৬০ দশক ছিল আমাদের শৈশব আর কৈশোর। সে সময় বাংলাদেশে শহুরে জনপদ ছিল একেবারেই সীমিত। জনগণের বেশীর ভাগই বাস করতেন গ্রামাঞ্চলে। যে সমস্ত লোকজন শহরে চাকুরী করতেন তাঁদের বেশীর ভাগের পরিবারই তখন থাকতেন গ্রামের বাড়িতে।
রাত যখন আটটা তখন গ্রামাঞ্চলে গভীর রাতের হাতছানি। সাধারণত সন্ধ্যার ঘন্টা দেড় দুয়েকের মধ্যেই গ্রামের লোকজনের রাতের খাবার পর্ব শেষ হয়ে যেত। রাত সাড়ে আটটা নয়টা নাগাদ প্রায় সবাই বিছানায়। কেউ কেউ হয়তো বা নাক ডাকা ও শুরু করে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই।
এ সময়ে ও মায়েরা রান্না ঘরে। বাড়ীর সবার খাবার দাবার শেষ হবার পর নিজের খাবার শেষ করে হাঁড়ি পাতিল, বাসন কোষন ধোয়া মোছা, রান্না ঘর ঝাড় দেয়া আর পরদিন সকালের নাস্তার আয়োজন শেষ করতে ব্যস্ত তখন মায়েরা। তখনকার সময়ে গ্রামাঞ্চলে গৃহকর্মীর প্রচলন তেমন ছিল না। বাড়ীর মায়েরাই মোটামুটি সব কাজ করতেন এক হাতে। বাঁশের বেড়া আর টিন বা ছনের চালা দিয়ে তৈরী রান্না ঘরে শীতের দিনে হু হু করে ঢুকে পড়তো ঠান্ডা বাতাস। সে সময় টাতে কুপি বাতির মৃদু আলোয় অবসন্ন শরীরে ঘুম ঘুম চোখে হয়তো বা কোন কোন মায়েরা দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সেরে নিতেন রান্না ঘরের শেষ কাজ গুলো।
রান্না ঘরে কাজ শেষ করে মায়েরা আসতেন শোবার ঘরে। ইতিমধ্যেই বাড়ীর অনেকেই গভীর ঘুমে। গ্রামীণ জনপদ। নির্জন চারিদিক। সারা দিনের ক্লান্ত আর অবসন্ন শরীর মায়েদের। ঘুমোতে যাবার আগে অজু করে এশার নামাজ আদায়ের জন্য মায়েরা তখন জায়নামাজে। নামাজ শেষ। এবার ঘুমাতে যাবার পালা। একান্নবর্তী পরিবার। সদস্য সংখ্যা অনেক। একই চৌকিতে তাই অনেকের একসাথে শোয়া। খাটের প্রচলন তখনো তেমন শুরু হয়নি গ্রামাঞ্চলে। সন্ধ্যার পর পর ঘুমিয়ে যাওয়া ছোট ছোট বাচ্চারা ইতিমধ্যেই ঘুমের মধ্যে অনেকটা এলো মেলো হয়ে গেছে। বালিশ একদিকে আর বাচ্চারা আরেক দিকে। একেবারে কম বয়সী হয়তো কেউ কেউ প্রস্রাব করে কাঁথা ভিজিয়ে দিয়েছে এরই মধ্যে। এদের কাঁথা বদলিয়ে দিতেন তখন মায়েরা। বালিশ থেকে দূরে সরে যাওয়া বাচ্চাদের আবার টেনে টেনে সোজা করে শুইয়ে দেয়া, একেবারে ছোটদের কাউকে কাউকে জাগিয়ে তুলে প্রস্রাব করিয়ে নেয়া এ কাজ গুলো সেরে হারিকেনের আলো একেবারে কমিয়ে দিয়ে শুতে যেতেন মায়েরা।
কতক্ষনই বা আর শুতে পারতেন তাঁরা? অনেক রাত্রিই অনেক মায়েদের দেখেছি বিনিদ্র কাটাতে। ছোট ছেলে মেয়েদের কারো হয়তো জ্বর, কারো ঠান্ডা কাশি, কারো পাতলা পায়খানা। রাত জেগে জেগে এদের শুশ্রূষা করতেন মায়েরা। নিশুতি রাত। নিস্তব্ধ চারিদিক। বাড়ীর পাশের ঝোপ ঝাড় থেকে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার বিরাম হীন ডাক। সমগ্র লোকালয় ঘুমিয়ে। শিওরে একটি কুপি বাতি জ্বালিয়ে এ সময় কোন কোন মা পরম মমতায় শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ক্রমাগত মাথায় পানি ঢেলে চেষ্টা করছেন জ্বর কমানোর। এ সময় তাদের অনেকের চোখেই পানি। জ্বরে ভুগে ছেলেটা হয়তো কোন কিছু একটা ভালো খাবারের আবদার করেছিল। সেই আবদার হয়তো বাবা মায়ের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয়নি। থেকে থেকেই মায়েদের মানে পড়ে যায় সেই কষ্টের কথা। অজান্তেই ভিজে আসে চোখ। এভাবে কেঁদে কেঁদে চোখের জলেই অনেক বিনিদ্র রজনী পার করে দিতেন মায়েরা।
