৯
বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার সেলের অফিসের করিডোরে অপেক্ষা করে আছি। আমি আর মিতু। সোহরাব সাহেব সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শম্পাদির সাথে আলাপ শেষে ফোন দিয়েছিলাম। ভদ্রলোক বেশ খুশি হয়েছেন মনে হল। অবশ্য পুলিশে জানাশোনা কেউ আছে কি না এই প্রশ্নের পরে খুশি মনে হয় কিছুটা কমে যায়। তবে ভদ্রলোক আসলেই অমায়িক। এবং সম্ভবতঃ ভালো অভিনেতাও। বুঝতে না নিয়ে বেশ আগ্রহের সাথেই সবকিছু শুনলেন। কিছুটা তো সেদিন জানিয়েইছিলাম, বাকীটা তখন জানালাম।
শুনে শুধু বললেন,
— আই থিঙ্ক, যার ফোনে হুমকি আসছে, তাঁর তরফ থেকে কমপ্লেইন হলে ভালো হয়।
ব্যাপারটা আমিও ভেবে দেখলাম। মিতুকে ইনভলভ করতে আমার তেমন কোন আপত্তি নেই, যদি না ও ভয় পায়। এরপরে কিছুটা অভদ্রের মতোই ‘আজকে তাহলে রাখি?’ আলাপের ইতি টানলাম। উনার ‘ওকে’ র ভেতরে কিছুটা হতাশা মিশে ছিল মনে হল। বাট, আমার আসলে উপায় ছিল না। এক তরফা কি আর কথা বলা যায়? অনেস্টলি স্পিকিং, আসলে ভেতর থেকে কোন কথা আসছিলও না। মাথায় তখন পাজল সলভ করার ভূত চেপেছিল।
পরের ফোনটা করলাম মিতুকে। মেয়েটা প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ফোন ধরেই ‘এক্সট্রিমলি সরি’ বলে ব্যাখ্যা শুরু করতে যাচ্ছিল। থামালাম। বললাম
— একদম কোন কথা না বলে, আগে আমার কথাগুলো শুনুন।
এরপরে আমার ব্যাখ্যা শুরু করলাম। জানালাম, আমি নিজেও জানতে চাই, কে আপনাদের হুমকি দিচ্ছে। যেহেতু আমার জন্য দিচ্ছে, তাই আমার জানা দরকার কে আমার সেই ওয়েল উইশার, কাম অবসেসড লাভার। ব্যাপারটায় সম্মতি দিতে মনে হয় হেজিটেশান ছিল। তাই যোগ করলাম
— দেখুন, ব্যাপারটায় ভয় পেলে আখেরে ক্ষতি হতে পারে। আর এমনও হতে পারে ব্যাপারটা ওর পেশা। হয়তো এভাবে ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়াটাই ওর মতলব।
কনভিনসড হল। ফোন রাখবার আগে ছোট্ট করে শুধু জানাল
— উই ব্রোক আপ।
রিয়াক্ট করতে পারতাম। বোঝাতে পারতাম, জরুরী ছিল না। কিন্তু এখন এসব আলাপে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। বরং নেক্সট ফোনটা করা জরুরী। আনিস সাহেব। যদিও সোহরাব সাহেব বলেছিলেন, উনি জানিয়ে রাখবেন, ওখানে গিয়ে বললেই হবে, তারপরও, একবার নিজে কথা বলে নিতে ইচ্ছে করল। ফোন দিলাম ভদ্রলোককে। নিজের পরিচয় দিলাম।
— আমি মিনু। সোহরাব সাহেব আপনার নাম্বারটা দিলেন…
— জ্বি ভাবি…
