফেরত দিয়ে এই “তেইল্লাখাদক” নিয়ে বাড়ি ফিরলো।
রাতে প্যাকেটের নির্দেশনামতো পাউডারটা রান্নাঘরের মেঝে, সিঙ্ক, ডাইনিং টেবিলের চারদিকে ভালো করে ছিটিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
সকালে উঠে পাউডারের কার্যকারিতা দেখতে রান্নাঘরে গিয়ে সে খানিকটা বিস্ময়ের সাথে দেখলো বেশ অনেকগুলো তেলাপোকা মেঝে তে পড়ে আছে ঠিকই কিন্তু তেলাপোকাগুলো সব আধাখাওয়া। মানে কেউ অর্ধেক খেয়ে রেখে দিয়েছে। অদ্ভুত তো!
পুরো দৃশ্যটাই গা গুলানো। ঝাট দিতে গিয়ে এতোগুলো মরা তেলাপোকা জড়ো করলে এমনিতেই বমির উদ্রেক হয়। তার উপর আবার নাড়িভুঁড়িসমেত আধা খাওয়া তেলাপোকা।
এরপর এই ঘটনা নিয়মিত ঘটতে থাকে। রুমা প্রতিরাতে এভাবে পাউডার ছিটিয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর সকালে উঠে দেখে আধাখাওয়া তেলাপোকার স্তুপ। রুমার গৃহকর্মী শিউলি আপা সকালে এসে ঘর ঝাড়ু দিতে গেলে রাগ করে। বলে এভাবে আধাখাওয়া তেলাপোকা ফুলঝাড়ু দিয়ে ঝাট দেয়া কষ্ট। নাড়িভুঁড়িতে মাখামাখি সাথে বিকট গন্ধ। সোজা সাবানপানিসমেত শলার ঝাড়ু দিয়ে ঝাট দিতে হয়।
যদিও এমন করে তেলাপোকাগুলি খাচ্ছে কে সেটা বের করা যায়নি। রুমা নানা ব্যস্ততায় এসব নিয়ে আর মাথা ঘামালো না।
একরাতের কথা….
ম্যাগাজিনের ঈদসংখ্যার জন্য সম্পাদকের তাড়ায় জরুরী লেখা লিখছিলো রুমা। রাত ২ টা বাজে। হঠাৎ তার কানে কিছু একটা খাওয়ার শব্দ গেল। বিগত রাতগুলোতে রুমা একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তো বিধায় এসব শব্দ আগে পাইনি। কিন্তু এবার শব্দ পেয়ে কৌতুহল দমন করতে না পেরে ঘর থেকে বেড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
রান্নাঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার নয় আজ। পাশের বিল্ডিংয়ের চারতলা থেকে আলো রুমার তিনতলার এই ফ্ল্যাটটির রান্নাঘরে পড়েছে। আবছা আলো-ছায়ার খেলাতে সামান্য চোখ সয়ে এলে তার মেরুদন্ড বেয়ে একটি শীতল স্রোত নেমে গেল।
আলো-আঁধারিতে একটি অবয়ব তার দিকে সোজা তাকিয়ে আছে আর সমানে তেলাপোকা খেয়ে যাচ্ছে।
এরপরে রুমার আর কিছু মনে নেই……
– Maliha Tabassum Momo
Send private message to author