ক্লান্ত শরীর। সারাদিনের খাটা খাটনি। মাঝে মাঝেই পেয়ে বসে রোগ শোক। তখনকার চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিলোনা। গ্রামাঞ্চলে প্রকৃত অর্থে তখন কোনো চিকিৎসা সুবিধাই নেই তখন। হাতুড়ে ডাক্তার, কবিরাজী, বনাজী, আয়ুর্বেদি এগুলোই ছিল তখনকার গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি। কোন কোন এলাকায় তাবিজ আর পানি পড়ার প্রচলন ও দেখেছি তখন। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মায়েদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য সবাই হাজির হতেন গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছে। এ সমস্ত গ্রামীণ ডাক্তারদের প্রধান চিকিৎসা ছিল লাল শিশিতে দাগ কেটে দেওয়া মিকচার। মাঝে মাঝে দেখতাম মায়েদের চিকিৎসার জন্য সাধনা ঔষধালয়ের কিছু কিছু ঔষধ ও ব্যবহার হতো। এ সমস্ত চিকিৎসায় কতটুকু উপকার হত বোঝার বয়স তখনো হয়নি আমাদের। তবে যতটুকু মনে পড়ে এ গুলোই ছিল তখনকার সময়ে মায়েদের চিকিৎসার প্রধান অবলম্বন।
ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছেন মা। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। আবার কখনো কখনো জোসনার উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত গ্রামীণ জনপদ। নির্জনতা সারা গ্রাম জুড়ে। রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হঠাৎ করে জেগে উঠেন মা। গরমে ছোট ছেলেটার ঘুম আসছেনা, ছটফট করছে, মশারির ফাঁক দিয়ে ঢুকে গেছে কয়েকটি মশা, কামড়াচ্ছে ছোট ছোট বাচ্চাদের। জেগে উঠেছেন মা। হারিকেনের আলোটা খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে মশারির ভিতর বসে বসে মশা মারছেন। এরপর আবার হারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়ে মশারির নীচে ঢুকে হাত পাখা দিয়ে বাচ্চাদের বাতাস করতে করতে ঘুমানোর চেষ্টা। এক পর্যায়ে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েন মায়েরা। হাত পাখাটা অজান্তেই পড়ে যায় ক্লান্ত হাত থেকে। এভাবেই কেটে যায় কিছুটা প্রহর। খানিক ক্ষণ পরই বাড়ীর মোরগ গুলো ডেকে উঠে আর জানান দেয় সকাল সমাগত। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আযানের সমুধুর ডাক,
“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”।
চোখে তখনো রাজ্যের ঘুম মায়েদের। ক্লান্ত শরীর। মন চায় আরেকটু ঘুমিয়ে নিতে। কিন্তু তা হবার নয়। জেগে উঠতেই হতো তখন। রাত ফুরোলেই রাজ্যের কাজ তাঁদের। জেগে উঠতেন তাই মায়েরা।
