অদ্ভুত প্রেম(এক)
পহেলা বৈশাখ, ১৪১৪
আজ রাহীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। যে করেই হোক আজ সবার ধারনাকে সে মিথ্যে প্রমান করবেই। অনেকটা জীদ চেপে আছে মনে। কাল সারারাত ঘুমাতে পারেনি। নানারকম টেনশন, এক্সাইটমেন্ট, অনিশ্চয়তা সবকিছু মিলে এক অন্যরকম অনুভূতি ঘিরে ধরেছিল তাকে। তাই হাজার চেষ্টা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি।
ফজরের আযান দিতেই পড়িমরি করে উঠে বসল। ওযু করে নামায পড়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু এবারেও ব্যর্থ হল। বারবার ঘড়ির দিকে চোখ যাচ্ছে। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার চেয়েও দ্রুত চলছে ওর হৃদস্পন্দন। কেবল বারোটা বাজার অপেক্ষা।
সময় নামের জিনিসটার উপর এখন প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে রাহীর। বড় দুষ্টু এই সময়। যখন প্রয়োজন ধীরে যাবার তখন তার এত তাড়া থাকে এক মূহুর্ত যেন থামতে চায়না, আর যখন প্রয়োজন তাড়াতাড়ি যাবার তখন এই আলসে সময়টা যেন একেবারেই নড়তে চায় না। আজ ঠিক তেমনি কোন ভাবেই সময় এগুচ্ছে না। আবার রাহীর ঘুমও আসছে না টেনশনে।
পাশের ঘরে বাবা মা ঘুমাচ্ছে। ছোট ভাইটা উঠে পড়েছে আজ। ওর একটু বেলা করে উঠার অভ্যাস। এত সকালে উঠতে দেখে রাহী জিজ্ঞেস করল
-কিরে আজ সকালে সূর্য কোনদিকে উদয় হয়েছে?
ওর প্রশ্ন শুনতে পায়নি এমন ভাব করে রাফী বলল
-ভার্সিটিতে যাব। পরীক্ষা আছে আজকে। বিরক্ত করিস না এখন।
রাফী আর রাহী দুই ভাইবোন। বাবা মা মিলিয়ে নাম রাখলেও ওদের স্বভাব সম্পূর্ন বিপরীত। রাহী চুপচাপ, বই পড়তে, গান শুনতে ভালবাসে। রাফী যদিও গান শুনতে ভালবাসে, কিন্তু ওর পছন্দ রক মিউজিক। আর রাহীর পছন্দ সবসময় সফট মিউজিক। রাফী চঞ্চল হলেও পড়াশুনায় বেশ ভাল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বোটানিতে পড়াশুনা করছে।
নতুন এক স্যার জয়েন করেছেন রাফীদের ডিপার্টমেন্টে। উনি এইসব পহেলা বৈশাখ পালনের ঘোর বিরোধী। তাই আজকে অনেকটা ইচ্ছে করেই বন্ধের মধ্যে উনি পরীক্ষা নিবেন। আর সাথে এটাও বলেছেন এই ক্লাস টেস্টে যে হাইস্ট মার্ক পাবে উনি ফাইনাল পরীক্ষায় তাকে বোনাস দুই মার্ক দিবেন। আর যায় কোথায় ছেলেমেয়েরা। আগে পরীক্ষা তারপর পহেলা বৈশাখ।
রাগে গজগজ করতে করতে রাফী বের হয়ে গেল। রাহীর হাতে এখন অফুরন্ত সময়। সময় যেন কিছুতেই কাটতে চাচ্ছে না। অগত্যা গান ছেড়ে গোসলে গেল। রাহীর এই এক অভ্যাস টেনশনে থাকলে গান ছেড়ে রাখে। খাওয়া দাওয়া এমনকি গোসলও গান শুনে করে। আসলে গান শুনার চেয়ে মনকে অন্য দিকে ধাবিত করাই ওর মূল উদ্দেশ্য।
সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি দূর করতে অনেক সময় নিয়েই গোসল শেষ করল রাহী। আজকে তার জীবনের একটা বিশেষ দিন। কিন্তু ব্যাপারটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছে না। নিশ্চিত অনিশ্চিতের দ্বন্দে জড়িয়ে আছে রাহী। ঘটনাটা না ঘটা পর্যন্ত সে শান্ত হতে পারছে না।
আমাদের এই গল্প যাকে নিয়ে তার নাম রাহী। বাবা মায়ের দুই সন্তানের মধ্যে রাহী বড়। পড়াশুনা করছে শহরের একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রী হিসেবে ভালই বলা যায়। এমনটা নয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে দূরে হওয়ায় বাবা মা একমাত্র মেয়েকে ছাড়তে চাইলেন না। মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই বেশ আহ্লাদী। এত কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। পছন্দ মত বিষয় না পাওয়ায় রাহীও আর দ্বিমত করলনা বাবা মায়ের সাথে।
