১২
বের হওয়ার কথা ছিল এগারোটায়, কিন্তু কিভাবে যেন বেরোতে বেরোতে একটা বেজে গেল। কাজ একটাই, বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে আঙ্গুলের মাপ দিয়ে আসা। অবশ্য সোহরাব সাহেব আজ সকালে ফোন করে আনঅফিসিয়াল একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। কোন আংটি পছন্দ হলে কথাটা যেন ওখানে এক সেলসম্যান রনিকে ব্যাপারটা জানাই। উনার প্রস্তাবের ব্যাপারে কি করব, এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি। আপাততঃ প্রথম কাজ, এখানে এসে আঙ্গুলের মাপ দেয়া।
দ্বিতীয় আরেকটা কাজও আছে। যদিও আমাদের তরফ থেকে, আই মিন, ছেলের কোন এনগেজমেন্ট হবে না, তাই ভেবেছি আমাকে আংটি পড়াবার পরে আমিও একটা আংটি পড়াব। নিজের টাকাতেই কিনব সে আংটি। আজ দুটো কাজই সারব। সেকারণেই একবার ভেবেছিলাম, শম্পাদিকে ডেকে নিই। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। বেশ কিছুদিন ছুটি নিতে হয়েছে। এখন আবার একদিন ছুটি চাইলে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম একটু বিরক্ত হবেন। আর তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে। বলছি।
গতকাল রাতের দিকে ঘটনাটা ঘটে। খুব ইম্পর্ট্যান্ট না। তারপরও ব্যাপারটা একেবারে ফেলে দেয়ার মত না। আর কেন যেন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রলয় ফোন করেছিল। ব্যাপারটার পেছনে মিতু থাকলেও, পুরোপুরি মিতুর রিকোয়েস্টে করেছে এমন না। সেদিন যখন রেস্টুরেন্টে আমার ক্লিপ্টোম্যানিয়ার কথা বলেছিলাম, তখনই জানতাম, এমন একটা কিছু ঘটবে। মিতু গিয়ে জানাবে প্রলয়কে। প্রলয়ের তখন অনুশোচনা হবে। দেন, একটা সরি এপিসোড ঘটবে। মিতু চাইলে ব্যাপারটা চেপে যেতে পারে, কিন্তু আমার মন বলছিল, মেয়েটা এমন করবে না। বুদ্ধিমতী। জানে, প্রেমিককে বেঁধে রাখা যায় না।
হলও তাই। সন্ধ্যা সাতটার দিকে মোবাইলে ফোনটা আসল। আননোন নাম্বার। আমার এই রোগ বেশ পুরনো। আননোন নম্বর দেখলেই শুরু হয় গেস ওয়ার্ক। কে হতে পারে। এই মুহূর্তে আমার গেস ওয়ার্কের লিস্টে এক নম্বরে থাকছে, সেই কিলার স্মাইল ওয়ালা ক্লিপ্টো। কেন যেন মনে হচ্ছে কোনভাবে আমার মোবাইল নাম্বার যোগাড় করে ফোন করবে। আর সেদিনের ‘আই লাভ ইউ’ ইভেন্টের পরে তো কেমন যেন একটা বদ্ধ ধারণা হয়ে গেছে, ‘হি উইল কন্টাক্ট মি’।
যদিও বদ্ধ ধারণাটার পেছনে তেমন কোন লজিক নেই। সেদিন ছেলেটা তেমন কোন রেসপন্স দেখায়নি। আমার ‘আই লাভ ইউ’ বলার পরের রিয়াকশানটা ছিল একটা ‘তাই?’ টাইপ। আমরা মেয়েরা কোন প্রেমের প্রস্তাব পেলে যে রিয়াকশানটা দিই, সেরকম। যখন চাই, ঝুলিয়ে রাখতে, তখন যেমন, ‘ভেবে দেখি’ অ্যাটিচ্যুড দেখাই, সেরকম রিয়াকশান ছিল।
কেমন একটু অপমানে লেগেছিল। দোষ আমার, স্বীকার করছি। এভাবে লাফিয়ে গিয়ে, আই নো, ইট লুকস অড, বাট… আসলে তখন আমি ঠিক আমি ছিলাম না। নয় বছর আগে ফিরে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রলয়ের কথার কাউন্টার দেয়ার জন্য যে ব্যাপারটা ঘটিয়েছিলাম, যেটা আমাকে’ড্যাম কেয়ার’ মেয়ের তকমা দিয়েছিল, আজ সেটাই দিল ‘হ্যাংলা’ মেয়ের তকমা।
এটাই একটা মেয়ের লাইফ। বিধি নিষেধ এবং অন্যে কি ভাবল, সেটা নিয়ে ভেবেই সময় যায়। তবে কেন যেন একটা ভালোলাগাও কাজ করছে। অনেক দিন পরে, নিজের ইচ্ছেমত কিছু একটা করেছি। শম্পাদিকে কথাটা বলিনি। জানি বকা দেবে। ব্যাপারটা দেখেছে শুধু মিতু। আমার আওয়াজ ওর কানে গেছে কি না, জানি না। গেলেও সমস্যা নেই। ওর সাথে যেহেতু আর দেখা হওয়ার সুযোগ নেই, তাই, প্র্যাক্টিক্যালি আমি ছাড়া আর কেউ জানে না সেই ঘটনাটা।
যাইহোক, কার ফোন এসেছে, সেই লিস্টের দ্বিতীয় জন ছিল প্রলয়। মিতুর কাছে সব শোনার পরে ‘সরি’ বলতে ফোন করতে পারে। মিতুকে সব খুলে বলার পেছনে আমার সাবকনসাস মাইন্ডে এমন কোন প্রত্যাশা কি ছিল? নট সিওর। হয়তো।
তবে প্যাচ আপের কোন চিন্তা ছিল না। বরং ওদের প্যাচ আপ হোক, এটাই চাইছিলাম। ফোনটা রিসিভ করার পরে নিজে থেকে কোন কথা বলিনি। অপেক্ষায় ছিলাম, ওদিকে কে। ‘হ্যালো’ আওয়াজটা শোনার পরে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়। প্রলয়ের গলা। কিছুটা হতাশ হলেও, একটু আনন্দও লেগেছিল। উত্তর দিলাম
— হ্যালো
— আমি প্রলয়
— জানি। বলো
— তুমি রেগে আছো?
