চাতক

জাহানারা বেগম বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু দেখছেন কি-না বোঝা যাচ্ছে না। উনি সকাল এবং বিকাল দু’বেলাই এভাবে বারান্দায় এসে বসেন। বসে থাকতে দেখে মনে হয়, উনি কারও জন্য বোধহয় অপেক্ষা করছেন। আমি সকালে যখন বের হই তখনও তাকে বারান্দায় দেখি আবার বিকেলে যখন অফিস থেকে ফিরি তখনও তাকে বসে থাকতে দেখি। আমি অবশ্য দেখা হলেই কথা বলি। কথা গুলো খুবই সাধারণ যেমন, চাচি শরীর কেমন আছে অথবা কিছু কি লাগবে চাচি! এই সব কথা বার্তা। জাহানারা চাচি আর উনার প্রয়াত স্বামী কায়সার চাচা এই এলাকায় একসময় খুব জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। চাচা কলেজে অধ্যাপনা করতেন আর চাচি চাচার সংসার কে আলো করে রাখতেন। উনারা দু’জনই মানুষের অনেক উপকার করতেন। কার ছেলের মাধ্যমিকের ফিস জমা দেওয়া হয়নি, কার মেয়ের বিয়েতে টাকার কম পড়েছে অমনি কায়সার চাচা আর জাহানারা চাচি গিয়ে হাজির। পাড়ায় যেসব মহিলারা বাসা বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করতো, তারা জাহানারা চাচির কাছে টাকা জমা রাখতো। উনারা দু’জনই এলাকার সকলের অঘোষিত অভিভাবক। উনাদের তিন ছেলে দুই মেয়ে। সবকটি ছেলেমেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এক ছেলে শুধু দেশে আর বাকীরা সবাই বিদেশে। চাচা মারা যাওয়ার প্রায় সাত বছর হয়ে গেছে। সেই থেকে চাচি একা। বাড়ীতে একটা কাজের মেয়ে আর একটা ছেলে আছে। ওদের নিয়েই এখন উনার জীবন যাপন।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে দেখি যথারীতি চাচি বারান্দায় বসে আছেন। ” চাচি কেমন আছেন? “
—– ভালো, তা তুই কেমন আছিস? তোর বাচ্চারা ভালো আছে? ওদের অনেক দিন দেখি না। একদিন নিয়ে আসিস।
—– ঠিক আছে চাচি, ওদের নিয়ে আসবো। তা, আপনার কি কিছু লাগবে? লাগলে বলেন, আমি ফেরার পথে দিয়ে যাবো।
—– কিছু লাগবে না। এই যে তুই একটু কথা বলিস, এতেই মনটা ভরে যায়।
—– কি যে বলেন চাচি। আচ্ছা চাচি, আমি এখন তাহলে এগোই। দেরি হয়ে যাচ্ছে। পরে এক সময় আসবো।
—– ঠিক আছে যা, সাবধানে যাস।

কয়েকদিন খুব কাজের চাপ গেছে। জাহানারা চাচির সাথে ঠিক মতো কথা বলা হয়নি। আসলে গত দুইদিন দেখাও হয়নি। আজ অফিস শেষে ভাবলাম চাচির সাথে দেখা করে বাসায় ঢুকবো। পরে ঠিক করলাম, বাসায় ফিরে ফ্রেস হয়ে তারপর চাচির ওখানে যাবো। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ফ্রেস হয়ে চাচির বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি চাচি জ্বরে আক্রান্ত। দুই দিন হয়ে গেছে শুধু প্যারাসিটামল দিয়েই চলছে। আমি আর দেরী না করে চাচি কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার দেখে কিছু টেস্ট করতে দিলো আর বললো এমনিতে ভয়ের কিছু নেই। সিজনাল জ্বরই মনে হচ্ছে তবে শরীর খুব দূর্বল। একটু খেয়াল রাখবেন। আর টেস্ট গুলো করালে বোঝা যাবে অন্য কোন সমস্যা আছে কি-না?

গত দুইদিন ধরে চাচির টেস্ট গুলো করানো হলো। আজ রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। সন্ধ্যায় অফিস শেষ করে সব রিপোর্ট সংগ্রহ করে ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার সব রিপোর্ট দেখে বললেন, ” রিপোর্ট সব ঠিক আছে। তেমন কোন অসুবিধা নেই। তবে একটা বিষয় উনাকে খুব বিমর্ষ মনে হয়েছে। উনি আপনার কি হন?”
—– জ্বি, চাচি। মানে প্রতিবেশি চাচি।
—– উনার পরিবারে কেউ নেই?
—– আছে, তবে কর্মসুত্রে সবাই দুরে থাকে।
—– বুঝতে পেরেছি। তবে খেয়াল রাখবেন উনি যেন একটু হাসি খুশি থাকেন।

বাড়ী ফিরে রিনার সাথে বিষয় টা শেয়ার করলাম। রিনা সব শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো, ” আসলে চাচির ছেলেমেয়েরা গত তিন বছরের মধ্যে একটি বারের জন্যও কেউ আসেনি। অন্যদের কথা বাদ দিলাম তোমার বন্ধু যিনি, উনি তো ঢাকাতেই আছেন। উনিও তো আসেননি। এদিকে ফেসবুকে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর ছবি আপলোড দিতে কিন্তু ভুলেন না। যাই হোক কাল বিকেলে আমি বাচ্চাদের নিয়ে চাচিকে দেখতে যাবো। “
—— ঠিক আছে, তাহলে আমিও অফিস থেকে সরাসরি চাচির ওখানে চলে যাবো।