ছোটবেলা থেকে একটু ভাবুক প্রকৃতির মেয়ে রাহী। কোন কিছু মাথা খাটিয়ে চিন্তা করার চেয়ে আবেগ দিয়ে চিন্তা করে বেশী। এই জন্যই বাবা মায়ের খুব চিন্তা রাহীকে নিয়ে। তাই দূরে কোথাও দিতে চান না সারাক্ষণ চোখের সামনে রাখতে চান। সেদিক থেকে ছেলে রাফী কিন্তু বয়সের তুলনায় অনেক বেশী পরিনত চিন্তা ভাবনায়। তাই ছেলেকে নিয়ে খুব একটা ভাবেন না, জানেন ছেলে যে কোন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে। তাই যখন রাফী বোটানিতে চান্স পেল ওনারা আর দ্বিমত পোষণ করলেন না।
ছোটবেলা থেকে গল্প উপন্যাস পড়তে পড়তে রাহীর মনে প্রেম ভালবাসা নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা ছিল। কিন্তু কারো সাথে প্রেম করবে এমন ইচ্ছে তার কখনো ছিল না। ছোটবেলা থেকে কো-এডুকেশনে পড়া রাহীর কাছে ছেলে মেয়েতে তেমন তফাৎ ছিল না। তার পরিবারেও কখনো সে এমন আচরণ পায়নি যেখানে নিজেকে মেয়ে বলে ভিন্নগ্রহের কোন মানুষ ভাবতে হবে। ওর বাবা মায়ের কাছে রাফী যেমন রাহীও তেমন।
আসলে ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক শিক্ষাটা পায় পরিবার থেকে। পরিবারে সবার আচার আচরণ থেকে ওরা সম্পর্কগুলোকে বিচার করতে শিখে। যেসব পরিবারে মেয়েদের অবহেলা করা হয় সেসব পরিবারের মেয়েরা একধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। অপরদিকে ছেলেরা মেয়েদের সম্মান দিতে শিখে না।
রাহী এই দিক থেকে অনেক সৌভাগ্যবতী। ওর বাবা মা সবসময় ওকে মেয়ে নয় বরং একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতে শিখিয়েছেন।
এই গল্পের ঘটনার সুত্রপাত তিন বছর আগে রাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকে। অরিয়েন্টেশনের জন্য অডিটরিয়ামে বসে আছে হঠাৎ চোখ পড়তেই দেখে এক জোড়া দুষ্টুমি ভরা চোখ অনেকক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ্য করছে। রাহীর কাছে ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যজনক মনে হলো কারন এই ছেলেটিকে সে আগে কখনও দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। কেউ অপরিচিত কারও দিকে এইভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে পারে রাহী যেন ব্যাপারটা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
বেশ অনেকক্ষণ যাবত ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে আছে আর মিটিমিটি হাসছে।রাহীর বেশ অসস্থি হতে থাকে। আর না পেরে বান্ধবী রিয়াকে বলল
-দেখত ছেলেটা কেমন নির্লজ্জের মত তাকিয়ে আছে।
রিয়ার আবার এইসব ব্যাপারে অতিউৎসাহ। সাথে সাথে বলে উঠল
-কোথায় দেখি, কোন ছেলেটা দেখাতো আমাকে।
-ঐ যে দেখ লাল কালারের টিশার্ট পরা ছেলেটা। অনেকক্ষণ ধরে এইদিকে তাকিয়ে আছে আর কেমন শয়তানের মত হাসি দিচ্ছে দেখ।
-আল্লাহ্ কি বলিস শয়তান হবে কেন? কি সুন্দর দেখতে! একেবারে রাজপুত্র।
-তুইও না কেমন জানি! লাজলজ্জা্র মাথা খেয়েছিস মনে হয়।
-এই শুন এখন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিস, তোর এই সব খালাম্মা টাইপ আচরণ বন্ধ কর। এখনই তো সময়। এখন এসব না করলে কি বুড়ো বয়সে করবে?
-মানে কি? ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিস কি লেখাপড়া করতে না এসব করতে?