এরপরে জানালেন আমাকে কি করতে হবে। শুনলাম। আমি যে ভাবি না, বা এখনও হইনি, উনার এই ভুল ভাঙ্গাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না। বুকের ঢিপঢিপানি বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে সেই ক্লিপ্টোম্যানিয়াকের খুব কাছে চলে এসেছি। এক মাত্র এক ধাপ। হয় ওর অ্যাড্রেস পেয়ে যাব, আর নয়তো আইপি অ্যাড্রেস, আর সেটা ইউজ করে আসল অ্যাড্রেস।
মিতুকে জানালাম। আগামীকাল সকাল দশটায় অবশ্যই যেন পৌঁছে যায়। এরপরে পুরো রাত কেটেছে অদ্ভুত এক টেনশানে। যদি সত্যিই দেখা যায় সেই ছেলে, তাহলে? কি করব? কেবল হাই হ্যালো? না…
এপাশ ওপাশ করতে করতে কখনো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুম ভাঙল মিতুর ফোনে। ও রওয়ানা দিচ্ছে। আজকে ছুটি নিয়েছি। তাই মা ও ডাকে নি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ন’টা বাজে। ঝড়ের বেগে তৈরি হলাম। এতোটা এলোমেলোভাবে জীবনে কখনো বাইরে বেরোইনি। মা নাস্তার জন্য ড্যাকতে ডাকতেই আমি বাড়ির বাইরে। যদিও এমনি সময়ে মিনিট দশেকের পথ, কিন্তু ঢাকা শহর বলে কথা।
যাই হোক, সাড়ে দশটা বাজার কিছু আগেই পৌঁছে গেলাম। মিতুও এসেছে। করিডোরে একটা চেয়ারে বসে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে স্মাইল দিল। ওর পাশে গিয়ে বসলাম। কিছুটা হাঁপাচ্ছিলাম। সময় নিলাম সুস্থির হতে। এরপরে জানতে চাইলাম
— আমাকে কি কেউ খুঁজছিল?
মাথা দুদিকে নেড়ে বোঝাল ‘না’। প্রশ্নটা বোধহয় অযথাই করলাম। ওদের খোঁজার কথা না, আমাকেই জানাতে হবে, আমি এসে গেছি। আনিস সাহেবকে ফোনটা করতে যাব এমন সময় মিতু আমাকে থামাল
— কাজটা কি ঠিক করছি?
ওর চোখে ভয়। ওর একমাত্র চিন্তা ওর বুটিক। ওর হাতের ওপর হাত রেখে আশ্বস্ত করলাম। বললাম
— সব ঠিক হয়ে যাবে।
এমন সময় ফোনটা আসল। সোহরাব করেছে। ফোনটা রিসিভ করলাম
— পৌঁছে গেছেন?
— জ্বি।
— আপনি রিসেপশানে একটু নিজের পরিচয় দেন, ওখানে ইনফর্ম করা আছে।
কথামত এগিয়ে গেলাম। নিজের পরিচয় দেয়ার পরে আমাদেরকে খাতায় সিগনেচার করতে হল, ভিজিটর কার্ড দেয়া হল। সেটা ঝুলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। আনিস সাহেবের রুমের ডিরেকশান দেয়া হয়েছে। সেখানে পৌঁছে দরজায় নক করলাম।
ভদ্রলোক বোধহয় আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ভেতরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালেন।
— বসেন ভাবি।
মিতু বেশ অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল। ওর হতভম্ব ভাবটা আপাততঃ এঞ্জয় করা ছাড়া উপায় নেই। এই ভদ্রলোকের ভুল ভাঙ্গানোর চেয়ে জরুরী হচ্ছে আমার প্রব্লেমের সুরাহা করা। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললাম
— কিছু জানা গেল?
