যাকে নিয়ে রাহীর এই হাল সে হল শান্ত। ভীষণ দুষ্টু। সারাক্ষণ আড্ডাবাজি, হৈ হোল্লোড় নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের কড়া শাসনের বেড়াজালে বড় হলেও পরিবারের সবার ছোট হওয়ার কারনে ভাইবোনদের সবার আশকারা পেত। তিনবোন দুভাইয়ের মধ্যে শান্ত সবার ছোট। তাই মায়ের নজরদারি এড়াতে বোনরা তাকে অনেক সাহায্য করত। যার ফরস্বরূপ পড়াশোনার চেয়ে অন্যান্য বিষয়ে তার আগ্রহ বেশী।
সারাক্ষণ বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকা শান্ত ভার্সিটির অরিয়েন্টেশনে যখন রাহীকে দেখে তার বেশ ভাল লাগে। কেন যেন খুব দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করছিল তাই এক দৃষ্টিতে রাহীর দিকে তাকিয়ে ছিল। শান্ত অবশ্য রাহীর নাম বা কোন ডিপার্টমেন্ট কিছুই জানে না। সে কেবল মজা করার জন্য এমনটা করছিল।
রাহীকে যখন আড়চোখে তার দিকে তাকাতে দেখল তখন তার মনে দুষ্টুমি বুদ্ধি এল। সে অপলক রাহীর দিকে চেয়ে রইল। শান্ত প্রথমে রাহীর বিব্রত হওয়ায় যতটা মজা পেয়েছিল পরে রাহীর আড়চোখে তাকানো দেখে রাহীর প্রতি কিঞ্চিত আগ্রহ বোধ করে। সে তখন রাহীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা শুরু করে। একটা হলুদ রঙয়ের জামা পরে এসেছে। চুলগুলো এলোমেলো করে উঁচু করে ঝুঁটি বাঁধা। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কোন মেয়ে এমন বাচ্চাদের মত ঝুঁটি বাঁধতে পারে এমনটা শান্তর ধারনা ছিল না।
তার বড় বোনদের সবসময় দেখেছে বেশ পরিপাটি হয়ে ভার্সিটি যেতে। আরো অনেক মেয়ে আছে এই অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে কিন্তু এই মেয়েটি একেবারে অন্যরকম। দেখতে শুনতে ভালই। একটু পরিপাটি করে চললে আরও ভাল লাগবে। এখনো বাচ্চাবাচ্চা একটা ভাব আছে মেয়েটার মাঝে। সব মিলিয়ে খারাপ নয়।
শান্ত এইসব চিন্তা করছিল আর রাহীর দিকে তাকিয়ে ছিল। আর রাহীও বেশ আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছিল শান্তর দিকে। ব্যাপারটা দারুনভাবে উপভোগ করছিল শান্ত। ভার্সিটির প্রথম দিনেই এমন একটা কান্ড সামনে আরও কত কিছু অপেক্ষা করে আছে এই ভেবে মনে মনে দারুন আনন্দিত হচ্ছিল।
………………
“একটা ছেলে মনের আঙ্গিনাতে ধীর পায়েতে এক্কা-দোক্কা খেলে
বন পাহাড়ি ঝর্না খুঁজে, বৃষ্টি জলে একলা ভিজে
সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে...............”অডিটোরিয়ামের মঞ্চ হতে ভেসে আসছে গানটি। রাহী অসাধারণ গাইছে। বরাবরই গান বেশ ভাল করে রাহী। ছোটবেলা বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছে রাহী গানের জন্য। গান শুরু হওয়ার সাথে সাথে অডিটোরিয়ামের চারিদিকে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। অদ্ভুত আকর্ষন যেন রয়েছে রাহীর কন্ঠে, সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনল। গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে করতালিতে সমস্ত অডিটোরিয়াম যেন ফেটে পড়ল।
কেবল মন্ত্র মুগ্ধের মত চেয়ে রইল শান্ত। হঠাৎ করে ওর কি যেন হয়ে গেল কোন অনুভূতি যেন কাজ করছিল না। ও এতদিন রাহী সম্পর্কে যা যা ধারনা করেছিল তার চেয়েও যেন কয়েক হাজার গুন উপর দিয়ে গেল। দুজনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা হওয়ার কারনে অরিয়েন্টেশনের পর থেকে ওদের খুব একটা দেখা হত না। মাঝে মাঝে দেখা হলে সেই চোখে চোখে দৃষ্টি বিনিময় চলত। একজন সরাসরি তাকিয়ে থাকত আর একজন আড়চোখে।
প্রায় দুমাস পর আজ নবীন বরন হচ্ছে। শান্তর খুব একটা কেন জানি আগ্রহ হয়নি রাহীর ব্যাপারে। এমনিতে শান্তর প্রচুর বন্ধু বান্ধব। নিজের বন্ধুবাৎসল্য স্বভাব আর সুদর্শনতার কারনে মোটামুটি নিজের ডিপার্টমেন্ট ছাড়িয়ে অন্যান্য ডিপার্টমেন্টেও পরিচিতি লাভ করেছে শান্ত। সেখানে রাহীকে তার নিজের ডিপার্টমেন্টের বাইরে খুব একটা কেউ চিনে না। তাই দেখা হলেও শান্ত আগ বারিয়ে কখনও কথা বলেনি রাহীর সাথে। তবে এ ওর কাছ থেকে শুনে বুঝেছে ওর নাম রাহী।
কিন্তু শান্ত রাহীর পুরো নাম জানত না। রাহীর পারফর্মেন্সের আগে ঘোষনায় রাহীর পুরো নাম বললে তাই শান্ত বুঝতে পারেনি। আর তাছাড়া অনুষ্ঠান প্রায় শেষ এখন কে না কে গান গাইবে তাও আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই গান শোনা এ যেন শান্তর সাথে একেবারেই যায় না। কিন্তু গান শুরু হওয়া মাত্র সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতে থাকল।
একটা গান এমন ভাবে মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারে রাহীর জানা ছিল না। নবীনবরন অনুষ্ঠানে গান করার পর তার বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা বাড়তে লাগল। এতদিন ডিপার্টমেন্টের বাইরে তার খুব একটা নতুন বন্ধু হয়নি এখন অনেকেই এসে নিজে থেকে কথা বলে
-আরে তুমি রাহী না? সেই একটা ছেলে………! কেমন আছো? ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাহী অবশ্য ব্যাপারটা ভালই উপভোগ করছে। এমনি একদিন ওরিয়েন্টেশনের সেই ছেলেটা এসে কথা বলল
-কেমন আছ?
রাহী বেশ অবাক হয়। এতদিন ধরে ছেলেটাকে দেখছে কিন্তু কখনও কথা হয়নি। রাহী অবশ্য নিজে থেকে কখনও অপরিচিত কারো সাথে তেমন কথা বলে না। এতদিন কেবল রাহীর দিকে তাকিয়ে হাসি দিত আজ কথা বলতে দেখে বেশ অবাক হল রাহী। তারপরও বুঝতে না দিয়ে বলল
-ভালো। আপনি?
এইকথায় শান্ত বেশ অবাক হয়ে বলে
-আপনি টাপনি রাখ। আমাদের ডিপার্টমেন্ট আলাদা হলেও আমরা কিন্তু ব্যাচম্যাট। তুমি করে বল। আমিও ভালো আছি।
মানুষকে কাছে টেনে নেবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে শান্তর। রাহীকে চুপ করে থাকতে দেখে নিজে থেকে আবার বলল
-আমি শান্ত। তোমার নাম রাহী আমি জানি সেটা। তুমি অবশ্য আমার নাম জান কিনা আমি সেটা জানি না।
রাহী এবার একটু হেসে বলল
-না আমি জানতাম না এখন জানলাম।
শান্ত মনে মনে ভাবে না মেয়েটা স্মার্ট আছে। অন্তত ওর এলো চুলের মত না। শান্ত বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল রাহীকে বেশ পরিপাটী পোশাক পরা, উগ্র নয়। বেশ ভালো লাগে শান্তর রাহীর এই চালচলন। রাহী চলে যাবার উপক্রম হলেই শান্ত বলে
-বাই দ্যা ওয়ে তুমি কিন্তু বেশ ভালো গান কর। সেদিন পুরো অডিটোরিয়াম তো ফাটিয়ে দিয়েছ।
শান্তর কথায় বেশ লজ্জা পায় রাহী। একটু বাড়াবাড়ি রকমের কি বলছে না শান্ত? তারপরও শান্তকে ধন্যবাদ বলে রাহী চলে যায়।
………………..