এরপর চাচির ওখানে পরপর বেশ কয়েকদিন যাওয়া হলো। চাচি আগের চাইতে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এরমধ্যে আমি বেশ কয়েকবার চাচির বড় ছেলে সুহৃদ এর সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ওকে পাইনি। আজ চাচির ওখানে গিয়ে দেখি চাচি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চাচিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছি। এমন সময় দেখি সুহৃদ এর ফোন, ” হ্যালো শফিক, তুই নাকি আমার খোঁজ করেছিলি? তা কি এমন জরুরী বিষয় যে তুই অফিস, বাসা সব জায়গায় ফোন দিয়েছিস?”
—— কেন তোকে কেউ কিছু বলেনি?
—– হ্যা, বলেছে। মায়ের একটু শরীর খারাপ হয়েছে, এতে এতো অস্থির হওয়ার কি আছে?
—— অস্থির হওয়ার কিচ্ছু নাই! চাচি একা থাকেন। উনার শরীর খারাপ হলে ডাক্তার কাছেই বা কে নিয়ে যাবে, একবার ভেবে দেখেছিস!
—— কেন বাড়ীতে এতো মানুষ ওরা কি জন্য আছে?
—— সুহৃদ, ওরা সবাই কাজের লোক। ওদের কিন্তু কোন দায় নেই।
—— আমি এখন অনেক ব্যস্ত। আমার পক্ষে এখন বাড়ী যাওয়া সম্ভব না।
——- সুহৃদ কিছু মনে করিস না, এখন হয়তো আসার সময় পাচ্ছিস না। কিন্তু এমন না হয়, তুই এলি ঠিকই কিন্তু কাউকে আর পেলি না।

আমি ফোন টা রেখেই বুঝতে পারলাম, বেশ বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। সুহৃদ এর সাথে এই কথোপকথন জাহানারা চাচি পুরোটা শুনেছেন। চাচি ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে আমাকে বললেন, ” শফিক তুই আর এ বাড়ীতে আসবি না। “
——- কেন, চাচি? আমি কি ভুল করেছি!
—— না, তুই আর আসবি না। আমার সেবা তোর কোন দায় না।
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ” আমাকে মাফ করে দেন চাচি। আমি আসলে তখন ওভাবে বলতে চাইনি।”
—— তুই কিছু ভুল বলিসনি। তুই তোর বাবা মায়ের সব দায়িত্ব পালন করেছিস। এমনকি বাবা-মা একা থাকবে এর জন্য তুই বাইরে পড়ার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও গেলি না। তোকে সবাই ইমোশনাল ফুল বলে খেপাত। এমনকি সুহৃদও তোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক হাসি ঠাট্টা করতো। কিন্তু তোর চাচা আমাকে সবসময় বলতো, তোর মতো ছেলেই হয় না। নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে বাবা-মায়ের জন্য থেকে গেলি।
——- আপনারাও তো আমার জন্য অনেক করেছেন। চাচা না থাকলে, এই চাকরি টা পাওয়া সম্ভব হতো না। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হলাম, তখন যে চাকরিই পাই সেটাতেই অনেক দুরে পোস্টিং হয়। ও সময় আমি ভীষণ ভাবে ভেঙে পড়ি। তখন চাচা আমার পাশে এসে দাঁড়ান। চাচার সুপারিশে আমার এই চাকুরি। আপনি আমার দায় না চাচি, আপনি আমার দায়িত্ব।
এই কথা বলে আমি চাচির পায়ের কাছে বসে কাঁদতে থাকি। আর চাচি একদম ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছেন। একসময় নিরবতা ভেঙে চাচি বলে উঠলেন, ” এখন বাড়ী যা।”

চাচির ওখান থেকে এসে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। রিনা আমার চেহারা দেখে কিছু আর জিজ্ঞেস করলো না। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রিনা বললো, ” অতো চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আজ একটু সকাল সকাল অফিসে যেতে হবে। রিনা কে বললাম, ” আমার জন্য এখন আর নাস্তা বানানোর দরকার নেই। শুধু এককাপ চা দাও। আমাকে এখুনি বেরোতে হবে। “
—– খালি পেটে যাবে। আমি বরং ডিম পোঁচ করে দিই। একদম খালি পেটে শুধু চা খেয়ে বের হয়ো না।

অতঃপর ডিম পোঁচ আর চা খেয়ে পৌনে সাতটা নাগাদ বাসা থেকে বের হলাম। বাসা থেকে বের হয়ে একটু সামনে এগোতেই দুর থেকে দেখতে পাচ্ছি চাচি বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন। কি মনে করে চাচির বাসায় ঢুকলাম। ঢুকে সোজা দোতলায় চাচির বারান্দায় গিয়ে দেখি চাচি একদৃষ্টিতে পথের দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারলাম চাচি সকলকে দায়মুক্ত করে গেছেন।

ঝাপসা চোখে চাচির দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে দেখি একটা গাড়ী এগিয়ে আসছে।

© শোয়াইব আহমদ।

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
1
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Shoaib Ahmad
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!