মিতু আর প্রলয়ের ফোন নম্বরটা আগেই দিয়ে রেখেছিলাম। উনিই চেয়েছিলেন। বলেছিলেন এটা কোন ব্যাপারই না, আগামীকাল সকালে আসেন, সব জানিয়ে দেব, কে আছে এর পেছনে। বললে ধরে জেলেও চালান করে দিতে পারি।
না, এতোটা চাই না। শুধু একবার দেখতে চাই মানুষটিকে। এরপরে সিদ্ধান্ত নেব, কি করব।
ভদ্রলোক আমার প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপরে বললেন
— যে ব্যাটা কাজটা করেছে, সে মনে হয় না এলেবেলে কেউ। কম্পিউটার, নেটওয়ার্কিং আর হ্যাকিং বেশ ভালোই বোঝে।
ভদ্রলোকের ভূমিকা শুনে মনে হচ্ছে, অ্যান্সার নেগেটিভ। ট্রেস করতে পারেনি। তারপরও স্পষ্ট করে বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করলাম
— ধরা যায়নি?
দুদিকে মাথা নেড়ে বোঝালেন, ‘না’। আর মুখে বললেন
— আসলে এই ব্যাটা বেশ মাস্টার হ্যাকার। আমাদের এখানকার অ্যানালিস্টরা পারল না। অবশ্য আমি অন্যভাবে ট্রাই করছি।
মুখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ‘কি ট্রাই?’ ভদ্রলোক আমার দিকে না তাকালেও আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন
— আমরা মাঝে মাঝে কিছু হ্যাকারের হেল্প নিই। সেরকম একজনকে আজকে ডেকেছি। দেখি…
— ও
গলায় বোধহয় হতাশাটা একটু বেশি ছিল। ভদ্রলোক একটু অস্বস্তিবোধ করলেন। এরপরে কথা ঘোরাবার জন্য বললেন
— চা বলি?
দ্রুত চিন্তা করছি। দুই দিন পরে এনগেজমেন্ট। এখন এভাবে একটা হুমকি ম্যাসেজের জন্য সাইবার সেলে বসে থাকাটা কতোটা উইয়ার্ড দেখাবে। তা ও আবার অন্যের মোবাইলে আসা ম্যাসেজ। কি উত্তর দেব ভাবছি এমন সময় মিতু উদ্ধার করল
— আমাকে একটু উঠতে হবে।
ভদ্রলোকও বোধহয় সেটাই চাইছিলেন। আমাদের খুব একটা শক্ত বাধা না দিয়ে একটু দায়সারা ভাবেই বললেন
— এক্ষুনি চলে আসবে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললাম
— আমরা বরং কালকে আসি
মিতু দেখলাম কিছু বলল না। ভদ্রলোকও ব্যাপারটা মেনে নিলেন। আবার এক পশলা ধন্যবাদ দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসলাম।
বাইরে বেরিয়েই মিতুর জেরার মুখে পড়লাম
— আর ইউ ম্যারিড?
হেসে ফেললাম। সেই সাথে মনের কোণে প্রশ্নটা উঁকি দিল। ও কি আম্র কথা ভেবে ব্রেকাপ করেছে? বললাম
— নট ইয়েট। কথাবার্তা চলছে।
— মাই গড!
— মাই গড কেন?
— আমি ভেবেছিলাম…
ওকে কথা শেষ করতে দিলাম না। বললাম
— চলো, কোথাও বসি। তুমি করে বললাম কিন্তু
— সিওর।
এরপরে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে ক্যাফে খুঁজলাম। খেয়ে আসিনি। খিদে পাচ্ছে এখন। সামনের রেস্তোরাঁটা সব ধরণের খাবারের। সেদিকে এগিয়ে গেলাম। বুঝতে পারছি মিতুর ভেতরে একরাশ প্রশ্ন কিলবিল করছে। ঠিক করে রেখেছি, ওকে যতোটা সম্ভব খুলে বলব। আমার জন্য ওদের প্রেমে বিঘ্ন হোক, সেটা চাইছি না।
হোটেলটা খুব পরিষ্কার না। তারপরও, চলে। ভেতরে ঢুকে ফাঁকা দেখে একটা টেবিলে দুজন বসলাম। টেবিলের সামনেই পুরো দেয়াল জুড়ে একটা আয়না। ওটায় তাকালে পেছনের রাস্তা দেখা যাচ্ছে।
— কি খাবে?
