বলছি আমাদের ছেলে বেলার কথা। আমরা তখন শিশু কিশোর। সমাজ তখন আজকের মত এতটা অগ্রসর ছিলো না। মানুষের জীবন যাত্রা চাল চলন, জীবন যাপন ছিলো একেবারেই সহজ সরল আর সাদামাটা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো একেবারেই অনুন্নত। গরুর গাড়ী, নৌকা এই গুলোই ছিল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। ছিলো পালকী। রিক্সার প্রচলন ছিলো খুবই সীমিত আকারে। যান্ত্রিক যানবাহন গ্রামাঞ্চলে ছিলো না বললেই চলে। বর্ষাকালে নৌকাই হয়ে উঠতো যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
সে সময় টাতে গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় বাদে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ছিলো অনেক দূরে দূরে। প্রথাগত ভাবে সে সময় বেশীর ভাগ গ্রামের মেয়েদের পড়াশুনা বাড়ীতে বা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। খুব অল্প বয়সেই তখন মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। ১১/১২ থেকে ১৪/১৫ মোটামুটি এই বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো সেই সময়। এমন কি ১০ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের কথা ও শোনা যেতো মাঝে মাঝে।
বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ীতে যাওয়ার সময় সারা বাড়ী জুড়ে উঠতো এক কান্নার রোল। এই সময় বিবাহিত মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বাড়ীর ছেলে বুড়ো সবাই, আশে পাশের পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবী আর বাবা মায়ের কান্নায় এক আবেগ ঘন পরিবেশের তৈরী হতো, ভিজে উঠতো উপস্থিত সবার চোখ। এই সময়ের বধু বিদায়ের দৃশ্য ছিলো বড়ই বেদনা বিধুর।
যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন ছিল একেবারেই অনুন্নত আর সেকেলে। সাধারণত বিয়ের বর কনের জন্য ব্যবহার করা হতো পালকী। মাঝে মাঝে বর আসতেন পালকীতে চড়ে। যাবার সময় কোন কোন ক্ষেত্রে সেই পালকীতে চড়েই কনে বা ক্ষেত্র বিশেষে বর কনে দুজনেই পাশাপাশি বসে রওনা হতেন বরের বাড়ী। আবার কখনো কখনো দেখা যেত কনে একা পালকীর ভিতরে বসে আর বর যাচ্ছেন পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে। এ সময় প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই বরের মুখ ঢাকা থাকতো একটি রুমাল দিয়ে। নতুন বউয়ের যেন মন খারাপ না নয় সেজন্যে বিয়ের পাত্রীর সাথে প্রায় ক্ষেত্রেই ছোট ছোট দুই একজন ভাই বোন সহযাত্রী হতো।