দাঁত মেজে আর অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজ সেরে অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করতেন মায়েরা। নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই খানিকক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করে নিতেন। এরপরই শুরু হতো নিত্য দিনের কাজ। মুরগীর ঘরের দরজা খুলে দিলে বেরিয়ে আসত হাঁস আর মোরগ গুলো। এ সময় মায়েরা হাঁস মুরগীকে খাবার দিতেন। এরপর ঢুকতেন রান্না ঘরে। কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে খানিকটা আলো আঁধারিতে শুরু হতো তাঁদের দিনের কার্যক্রম। চারদিকে তখনো আঁধার কাটেনি। বড়দের আওয়াজ পাওয়া যেত তখন বাইরে। মেসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে খড়ম পায়ে ধীরে ধীরে বড়রা ছুটে যেতেন বাড়ীর পুকুর ঘাটে। হাত মুখ ধুয়ে ওজু করে বাড়ীর মসজিদে আদায় করে নিতেন ফজরের নামাজ। এরপর বাড়ী ফেরা।
এরই মধ্যে রান্না ঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মায়েরা। ছোটদের, মুরুব্বীদের, লজিং মাস্টার, আবার সময় সময় বাড়ীতে থাকা কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের খাবার আয়োজন এর সব গুলোই মায়েদের করতে হতো এ সময়ে। অল্প সময়ে এক হাতে নানান কাজ। এর মধ্যে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা সকালে আরবী শেখার জন্য ছুটে যেতো মক্তব খানায়। প্রায় ক্ষেত্রেই তখন ও ছোটদের নাস্তার আয়োজন হয়নি। মক্তব শুরুর আর সময় ও বাকি নেই। তাই এই সময় মায়েরা ছোটদের হাতে দু একটি মুড়ির মোয়া,খই, চিড়া বা মুড়ি জাতীয় কিছু খেতে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন মক্তবে। ছোটরা কায়দা, ছিপাড়া বা কোরআন শরীফ নিয়ে চলে যেতো মক্তবে।
ছোট বাচ্চাদের মক্তবে বিদায় করে দিয়ে মায়েরা আয়োজন করতেন অন্য সবার জন্য সকালের নাস্তা। বড়রা ফিরে আসতেন মসজিদ থেকে। সে সময়টায় সকালের নাস্তায় পান্তা ভাতই ছিল প্রধান উপকরন। দেশে তখনো আটা রুটি চালু হয়নি। পিড়ি আর পাটি বিছিয়ে সবাই বসে যেতেন খেতে। মায়েরা এই পর্বে সবার নাস্তা খাওয়ানো শেষ করতেন। ইতিমধ্যেই মক্তব থেকে আরবী পড়া শেষ করে ফিরে আসতো বাচ্চারা। পেটে ওদের তখন প্রচন্ড ক্ষিধা। এসেই সরাসরি রান্না ঘরে। মায়েরা তখন এদের সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ করাতেন। ইতিমধ্যেই সময় প্রায় সকাল আটটা। মায়ের খাবার এখনো হয়নি। এরপর বাকী থাকলো বাড়ীর লজিং মাস্টার আর কৃষি শ্রমিক। সবার খাবার শেষ করে মায়েরা যখন খেতে বসতেন তখন সময় সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে। সেই কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রায় তিন ঘণ্টা মায়েদের কেটে গেলো হেঁসেলেই।
নাস্তা পর্ব শেষ। এবার ছেলে মেয়েরা যাবে স্কুলে। রান্না করতে হবে গরম ভাত। বেলা দশটা নাগাদ গরম ভাত খেয়ে স্কুলে যাবে বাচ্চারা। রান্নার পাশাপাশি এই সময়টা বাচ্চাদেরকে স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত করাতেন মায়েরা। ছোট মেয়েরা ছুটে আসত রান্না ঘরে। মায়ের কাছে আবদার করতো চুলে বিনুনী করে দেয়ার জন্যে। মায়েরা তখন মেয়েকে বসাতেন পিড়িতে নিজের সামনে। পরম মমতায় চুলে তেল মেখে চুল আঁচড়িয়ে দিয়ে মাথায় সুন্দর করে বেঁধে দিতেন একটা বা দুটো বিনুনী। সাথে দু একটি চুলের ক্লিপ আর লাল নীল ফিতা ও জুড়ে দিতেন বিনুনীর সাথে।
