নেহারী আমাদের প্রায় সকলেরই অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার। খাসীর নেহারীর চাইতে তুলনামূলক ভাবে গরুর নেহারীই লোকজনের কাছে বেশী প্রিয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নেহারী রান্না আর পরিবেশনায় ও পরিবর্তন এসেছে অনেক।
বলছি স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশের কথা। আমরা তখন শিশু কিশোর। গরুর পায়ের নলা/নেহারী তখন ও তুমুল জনপ্রিয় সারাদেশে। গরুর মাংস তখন ২/৩ টাকা প্রতি কেজি। স্বভাবতই পায়া ও অনেক সস্তা। তবে তখনকার পায়া গুলো এখনকার মত এত “কিপটুস” পায়া ছিলো না। পায়া গুলোর সাথে তখন বেশ কিছু মাংস ও থাকতো। আজকাল গরুর মাংসের দাম অনেক বেশী হওয়ায় দোকানীরা প্রায় ক্ষেত্রেই পায়া/নলা গুলো থেকে যথা সম্ভব মাংস ছাড়িয়ে নেন। তবে আমাদের ছোটবেলায় এ রকমটা ছিল না। আজকালকার নলাতে মাংসের তেমন অস্তিত্ব দেখা যায় না, আর নলার সাইজ গুলো হয় খুব ছোট ছোট। আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি নলার সাইজ অনেক বড় আর তখন নলাতে প্রচুর মাংস ও থাকতো।
সে সময়টাতে বড় বড় শহরের বাইরে কোথাও ফ্রিজ ছিল না। স্বভাবতই ঈদুল আযহার কোরবানীর পর মাংস সংরক্ষণের বিজ্ঞান সম্মত কোন ব্যবস্থা না থাকায় নলাগুলো তাৎক্ষণিক ভাবে রান্না করা হতো। তা ছাড়া ও মাঝে মাঝে লোকজন গ্রামের বাজার থেকে ও নলা কিনে নিয়ে আসতেন।
গ্রামাঞ্চলে তখন রান্নাঘরে মাদুর বিছিয়ে খাওয়া হতো। যেদিন বাড়িতে গরুর নলা রান্না করা হতো সেদিন খাবারের সময় রান্না ঘরে নানান রকমের আওয়াজ পাওয়া যেত। এই আওয়াজ গুলো ছিল মূলত সঠিক আর জুতসই ভাবে নলা খাওয়ার জন্য ছেলে, বুড়ো আর সব বয়সীদের নলার সাথে সংগ্রামের আওয়াজ।
সে সময় কালে নলা গুলোর সাইজ এমন ছিল যে এক টুকরো নলাই প্লেটের পুরো অংশ দখল করে নিতো। আমরা ছোটরা তখন বড় বড় টুকরো নলা নেয়ার জন্য মাঝে মাঝে বায়না ধরতাম। কিন্তু সমস্যা হতো এটা খাওয়ার সময়। শুরুতেই আমরা হাত দিয়ে নলা চেপে ধরে নলার খোলা দিকটা মুখে পুরে দিয়ে জোরে জোরে টান দিতাম যাতে করে নলার ভিতরে থাকা নরম অত্যন্ত সুস্বাদু জিনিসটা সহজেই বেরিয়ে আসে। এক্ষেত্রে আমাদের তিনটে সমস্যা হতো। প্রথমত, আমাদের হাতের তালু ছোট থাকার কারণে নলা ঠিকমত ধরতে পারতাম না। ফলত নলা মাঝে মাঝে হাত পিছলে প্লেটে বা মাটিতে পড়ে যেত। দ্বিতীয়ত, আমাদের মুখ দিয়ে টানার শক্তি কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ভিতরের নরম অংশের সবটুকু বের করতে পারতাম না। তৃতীয়ত, নলার সাইজ বড় হওয়ার কারনে আমরা মাঝে মাঝে মুখ পুরোপুরি হা করে ও নলা ঠিকভাবে মুখে পুরতে পারতাম না। এবার ভিন্নভাবে শুরু হতো আমাদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। এই পর্যায়ে আমরা ডান হাত দিয়ে নলাটাকে শক্ত করে চেপে ধরে বাম হাতকে মুষ্টিবদ্ধ করে তা দিয়ে দিয়ে ডান হাতের উপর জোরে জোরে আঘাত করতাম। কেউ কেউ আবার নলাকে টিনের প্লেটের সাথে সাথে জোরে জোরে আঘাত করে ও তা বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। এতে মাঝে মাঝে কাজ হতো, তবে সব সময় আমরা এ প্রচেষ্টায় ও সফল হতাম না।
অপেক্ষা করুন। দয়া করে অধৈর্য হবেন না। আমাদের কাছে এখনো আমাদের আরো কিছু পদ্ধতি মজুদ আছে। প্রথম পদ্ধতি গুলো থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল না পেলে আমরা একটি অ্যালুমিনিয়াম চামচের হাতলটা নলার ভিতরে ঢুকিয়ে দিতাম আর তা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে নিয়ে আসতাম থেকে যাওয়া বাকী অংশটুকু।
সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হতো তখন চূড়ান্ত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার হতো শীল/পাটা। নলাকে শীলের উপর রেখে পাটা দিয়ে তাতে জোরে জোরে আঘাত করে তা বড়রা ভেঙ্গে দিতেন। আর তারপর আমরা তা খেতাম।
এ পদ্ধতি আমরা ছোটরাই যে শুধু ব্যবহার করতাম তা কিন্তু নয়। বড়দেরকে ও দেখেছি এই পদ্ধতি গুলো ব্যবহার করতে। যখনই বাড়িতে নলা খাওয়া হতো, তখন রান্নাঘর থেকে নলার সাথে যুদ্ধের বিভিন্ন রকম আলামত লক্ষ্য করা যেত, পাওয়া যেত নানান রকমের শব্দ। কেউ মুখ দিয়ে লম্বা লম্বা টান দিয়ে নলার ভিতরের অংশ বের করার চেষ্টা করছে, কেউ নলার উপরের অংশ চুষে চুষে ওর থেকে রস বের করে খাওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ কেউ আবার নলার ভিতরে চামচ ঢুকিয়ে চেষ্টা করছেন ভিতরে অংশটুকু বের করার। কেউ কেউ আবার সব চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর রেগে আর বিরক্ত হয়ে নলা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন। নলা খাওয়ার সময় রান্না ঘরে প্রায়শই এরকম একটি যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। এত কিছুর পর ও কিন্তু নলা খাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোন ক্লান্তি ছিলনা, ছিলনা আগ্রহের ও কোন রকম ঘাটতি।
দিন বদলেছে। আজকাল নলা গুলোর সাইজ অনেক ছোট হয়েছে, নলার সাথে থাকা মাংসের অস্তিত্ব ও ধীরে ধীরে কমে আসছে। হোটেল রেস্তোরাঁ গুলোতে নলা পরিবেশনে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটেছে। আজকাল বাসা বাড়ীতে ও আমরা নলাকে ছোট ছোট পিস করে রান্না করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এতে করে আজকালকার প্রজন্মকে আমাদের মত এত যুদ্ধ আর সংগ্রাম করে নলা খেতে হয়না।
নলা সেকালে জনপ্রিয় ছিল। আর একালে ও তা সমানভাবে জনপ্রিয়। বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যবাহী নলা যুগ যুগ ধরে আমাদের কাছে একই রকম জনপ্রিয় খাবার হিসেবে টিকে থাকবে সেটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।
Md. Aowrangazeb Chowdhury
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১।





বেশ ভালো লাগলো পড়ে। 😁