এভাবেই শুরু হয়ে যেত এক কিশোরীর নতুন জীবন, জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। অল্প বয়স। এখনো পুতুল খেলার বয়স ও পেরোয় নি। যেই বয়সে ছোট্ট এই কিশোরীর ছুটে বেড়ানোর কথা সারা বাড়ী আর উঠোন জুড়ে, যেই বয়সে তার খেলার কথা ওপেয়েন্টি বাইস্কোপ আর চোর পুলিশ, সেই বয়সেই ঘোমটা মাথায় সেই কিশোরী নববধূ বেশে শ্বশুর বাড়ী। বাস্তব অর্থেই এই সময়টা এই বয়সী একজন কিশোরী নববধূর জন্য ছিলো খুবই কঠিন। সেই সময় পরিবার গুলো ছিল একান্নবর্তী। এক একটি পরিবারে তখন ছোট বড় মিলে গড় সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় ১২ থেকে ১৫ জন। এর বাইরে ও থাকতো বাড়ীর কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিক। প্রায় সময়েই বাড়ীতে আরো থাকতো দুই একজন মহিলা বা পুরুষ অতিথি।
শ্বশুর বাড়ীতে শুরুতে দিন কয়েক কাটানোর পরই শুরু হতো এই কিশোরী নববধূর দায়িত্ব গ্রহণের পালা। শুরুর কয়েক দিন গ্রামের আশে পাশে বাড়ী থেকে দল বেঁধে মহিলারা আসতেন নতুন এই বউকে দেখতে। আসতেন পাড়া প্রতিবেশী আর মুরুব্বীরা। লম্বা ঘোমটা টেনে কিশোরী নববধূ পায়ে ধরে সালাম করতেন মুরুব্বী মহিলা আর পুরুষদের। মুরুব্বীরা সালাম নিয়ে দোয়া করে দিতেন এই সব নব বধূদের।
এক বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। সেই কাক ডাকা ভোরে জেগে রাত অবধি সারা দিন হাজার রকম খাটা খাটনিতে সময় চলে যেত অল্প বয়সী এই কিশোরী গৃহবধূর। বাড়ীতে শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, দেবর, ননদ, ভাসুর, জা সহ ছোট ছোট আরো অনেক ছেলে মেয়ে। বিরাট এক একান্নবর্তী পরিবারের দায় দায়িত্ব ধীরে ধীরে এসে পড়ে এই কিশোরী নব বধূর উপর। কতটুকুই বা আর বয়স। সেই তুলনায় এক বিশাল সংসারের গুরু দায়িত্ব তাঁর কাঁধের উপর। অনেক ক্ষেত্রেই পান থেকে চুন খসার ও কোন জো থাকতো না। সবার মন জুগিয়ে চলা ছিলো এক কঠিন ব্যাপার। এরই মধ্যে আবার ছিলো বাড়ীর মুরব্বীদের কারো কারো চোখ রাঙানো।
এক পর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠতো সেই কিশোরী নববধূ। প্রচন্ড এক দুঃখ বোধ আর কষ্ট পেয়ে বসতো তাকে। কারো সাথে মনের দুঃখ কষ্ট শেয়ার করতে পারতো না। মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে যেতো। এই সময় খুব করে মনে পড়তো মা বাবার কথা, ভাই বোনদের কথা আর মনে পড়তো ছোট বেলার খেলার সাথীদের কথা।
এই সময়ে আবার কেউ কেউ পেটে সন্তান ধারন করতেন। এই সময় মায়ের কথা খুব মনে হতো তাদের। কেউ কেউ সন্তান সম্ভবা হলে আবার বাবার বাড়ীতে চলে যেতো। বাবার বাড়ী যেতে সবারই খুব করে মনে চাইতো তখন। কিন্তু মন খুলে আর মুখ ফুটে শ্বশুর বাড়ীর কাউকে এই বিষয়ে কিছু বলতে পারতো না তারা। কষ্টটা তাই নিজের মধ্যেই লালন করতে হতো তাদের।
গর্ভকালীন এই সময়ে শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। স্বভাবতই এই সময়ে খুব চিন্তা যুক্ত হয়ে পড়ে এরা। এই বিষয় নিয়ে জানতে, কথা বলতে ইচ্ছে হয় কিশোরী নব বধূর। কিন্তু খুব কাছের আপন জন না হলে এ বিষয় নিয়ে কারো সাথে আলাপ করতে সংকোচ বোধ করতো এই কম বয়সী নব বধূরা। শ্বশুর বাড়ীর কারো সাথে লজ্জায় এ বিষয়ে আলাপ করতে চাইতোনা। থেকে থেকে তাই মায়ের কথা মনে পড়তো এই সময়। প্রথম সন্তান ধারণের এই সময়টা যে কোন মেয়ের জন্য এক অন্য রকম অনুভুতি আর অভিজ্ঞতা। শরীর মন দুটোই খ
