ক্লিপ্টোম্যানিয়াক পর্ব ১১

১১

বাসায় ফিরেই প্রথম যে কাজটা করলাম, সেটা হচ্ছে শম্পাদিকে ফোন করা। ওদিকে রিং বাজছে, আর এদিকে আবার বুকে হাতুড়ি। তিনবার রিং হওয়ার পরে ফোন ধরল শম্পাদি।

— বলো কেন ফোন করেছি?

শম্পাদি কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন

— এনগেজমেন্ট পেছালো নাকি?

হেসে ফেললাম। বললাম

— না। তার চেয়েও এক্সাইটিং একটা ঘটনা ঘটেছে।

— এনগেজমেন্ট নিয়ে একদম কোনরকম পাগলামি করবি না।

— টু লেইট শম্পাদি। অলরেডি করে ফেলেছি।

এবার সত্যিই আঁতকে উঠলেন শম্পাদি। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন

— কি করেছিস?

আমি তখন পুরোপুরি দুষ্টুমির মুডে। বললাম

— গেস কর।

এবার বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করলেন শম্পাদি। জিজ্ঞেস করলেন

— সেই চোরের খোঁজ পেয়েছিস?

এমন সময় মা ঢুকলেন ঘরে। ফলে উত্তর দিতে পারলাম না। মাউথপিসে হাত রেখে ফোনটা কান থেকে সরালাম। মা বললেন

— ওরা খবর পাঠিয়েছে। আঙ্গুলের মাপ চাইছে।

— দিয়ে দাও।

— বলছে বসুন্ধরা সিটিতে ভেনাস জুয়েলার্সে গিয়ে মাপটা দিয়ে আসতে।

মা কে এখান থেকে ভাগানো দরকার। ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালাম। আর মুখে বললাম

— ওকে। কাল সকালে গিয়ে দিয়ে আসব।

 আরও কিছু হয়তো বলতেন, আমি আবার কানে ফোন দিয়েছি দেখে চলে গেলেন। আমি  তখন রীতিমত উত্তেজিত। শুরু করলাম

— বিশ্বাস করবা না আজকে সকালে কি হয়েছে।

এরপরে যথারীতি সাইবার সেলে যাওয়া থেকে শুরু করে সব ডিটেইল বল্যতে শুরু করলাম। রেস্তোরাঁর ঘটনায় এসেছি এমন সময় শম্পাদি আমাকে থামালেন। 

— এই শোন, একটু পরে তোকে ফোন দিচ্ছি। 

মুডটাই নষ্ট হয়ে গেল। ফোনটা পাশে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই চেহারাটা ভেসে উঠল। সেই অবাক চাহনি মন থেকে যাচ্ছে না। শুরুটা করেছিলাম আমি…  

খুব দ্রুত কয়েকটা কাজ সেরে ফেলেছিলাম। ‘এক মিনিট’ বলে মিতুর কাছে থেকে অনুমুতি নিয়ে দ্রুত টিস্যু দিয়ে যতোটা সম্ভব পরিষ্কার করে হাত মুছলাম। বুকটা এখনও ধকধক করছে। সেই ছেলেই তো? এখনও সিওর না। একই হ্যাভারস্যাক অনেকেরই থাকতে পারে। তারপরও কেন যেন মন বলছে, ইট মাস্ট বি দ্যাট গাই।

টেবিলটা পার হলাম। ঘোরার সময় টের পেলাম হার্ট অসম্ভব জোরে বিট করছে, মনে হচ্ছে আশে পাশে সবাই শুনতে পাচ্ছে আমার হার্টবিট। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। এরপরে যখন চোখ খুললাম, দেখলাম বেশ মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করে যাচ্ছে। আমাকে এখনও লক্ষ্য করেনি। আমি নিজেও তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি নিজের লাককে। এভাবে, এই রেস্টুরেন্টে, হঠাৎ করে আবার দেখা হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। 

এনিওয়ে, তবে এখন কি করতে হবে, সেটা আমি জানি। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে ঐ টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম।

ছেলেটা ল্যাপটপে কাজ করছিল। আমি গিয়ে একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালাম। নেহাত গবেট না হলে বুঝতে পারবে, আমি ওর সাথেই কথা বলতে চাই। বুঝল মনে হল। চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। চোখে ‘হ্যালো’ টাইপ একটা সম্ভাষণ। অবশ্য অন্য কিছু হলেও আমি ঠিক এই কাজটাই করতাম। আমি তখন ভেরি মাচ ডেসপারেট। কোন রকম হেজিটেশান ছাড়া, হ্যান্ডশেকের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। 