— কিছু বলার জন্য ফোন করেছো?
গলার আওয়াজ ইচ্ছে করেই কি শীতল রাখলাম? জানি না। রাগ কাজ করছে? হয়তো। কিছুটা অবাক লাগছে। ভেবেছিলাম দ্যা স্টোরি ইজ ওভার। আই মুভড অন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, দেয়ার ইজ সাম স্কোর টু সেটল। আমি তাহলে অপেক্ষায় ছিলাম, কবে ও সরি বলবে, আর আমি মিসবিহেভ করে সেদিনের শোধ নেব?
নিজেকে কন্ট্রোল করা জরুরী। প্রতিশোধ নেব না। তবে ভূমিকা শুনতেও বিরক্ত লাগছে। ঠিক করলাম, যদি সত্যিই ও সরি হয়, তাহলে চুপচাপ সরি শুনব। ওকে ওর নতুন লাইফের জন্য কংগ্র্যাচুলেট করব। অ্যান্ড, চ্যাপ্টার ক্লোজ করব।
যদিও আমার কাটা কাটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছে, মূল পয়েন্টে আসতে, তবে সেটা করেছি বাধ্য হয়েই। ও কিছু ভূমিকা করতে চাইছিল। সেটা শোনার মুড ছিল না। প্রলয় বোধহয় আমার শীতল আওয়াজ এক্সপেক্ট করছিল। প্রিপেয়ার্ড ছিল। অভিমান ভাঙ্গাবার জন্য তাই আবার ট্রাই করল।
— বিরক্ত ফিল করছো?
ওকে বোঝানো দরকার, এটা অভিমান না। বেশ কিছুটা নরম হয়েই বললাম
— না। যে কারণে ফোন করেছো, সেটা বললে খুশি হব।
— এমনি ফোন করতে পারি না?
এই টিপিক্যাল এক্সকিউজগুলো ভালো লাগে অভিমান পিরিয়ডে। এই মুহূর্তে বিরক্ত লাগছে। এরপরে কি কি বলবে, সেটাও যেহেতু জানি, তাই শোনার খুব একটা ইচ্ছে নেই। জানি রাগ দেখানো মানেই হচ্ছে এখনও অভিমান করে আছি। তাই বিরক্তি কোন রকমে চেপে নরম স্বরেই বললাম
— আমি আসলে একটু ব্যস্ত। যা বলার দ্রুত বলে ফেললে উপকার হয়।
ও কি ভাবল জানি না, তবে এবার কথাটা কাজে দিল। দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। বোধহয় বুঝল, কাহিনী তিন বছর আগের মুহূর্তটায় আটকে নেই। ফলে এরপরের কথাটা হল বেশ প্রেসাইস।
— সরি।
আরও কিছু বলবে ভেবেছিলাম, কিন্তু বলল না। মনে হচ্ছে এবার ওদিকে শুরু হতে যাচ্ছে অভিমান পর্ব। ‘আমি তো সরি বললামই, আর কি করার আছে?’ রিয়াকশান আসন্ন। কিংবা হতে পারে আমার কর্কশ রিয়াকশানের ভয়। যদিও বুঝে গেছি এবারের সরিটা তিন বছর আগের জন্য, তারপরও ক্লিয়ার হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম
— ফর?
