গল্পটা হ্রদয়ের

মাত্র এক সপ্তাহ হলো ত্রাতুল ঘরের বাইরে যায়।এর মধ্যেই একটা অদ্ভুত জিনিস হচ্ছে।।অনেকদিন হস্পিটালে

থেকে ১২ দিন আগেই বাসায় এসেছে।কয়দিন ধরে একটা মেয়ে ত্রাতুলের পিছনে পিছনে এই পার্ক পর্যন্ত আসে। ছোট একটা মেয়ে।খুব ছোট না আবার বাচ্চাও বলা যায় না, কিশোরী মেয়ে।কিন্তু ত্রাতুল কেন জানি মেয়েটার মধ্যে বাচ্চা বাচ্চা ভাবটাই বেশি পায়। মেয়েটা ঠিক কবে থেকে ওর পিছু নিয়েছে ও জানে না।কিন্তু শেষ তিনিদিন ধরে দেখেছে মেয়েটাকে। প্রথমে ভেবেছিলো হয়তো এটা কোএন্সিডেন্স। কিন্তু না।মেয়েটা ওর পিছনেই আসে।আর ওর থেকে একটু দূরের বেঞ্চে বসে থেকে ওকে দেখে।মনে হয় পড়া বা কোচিং থেকে আসে।কাঁধে একটা স্কুল ব্যাগ থাকে।ব্যাগটা বেশ অন্যরকম। অনেক পুরান আর দেখে মনে হয় হাতে বানানো,এর উপর বিভিন্নভাবে ‘ক’ লেখা। ত্রাতুল আজকে ভালো করে মেয়েটাকে লক্ষ্য করলো।ও জানেনা ঠিক কেন মেয়েটাকে দেখার পর থেকে ওর মেয়েটার জন্য কেমন একটা অনুভুতি হয়।কিসের জানি খুব একটা মায়া টানে ওকে মেয়েটার দিকে। কত বয়স হতে পারে ১১-১৪ এর মধ্যে।এর বেশি মনে হয় না।আবার হতেও পারে কে জানে।কিন্ত মেয়েটা রোজ কি দেখে? আজ ত্রাতুল ও সময় নিয়ে মেয়েটাকে দেখলো।চোখাচোখি হলো।মেয়েটার চোখে কিসের জানি একটা  প্রত্যাশা কখনো অস্থিরতা । ত্রাতুল মনোবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় এসব বেশ বুঝতে পারে।কিন্তু বুঝতে পারে না কেন মেয়েটা তার পিছনে আসে আর তার থেকে বেশি বুঝতে পারে না কেনই বা ওর মেয়েটার জন্য মায়া কাজ করে।

-কি রে খাবি না?

-এসব খেতে আর ভালো লাগেনা মা।

– তো কি খাবি?

– ঘি দিয়ে একটা ডিম ভেজে দিবে, সাথে পোড়া মরিচ? এর পর এক কাপ মালাই চা

– নাটক করিস না,খেয়ে নে।তুই জানোস তুই কানলেও তোকে আমি এসব দিব না।

-প্ল্রিজ মা, একদিন।আর খাবো না।

-খা তো চুপচাপ

-প্লিজ না মা

– ভার্সিটির  ছেলের এসব ঢং কিন্তু ভালো লাগেনা।

-প্লিজ

-দেখ, জ্বালাইস না।চুপচাপ খেয়ে ওষুধ খা।

ত্রাতুল খুবই বিরক্ত হয়ে টিভিটা ছেড়ে খেতে বসলো।আল্লাহই জানে আর কতদিন এসব খেতে হবে।হঠাৎ টিভিতে একটা এড দেখে ও খাওয়া বন্ধ করে দিলো।

“আমাকে ডাক্তারের সাথে দ্রুত কথা বলতে হবে।”

ত্রাতুল আজ অন্যদিনের চেয়ে আগেই পার্কে গিয়ে বসে আছে, মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষন পরই মেয়েটা আসলো।এসে বরাবরের মতো একটু দূরের বেঞ্চটায় গিয়ে বসলো।ত্রাতুল গিয়ে ওর পাশে বসলো। ও কিছু বলার আগেই মেয়েটা বলে উঠলো “ আসলে আমি সরি।আমি জানি আপনার অসস্তি হয়,স্বাভাবিক কেউ এমন পিছে পিছে ঘুরলে যে কারোই বিরক্ত লাগবে। আমি এমন করতাম না,কিন্তু কেন জানি নিজেকে থামাতেই পারি নাই।আপনাকে দেখলে না কেন জানি আমার…….

-তোমার মার  কথা মনে হয়?

মেয়েটার কথা শেষ করার আগেই ত্রাতুল বললো। মেয়েটা শুধু বড় বড় চোখে ত্রাতুলের দিকে তাকালো।চোখটা টলমল করছে।

সেদিন খেতে খেতে ত্রাতুল একটা এড দেখছিলো যে, একটা বাবুর কান্না তার দাদী, ভাই বোন, ডক্টর কেউই থামাতে পারছিলো না। শেষ মেশ একটা লোক কোলে নিয়ে আদর করতেই থেমে গেল।কারন লোকটার বুকে বাবুটার মায়ের হ্রদয়।যা মহিলা মারা যাওয়ার আগে ডোনেট করে গেছে।মায়ের হার্টবিটের শব্দ পেতেই বাবুটা শান্ত হয়ে যায়।