— হাই, আমি মিনু

তাকিয়ে ছিলাম ওর চোখের দিকে। এক্সপ্রেশানটা কনফিউজিং। চিনতে পেরেছে কি না বুঝতে পারলাম না। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির একটা হাসি ঝুলিয়ে আমার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা নিজের হাতে নিয়ে হ্যান্ড শেক কমপ্লিট করল। 

এরপরে কি করব বা কি বলব, ভেবে আসিনি। শুধু জানি, এর সাথে একবারের জন্য হলেও কথা বলতে চাই। ঠিক যেভাবে নয় বছর আগে প্রলয়ের টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প করছিল। সোজা সেই টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেছিলাম

— আপনার নাম প্রলয়?

হতবাক প্রলয় কিছুক্ষণ কোন উত্তর দিতে পারেনি। বন্ধুবান্ধবরা কেউ কেউ তখন মুখ টিপে হাসছিল। দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে নোড করল। মুখে বলল

— ইয়েস।

এবার আমি পরের প্রশ্নটা, ঠিক একইভাবে করলাম। 

— আপনার বাড়ি খুলনা?

এবার আর ততোটা অবাক হল না। বুঝল, কিছুক্ষণ আগে করা ওর অ্যাকশানেরই রিয়াকশান হচ্ছে। চোখেমুখে একটা ইতস্ততঃ ভাব। কি বলবে ঠিক করতে পারছে না। আমি দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে স্থির চোখে প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। প্রলয়ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে ওর চোখে অ্যাপ্রেশিয়েশান ফুটে উঠল। ‘এই মেয়ের তো বেশ সাহস আছে’ টাইপ একটা এক্সপ্রেশান। এবার ঠোঁটে উঠে এলো সেই কিলার স্মাইল। বলল

— না। 

এবার আমি হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। মুখে বললাম

— নাইস মিটিং ইউ।

যতোটা চমকে ওঠার কথা, ততোটা চমকালো না। চোখে ফুটে ওঠা অ্যাপ্রেশিয়েশানটা তখনও। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে, নিজের হাতটা বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। এরপরে হয়তো আরও কিছু বলতে চাইছিল। সুযোগ পেল না। আমি হ্যান্ডশেক শেষ করেই ঘুড়ে যাই। এরপরে বেশ বীরদর্পে গটগট করে হেঁটে সেখান থেকে বেরিয়ে যাই। বুঝতে পারছি পেছনে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রলয় আর ওর বন্ধুরা।

এরপর আর আমার নিজের তরফ থেকে কিছু করতে হয়নি। টিপিক্যাল প্রেমিকের মত, এর কিছুদিন পরেই একদিন ক্লাস শেষ বেরিয়েই দেখি, প্রলয় হাজির। আগে লক্ষ্য করিনি বলে একেবারে মুখোমুখি পড়ে যাই প্রলয়ের। আমরা বান্ধবীরা তখন একসাথে। সেই অবস্থাতেই আমার দিকে এগিয়ে এলো। এরপরে সেই কিলার স্মাইল দিয়ে বলল

— তোমার সাথে একটু কথা আছে, সময় হবে?

বান্ধবীদের আর বুঝতে বাকী থাকল না, আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ইউনিভার্সিটির কমবেশি প্রত্যেকটা মেয়েরই এভাবেই শুরু হয় প্রেম। এরপরের কাহিনী বেশ গতানুগতিক। মুখে প্রপোজ না করলেও, ওর চোখ বলছে, বেশ ভালো রকম প্রেমে পড়েছে। আমার দিক থেকেও ‘হ্যাঁ’ ছিল। তাই আর সব জুটির মত শুরু হয়ে যায় আমাদের ডেটিং। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বিকেলে গ্রুপ স্টাডির নাম করে বাসা থেকে বেরিয়ে টিএসসি সামনে গল্প করা। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে কবিতাও লিখত। যেভাবে ইউনিভার্সিটির প্রেম হয়, সেভাবেই সবকিছু এগোতে থাকল। চলল প্রায় পাঁচ বছর। ঠিক যখন বিয়ের প্ল্যানিং হচ্ছিল, সেই সময়ে অঘটনটা ঘটল।

— আমি সৈকত।

আমি বরং বর্তমানে ফিরে আসি। ওর অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে আর সেই কিলার স্মাইলের জন্য খুব অল্প সময়ের জন্য নস্টালজিক হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে ভাসছিল নয় বছর আগের দিনগুলো। ছেলেটা নিজের নাম বলার সাথে সাথে হাতের ইশারায় বোঝাল, বসুন। আমি তখন ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি, আমাকে চিনতে পেরেছে কি না। মনে হচ্ছে পেরেছে। অন্ততঃ ওর চোখে আলাপ করার ইচ্ছে আছে। একেবারে অপরিচিত, উটকো মানুষের সাথে আলাপ না করতে চাওয়ার এক্সপ্রেশান ওটা না। অবশ্য আলাপের ইচ্ছের আরও একটা কারণ থাকতে পারে, আমি খুব না হলেও মোটামুটি সুন্দরী একটি মেয়ে।

এসব নিয়ে এখন ভাবা সম্ভব না। কিছুটা আলাপ হলেই বুঝে যাব, সেদিনের আমার সেই ভ্রু নাচানো, ‘কি হচ্ছে?’ এক্সপ্রেশানটা মনে আছে কি না। মনে হয় না ভুলেছে। বাট… 

যদি ভুলে থাকে? চিনতে না পেরে থাকলে কি করব? কাহিনীর এখানেই ইতি? 

কিছু একটা বলা দরকার। এখানে আসবার আগে খুব একটা প্ল্যানিং এর সময় পাইনি। ঘাড় ঘুরিয়ে যখন মিকি মাউসের ছবিওয়ালা হ্যাভারস্যাকটা দেখলাম, পুরো মন জুড়ে একটাই এক্সপেক্টেশান কাজ করছিল, যেন সেই ছেলেই হয়। ছেলেটা আমার দিকে পিঠ দিয়ে আছে। চেহারাটা বোঝা যাচ্ছে না। উঠে সামনে যেতে হবে। 

এনিওয়ে, ব্রেন বলছে, যা করার এক্ষুনি করতে হবে। বড় একটা নিঃশ্বাস নিলাম। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, নিজে থেকে কথা শুরু করব, না অপেক্ষা করব ও কিছু বলে কি না।

সেদিন যখন প্রলয় আমার দিকে তাকাচ্ছিল না, তখন এভাবে দুম করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, ওর বন্ধুদের সামনেই ওর মুখোমুখি হব। আর সেটা করতে গিয়ে এমনই অ্যাবসার্ড একটা অবস্থায় পড়েছিলাম নয় বছর আগে। এই মুহূর্তে বয়সটা উনিশ কুড়ি হলে হয়তো সেদিনের মত উদ্ভট একটা কিছু করতে পারতাম। কিন্তু এখন? এই রেস্টুরেন্টে? তাছাড়া, আমি তো জানিই না ছেলেটা কে, কি করে। আবার এটাও ফিল করছি, হাতে সময় নেই। ছেলেটা চোখে প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। 

কি বলব বুঝতে পারছি না। সামনের দিকে তাকালাম। মিতুও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ইশারায় বোঝালাম, প্লিজ একটু ওয়েট কর। আমার দৃষ্টি ফলো করতে ছেলেটা ঘুরল। দেখল পেছনের টেবিলে মিতু বসে আছে। এরপরে আবার ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল

— ইজ এনিথিং রং?

কেমন ফ্যাকাসে একটা হাসি দিলাম। যে কেউ দেখলে বুঝতে পারবে, আমি নিজেই জানি না কি বলতে চাইছি। মুখের ভাষাতেও সেই হেজিটেশান স্পষ্ট। কথা যখন বলতে শুরু করলাম তখন মুখ দিয়ে কি সব আবোল তাবোল কথা বেরোল। বললাম

— আ… আসলে… 

ছেলেটা এবার সুন্দর করে হাসল। দ্যাট কিলার স্মাইল। আর সেই দিকে তাকিয়ে সামথিং হ্যাপেন্ড ইনসাইড মি। মনে হল নয় বছর আগের আমি হয়ে গেছি। হঠাৎ করে মুখে ভাষা ফিরে পেলাম। এরপরে যে কাজটা করলাম, সেটা কোন সুস্থ মেয়ে করবে না। 

কাজটা কেন করলাম জানি না। দুইদিন পরে যার এনগেজমেন্ট, এমন একজন মেয়ের জন্য কাজটা বেশ দুঃসাহসিক, সেই সাথে হয়তো অন্যায়ও। কথাটা শুনে ছেলেটা যতোটা অবাক হবে ভেবেছিলাম, ততোটা হল না। বরং এই মুহূর্তে চোখে একটা মিটিমিটি হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কারণ একটু আগে ওর চোখে চোখ রেখে বেশ শান্ত গলায় বলেছি

— আই লাভ ইউ।

চলবে

– Razia Sultana Jeni

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
1
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!