-সব করতে। এমন কোন ধারাতো সংবিধানে নেই তুই ভার্সিটিতে পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু করতে পারবি না।
এই বলে রিয়া হেসে কুটিকুটি। রাহী বেশ বিরক্ত হয়ে বলে
-এমন শয়তানের হাসি দিবি না।
-আমার হাসিতে কি আসে যায় বল। তুইতো না হেসেই ফাঁসিয়ে ফেলেছিস।
এবার রাহী রিয়ার দিকে কড়া চোখে তাকালে রিয়া আর কিছু বলবে না এমনটা ইশারা দেয়।
রিয়ার কথায় কি যেন ছিল রাহী এবার একটু আড়চোখে দেখতে থাকে ছেলেটিকে। বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর আবিষ্কার করল ছেলেটি দেখতে বেশ ভালোই। লম্বা, সুঠাম দেহ দেখেই বুঝা যায় রীতিমত জিম করে। গায়ের রঙ ফর্সা তবে সবচেয়ে আকর্ষনীয় হল চশমার আড়ালে থাকা কালো মনির চোখ দুটি। সারাক্ষন যেন দুষ্টুমি ঝিলিক দিচ্ছে চোখ জোড়া থেকে।
কিসের ওরিয়েন্টেশন কিসের কি! পুরো প্রোগ্রাম জুড়ে চলল ওদের এই চোখাচোখির খেলা। কেউ বা সরাসরি আবার কেউ বা আড়চোখে। রাহী ভেবে পায়না কবে থেকে সে এমন বেহায়া হয়ে গেছে। বাসায় ফিরে এসেও সেই ঘটনার রেশ রয়ে গেল রাহীর মনে। সারাক্ষন মনের মধ্যে কেবল সেই দুষ্টুমি ভরা চোখ জোড়া ঘুরে বেড়াতে লাগল। যতই মনকে লাগাম টেনে ধরতে চায় মন যেন রেসের ঘোড়ার মত দুর্দান্ত প্রতাপে দৌড়োতে থাকে।
নিজের এমন আচরনে খুব অবাক হয় রাহী। ভেবে পায়না সে কবে থেকে এমন বেহায়া হয়ে গেল। তবে বেহায়া বা যাই হোক না কেন সে যে ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেছে সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না। “Love at first sight” ব্যাপারটায় রাহীর বরাবরই আপত্তি। সে কোন ভাবেই মানতে নারাজ একটা মানুষের সম্পর্কে কোন কিছু না জেনে কেবল প্রথম দেখায় কেউ কারো প্রেমে পড়তে পারে। কিন্তু আজ নিজের সাথে যা কিছু হল তাতে সে বেশ খানিকটা অবাকই হল।
রাহী বেশ বুঝতে পারছিল সে ডুবতে বসেছে। কিন্তু তাই বলে প্রথম দেখাতেই? এতদিনের তার সকল ধ্যান ধারনা কি বিসর্জন দিতে বসেছে সে? কোন কথা হল না, নাম জানে না, কোন ডিপার্টমেন্ট তা জানে না কেবল একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়ে যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে পরবর্তিতে কি হবে ভেবে ভয়ে শিউরে উঠে রাহী। বারেবারে বাবার সেই আদেশ বানী মনে পরে যায়, যা বাবা ওদের দুভাই বোনের উদ্দ্যেশ্যে প্রায়ই বলে থাকেন
-অনেক স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছি বলে ভেব না আমি তোমাদের সবকিছু মেনে নিব। যদি মামুনের মত কর তাহলে কেটে টুকরো টুকরো করে কর্নফুলী নদীতে ভাসিয়ে দেব।
মামুন হচ্ছে রাহীর বড় ফুফুর বড় ছেলে। রাহী ও রাফী তখন অনেক ছোট, এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল মামুন ভাইয়ের। কিন্তু বাবা মা কোন ভাবেই মেনে না নেয়ায় অবশেষে পালিয়ে বিয়ে করে আলাদা থাকছে। এই নিয়ে পরিবারে অনেক ঝামেলা হয়েছে। এইসব দেখে আর বাবার সতর্কবানী শুনে রাহীর জীবনে প্রেম করার ইচ্ছেই যেন জন্মায়নি কখনও।
কিন্তু আজ এই কি হচ্ছে তার মাঝে! সে হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে সামলাতে পারছে না। অবশেষে ভেবে নিল যা হবার তা হবে এখন এইসব বিষয় নিয়ে আর ভাবতে চায় না সে।
চলবে…………
তানিয়া আবেদিন (Tania Abedin)
Send private message to author




তারপর রাহীর কী হলো?
জানার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম!