৬০ দশকের কথা। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান, তথা আজকের বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন একেবারেই সেকেলে ধরনের। বড় বড় শহর ছাড়া আর কোথাও টেলিফোন যোগাযোগ নেই। বেশীর ভাগ টেলিফোনে কথা হতো এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। ছোটখাট শহর গুলোতে প্রথমে ডায়াল করে এক্সচেঞ্জকে বলতে হতো আপনি কোন নাম্বারে কথা বলতে চান। এক্সচেঞ্জ থেকে তখন আপনাকে কাঙ্খিত নাম্বারে কানেকশন দেয়া হতো। প্রায় ক্ষেত্রেই এটা ছিল অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ।
বিপরীতে বাংলাদেশের পোস্ট অফিস গুলো তখন বেশ জমজমাট। পোস্টকার্ড আর ইনভেলাপের মাধ্যমে পত্রালাপ ছিলো যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। পোস্টকার্ডের দাম ছিল ৫ পয়সা আর ইনভেলাপের দাম ছিল ১০ পয়সা। ডাক ঘরের মাধ্যমে পোস্ট কার্ড আর ইনভেলাপে লিখা চিঠি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌছতে গড়ে প্রায় দশ থেকে বারো দিন সময় লেগে যেতো। কোন কোন ক্ষেত্রে তার চাইতে ও বেশী সময় লাগতো।
পোস্টকার্ড আর এনভেলাপের বাইরে ডাক বিভাগের আরেকটি সেবা ছিল “মানি অর্ডার।” ডাক ঘরের মাধ্যমে কেউ কাউকে টাকা পাঠালে বিনা মূল্যে প্রাপ্ত মানি অর্ডার ফরম ব্যবহার করা যেতো। মানি অর্ডার ফরমের নীচে ইঞ্চি দেড়েকের মত খালি সাদা জায়গা থাকতো যেখানে প্রেরক কিছু কথাবার্তা লিখতে পারতেন। কিন্তু এটা ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হতো না, কারণ এই সুবিধা পাওয়ার জন্য আপনাকে কোথা ও টাকা পাঠাতে হতো।
ডাক হরকরা (যারা বড় বড় পোস্ট অফিস থেকে চিঠির বস্তা কাঁধে বয়ে নিয়ে বিভিন্ন দুরবর্তী আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ছোট পোস্ট অফিসে পৌঁছে দিতেন। আবার সেই বস্তায় পুরে ফিরতি চিঠি গুলো বয়ে নিয়ে আসতেন বড় পোস্ট অফিসে)।
কারো অসুখ বিসুখ হলে, কেউ মৃত্যু শয্যায় থাকলে, কারো মৃত্যুতে বা অন্য যে কোন ইমারজেন্সিতে বিভিন্ন জনকে এই সব বিষয়ে খবর পাঠানোর তেমন কোন নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না তখন। অবস্থান কাছাকাছি হলে লোক পাঠিয়ে দিয়ে এই সব খবর দেয়া হতো। কিন্তু বিপত্তি ছিলো দুরে থাকা নিকট জনদের কাছে এই সব খবর পৌছানো। সময় স্বল্পতার কারনে পোস্টকার্ড আর এনভেলাপের মাধ্যমে দুরে এই সমস্ত খবর পাঠানো হতো না।
বিকল্প ব্যবস্থা ছিলো টেলিগ্রাম। সাধারণত বড় বড় পোস্ট অফিসে টেলিগ্রামের ব্যবস্থা থাকতো। যতটুকু মনে পড়ে এমন কি থানা পর্যায়ের সব পোস্ট অফিস গুলোতে ও টেলিগ্রামের ব্যবস্থা ছিল না।
বড় বড় পোস্ট অফিস গুলোতে লোহার তৈরী এক ধরনের ছোট্ট একটি মেশিন ছিল, যেখানে প্রায় সময়েই খট খট আওয়াজ করতো। এখন ঠিক মনে পড়ছে না টেলিগ্রাম আদান প্রদানের জন্য এই মেশিনটিই ব্যবহার করা হতো কিনা? তবে যা মনে আছে সেটা হল মেশিনটাকে আমরা “টরে টক্কা” মেশিন বলতাম। কেন এই নামকরন হয়েছিল তা ও আমাদের জানা নেই।
প্রায় সব ক্ষেত্রেই টেলিগ্রামের লিখা গুলো ছিলো একই ধরনের। এই গুলো লিখা থাকতো ইংরেজীতে। যেই লিখাটি সবচাইতে কমন ছিলো তা এই রকম।
“Wife/Father/Mother/Son: Seriously ill/Died.
Come sharp.”
এই তথ্য গুলো থাকতো হাতে লিখা। দুঃখ জনক বিষয় হলো কোন কোন ক্ষেত্রে এই লিখাটা থাকতো খুবই অস্পষ্ট। ফলত বোঝা কঠিন হয়ে যেতো এর বিষয়বস্তু।
যাই হোক টেলিগ্রাম তো এলো। সেই সময় কারো কাছে এই রকম কোন টেলিগ্রাম আসলে আশেপাশে তা খবর হয়ে যেতো। কারণ বেশীর ভাগ টেলিগ্রামই আসতো নানান ধরনের দুঃসংবাদ নিয়ে। “অমুকের টেলিগ্রাম আইছে, অমুকের টেলিগ্রাম আইছে” এই সংবাদ খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তো চারিদিকে।
কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বাস্তবতা যা ছিল তা এইরকম,
“ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেলো।”
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
Md. Aowrangazeb Chowdhury
১৫ জুন ২০২১।




