মেজো আপার শ্বশুর বাড়ী, ছোটখাটো রাজবাড়ি।পুকুরপাড়ে লেবুবাগানের লেবুর ঘ্রাণ খুব করে আসছে নাকে।আপা মনে হয় ভেতরের ঘরে,আমি ধীরগতিতে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম,কেমন জানি আমার ভয় ভয় হচ্ছে।
মেজো আপার বাড়িতে এটাই আমার প্রথম আসা নয়,আরো কয়েকবার এসেছি,যতবার এসেছি,ততবার থাকতে চেয়েছি,কিন্তু আপা রাজি হয় নাই।আপাকে তো আমি বলি নাই যে,টুলুর সাইকেলের উপর আমার লোভ।টুলু হচ্ছে আপার ননদের ছেলে,সবাই ওকে খুব আদর করে।মার মুখে শুনেছি,টুলুর বাবা আপার ননদকে তালাক দিয়েছে।কেন দিয়েছে,তা মা কে আর জিজ্ঞেস করিনি।আমাদের সংসারের অবস্থা ভয়াবহ খারাপ।আমি মাত্র ক্লাস টেনে পড়ি,আমাদের পরিবারে আমি, আম্মা আর আব্বা, এ নিয়েই আমাদের সংসার।আমাদের আরো দুইজন ভাই ছিলেন,একজন মেজো আপার বড়,আরেকজন মেজো আপার ছোট,কিন্তু তারা জন্মানোর পর বেশিদিন দুনিয়ার আলো দেখে নাই,মাস ছয়ের মধ্যেই মারা যান,একজনের নাম রহিম,আরেকজন রুস্তম।
ইচ্ছে করলে আমি মেজো আপাকে বড় আপা ই বলতে পারি,কিন্তু আম্মা রাজি হন না,এভাবে নাকি আমরা আমাদের বাকী দুই ভাইকে ভুলে যাবো।নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এটাই হইতো বিলাসিতা,সকালের নাস্তার সাথে চা বিস্কুট এর মতো সুখ।
আমাদের আব্বাজান, বাজারের গলিতে আনাজপাতির ব্যবসা করেন,মাঝেমধ্যে আমি আব্বার সাথে সাহায্য করি,কখনো গাছের কাঁঠাল,কখনো গাছের পেয়ারা নিয়ে আব্বার পাশেই আমি বসতাম,সন্ধ্যা বেলায় পেয়ারা বিক্রি করে একপোয়া কেরোসিন আর হারিকেন এর সলতে কিনে আমি বাড়ি ফিরতাম।মেজো আপা ততক্ষণে পড়তে বসে যেত,আপার মেট্রিক পরীক্ষা,সেজন্যে আম্মা ওর জন্যে গাইয়ের দুধ আর আমাদের পিচ্ছি কালো মুরগীটা,যেইটা আপার উপবৃত্তির টাকায় কেনা,সেইটা গত সপ্তাহ থেকে ডিম দিচ্ছে,সেই ডিম সব আপার জন্যে বরাদ্দকৃত। আপা অবশ্য ডিম আমাকেই দিয়ে দিতো,আমার ডিম খুব পছন্দের ছিলো সেজন্যে।
আপা বলতো,বুলু তুই ডিমের খোসা ছাড়িয়ে দে আমাকে,আমি তখন ডিমের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে খোসায় আটকে থাকা ডিম খেতে খেতে পুরো ডিমই খেয়ে নিতাম।
আপা তখন খুব রাগ করে বলতো,পরের বার ডিম সেদ্ধর সময় আম্মাকে লবণ দিতে বলিস।আপা এসব জেনে বুঝেই করতো,এখন বুঝতে পারি।আমার মেজো আপা সবার সেরা।
একদিন রাতে আমার ঘুম ভেংগে যাওয়ায় দেখি,মেজো আপা ফারুক ভাইয়ের সাথে অন্ধকারে কথা বলছেন।ফারুক ভাই হলেন আমাদের গ্রামের মাতব্বরের ছেলে।
পড়ালেখা করে নাই,একটা বাইক নিয়ে সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই বাবা মা ও যেনে গেলেন,আপার স্কুল যাওয়া বন্ধু,মেট্টিক পরীক্ষাও দেওয়া হলো না।
একদিন আমি স্কুল থেকে ফিরে দেখি,বাড়ি ভরপুর মানুষ জন।