অবসন্ন থাকে এই সময়। মাঝে মাঝে শরীরে দূর্বলতা ভর করে। দুশ্চিন্তা ও ভর করে মনে কারনে অকারনে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় শুয়ে শুয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিতে। ইচ্ছে হয় এই সময় কিছু কিছু বিশেষ খাবার খেতে। এই সমস্ত খাবারের ইচ্ছের কথা শ্বশুর বাড়ীর কাউকে বলতে দ্বিধা বোধ করে এরা। মায়ের কাছে থাকলে এই সমস্ত খাবারের ইচ্ছের কথা সহজেই বলা যায়। ইচ্ছে হয় এখনই ছুটে যেতে মা বাবার কাছে। মা বাবার পাশে বসে পরম ভালোবাসায় আর মমতায় নিজের জীবনের কথা গুলো মা বাবার সাথে শেয়ার করতে।
ইচ্ছা করলেই তো আর তা করা যায় না। মনে মনে ভাবে কখন আবার দেখা হবে মা বাবা আর বাড়ীর অন্যদের সাথে। কল্পনায় থেকে থেকে মনে আসে বাবার বাড়ী নাইওর যাওয়ার দৃশ্য। এই সব ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই ভিজে আসে কিশোরী বধূর চোখ দুটো।
কাউকে দিয়ে পোস্ট অফিস থেকে আনিয়ে নেন একটি পোস্ট কার্ড। চিঠি লিখতে বসেন মা বাবাকে। এক প্রচন্ড আবেগ ভর করে তখন তার মনে। মনে পড়ে যায় মা বাবার সাথে কাটানো উচ্ছল সেই সোনালী দিন গুলোর কথা। ইচ্ছে থাকলে ও নিজের দুঃখ কষ্টের কথা মা বাবাকে লিখতে চান না। নিজের কষ্ট নিজের বুকেই চেপে রাখেন এই সব কিশোরীরা। নিজের কষ্টের কথা বলে মা বাবার মনের কষ্ট আর অহেতুক বাড়াতে চান না তারা।
রাত জেগে শুরু হয় কিশোরীর পত্র লেখা মা বাবার উদ্দেশ্যে। হাজারো স্মৃতি তখন ভর করে মনে। পোস্ট কার্ডের এই ছোট্ট পরিসরে ও কিছু কথা লিখা কখনোই বাদ যায় না এই সমস্ত অল্প বয়সী গৃহ বধূদের। চিঠির ছোট্ট একটি অংশে সচরাচর মনের একটি ছোট্ট ইচ্ছা স্থান পায়। প্রকাশ পায় নাইওর নেয়ার আকুল আকুতি। ছোট্ট এই চিঠিতে সচরাচর যে কথাগুলো লেখা থাকে সেগুলো এই রকম।
চিঠির শুরুটা থাকতো এই রকম,
” আমার সালাম ও কদমবুচি গ্রহণ করিবেন। বাড়ীর সবাইকে শ্রেণী মত সালাম ও দোয়া জানাইবেন। পর সমাচার এই যে আমি আপনাদের দোয়ায় এক রকম ভালো আছি। আশা করি আপনারা ও সবাই ভাল আছেন।”
চিঠির মাঝ খানটা মোটামুটি এইরকম থাকতো,
“আপনাদের কথা খুব মনে পড়ে। আপনাদেরকে দেখিতে খুব মনে চায়। কবে আমাকে দেখিতে আসিবেন জানাইবেন। আপনাদের আসিতে অসুবিধা হইলে জামালকে দুই এক দিনের জন্য আমাকে দেখিয়া যাইতে পাঠাইয়া দিবেন। আমি জামালের সাথে দুই একদিনের জন্য হইলে ও আপনাদেরকে দেখিতে যাইব।”
চিঠির শেষ অংশে অবধারিত ভাবে শতভাগ ক্ষেত্রে এই কথা গুলো লিখা থাকতো,
” আপনার শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। আম্মার প্রতি খেয়াল রাখিবেন। ওষুধ গুলি নিয়মিত খাইবেন। আমার জন্য কোন চিন্তা করিবেন না। নামাজ পড়িয়া আল্লাহর কাছে আমার জন্য খাস দিলে দোয়া করিবেন।”
ইতি,
আপনার স্নেহের
খাদিজা।
