-আপনার কি মিসক্যারেজের হিস্ট্রি আছে?
আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর জন্য আমাকে টেবিলে শুইয়ে দিয়ে শহরের নামকরা ডাক্তার মনিটরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে ভরাট কন্ঠে প্রশ্নটি করলেন।
আমি থরথর কন্ঠে বলি, ‘হ্যাঁ ডাক্তার সাহেব, আরো দু’বার মিসক্যারেজ হয়েছে’।
উত্তরটা দিয়ে আমার মনের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। গলাটা শুকিয়ে যায়। ডাক্তার কেনো আমাকে এই প্রশ্নটি করলেন?
তার মানে কি আবারও মিসক্যারেজ! এটার যে কতো জ্বালা, কতো যে মানসিক যন্ত্রণা, তা বলে বুঝানোর মতো ভাষা আমার নেই।
প্রথমবার ‘কি থেকে কি হয়ে গেল’ আমি কিছু বুঝে উঠতেই পারিনি। অর্ণব রাতে আল্ট্রাসনোগ্রামের রিপোর্ট নিয়ে আমার সামনে এসে মন বেজার করে বললো ‘সব শেষ’। আমার পা দুটা তখন তরতর করে কাঁপতে শুরু করে। প্রতিটা মেয়েই মা হওয়ার স্বপ্ন আজন্ম লালন করে থাকে। সেই স্বপ্নে বাঁধা পড়লে হৃদয়টা কষ্টে-জ্বালায় তছনছ হয়ে যায়।
সেই দিন থেকে একটা সপ্তাহ আমি কেমন করে কাটিয়েছি তা শুধু অর্ণবই ভালো বলতে পারে। আস্তে আস্তে আমি স্বাভাবিক হই। আমরা নিজেকে এ বলে সান্ত্বনা দেই যে, ‘যে যাবার, সে যাবেই’। আমরা আমাদের দু-স্মৃতি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। শহরের একজন বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলোজিস্টের শরণাপন্ন হলে তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ে মোটেই টেনশন করবেন না। অনেক কারণে এমন হতে পারে, তবে এই সময়টাতে জার্নি এড়িয়ে চলুন, যতটুকু পারেন সাবধানে থাকবেন। মাস ছয়েক পর আবার কনসিভ করুন, আশাকরি সমস্যা হবে না’।
অর্ণব একদিন বললো- ‘ চাকরির জন্য যেহেতু তোমার জার্নি করতে হয়, তাই তুমি এটা ছেড়ে দাও’।
আমার মাথায় পুরো আকাশটা যেন ভেঙ্গে পড়ল । এই চাকরির জন্য কত খেটেছি! আর আজ কিনা…!
যাই হোক, আমাদের অনাগত সন্তানের কথা ভেবে আমি এই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে দেরি করিনি। চাকরিটা ছেড়ে দিই।
কিন্তু যখন দ্বিতীয়বার কনসিভ করি তখনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। আমি তখন বিমর্ষ হয়ে তিনদিন হাসপাতালে ছিলাম। তখন মনে হলো, এমন হতাশা-অপ্রাপ্তির জীবন রেখে লাভ কী? তারচেয়ে বরং মরে যাওয়াই শ্রেয়। পরিবারের সবার কথায় চাকরিটা ছাড়লাম, তাতেও লাভ হলো না। বিধাতা আমার প্রতি এতটাই বিমুখ! এতোটাই অপ্রসন্ন! যখন একা থাকি তখন ডুকরে কেঁদে উঠি। জীবনটা যেন পানসে হয়ে গেছে আমার। অর্ণব রাত করে বাসায় ফেরে, দেখলাম সে অনেকটাই স্বাভাবিক, নির্ভার ! কিন্তু আমি দিনদিন যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি।
পাশের বাসার ভাবি এই তিন বছরে দুইটা বাচ্চা নিয়েছেন। আমার চোখের সামনে বাচ্চাগুলো বেড়ে উঠছে। তিনি আমাদের বাসায় আসলেই ‘এটা করেন, ঐ টা করেন’ উপদেশ দেন। আমার ভেতরটা তখন আগুনে পোড়ে যায়। লোকসমাজে যেতে ইচ্ছে করে না। আমার কাছে মনে হয় রিলেটিভরা যেন গায়ে পড়ে পরামর্শ দিচ্ছে। তাই বাইরে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।
*
ডাক্তার মনিটরে স্থিরদৃষ্টি রেখে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। আমাকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করছেন। আমি বলি, কোনো সমস্যা ডাক্তার সাহেব ?
