একটা বয়সে আমি জানতাম আমার একটা বাড়ি হলে কেমন হবে। চকচকে দালান কোঠা, আভিজাত্য, যৌলুস আমার স্বপ্নেও আমাকে আকৃষ্ট করেনি কখনো। আমি মন ও মগজে চিরায়ত মধ্যবিত্ত মানুষ। আমার মাথার মধ্যে আমার যে বাড়িটা সাজানো, সেটা একটা মধ্যবিত্ত সাদাসিধে একতলা বাড়ি। মাটির খুব কাছাকাছি। জমির অর্ধেকের থেকেও কম জায়গা জুড়ে বাড়িটা আর উঠান ঘিরে গাছ গাছালি। কি কি গাছ থাকবে সে নকশাও আকা আছে মনে মনে।
যদি কোন নির্জন দুপুরে ভুল করে পৌছে যান কোনো কানাগলিতে। গলির শেষ মাথায় গাছ ঘেরা ছোট বাড়িটা আপনি দূর থেকেই চিনতে পারবেন সবুজ রং করা লোহার সদর দরজা দেখে। দরজার একপাশে মধুমন্জরী আর অন্য পাশ থেকে বাগান বিলাস এসে নুয়ে পড়েছে। বাড়িতে আপনাকে ঢুকতে হবে ছোট কেচি গেট খুলে। ঢুকতেই ইট বিছানো রাস্তা, রাস্তার দুপাশে মৌসুমী ফুলের সারি। বেশি হাটতে হবে না। দশ বারো পা ফেলে চলে আসবেন কালো শান বাধানো মেঝের বারান্দায়।
যেন সারা বছর ফুল ফোটে সেভাবেই গাছ বাছাই করা আছে এ বাড়ির উঠান ঘিরে। গ্রীষ্মে জারুল, বর্ষায় কদম আর সেগুন, শরৎ হেমন্তে শিউলি, শীতে জুই আর বসন্তে শিমুল। সেগুন গাছে যে খুব ছোট সাদা ফুল হয় দেখেছেন কখনো? বৃষ্টির আগে যখন বাতাস ভারী হয়ে আসে আর মাটি থেকে ভেজা গন্ধ আসে, তখন সবার আগে টের পায় সেগুন গাছের এই ফুল গুলো। একটু বাতাসেই ঝরে পরতে থাকে তুষারের মত। ঠান্ডা বাতাস আর সেগুন ফুলের সাদা হয়ে যাওয়া পিচঢালা রাস্তা – মুগ্ধ বিস্ময় দেখার জন্য খুব বেশী সময় পাবেন না। তার আগেই আপনাকে লন্ডভন্ড করে দেয়ার মত বৃষ্টি নেমে আসবে। এমন একটা গাছ কোনো বাড়িতে না থাকলে চলে? বাড়িতে জানালার ধার ঘেঁষে থাকবে দোলা চাপা আর বেলী। দুটো ফুল এক জানালায় না কিন্ত। ভিন্ন জানালার থাকতে হবে। না হলে সৌরভ আলাদা করতে পারবেন না। এই সব ফুল গাছ ছাড়াও অতি আবশ্যকীয় ভাবে থাকতে হবে একটা করে নিম, কাঠগোলাপ, মেহেদী আর বাবলা গাছ। বাবলা গাছটা থাকবে পশ্চিমে। বাবলা গাছের হলুদ ফুলের আড়ালে নেমে যাবে বিকেলের সূর্য।
গাছ ছাড়াও এই বাড়ির আকর্ষণীয় অংশ এর ছাদ।সন্ধ্যার পর বা মধ্যরাতে চাইলেই চলে যাওয়া যাবে ছাদে। ছাদে উঠলেই সিড়িঘরের সাথে থাকবে চিলেকোঠার ঘর। যে ঘরে আসবাব বলতে নিতান্তই একটি আরাম কেদারা। আর থাকবে বেতের বুক শেল্ফ ভরা বই। তেমন জাদরেল কোন সাহিত্য পুস্তক থাকতে হবে, তেমন না। বহুবার পঠিত প্রিয় সব মন কেমন করা বইগুলো। যে বইগুলোর যে কোনটি হাতে নিয়ে আলগোছে একটু চোখ বুলিয়ে নিলেই গল্পের অলি গলি সব মনে পড়ে যায়। চিলেকোঠা থেকে বের হলে দেখা যাবে ছাদটার দুটো অংশ। একভাগ একটু নিচু, আর এক ভাগ একটু