মন কাঁদে। মন বিষণ্ন হয় কিশোরী বধুর। প্রতি নিয়ত ইচ্ছে করে বাবা মায়ের কাছে ছুটে যেতে। সব সময় ভাবেন কবে আসবে সেই বাবার বাড়ী নাইওরী যাওয়ার ক্ষন। তাঁদের এই মনের আকুলি আর ক্ষুধা অত্যন্ত হৃদয় স্পর্শী ভাবে প্রকাশ পেয়েছে সম সাময়িক সাহিত্যে আর সঙ্গীতে।
“কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া,
ভাই ধনেরে কইও আমায়
নাইওর নিতো আইয়া,
তোরা কে যাস কে যাস রে।”
(শচীন দেব বর্মনের গান)।
“আরে ও ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া,
ঠাকুর ভাইরে কইও আমায়
নাইওর নিতো আইয়ারে
ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া।”
(আব্দুল আলীমের গান)।
“আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে,
পুবালী বাতাসে,
বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি
আমার নি কেউ আসেরে,
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে।”
(উকিল মুন্সীর গান)।
এই রকম আরো অনেক সম সাময়িক গান, কাব্য আর সাহিত্যে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই সমস্ত কিশোরী বধুদের নাইওর যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
দিন যায়। মাস যায়। নাইওরীর আর বাবার বাড়ী যাওয়া হয় না। মেয়ের কথা স্মরণ করে মা কাঁদে আর অন্য দিকে মায়ের কথা স্মরণ করে থেকে থেকে নীরবে কাঁদে মেয়ে ও। দুজনের মনেই তখন তীব্র আকাঙ্ক্ষা কখন দেখা হবে তাদের। পথ পানে চেয়ে চেয়ে অপেক্ষা দুজনেরই। এই অপেক্ষার পালা আর যেন শেষ হয় না। দুই জনেরই কত শত ইচ্ছা আর পরিকল্পনা মনে মনে। কি কথা হবে, কি করবে সাক্ষাতের সময়, কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবেন, নিজ হাতে কি কি রেঁধে মাকে আর মেয়েকে খাওয়াবেন এই রকম আরো কত কত শত শত এলো মেলো সব ভাবনা।
সময় গড়িয়ে যায়। এক সময় সুযোগ আসে নাইওরীর বাবার বাড়ী যাবার। ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ মাস। এর মধ্যে শুধু একবার বাবার সাথে দেখা হয়েছিল কিছু ক্ষণের জন্য। ছোট ভাইকে বাবা পাঠিয়ে দেবেন শীঘ্রই। আর সে এসে বোনকে সাথে করে নিয়ে যাবে বাবার বাড়ী।
বর্ষা কালে বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে গ্রামাঞ্চলের চারিদিক সয়লাব হয়ে যেতো। রাস্তা গুলো এই সময় তাই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যেতো। এই সময়টাতে বেশীর ভাগ নাইওরীর চলাচল হত নৌকায়। বর্ষার আর বন্যার পানি গ্রামের আনাচে কানাচে প্রবেশ করায় নাইওরীর নৌকা গুলো বাড়ীর একেবারে কাছা কাছি ভিড়তে পারতো তখন।
ছোট ভাই এসে তাকে নাইওর নিয়ে যাবে বাবার বাড়ী। খুশীতে মনটা ভরে ওঠে মেয়ের। প্রস্তুতি শুরু হয় আর দিন গুনতে থাকে যাবার ক্ষনের।
নিজের প্রস্তুতি খুবই অল্প। নানান রঙের বর্ণিল ফুলের ছবি আঁকা লোহার ছোট্ট একটি ট্রাংকে সামান্য কিছু কাপড় চোপড়, একটি তিব্বত স্নো আর পাউডারের কৌটা, পায়ের পাতায় ব্যবহারের জন্য লাল রংয়ের ছোট্ট একটি আলতার শিশি। এই হচ্ছে আমাদের নব বধূর প্রসাধনী।