‘না, তেমন কিছু না। এই মুহূর্তে বেবিটার কার্ডিয়াক এক্টভিটিজ পাচ্ছি না।’
কথাটা শুনে মনে হল আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। তার মানে আবারো। তৃতীয় বার! ওহ গড আমি আর নিতে পারছি না। এসি রুমে থেকেও আমার শরীর ঘামতে শুরু করলো। আমি ডাক্তারকে বললাম, ‘প্লীজ ডক্টর, একটু ভালভাবে দেখুন। এবার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো না’।
অর্ণব রাতে রিপোর্ট নিয়ে এলো। ইংরেজীতে স্পষ্ট করে লিখা ‘About eight weeks of pregnancy with absent Cardiac activitiy’.
আমার পৃথিবীটা ধূসর হতে থাকে। যে দিকে তাকাই শুধু নিকষ কালো অাঁধার। আয়নাতে আমার চেহারা বীভৎস লাগে। রাতে ছোট শিশুদের কোলাহলধ্বনি কানে বাজে। জানালা খুললে হিজল গাছের ডালে শালিক পাখির বাচ্চাদের কিচিরমিচির শোনা যায়। আমার চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। এই দেয়াল ভেদ করতে না পারি আমি, না পারে আমার আত্মীয়স্বজন। আমি যেন আমিতেই বন্দি। রুমে একা থাকি, একাএকা কথা বলি। সময়স্রোত বয়ে যাচ্ছে, বয়সের খাতা ভারী হচ্ছে।
একরাতে আমি অর্ণবকে বলি, ‘তুমি একটা বিয়ে করো অর্ণব’।
সে উত্তেজিত হয়ে বলে,’তুমি পাগল হইছো!’
আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। এই সমাজের একটা মানুষেরও আমাদের ‘কান্না’ দেখার সময় নেই, আমাদের কষ্ট অনুভব করার সামর্থ্য নেই।
“দুই”
যেহেতু পরপর তিনবার মিসক্যারেজ হয়েছে তাই অনেক ভেবে চিন্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটা দত্তক নিবো। একটা মেয়ে, ফুটফুটে মেয়ে। দেবশিশুর মতো গড়ে তুলবো তাকে। আদরযত্ন, ভালোবাসায় কমতি থাকবে না।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার দু’ সপ্তাহের মাথায় অর্ণব পেয়েও যায় একটা ছ’মাসের মেয়েশিশুর সন্ধান। তাকে ঘরে তোলার আনন্দে আমরা উত্তেজিত, পুলকিত। এক সকালে গিয়ে বেশ ঘটা করে তাকে আমরা নিয়ে আসি। নাম রাখি তার ‘ঐন্দ্রিলা’।
ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে আমাদের নতুন জগত সৃষ্টি হয়। আমাদের চোখের সামনে সে দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে। আমি হিসেব করি- একবছর, দেড় বছর, দুবছর…। ঐন্দ্রিলা হৃদয় উজার করে আমাকে ‘মা’ বলে ডাকে, অর্ণবকে ‘বাবা’ বলে ডাকে। আমরা এক স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করতে থাকি। আমাদের চার চোখে বর্ণালী আলোকচ্ছটা খেলা করে যেন। এ ভুবন আমাদের কাছে হয়ে ওঠে রঙিন, বড় মায়াময়।
ঐন্দ্রিলা যেমন মায়াবতী তেমনি প্রখর মেধাবী। সারাক্ষণ পড়াশুনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আমি যেমনটা হতে চেয়েছিলাম, যেমন স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার প্রতিচ্ছবি যেন আমি ঐন্দ্রিলার মধ্যে পেতে থাকি। আমার অবচেতন মনে কখনো ভাবিনি সে আমার দত্তক মেয়ে। সে আমাকে আদরযত্ন করে, ভালোবাসা দিয়ে,বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমার হৃদয়ের পুরোটা দখল করে নেয়।