গরম ভাত খেয়ে বই খাতা বগল দাবা করে ছেলে মেয়েরা চলে যেতো স্কুলে। এবার মায়েরা শুরু করতেন দুপুরের খাবারের আয়োজন। বড় মেয়েটা সপ্তাহ দুয়েক ধরে মায়ের বাড়ী। আল্লাহ চাহে তো প্রথম সন্তানের মা হবে মেয়েটা। দুপুরে রান্নার আয়োজনের আগে খানিকটা সময় হাতে থাকে মায়েদের। সপ্তাহ খানেক পর মেয়েটা চলে যাবে আবার শ্বশুর বাড়ী। মেয়ের আগত বাচ্চার জন্য ছোট ছোট কাঁথা সেলাই করতে বসে যান মা। এক মনে কাঁথা সেলাই করেন আর প্রথম নানী হওয়ার স্বপ্ন বুনেন মনে মনে। এ সময় মাঝে মাঝে আশে পাশের ঘর থেকে সম বয়সী দু এক জন মায়েরা আসেন। খানিকটা সময় সুখ দুঃখের আলাপচারিতায় কেটে যায় সবার।
কিছুক্ষণ পর আবার মায়েরা ঢুকেন রান্নাঘরে। দুপুরের খাবারের আয়োজন। একান্নবর্তী পরিবার। বড় সংসার। দুপুরের খাবার আয়োজনটা ও তাই বেশ বড়সড়। মাটির চুলো। খড় কুটো আর লাকড়ী দিয়ে রান্না বান্না। সকালে নাস্তার পর কিছুটা সময় পেলেই মায়েরা গরুর গোবর বাঁশের কঞ্চিতে লাগিয়ে তা রৌদ্রে শুকোতেন। এটা ছিল তখনকার গ্রামাঞ্চলে জ্বালানীর একটি বড় উপাদান। চুলোর পাশে মায়েরা কিছুটা ধানের তুষ রাখতেন। মাঝে মাঝে আগুন দুর্বল হয়ে আসলে তাতে কিছুটা ধানের তুষ ছিটিয়ে দিতেন। এর ফলে আগুনের তেজটা খানিকটা বেড়ে যেতো। চুলার পাশে থাকতো একটি বাঁশের চুঙ্গা। আগুনের তেজ বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝেই মায়েরা তা দিয়ে জোরে জোরে চুলোয় ফুঁ দিতেন। শীতকালে জ্বালানি কিছুটা ভেজা আর স্যাত স্যাতে থাকাতে অনেক সময় ফুঁ দিতে দিতে মায়েদের চোখ লাল হয়ে যেত আর এর ফলে চোখ জ্বালা করতো। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে আবার অল্প কিছু সময়ের জন্য মায়েদের উঠে যেতে হতো রান্না ঘর থেকে। বাড়ীতে আছে শ্বশুর শ্বাশুড়ি। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে শ্বাশুড়ীকে পান ছেঁচে দিয়ে আসতে হতো। আবার মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে শ্বশুরের হুকোয় তামাক সাজিয়ে দিয়ে ও আসতেন মায়েরা। প্রচন্ড ব্যস্ত সময় এই দুপুর বেলা। এমন ও হতো মাঝে মাঝে দুধের বাচ্চা শিশুটা কেঁদে উঠতো এই সময়। উঠে গিয়ে শিশুকে নিয়ে আসতেন কোলে করে আর তাকে কোলে নিয়েই চুলোর পাশে বসে শেষ করতেন দুপুরে রান্না।
দুপুরে রান্নার আয়োজন শেষ করে মায়েরা যেতেন গোসল করতে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই গোসল হতো পুকুরে। মহিলাদের জন্য পুকুরের এক কোণে বাঁশের বেড়া দিয়ে একটি অংশ ঘেরাও দেয়া থাকতো। দুপুরের দিকে সেখানে গোসল করতে গেলে আশে পাশের বাড়ীর দু একজন সম বয়সী মহিলাদের সাথে দেখা হয়ে যেতো মায়েদের। এ সময়টা পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হতো তাঁদের মধ্যে। খুব বেশী সময় দেয়ার সুযোগ ছিল না তখন সেখানে। গোসল সেরে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে দুপুরের খাবার নিয়ে। দুপুরে গোসল করতে যাওয়ার সময় মায়েদের কেউ কেউ খালি কলস নিয়ে যেতেন। আসার সময় পুকুর ঘাট থেকে কলসী ভরে পানি নিয়ে আসতেন রান্না ঘরের বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্যে। সবার দুপুরের সবার খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসতো স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা। তাদের খাবার দাবার শেষ করার পর এই সময়টা খানিকটা বিশ্রামের ফুসরত ছিল মায়েদের। খানিকটা বিশ্রাম নিতেন তাঁরা এই সময়ে যদি ও আচমকা মাঝে মাঝে উঠকো অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে সব সময় এ বিশ্রামের সুযোগ ও হতো না।