প্রায় ১০ মাস পর বাবার বাড়ীতে নাইওর যাত্রা। কিশোরী বধু বাবার বাড়ীর জন্য নিজের হাতে তৈরী করে নেয় নানান রকম পিঠা। ঘরে থাকা কয়েকটি পাকা আতা, গাছের কয়টি তাজা পেয়ারা ও সাথে নেয়। নিজ হাতে কিছুটা বেশী ঝাল দিয়ে রান্না করে করে বাড়ীতে পালা একটা বড় মুরগী। এই রকম রান্না করা মুরগীর মাংস বাবা মা দুই জনেরই খুব পছন্দের।
দিন ক্ষণ এসে যায়। একদিন ভোরে ছোট ভাইকে নিয়ে সে বসে পড়ে নাইওরীর নৌকায়। বাবার বাড়ীতে তখন বিশাল এক প্রস্তুতি কিশোরী মেয়েকে বরণের। বর্ষাকাল, তাই নৌকা ভিড়বে বাড়ীর একেবারে কাছাকাছি। বাবা মা আর বাড়ীর নিকট জন সবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা নাইওরীর নৌকার জন্যে। কিশোরীর প্রায় ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা দাদী ও লাঠিতে ভর করে হেঁটে হেঁটে সবার সাথে এসে উপস্থিত হয়েছে আদরের নাতীনকে বরনের জন্য। অপেক্ষা আর শেষ হতে চাযনা।
ধীরে ধীরে এক সময় দৃশ্যমান হয় নাইওরীর নৌকা। উৎফুল্ল হয়ে উঠেন সবাই। কিশোরী নাইওরীর নৌকা এসে ভিড়ে বাড়ীর আঙিনায়। নৌকা থেকে নেমে আসে সেই কিশোরী বধু।বছর খানেক ও আগের সেই হাসি খুশী, বাড়ী ঘর মাতিয়ে রাখা সেই দুরন্ত কিশোরী। সবার চোখ তখন অশ্রু সিক্ত। মনে হয় যেন কত শত বছর পর প্রিয় জনের সাথে আবার দেখা।
কিশোরী বধূ নেমেই জড়িয়ে ধরে মা বাবাকে। শুরু হয় বিলাপ করে কান্না। উপস্থিত সবাই তখন আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন। খানিক ক্ষণ পর সবাই চোখ মুছতে মুছতে নাইওরীকে নিয়ে রওনা হয় বাড়ীর দিকে। আশে পাশের বাড়ী থেকে পরিবার স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী আর ছোট বেলার খেলার সাথীরা ও এসে ভিড় করে তার বাড়ীর আঙ্গিনায়।
বাড়ীতে ঢুকেই নাইওরী সারা বাড়ী ময় ঘুরে বেড়ায় কিছুক্ষণ। স্মৃতি হাতরে খুঁজে বেড়ায় তার শৈশব আর কৈশোর। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধান। কিন্তু তার কাছে মনে হয় এর মধ্যেই যেন পেরিয়ে গেছে এক যুগ। আশে পাশের বয়স্ক মুরুব্বীদের ঘরে গিয়ে গিয়ে তাদেরকে সালাম আর কদমবুচি করে আসে। খানিক ক্ষণ পর এসে বসে বাড়ীর বারান্দায়। সবার সাথে জমে ওঠে আলাপ। কত রাজ্যের কথা। কথা যেন শেষই হতে চায় না। ইতিমধ্যেই সময় হয় দুপুরে খাবারের। আগত লোকজন সবাই ফিরে যায় যার যার বাড়ী।
রান্না ঘরে পাটি আর পিড়ি বিছিয়ে বাড়ীর সবাই খেতে বসে এক সাথে। কিশোরী নাইওরীর পছন্দের খাবার শিং মাছের ঝোল, চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা, মাষ কলাইয়ের ডাল, কলমী শাক ভাজা, গুঁড়া চিংড়ি দিয়ে লাউ আর ছোট মাছের চরচরি ইতোমধ্যেই মা পরম যত্নে রেঁধে রেখেছেন অন্যান্য খাবারের সাথে। পরম আদর আর মমতায় মেয়েকে পাশে বসিয়ে তার পাতে তুলে দেন মেয়ের পছন্দের এই সব খাবার গুলো। এই দৃশ্য দেখে কি এক বিশাল তৃপ্তি তখন মার মনে?
