“লাগবে লেইস ফিতা চুড়ি, লেইস ফিতা চুড়ি।”
বেশী দিন আগের কথা নয় যখন বাংলাদেশে মহিলাদের বিশেষত গ্রামীণ মহিলাদের মার্কেটে গিয়ে বাজার করার দৃশ্য সচরাচর দেখা যেতো না। খুব অল্প পরিমাণে যে সব মহিলাদের মার্কেটে দেখা যেত তাদের সাথে ও প্রায় সব ক্ষেত্রেই এক বা একাধিক পুরুষ সদস্য থাকতেন। শুধুমাত্র একাকী বা দল বেঁধে মহিলাদের মার্কেটে গিয়ে নিজের জিনিস পত্র কেনাকাটা করার চিত্র তখন সচরাচর দেখা যেতো না।
এই লেইস ফিতা আর চুড়ি ফেরিওয়ালারা তাদের সওদা নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াতেন গ্রামাঞ্চলের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সজোরে ডাক দিতেন এই বলে “লেইস ফিতা চুড়ি, এই লাগবে লেইস ফিতা চুড়ি, আছে লেইস ফিতা চুড়ি।”
তাদের এই ডাক শুনে গ্রামের মহিলারা জড়ো হতেন এক জায়গায়, ঘিরে দাঁড়াতেন ফেরিওয়ালার চারিদিকে। ছোট, বড়, বৃদ্ধ, অল্প বয়সী, গ্রামের বৌয়েরা, মায়েরা বয়স নির্বিশেষে এইসব ফেরিওয়ালার কাছে ভীড় করতেন তাঁদের বিভিন্ন দরকারী সামগ্রী কেনা কাটার জন্য। যদিও তারা ডাক দিতো “লেইস ফিতা চুড়ি” বলে বাস্তবে তাদের কাছে আরো অনেক জিনিস থাকতো। পাউডার, স্নো, চুলের ফিতা, চুলের ক্লিপ, নেইল পলিশ, গলার চেইন, আলতা, পায়ের মল, কপালের টিপ, নাকের ফুল, কানের দুল, লীপ স্টিক সহ মহিলাদের ব্যবহৃত আরো নানান প্রয়োজনীয় আর প্রসাধনী সামগ্রী থাকতো এদের কাছে। কোন কোন ফেরিওয়ালার কাছে আবার মহিলাদের পরিধেয় বস্ত্র ও পাওয়া যেতো। কখনো কখনো এরা আবার একসাথে দুজন থাকতো। একজনের কাছে থাকতো গহনা আর প্রসাধন জাতীয় সামগ্রী। আর অপরজনের কাছে থাকতো কাপড় জাতীয় সামগ্রী।
সাধারণত এই সমস্ত ফেরিওয়ালাদের কাছে কাঁচে বাঁধানো একটি কাঠের বাক্স থাকতো। বাইরে থেকে কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখা যেত বাক্সের ভিতরে কি কি জিনিস আছে। এই বাক্সে ফেরিওয়ালারা কানের দুল, নাকের ফুল, চুড়ি, ফিতা, নেকলেস এই জাতীয় ছোট খাটো জিনিস গুলো সাজিয়ে রাখতেন। বাইরে থেকে দেখে মহিলারা অনুরোধ করতেন বিভিন্ন দ্রব্যাদি দেখাতে। তখন বাক্স থেকে ফেরিওয়ালারা এগুলো বের করে আনতো আর পছন্দ হলে মহিলারা দাম দর করে এগুলো কিনে নিতেন।
কাঁচ দিয়ে বাঁধানো কাঠের বাক্সের বাইরে ও তাদের কাঁধে কাপড় দিয়ে বাঁধা বড় একটি পোটলা থাকতো যেখানে শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট সহ মহিলাদের ব্যবহার্য অন্যান্য কাপড় সামগ্রী থাকতো। সারা বছর জুড়েই মহিলারা এদের কাছ থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে ব্যবহার করতেন। এই সময়ে এই সমস্ত ফেরিওয়ালারা গ্রামীণ জনপদের মহিলাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
সত্যিকার অর্থে তখনকার সময়ে এই সমস্ত ফেরিওয়ালার কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনেই মহিলাদের চাহিদা মোটামুটি পূরণ হয়ে যেত। সাধারণত ঈদের সময় লেইস ফিতা চুড়ি ওয়ালাদের এই ব্যবসা ছিল খুবই জমজমাট। এই সময়টায় বাড়ীতে বসেই খানিকক্ষণ পর পর শোনা যেত এই সমস্ত ফেরিওয়ালাদের ডাক।
ঈদের মৌসুমে অনেক সময় কিছু কিছু মৌসুমী ফেরিওয়ালা ও দেখা যেত। এই সময় যেহেতু বেচাকেনা ভালো ছিল সেজন্য এই সময়টাতে অল্প কিছুদিনের জন্য কিছু লোক এই সমস্ত সামগ্রী ফেরি করে বিক্রি করতো।
গ্রামীণ জনপদে ফেরি করে বেড়ানো এই সমস্ত ফেরিওয়ালাদের বিক্রিত সামগ্রী মানের দিক থেকে খারাপ ছিল বলা যাবেনা না। এই সমস্ত জিনিস গুলো তাঁরা অল্প লাভেই বিক্রি করতেন। বলা যায় মোটামুটি মানসম্পন্ন এই সমস্ত সামগ্রী সাশ্রয়ী মূল্যে এদের কাছ থেকে কেনা যেত। সেই কারণে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় সবখানেই এই সমস্ত লেইস ফিতা চুড়িওয়ালারা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
সময় বদলেছে। বদলেছে আমাদের কেনাকাটার অভ্যাস। আজকাল গ্রাম পর্যায়ে ও এই সমস্ত সামগ্রী কেনার সুন্দর সুন্দর আর মানসম্মত দোকান রয়েছে। আর এর সাথে সাথে হারিয়ে গেছে আমাদের অনেক দিনের পুরোনো ঐতিহ্য গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বেড়ানো এই সব লেইচ ফিতা চুড়ি ওয়ালারা।
আজকাল আর শোনা যায় না এই ডাক “লেইস ফিতা চুড়ি, লাগবে লেইস ফিতা চুড়ি, এই আছে লেইচ ফিতা চুড়ি। তবে আমাদের কানে এখনো বাজে লেইস ফিতা চুড়ি ওয়ালাদের সেই ডাক।
“লেইস ফিতা চুড়ি, আছে লেইস ফিতা চুড়ি।”
হয়তো আপনাদের অনেকের কানে ও আজো বাজে সেই সুরের প্রতিধ্বনি।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
Md. Aowrangazeb Chowdhury.
১৮ জুন ২০২১।
Send private message to author