বছরের শেষে বাচ্চাদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা। কেউ কেউ আবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। মায়েদের মনে তখন এক বিরাট উৎকণ্ঠা। সারাক্ষণ ভাবনা কিভাবে ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে। ছেলে মেয়েদের শরীর স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রেখে মায়েরা তখন সাধ্য মত বাচ্চাদের কিছু অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার যেমন দুধ ডিম এগুলো দেয়ার ব্যবস্থা করতেন। পরীক্ষার বেশ আগে থেকেই কোন কোন মায়েদের দেখেছি সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো করার উদ্দেশ্যে খতমে ইউনুস শেষ করতেন। কেউ কেউ আবার এই উদ্দেশ্যে নফল রোজা ও রাখতেন। পরীক্ষার দিন পরীক্ষা দিতে যাবার আগে মায়েরা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সূরা, আয়াতুল কুরসি বা অন্যান্য দোয়া দুরুদ পড়ে পরীক্ষার্থী সন্তানদের গায়ে আর মাথায় ফুঁ দিতেন।
বিকালে বারান্দায় বা উঠোনে এসে বসতেন মায়েরা। সারা দিনের শুকোতে দেওয়া কাপড় চোপড় ভাঁজ করে নিয়ে যেতেন ঘরে। বাড়ীর মোরগ হাঁস গুলো ইতিমধ্যেই সারা হাট মাঠ ঘুরে আবারো দিনান্তে বাড়ির আঙিনায়। মায়েরা চোখ রাখতেন হাঁস মুরগির দিকে। খোয়াড়ের দরজাটা খুলে দিতেন। সময় মতোই হাঁস মুরগী গুলো ঢুকে যেতো খোয়ারে। মায়েরা খেয়াল রাখতেন সবগুলো হাঁস মুরগী ফিরে এসেছে কিনা। তারপর খোয়ারের দরজা বন্ধ করে দিতেন।
বিকালের এই ক্ষণিক অবসরে আশে পাশের বাড়ী থেকে ও কিছু কিছু মহিলারা এসে সামিল হতেন এই সময়টায়। সামনে দেয়া হতো পানের বাটা। পান, সুপারি, চুন, সাদা পাতা, জর্দা আর খয়ের থাকতো পানের বাটায়। মহিলারা নিজ হাতে পান বানিয়ে খেতেন আর মেতে উঠতেন হালকা গল্প গুজবে। কোন কোন মহিলারা আবার পিড়ি নিয়ে একজন আরেক জনের সামনে বসে যেতেন। শুরু হয়ে যেতো এক জন আরেক জনের চুলের উকুন বেছে আর তেল লাগিয়ে দিয়ে চুল বেঁধে দেয়ার কাজ।
ইতিমধ্যেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আগত প্রায়। বাড়ীর বড়রা গ্রামের বাজার থেকে বাজার করে ঘরে ফিরেছেন। এখনই আয়োজন করতে হবে রাতের খাবারের। এখনকার মত গুড়ো মসল্লার প্রচলন তখনো শুরু হয়নি। প্রয়োজনীয় সব মসল্লাই তখন শীল পাটায় বেটে তৈরী করা হতো। আর এ কাজটি ও মায়েরাই করতেন।
বাজার রাখা হয়েছে রান্নাঘরে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে এরই মধ্যে। মায়েরা ফিরে গেছেন ঘরে। ঘরে গিয়ে কেরোসিনের হারিকেন আর কুপি বাতি জ্বালিয়ে সব ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন। অজু করে আদায় করে নিয়েছেন মাগরিবের নামাজ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বৈঠক খানায় লজিং মাস্টারের কাছে পড়তে পাঠাচ্ছেন। ওদের সাথে ও দিয়ে দিয়েছেন একটি হারিকেন।