উচুতে। যেসব রাতে আকাশ ভেঙে জোছনা নামবে বা তারাগুলো বেশী উজ্জ্বল থাকবে, সেই সব রাতে বসতে হবে ছাদের উচু অংশে। সময়টা লোডশেডিং হলে সবচেয়ে ভাল হয়। তাহলে কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমন্ডল কিংবা ক্যাসিওপিয়া বেশ একটু ঝালাই করে নেয়া যাবে। আর যদি মধ্যরাতের বৃষ্টিতে মন ভেজাতে ইচ্ছে করে, নিচু ছাদটাতে পা ঝুলিয়ে বসলেই হবে। চাইলে যেন বৃষ্টির পানি জমিয়ে ফেলা যায় সেই ব্যবস্থা করা থাকবে। কদম আর সেগুন গাছটা ঠিক এই ছাদের পাশটিতেই, একদম ছাদের উপরেই উঠে এসেছে যেন। ইচ্ছে হলে হাত বাড়িয়ে তুলে নেয়া যাবে এক তোড়া কদম। ছাদে বড় একটা পাত্রে চাষ করতে পারেন শাপলা বা কচুরিপানা। পানিতে বৃষ্টির ফোটা দেখতে দেখতে ধুয়ে নেয়া যাবে সব অভিমান। এই তো, কেমন লাগলো আমার বাড়ি?
অনেক অনেক বছর ধরে মনের মধ্যে একেছি বাড়িটা। এই বাড়ির সব ঘর,বারান্দা, উঠান, ছাদ এত স্পস্ট যে চোখ বন্ধ করে আমি সারা বাড়ি বেড়াতে পারি। এত বছর এই বাড়িটা ছিলো শুধুই আমার। ঠিকানা জানা ছিলোনা কারো। এত বছর পর, অন্য দেশ মাটিতে থাকাটা একরকম যখন পাকাপোক্ত হয়ে গেল, জেনে গিয়েছি এই বাড়িটা আমার কখনো বানানো হবে না। তখন মনে হলো দেইনা ঠিকানাটা বাতাসে ছড়িয়ে। আমার না হলো,অন্য কারো তো হতে পারে। কারো যদি ভাল ভাগে নিক না দখল। দাবী রাখবো না কোনো।
কানাডায় ফুল ফোটে চার মাস। খুব হিসেব করে ভেবেচিন্তে গাছ বাছাই করে বাগান করলে সেটা টেনে টুনে বড়জোর ছয়মাস হবে। গত কিছুদিন সে হিসেব করছিলাম, আর মনে পড়ছিলো আমার স্বপ্নবাড়িটা। যা কখনো বাস্তবে ধরা দিবে না। তাই ভাবলাম সবাই কে আজ ঠিকানা টা দিয়েই দেই।
একটা সময় পর্যন্ত খুব মন খারাপ হতো।
এখন আর হয় না। এই পুরো বিশ্বব্রক্ষান্ড তো একজনের ই বানানো। পৃথিবীর এক এক কোনায় এক এক রকম সৌন্দর্যে তিনি সাজিয়েছেন। তাই যে দেশে তিনি আমার রিজিক নির্ধারন করেছেন সে দেশের মাটি,হাওয়া বাতাসে, সে দেশের প্রকৃতিতে নতুন করে স্বপ্ন বুনছি। তবুও আজন্ম পরিচিত জল, মাটি তে যে স্বপ্নের নীড় বুনেছিলাম সেটার কথা দৈবাৎ ভাবতেও ভাল লাগে।
অবশ্য আজকাল আর দেশ কি বিদেশ, বৃষ্টি কি তুষার, জারুল বা লাইলাক, কোনকিছু ই আর পুলকিত করে না সেভাবে। অতি পার্থিব এই অপার সৌন্দর্য ছেড়ে চলে যেতে হবে সত্যিকারের ঘরে। নিজের শরীরের সমান লম্বা একটা ঘরে। সে ঘর সাজানোর যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছেনা। সেটা ভেবেই বিমর্ষ হই। সময় চলে যাচ্ছে যাপিত জীবন নিয়ে অহেতুক সব ব্যস্ততা আর প্রলোভনে। ঠিকানাহীন ঘরবাড়ি সাজাতে সাজাতে নিজেকেই ঠকাচ্ছি যেন প্রতিনিয়ত।