মেয়েটা তাকিয়েই আছে, ত্রাতুল বলতে শুরু করলো।

“ছোট থেকেই আমার হার্টে সমস্যা।ডক্টররা বলে ছিলো যদি ট্রান্সপ্লান্ট না হয় আমি ত্রিশ বছরের বেশি বাঁচতে পারবো না।

গতমাসেই আমার অপারেশন হয়।অনেক খোঁজাখুঁজি করে হাল ছেড়ে দেয়ার পর হঠাৎ একজন ডোনার এর সন্ধান পাওয়া যায়।আমার পরিবার দেরি না করেই অপারেশনটা করে ফেলে। আমি এতদিন সেই ডোনার কে চিনতাম ও না।তার সম্পর্কে জানতামও না।শুধু সেই মানুষটার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি আল্লাহর কাছে।  আমার সেই ডোনারের নাম কবিতা সরকার। এক্সিডেন্ট এ মৃত্যু উনার।মারা যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন যেন তার হ্রদয়টি দান করা হয়। তিনি ২ সন্তানের মা।উনার বড় মেয়ে ‘রেখা’, ডক্টর,যে আমার অপারেশনও ছিলো। আর ছোট মেয়ে ‘ছন্দ’ক্লাস  সেভেনে পড়ে। কোচিং ফাকি দিয়ে পার্কে আসে”

ত্রাতুল দেখলো মেয়েটা এবার নীরব শুধু চোখের পানি ফেলছে।

“তোমার মা অনেক মহান মানুষ, ছন্দ।”আমাকে কি কখনো তোমরা ক্ষমা করতে পারবে?

ত্রাতুল বললো।

“হুম” বলে মেয়েটা আবার কান্না করতেই থাকলো।

কাজটা ঠিক হবে কিনা ভেবেই ত্রাতুল হূট করে ছন্দের হাতটা বুকের মাঝে ধরে বললো “এটা তোমার মায়ের হ্রদয়, এই শব্দ কি তুমি শুনতে পাচ্ছো?”  ছন্দ এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো।কিছুক্ষন এভাবেই হাত রেখে বসে রইলো। এর পরা হঠাৎ করেই শক্ত করে ত্রাতুলকে জড়িয়ে ধরে বুকে কান দিয়ে শুনতে লাগলো। ওর মনে হলো অনেকদিন পর মার কাছে গিয়েছে। এবার ত্রাতুলের চোখ দিয়েও বন্যা বয়ে গেল।এভাবেই একটা মেয়ে অনেক দিন পর মা কে খুঁজে পেলো।পার্কে  অনেকেই ওদের দেখছে,যা তা না ভাবছে।মন্তব্য করছে।কিন্তু ত্রাতুলের তা গায়ে লাগছে না।সে শুধু এটাই ভাবছে যে দুনিয়ায় সব কিছু কত জটিল,ওর বেচে থাকায় আজ একটা মেয়ে মা হারা।থাক কিছুক্ষন মেয়েটা মায়ের হ্রদয়ের শব্দ শুনে নেক।

একটু পর ছন্দ উঠে দাড়ালো।এর পর জিজ্ঞেস করলো “আপনার নাম কি?”

-ত্রাতুল

– “ত্রাতুল,আপনি কি আমাকে প্রতি মাসে চিঠি লিখতে পারবেন?সামনের মাসে আমার ফাইনাল শেষ হলে আমরা জাপান চলে যাবো।আপু ওইখানে একটা হস্পিটালে আপুর চাকরি হয়েছে।”….. একটু চুপ থেকে আবার বললো “মা র চিঠি লেখা খুব পছন্দ ছিলো।এই যুগেও মা সবাইকে চিঠি আর চিরকুট দিতো।”

– হ্যাঁ, প্রতি মাসে কম হলেও দুইটা চিঠি দিব।

ছন্দ বাচ্চাদের মতো হেসে দিলো। বললো,আমি আজকে যাই,কালকে দেখা হবে। বলে হাঁটা দিলো। কিছু দূর গিয়ে  আবার ফিরে আসলো, এসে বললো “ আপনি এখন থেকে শুধু হেলদি ফুড খাবেন।আমি বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছি, তেল মশলা কম খেলে হার্ট ভালো থাকে। ঠিকাছে? “

ত্রাতুল মুচকি হাসি দিয়ে বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লো।

ছন্দ আবার একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো।

ত্রাতুল চুপ করে বসের রইলো। ওর মাথায় হিসাব মিলছে না।

আচ্ছা ও না পড়েছে যে অনুভূতি, ভালোলাগা, আদর, স্নেহ, টান মায়া মোহ এগুলা সব মস্তিষ্কের খেলা। তাহলে এই হ্রদয়ে কেন ছন্দ তার মাকে খুঁজে পেলো। আমি ত অন্য মানুষ। হ্যাঁ, তাই তো।আমিতো অন্য মস্তিষ্কের অন্য মানুষ। তাহলে আমার কেন এই মেয়ের জন্য মন এমন করে।ওকে দেখে আমার কেন অস্থিরতা হতো।হ্রদয় না হয় ওর মায়ের।কিন্তু আমি তো ত্রাতুল।আমার ছেলে মানুষের মস্তিষ্ক কিভাবে একজন নারীর মতো স্নেহ করতে পারে। এসব মস্তিষ্কের বিষয়। আমি জানি আমি পড়েছি।আমি ঠিক।

কিন্তু মেয়েটার জন্য আমি প্রটেক্টিকভ ফিল করছি।

আরেহ এসব কেন হবে?

কে ঠিক? হ্রদয় না মস্তিষ্ক ।

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
9
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Sabrina Mohammad Amin
3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!