বেশ কিছুদিন ধরে রাহী লক্ষ্য করছে শান্ত বেশ যেচে এসে কথা বলছে ওর সাথে। প্রথম প্রথম একটু অবাক হয়েছে রাহী। কারন ক্লাস শুরু হয়েছে দুইমাস, এরমাঝে প্রায় দেখা হলেও শান্ত কখনও ওর সাথে কথা বলেনি। অথচ ওদের অনেক কমন ফ্রেন্ড আছে। কেবল দৃষ্টি বিনিময় করে হাসি দেয়া ছাড়া কখনও কোন আগ্রহ শান্তর মাঝে রাহী দেখেনি। এমনকি কখনও নাম জানতে চাওয়ার বাহানায়ও শান্ত ওর সাথে কথা বলেনি। তাই এতদিন পর যখন নিজ থেকে এসে কথা বলল তখন বেশ অবাক না হয়ে পারল না।
রাহী কখনও কোন বিষয় খুব গভীর ভাবে চিন্তা করে না। শান্তর ব্যাপারটা নিয়েও আর তেমন চিন্তা করল না। দেখা হলে টুকটাক কথা চলতে থাকল। কিন্তু উপরে একজন বসে অন্য কিছু যে পরিকল্পনা করছিলেন সেটা দুজনের কেউ বিন্দুমাত্র টের পায়নি।
শুরু থেকেই শান্তর প্রতি দুর্বলতা কাজ করছিল রাহীর। প্রথম দেখায় বেশ ভালো লাগে শান্তকে, কেন সেটা রাহী নিজেও জানে না। হয়ত শান্তর সেই দুষ্টুমি ভরা হাসিই যত নষ্টের মূল। রাহীর মাঝে মাঝে মনে হয় এই হাসি দেখার জন্য সে হাজার বার জীবন দিতে পারবে। শান্তর নিজ থেকে এসে কথা বলা, দুষ্টুমি করা রাহীকে ক্রমশ যেন চোরাবালিতে আটকে ফেলছিল। সে যে শান্তর দিকে ঝুঁকতে থাকে এটা রাহী টের পেলেও শান্তর কাছে এই ব্যাপারটা একেবারেই অজানা।
রাহী নিজের মাঝে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করছে বেশ কিছুদিন ধরে। সে কেন যেন শান্তর সাথে আগের মত স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছে না। শান্তকে দেখা মাত্রই তার হাত পা সব কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। একদিন রিয়া তাকে বেশ করে ধরল
-রাহী তোর কি হয়েছে বলত?
রাহীর প্রথমটায় বুঝতে না পেরে বলল
-কি ব্যাপারে কি হয়েছে আমার?
-এই যে শান্তর ব্যাপারটা?
শান্তর নাম কানে আসতেই রাহী যেন লজ্জায় লাল নীল বর্ন ধারন করতে লাগল। ওর এই পরিবর্তন রিয়ার চোখ এড়ায় না। তারপরও এইব্যাপারে সে কিছুই বলল না। রিয়া আর রাহী ছোটবেলা থেকেই বন্ধু। রাহীকে রিয়ার চাইতে ভাল কেউ বোঝে না। রিয়া বেশ কয়দিন ধরে রাহীর মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। ওর এই পরিবর্তনের কারন যে শান্ত এই ব্যাপারে রিয়ার কোন সন্দেহ নেই। রিয়া অপেক্ষা করছিল রাহী নিজ থেকে কিছু বলে কিনা ওকে। কিন্তু ব্যাপারটা এখন এমন ভাবে ওর চোখে পরছে আর জিজ্ঞেস না করে পারল না।
রাহী কে যতটুকু চিনে রিয়া তাতে সে এটা জানে রাহী সম্পর্কের ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। আর শান্তকে দেখে যতটুকু ও বুঝতে পেরেছে শান্ত ঠিক রাহীর উল্টো। রাহী যদি একবার সত্যিকারে জড়িয়ে যায় এই সম্পর্কে তাহলে এখান থেকে বের করে আনা অনেক কষ্টকর হবে। আর শান্তকে কেন জানি রিয়ার কখনও খুব একটা পছন্দ নয়। অন্তত রাহীর জন্যতো একেবারেই নয়।
রাহীকে চুপ করে থাকতে দেখে রিয়া এবার একটু চেপে ধরে
-শান্তর ব্যাপারটা রাহী। আমার মনে হয় তুই বুঝতে পারছিস আমি কি বলতে চাচ্ছি।
-শান্তর সাথে তো আমার কোন সম্পর্কে নেই।
চলবে…………………
তানিয়া আবেদিন (Tania Abedin)
Send private message to author