ঐন্দ্রিলা যখন তার এমবিবিএস ডিগ্রীটা অর্জন করলো তখন তাকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলাম আমরা। এখন সুপাত্রস্থ করা উচিত। তার বিয়ের বিষয়টা মাথায় আসতেই থমকে উঠি। সেদিনের এইটুকু মেয়ে আজ বিয়ের পাত্রী। তাকে আমাদের সংসারে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ আমরা তাকে নিয়ে কতটা মত্ত ছিলাম; তা ভাবতে গেলেই চোখের কোণায় অজান্তে নোনা জল জমাট বাঁধে। আমার দু’চোখ ঝাঁপসা হতে থাকে। আমি সাঁতার কাটি ফেলে আসা সেই দিনগুলোর উতাল-পাতাল ঢেউয়ের মাঝে। এসব স্মৃতি রোমন্থন করতে কখনো দু’ঠোটের কোণায় হাসি খেলা করে আবার কখনো বা দু’চোখ বেয়ে নোনা জল বইতে থাকে।
আজ ঐন্দ্রিলার বিয়ে। আজকের এই দিনে আমাদের দুঃসময়-সুসময়ের কথা তাই মনে পড়ছে খুব। বাড়ি জুড়ে শত মানুষের সমাগম। আমি আর অর্ণব অতিথিদের আপ্যায়ন করতে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করি। কতশত কাজের ব্যস্ততা। এরই মধ্যে হৃদয়টা মাঝেমাঝে কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। আহ! মেয়েটা আজ আমাকে ফেলে চলে যাবে। তার ঘরটা শূন্য হয়ে যাবে, হাহাকার করবে। তার ব্যবহৃত আসবাবপত্র আমাদের দিকে করুণ চোখে তাকাবে। আমি আনমনে ভাবি, ঐন্দ্রিলাবিহীন জীবনের এই কঠিন ভার আমি কিভাবে সইবো !
এসব ভাবনার মধ্যে ‘মা’ ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি অয়ন আমাকে ডাকছে। ও বলছে, ‘তুমি এখানে কী করছো মা, একটুপর দিদি বিদায় নিবে, ঐদিকে দিদির শ্বশুরবাড়ির লোকজন তোমাকে হন্য হয়ে খুঁজছে, আর তুমি এদিকে একা একা কাঁদছো’ !
আমি শাড়ির আচল দিয়ে চোখ মুছে বলি, ’চল বাবা চল’। অয়ন আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, দিদিকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো মা !
অয়ন কাঁদে, আমি কাঁদি, অর্ণব কাঁদে, কাঁদে ঐন্দ্রিলা।
সত্যি বলতে কি, কারো জীবন কখনো থেমে থাকে না। জীবন বহতা নদীর মতো। কারো বা স্বচ্ছ জলের মত চকচকে উজ্জল, আবার কারো ঘোলাটে, ঝাঁপসা। কারো কপালে হয়তো সৃষ্টিকর্তা আজন্মই ভোগ-বিলাস লিখে রেখেছেন, আবার কাউকে হয়তো কষ্টের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ কখন কার জীবনে কী নেমে আসে তা অগ্রীম বলা কঠিন। যেখানে আমরা মা-বাবা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছেড়েই দিয়েছিলাম ঠিক তখনই ঐন্দ্রিলার বয়স যখন তিন বছর আমি আবারও কনসিভ করি। আমার কোল আলো করে আসে নয়নের মণি, আমার আরাধ্য, ‘অয়ন’!
আমি তখন হারাতে হারাতে ফিরে পাই মাতৃত্বের অমিয় স্বাদ !
পার্থ তালুকদার
Partha Talukdar
Send private message to author