মেজো আপা সুন্দর একটা লাল শাড়ি পরে চেয়ারে বসা।পিছনেই রত্না আপা দাঁড়িয়ে আছেন।
আমি স্কুলের বই খাতা রেখে,পুলাউ মাংস খেতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
রাত দশটায় মেজো আপার বিয়ে হয়ে গেল।আমি শুধু বোকার মতো দেখে যাচ্ছিলাম।
কিছুই বুঝে উঠতে পারি নাই।
এভাবেই চলে গেল এক বছর,এর মধ্যে আপা একদিনের জন্যেও আমাদের বাড়িতে আসে নাই।
মেজো আপার সেই কালো মুরগী থেকে অনেকগুলো বাচ্চা হয়েছে।
সেগুলো আজ আমার হাতে,আপার জন্যে মা দিয়ে দিয়েছেন,পেয়ারা, লাউ,কিছুই বাকী রাখে নাই তিনি।
আপা এসব দেখে হয়তো খুব খুশি হবেন।আমাদের অভাবের সংসার,সেজন্যে অনেক কিছু আপাকে দিতে পারি না।রহিম পুতুর কাছে আমাদের যে ভিটা ছিলো,সেটা গত সপ্তাহে বিক্রি করে দিয়েছেন বাবা।দুলাভাই মোটরসাইকেল কিনবেন বলে বাইনা ধরেছেন।দুলাভাইয়ের বাইক কেনার টাকার জন্যেই মেজো আপা,শান্তাদের মোবাইলে ফোন দিয়েছিলো।মা সেদিন অনেক কান্না করেছিলেন।আমি মেজো আপার সাথে কথা বলতে পারি নাই,শান্তা তাদের মোবাইলটা নিয়ে গেল।
সেই টাকা নিয়েই এসেছি আজ,মা,বাবা,আমি
কোথায় থাকবো, আমার জানা নেই।বাবা ও হয়তো জানেন না।
গেইট থেকে ভেতরের দিকে যেতেই আমার চোখে পড়লো মেজো আপার সবচেয়ে পছন্দের বেলিফুলের গাছটা।গাছটা আমি আপাকে উপহার দিয়েছিলাম।আপা সেটা তার রুমের সামনে লাগিয়েছেন।
ফুল আসে নাই এখনো, কবে আসবে ফুল,মেজো আপার কাছে আমি থাকলে হয়তো সারাদিন এই প্রশ্নই করতেন।
আপার রুমের দরজা লাগানো, হালকা একটু ধাক্কা দেওয়াতেই দরজা খুলে গেল।
ও মা,চেয়েদেখি আমার মেজো আপা ফ্যানের সাথে ঝুলছেন।আপার বিয়েতে দেওয়া সেই সিল্কের লাল শাড়িতে।
আমার ভেতরটা কেমন জানি করছে,শত চেষ্টা করেও আওয়াজ করে কান্না করতে পারছি না।আরেকটু চেষ্টা করলেই হয়তো আমার গলার রগ ছিড়েখুঁড়ে যাবে।আমার নিষ্পাপ মেজো আপা কেন এমন করলো,ভাবতে ভাবতেই পুলিশের বড় একটা গাড়ি এসে আপাদের উঠোনে দাড়ালো।
আপার শাশুড়ী শুরু করে দিলেন,আওয়াজ করে বিলাপ।
আমি এদিক ওদিক তাকিয়েও দুলাভাইকে দেখলাম না।
আমি ফিরতি পথে,টুলুর সাইকেলের প্রতি আর আমার কোন আগ্রহ নেই,আপার বাসায় থেকে যাওয়ার ও আর ইচ্ছে নেই।
ভোরের আযানে আমার ঘুম ভেংগে গেল,আমি একদম ঘেমে গেছি,অপাশে তাকিয়ে দেখি,মেজো আপা পড়ছেন,আজ আপার মেট্টিক পরীক্ষা,আমাদের বাড়ির মেয়েদের মধ্যে প্রথম কেউ মেট্টিক দিচ্ছে।আম্মা ঘরে ঢুকলেন ডিম সেদ্ধ নিয়ে,মেজো আপা আমাকে ঢাকলেন,বুলু এইদিকে আয়,আপাকে ডিমের খোসা ছাড়িয়ে দিয়ে যা।
আমি হেসে দিলাম, মেজো আপা….
পুনশ্চঃ গল্পটি বিয়ের উপহার হিসেবে দেওয়া হলো অভিনেত্রী প্রসূন আজাদ কে।
যার বুলুর মতো একজন ভাই আছে।
সাদী আয়াত,দোহা,কাতার।
Send private message to author