নামাজ শেষ করে আবারো রান্না ঘরে মায়েরা। বাজার থেকে আনা মাছ মাংস কেটে কুটে মশল্লা পাতি বেটে আবারো জ্বালিয়ে দিয়েছেন উনুন। শেষ করেছেন রাতের রান্না। সবাই খেতে আসার আগে খানিক ক্ষণের জন্য আবারো ফিরে এসেছেন মুল ঘরে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই বাচ্চারা বৈঠক খানা থেকে ফিরে আসবে পড়াশোনা শেষ করে। বড়রা ও ফিরে আসবেন বাড়ীর মসজিদে এশার নামাজ আদায় করে।
আবারো সবাই একত্রে খেতে বসবেন রান্না ঘরে। কেউ কেউ বসেছেন পাটিতে। কেউ কেউ আবার পিড়িতে। সে সময়টাতে শ্বশুর শ্বাশুড়িরা ছেলের বৌদের সাথে এখনকার মতো এতটা ফ্রি ছিলেন না। শ্বশুর শ্বাশুড়ীর সামনে তাই বাড়ীর বৌয়েরা তথা মায়েরা ততটা সহজ হতে পারতেন না। কিছুটা সংকোচ বোধ করতেন।
রান্না ঘরে মায়েরা বসতেন চুলার পাশে। ভাতের আর তরকারীর ডেকচী থেকে ভাত তরকারী বেড়ে দিতেন সবাইকে। মুরুব্বীদের তরকারী দেবার জন্য সাধারণত ছোট ছোট ছোট বাটি থাকতো। ছোটদেরকে মায়েরা হাড়ি থেকেই সরাসরি প্লেটে বেড়ে দিতেন ভাত তরকারী।
সে সময় গ্রামীণ জনপদে অভাব খুব বেশী না থাকলে ও বিলাসিতার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। খাওয়া দাওয়া আর রান্নার ক্ষেত্রে ও অনেকেই তাই ছিলেন সংযমী। মানুষ জন তুলনা মূলক ভাবে অনেক সৎ ছিলেন আর সাধ্যমত চেষ্টা করতেন সীমিত আয়ের মধ্যে থেকেই জীবন যাপন করতে। এ বাস্তবতায় মায়েদেরকে অনেক সময় কঠিন বিপদে পড়তে হতো মাঝে মাঝে। মাছের মাথা, মুরগীর কলিজা, মাছের পেটি বা অন্যান্য কোন কোন জিনিসের প্রতি কারো কারো আগ্রহ থাকতো, খাবার সময় তারা তা পেতে চাইতো মনে মনে। সীমিত এ খাবার দিয়ে একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে ভালোভাবে তুষ্ট করা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিল। মায়েদেরকে এই অসম্ভব কাজটাই সম্ভব করে তুলতে হতো। আশ্চর্যজনক হলে ও সত্য যে মায়েরা এই কাজটি খুব সুন্দর ভাবেই করতেন। তবে মাঝে মাঝে এমন ও দেখা যেত সবার খাবার শেষ হওয়ার পর মায়ের জন্য আর ভালো কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না। মায়ের তাতে কোনো রকম আফসোস ছিলোনা। খুব অল্পতেই তুষ্ট ছিলেন তাঁরা। সবাই খাওয়ার পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকতো সেটা খেয়েই তখনকার মায়েদেরকে দেখেছি তুষ্ট থাকতে। কোন কোন দিন এমন ও হতো যে তরকারী শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে কোন কোন মায়েরা তখন তরকারীর হাঁড়িতে ভাত নিয়ে লেগে থাকা ঝোলের সাথে সেই ভাত মিশিয়ে সেটা খেয়েই রাতের খাবার শেষ করতেন। এ কাজটা মায়েরা চেষ্টা করতেন লুকিয়ে লুকিয়ে করতে। অসাবধানতা বশত কেউ এটা দেখে ফেললে মায়েদের একটি তাৎক্ষণিক উত্তর তৈরী ছিল ” আমার না এভাবে খেতেই ভালো লাগে।” কি এক সহনীয়, নমনীয়, মমতাময়ী আর স্নেহময় চরিত্র তখনকার মায়েদের।