— ফর দ্যাট ডে। আমি আসলে জানতাম না তুমি ক্লিপ্টো…
— ইট’স ওকে।
বুঝে গেছি। আর শোনার দরকার নেই, বা ইচ্ছেও নেই। ‘জানলে কি করতে’ কিংবা ‘কেন জানতে চাইলে না’ টাইপ কথা হয়তো বলতাম, যদি ফোনটা আজ থেকে তিন বছর আগে আসত। অন্ততঃ প্রেমটা বেঁচে থাকা কালীন আসলে। এখন ইচ্ছে করল না। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, কথাগুলো শুনে যতোটা আনন্দ হবে ভেবেছিলাম, হল না। বরং মিতুর জন্য ভয় লাগল। আমার প্রতি প্রেম জেগে গেলে, ওর সাথে না আবার ফাইনাল ব্রেকাপ হয়ে যায়। ও রিয়াক্ট করার আগেই তাই বললাম
— সেদিনের ঘটনা নিয়ে কোন গিল্ট রেখো না। তোমার অবস্থায় আমি থাকলে, হয়তো আমিও একই ভাবে রিয়াক্ট করতাম।
কথাটা কি বেশি সফট হয়ে গেল? কোন কি হিন্ট দিলাম? এরপরে কথা শুনে মনে হল পরেরটা ভেবেহচে প্রলয়। এরকম কিছুর অপেক্ষায়ই বোধহয় ও ছিল। বলল
— একবার দেখা হতে পারে?
একবার ভাবলাম ‘না’ বলে দিই। দুইদিন পরে এনগেজমেন্ট। এখন এধরণের ঘটনা শুধু শুধু কনফিউশান তৈরি করবে। ওকে একটা ভুল সিগন্যাল দেবে। আবার ভাবলাম, ওকে ক্লিয়ারলি বোঝানো দরকার যে আই মুভড অন।
— আগামীকাল বসুন্ধরা সিটিতে যাব। এগারোটা নাগাদ। চাইলে দেখা করতে পার।
— ওকে।
এই ছিল গতকালের ছোট্ট ঘটনাটা। আজ এখানে এসে তাই এক্সপেক্ট করছি, ও এসে হাজির হবে। এক্সিলারেটরে উঠতে উঠতে এদিক ওদিক তাকালাম। ওকে ইচ্ছে করেই বলিনি, কোন দোকানে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম নিজে থেকে জানতে চাইবে। চায়নি। ফোন রেখে দেয়।
জানতে আনা চাওয়ার কারণ হতে পারে ভয়। অবশ্য আমার শীতল গলা শুনে। তবে না জানলে এত্তো বড় শপিং মলে দেখা করবে কোথায়? সকাল থেকে কোন ফোনও করেনি। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা তাই একটু অবাক লেগেছে। কিছুটা ইন্সাল্টিং ও। দেখা করার কি তাহলে কোন ইচ্ছা নেই?
পৌঁছে গেছি। স্লাইডিং ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। প্রায় ফাঁকা। এদিক ওদিকে তাকালাম। রনি নামক সেলসম্যানের খোঁজ করব? কেমন যেন রুচিতে লাগল। কোন আংটি পছন্দ হয়েছে, একথাটা ওকে বলা মানেই তো সোহরাব সাহেবের কাছে চাওয়া। অল্প হলেও নিজে তো ইনকাম করি। অন্যের কাছে কেন একটা আংটি চাইব?
একজন মেয়ে সেলসম্যান খুঁজলাম। দুজন আছে। ইচ্ছে করেই ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম। সামনে রাখা উঁচু চেয়ারটায় বসলাম। ছেলেদের আংটি দেখাতে বললাম। ভদ্রমহিলা প্রাইস রেঞ্জ জানতে চাইলেন। বললাম। উনি গ্লাস টপ কাউন্টারের ওপর দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন একটা রো। আমি যেগুলো পছন্দ করব, সেগুলো বের করে দেখাবেন।
মনে মনে সোহরাব সাহেবকে চিন্তা করার চেষ্টা করলাম। আঙ্গুলের দিকে কি তাকিয়েছি? বেশ কনফিউশানে পড়লাম। সেই মিঃ রনির সাহায্য কি নেব? উনি যেহেতু চেনেন সোহরাব সাহেবকে, একটা আইডিয়া দিতে পারবেন। কি করব ভাবছি। এদিক ওদিক তাকালাম। বেশ কিছু পুরুষ সেলসম্যান। এদের মধ্যে কে রনি?
— এখানে রনি নামে কেউ আছেন?
সাথে সাথে বেশ হুলস্থূল পড়ে গেল। ‘আপনিই মিস মিনু?’ বলে মহিলা আমাকে অন্য একদিকে আসতে বললেন। বুঝলাম, আমার জন্য স্পেশাল কোন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে যেতে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু তার আগে আমার আংটি কিনতে হবে। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। কি করব বুঝতে পারছি না। হঠাৎ সামনে রাখা আয়নাগুলোর একটায় চোখ পড়ল। নেকলেস কিনতে আসা মেয়েরা নেকলেস গলায় দিয়ে এটায় নিজেদের দেখে।
ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। ঠোঁটের কোণে সেই কিলার স্মাইল।
চলবে
Razia Sultana Jeni
Send private message to author