মিতু এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ম্লান হেসে শুধু বলল
— কিছু না।
এবার ব্যাখ্যা শুরু করলাম
— টেনশানে কাল রাতে ঘুম হয়নি। উঠেছি দেরীতে, ইনফ্যাক্ট তোমার ফোনে, দেন… এরপরে ঘাড় কাত করে বোঝালাম, সব এলোমেলো হয়ে যায়। আর মুখে বললাম
— সকালে খেয়ে আসা হয়নি। তোমার কি খুব তাড়া আছে?
মিতুর ঠোঁটে এবার সত্যিকারের হাসি। বলল
— মনে হচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে আমার চেয়ে আপনি টেনশান করছেন বেশি।
এবার আমিও হেসে ফেললাম। আসলেই, ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। দুইদিন পরে যার এনগেজমেন্ট…
— আপনাকে ভাবি বলল কেন? আই মিন…
— যার থ্রু দিয়ে এখানে এসেছি, তাঁর সাথে দুইদিন পরে আমার এনগেজমেন্ট। আর ভদ্রলোক ধরেই নিয়েছেন, বিয়েটা হচ্ছে।
ভ্রু কুঁচকে গেল মিতুর। আমিও অবাক হলাম। কি বললাম এটা। আসলে এমনটা মিন করতে চাইনি, তারপরও কথাটার মিনিং দাঁড়াচ্ছে, এনগেজমেন্টটা তো আসলে হবে না।
দ্রুত নিজেকে শুধরাবার চেষ্টা করলাম। বললাম
— আই মিন, উই আর গেটিং এনগেজড, বাট নট ইয়েট হ্যাপেন্ড, এই আর কি
মিতু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। এরপরে প্রশ্নটা করল। সম্ভবতঃ অনেক আগেই মনে জেগেছে, আজ সুযোগ পেয়ে প্রশ্নটা করে ফেলল
— আপনি কি এখনও প্রলয়কে ভালোবাসেন?
এমন সময় ওয়েটার আমার খাবার নিয়ে আসল। ওকে খাবারগুলো সার্ভ করার সময় দিলাম। ওয়েটার চলে গেলে মিতুর চোখে চোখ রাখলাম। খুব ভালমতোই জানি, গলা যদি একটু কেঁপেছে, ও আমার কথা বিশ্বাস করবে না। তাই কিছুটা সময় নিয়ে, শান্ত স্বরে বললাম
— না।
আমার গলায় থাকা সততাটা ও ফিল করল। মেনেও নিল। এরপরে মাথা নিচু করেই প্রশ্নটা করল
— তাহলে ওকে দেয়া একটা থ্রেট ফলো করার জন্য এতো মরিয়া হয়েছেন কেন?
প্রশ্নটার উত্তর কি দেব, বুঝতে পারছিলাম না। ওকে আমার আর প্রলয়ের পুরো ঘটনা খুলে না বললে, ওর মনে একটা সন্দেহ থেকেই যাবে। সেটা চাইছি না। মুখে শুধু বললাম
— হাতে সময় আছে?
মাথা নোড করল। আছে। আমিও গুছিয়ে নিলাম। সেই ‘তোমার নাম মিনু?’ থেকেই শুরু করব ঠিক করলাম। ধীরে সুস্থে পরাটার প্রথম গ্রাসটা মুখে দিলাম। ওটা করতে গিয়ে একটু ঝুঁকেছিলাম। মাথা তুলে যখন তাকালাম, মিতুর সাথে সাথে পেছনের আয়নায়ও চোখ চলে গেল। ও মাই গড। ঠিক আমার পেছনের টেবিলে মরার মত পড়ে আছে সেই হ্যাভারস্যাকটা। আর টেবিলের পেছনের চেয়ারে, আমার দিকে পিঠ করে বসে আছে একটা ছেলে। মনে হল হার্ট বিট করতে ভুলে গেছে।
ঝট করে ঘুরলাম।
চলবে
– Razia Sultana Jeni
Send private message to author