বাবার বাড়ী যেতে মাঝে মাঝে খুবই মন চাইতো মায়েদের। কিন্তু যাবার তেমন ফুরসত মিলত না। একান্নবর্তী পরিবার। ছেলে, মেয়ে, দেবর, ননদ, ভাসুর, শ্বশুর শ্বাশুড়ি সব মিলে এক মহাযজ্ঞ। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ ছেড়ে অল্প কিছুদিনের জন্য ও বাবার বাড়ীতে যাওয়া ছিলো প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার। বাড়ীর প্রায় সব দায়িত্বই এক হাতে সামলাতে হয় তাঁকে। দেখতে খুব ইচ্ছে হয় বাবা, মা, ছোট ভাই বোন আর ছোট বেলার খেলার সাথীদের। ইচ্ছে করলেই তো আর তা হয়না। মন খারাপ হয় অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা মায়ের কথা মনে হলে। ইচ্ছে হয় বেশ কিছুদিন বাবার বাড়ী থেকে মা বাবাকে নিজের হাতে তাঁদের পছন্দের কিছু খাবার রেঁধে খাওয়াতে। কল্পনা নিজের মনেই ঘুরপাক খেতে থাকে। একা একা থাকলে মনটা আনমনা হয়ে যায়। উদাস দৃষ্টি কাউকে যেন খুঁজে বেড়ায়। রাতে সবাই শুয়ে গেলে বাবা মার কথা মনে করে বিছানায় একা একা নীরবে কান্না করে মায়েরা। শচীন দেব বর্মনের একটি গানের কথায় মায়েদের মনের এ অবস্থা যথাযথ প্রকাশ পেয়েছে।
“কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া?
ভাই ধনেরে কইয়ো
আমায় নাইওর নিত আইয়া।
কে যাস, তোরা কে যাস রে”।
এমনি করে পার হয়ে যায় জীবনের বেশ কটি বছর। সেই অনেক অনেক বছর আগে চপলা চঞ্চলা কিশোরীর নব বধু বেশে আগমন এই বাড়ীতে। মেঘে মেঘে পেরিয়ে গেছে কয়েকটি যুগ। সময়ের আবর্তনে আপন করে নিয়েছেন সবাইকে। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সবার জন্যে। নিজের জন্য রাখেননি কোন কিছুই। ছিলোনা কোন চাওয়া, কোন পাওয়া, ছিলোনা কোনো আবদার। সেই কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে জেগে সারাটা দিন আর প্রতিটি ক্ষণ ব্যস্ত রেখেছেন অন্যদের ভালো রাখতে। নিজের প্রতি যত্ন নেয়ার সময় ও পাননি। মনের কষ্ট আর দুঃখ কাউকে বুঝতে ও দেননি কখনো। নীরবে বিসর্জন দিয়েছেন অশ্রু। সেই ঘোমটা পরা কিশোরী আজ বার্ধক্যে। শরীর আর চলতে চায় না। রোগ শোক ভর করেছে শরীরে। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে ও কোন অপূর্ণতা পেয়ে বসেনি মায়েদের। সারাটা জীবন সবার সেবা করে গেছেন, সবার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, আবদার মিটিয়েছেন সবার এটাই আজ তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর সান্ত্বনা।
তাঁদের এই ত্যাগ, সুখ শান্তি বিসর্জনের কারনেই আজ আমরা অনেকেই সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। অল্প পড়াশোনা জানা আমাদের এই সমস্ত মায়েরা আঁকড়ে ধরেছিলেন পরিবারকে। প্রচন্ড ভালোবাসা আর মমতায় ভরে দিয়েছেন পরিবারের ছোট বড় সবার জীবন। তাঁদের এই অবদান, এই ঋণ কোনভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়।
এরাই আমার মা, আপনার মা, আমাদের মা। আবহমান বাংলার শাশ্বত মায়েদের স্বরূপ এটাই। মমতায় ঘিরে রেখে আজীবন ছায়ার মতো যারা আগলে রেখেছেন সবাইকে, আমাদের সেই মায়েরা আজ অনেকেই দৃষ্টির অন্তরালে, পরপারে। হে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের মায়েদের তুমি জান্নাতবাসী করো, উত্তম প্রতিদানে ভরে দিও তাঁদের পরকাল।
Md. Aowrangazeb Chowdhury
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
২৪ এপ্রিল ২০২১।