দিন শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। চাঁদনী রাত। চারিদিকে জ্যোৎস্নার আলো। আশে পাশের ঝোপ ঝাড়ে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার বিরামহীন গুঞ্জরন। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ী থেকে কিছু কিছু মহিলা ছোট ছোট দল বেঁধে আসছে নাইওরীকে দেখতে। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে এই সময়টাতে তাদের কিছুটা অবসর।
উঠোনে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে পাটি। সাথে দেয়া হয়েছে পানের বাটা। মহিলারা এসে বসে পড়েন পাটিতে। নাইওরী বসে আছে মাকে সাথে নিয়ে। পানের বাটায় সুন্দর করে সাজানো আছে সুপারী, জর্দা, চুন, খয়ের আর সাদা পাতা। পান খেতে খেতে জমে ওঠে আড্ডা। কত রাজ্যের আলাপ। এ যেন কখনোই শেষ হবার নয়। আলাপের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে রাত। এক সময় শেষ হয় আলাপ। নাইওরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সবাই ফিরে যান।
বাবার বাড়ীর দিনগুলো খুব দ্রুতই কেটে যায় নাইওরীর। সময় ঘনিয়ে আসে ফিরে যাবার। মনটা বিষন্ন হয়ে উঠে সবার। আরো কিছু দিন থাকতে মন চায়। মায়ের ও মনের ইচ্ছে আরো কিছু দিন মেয়েকে বাড়ীতে রেখে তার পছন্দের খাবার গুলো রেঁধে, আশে পাশের বাড়ীতে মেয়েকে সাথে নিয়ে বেড়াতে যেতে আর পাশে বসিয়ে নিজের হাতে পছন্দের খাবার গুলো মেয়েকে খাওয়াতে। মন চায় আরো কয়েকটা দিন একসাথে কাটাতে।
ফিরে যাবার দিন দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসে। নাইওরীর শ্বশুর আসবেন ছেলের বউকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। বাড়ীতে আবার ধান ওঠার মৌসুম। ছেলের বউয়ের খুবই দরকার এই সময়। শ্বশুর এলেন। রাতে খাবার দাবার পর অনেক ক্ষণ ধরে আলাপ করলেন বেয়াই বেয়াইনের সাথে। পরদিন সকালে যাত্রা করবেন ছেলের বউকে নিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে।
পর দিন সকাল। সবাই এখন নৌকা ঘাটে। প্রস্তুত নৌকা। প্রস্তুত মাঝি। উপস্থিত সবার চোখ তখন অশ্রু সজল। আশে পাশের অনেকেই এসেছেন নৌকার কাছে বিদায় দিতে কিশোরী নাইওরীকে। লাঠিতে ভর করে এসেছেন বৃদ্ধা দাদী ও। দাদীর চোখ দিয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। বয়োবৃদ্ধ দাদী হয়তো ভাবছেন কি জানি আবার কখনো আদৌ দেখা হবে কিনা আদরের এই নাতনীর সাথে।
বিষন্ন মনে সবাই দাঁড়িয়ে আছেন নৌকার পাশে। আর দেরী করা যাবে না। নাইওরী এবার জড়িয়ে ধরে মাকে। শুরু হয় বাধ বাঁধা কান্না দুজনের। প্রচন্ড আবেগ ঘন এক পরিবেশ তৈরী হয় চারিদিকে। আশে পাশের সবাই ও তখন লুকিয়ে লুকিয়ে মুছে চোখের পানি।
সবাই ধীরে ধীরে পা বাড়ায় নৌকার দিকে। অশ্রু সজল চোখে নৌকায় উঠে বসেন আমাদের নাইওরী। পিছনে পড়ে থাকে তার বাবা, মা, ভাই, বোন, ছোট বেলার খেলার সাথী। পিছনে পরে থাকে তার শৈশব আর কৈশোরের দুরন্ত দিন গুলোর হাজারো হাজারো টুকরো টুকরো স্মৃতি।
নৌকা চলতে শুরু করে। ঘাটে দাঁড়িয়ে অশ্রু সজল সব প্রিয় মুখ গুলো। নৌকার মুখ এখন শ্বশুর বাড়ীর দিকে। ধীরে ধীরে এগুতে থাকে নৌকা সামনে। এক সময় নৌকা অদৃশ্য হয়ে যায় বাড়ীর সবার দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে।
নৌকা এবার প্রবেশ করে মুল জল সীমায়। খোলা প্রান্তরের বাতাস বাড়িয়ে দেয় নৌকার গতি। সাথে পাল্লা দিয়ে নাইওরীর মনে ও বাড়তে থাকে উত্তাল টেউয়ের তরঙ্গ। শৈশব আর কৈশোরের হাজারো স্মৃতি একের পর এক ভিড় করে তার স্মৃতির সেলুলয়েডে। আনমনা হয়ে যান কিশোরী বধূ। নৌকার ভিতর বসে উদাস দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকেন সামনের বিশাল উত্তাল জলরাশি আর দিগন্তের দিকে।
বাউল উকিল মুন্সীর লেখা শিল্পী বারী সিদ্দিকীর কন্ঠে গীত প্রয়াত চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চলচ্চিত্র “শ্রাবণ মেঘের দিনের” এই গানটিতে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বর্ণিত হয়েছে নাইওরীর তীব্র আকাংখা, মনের দুঃখ, কষ্ট আর বেদনার দৃশ্যপট।
“আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে
পুবালী বাতাসে
বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি
আমার নি কেউ আসে রে।
যেদিন হইতে নয়া পানি
আইলো বাড়ির ঘাটে
সখি রে
অভাগিনীর মনে কত
শত কথা ওঠে রে।
গাঙে দিয়া যায় রে কত
নায়-নাইওরির নৌকা
সখি রে
মায়ে-ঝিয়ে বইনে-বইনে
হইতেছে যে দেখা রে।
আমি যে ছিলাম গো সখি
বাপের গলার ফাঁস
সখি রে
আমারে যে দিয়া গেল
সীতা-বনবাসরে।
আমারে নিল না নাইওর
পানি থাকতে তাজা
সখি রে
দিনের পথ আধলে যাইতাম
রাস্তা হইত সোজা রে।
কত জনায় যায় রে নাইওর
এই না আষাঢ় মাসে
সখি রে
উকিল মুন্সির হইবে নাইওর
কার্তিক মাসের শেষে রে।”
স্বপ্নের মত দিন গুলো সবার কেটে যায় খুব দ্রুত। বিষন্ন মনে আবার সবাই ফিরে আসেন বাড়ীতে। নৌকার ভিতর একাকী বসে থাকা নাইওরীর মন তখন দুঃখের এক বিশাল মহাসমুদ্র। যেই সমুদ্রে এখন শুধুই আছড়ে পড়ছে বড় বড় সব উত্তাল ঢেউ।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
Md. Aowrangazeb Chowdhury.
১১ জুন ২০২১।
Send private message to author



