মুখ ও মুখোশ

[সব মিথ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অজানা কিছু সত্য]

দাদা দুটো পয়সা ভিক্ষে দিবেন?
আচমকা রাতুলের পেছনে একটা ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলাতে কিছুটা চমকে উঠলো রাতুল। সাধারণত ভিক্ষুকেরা ভিক্ষা চাইলে বাবা অথবা অন্য কোনো কিছু সম্মোধন করে কিন্তু এই ভিক্ষুকটি সরাসরি দাদা বলে বসলো। আর বলার ভঙ্গিটাও কেমন যেন অপরিচিত। কেমন যেন ওপার বাংলার একটা টান আছে। সাধারণত রাতুল ভিক্ষুকদের ফিরিয়েই দেয়। নিজের খরচই ঠিক মতো চলে না তার ওপর সিগারেটের খরচ যায় এক্সট্রা কিন্তু এই লোকটাকে ফিরিয়ে দিতেও ইচ্ছে করছিল না তার। এদেশে দিনশেষে লোকে সবচেয়ে বেশি ভিক্ষুকদের কাছে মাফ চায়। সে নিজেও অনেকবার চেয়েছে। এবার আর চাইলো না। হাতের সিগারেটটা মুখে দিয়ে মানিব্যাগ বের করলো। কচকচা দশ টাকার একটা নোট বের করে লোকটার সামনে ধরলো। লোকটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে বললো, দাদা দুদিন ধরে কিছু খেতে পারছি না যদি দয়া করে আর দুটো টাকা বাড়িয়ে দিতেন তবে কিছু খেতে পারতাম আর কি!
লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে রাতুল৷ সে নিশ্চিত হয় ইনি নিশ্চয়ই ভারত থেকে আসা কেউ। কারণ এদেশের ভিক্ষুক হোক অথবা সাহায্য প্রার্থী পাঁচ বা দশ টাকা দেওয়ার পরে আর দ্বিতীয়বার মুখ দেখাতো না। অবশ্য এখন আরেকটা সম্প্রদায়ের বিস্তার বেশ চোখে পড়ে। এ নিয়ে একটা কলামও লিখতে চেয়েছিল রাতুল কিন্তু সম্পাদক আজমল সাহেব তা নাকচ করে দিয়েছিলেন। কারণ ওপর মহলে এর প্রভাব না কি বেশ শক্ত। লোকটাকে দেখে তার মায়া হচ্ছে। একটু আলাপ করার নেশা চেপে বসলো রাতুলের মধ্যে। এমনিতেও বিকেলের আগে তেমন কোনো কাজ নেই৷ একজন লেখকের একটা ইন্টারভিউ নেয়া ছাড়া। রাতুল লোকটার দিকে ভালো করে তাকালো। ছেঁড়া একটা প্যান্টের পুরোটা কাঁদায় মাখামাখি। জুতার মধ্যে কয়েকটা সেলাই। শার্টের তিনটা বোতাম এলোমেলো করে লাগানো। চুল গুলো অস্বাভাবিক রুক্ষ। দাড়ি আর গোঁফে মুখ ঢেকে গেছে। এরকম দেখালেও লোকটার গা থেকে কোনো গন্ধ আসছে না। হয়তো সিগারেটের জন্য রাতুল টের পাচ্ছে না। হতেও পারে। ইদানীং গন্ধ জিনিসটা তার নাকে তেমন আসে না। খাবারের স্বাদও তেমন একটা পায় না।
লোকটার একটা জিনিস রাতুলের খুব বুকে বিধে। শুষ্ক চেহারায় একটা মায়া খেলা করছে লোকটার মুখে।। তারচেয়েও বড়ো বিষয় হচ্ছে লোকটার চোখটার রঙ অস্বাভাবিক কালো। সচারাচর এমন কালো চোখ দেখা যায় না। রাতুল পকেটের টাকা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললো, আপনাকে আমি নাস্তা খাওয়াতে পারি যদি আমার সাথে গল্প করেন তবে।
লোকটা প্রথমে বুঝলো না বিষয়টা। ভাবলো হয়তো রসিকতা করছে তার সাথে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো রাতুলের দিকে। রাতুল বিষয়টা বুঝতে পেরে লোকটার কাঁধে হাত রেখে বললো, চলুন ঐ বট গাছটার তলায় বসা যাক। নাম কী আপনার?
লোকটা এবার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললো, জি আমার নাম অরুণ ঘোষ। আপনার?
রাতুল বললো, আমার নাম রাতুল আহমেদ। আচ্ছা আপনাকে দেখে এপার বাংলার মনে হচ্ছে না। কোথায় থাকেন আপনি? প্রশ্নটা করেই রাতুল জোরে একটা চা ওয়ালাকে ডাক দিল।
লোকটা রাতুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, জি আমি এপার বাংলাতেই থাকি। আমার জন্ম এই এদিকেই।
রাতুল অভয় দিয়ে বললো, ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমি আপনার পাসপোর্ট দেখতে চাইবো না। বলুন সবটা খুলে। আপনি কী করেন, কোথায় থাকেন কীভাবে এলেন এসব কিছু। আচ্ছা তার আগে এটা বলুন কী খাবেন? চায়ের সাথে যা মন চায় খান। এখানে দোকান কম ফেরিওয়ালা বেশি। যা ইচ্ছে হয় খান বিল আমিই দেবো। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে রাতুল বললো, খান আর বলুন ঘটনাটা।
লোকটা ফেরিওয়ালাকে দুটো কেক আর পাউরুটি দিয়ে চা দিতে বললো৷ তারপর রাতুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি বুঝলেন কীভাবে যে আমি এপার বাংলার না?
রাতুল সিগারেটে টান দিয়ে বললো, আপনার বলার ভঙ্গিটায় একটা ওপার বাংলার টান আছে৷ অবশ্য সেটা এড়ানোর অনেক চেষ্টা করেছেন আপনি কিন্তু লাভ হয়নি। তাই ধরে ফেলেছি এবার বলুন ঘটনাটা।
লোকটা এবার আমতা আমতা করতে লাগলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলা শুরু করলো, আগেই বলেছি আমার নাম অরুণ ঘোষ। ঢাকায় এসেছিলাম এক বন্ধুর কাছে কাজ খুঁজতে। কাজ পেয়েও ছিলাম কিন্তু হঠাৎ মালিকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। যার হাত ধরে এসেছিলাম সে আমাকে রেখেই চলে যায়। হাতে তেমন টাকা পয়সা ছিল না। ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। তারপর আর কোথাও কাজ পাইনি৷ একবার একজায়গায় খুঁজতে গিয়েছিলাম তারা আমার স্বর শুনে পুলিশে ফোন দেয় পরে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর থেকে এদিক সেদিক থেকে ভিক্ষা করেই খাচ্ছি।
রাতুল দেখলো লোকটা কাঁদছে। হালকা পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, আপনি কোথায় থাকেন? মানে কোথায় দাঁড়িয়ে বেশিরভাগ ভিক্ষে করেন?
অরুণ ঘোষ নামের লোকটা এবার রাতুলের দিকে তাকালো৷ তারপর মিনমিন করে বললো, এই এখানেই থাকি। কেন বলুন তো?
রাতুল সিগারেটের ধোঁয়া বের করে বললো, দেখুন আমি একজন সাংবাদিক। যদি কিছু করতে পারি তবে আপনাকে জানাবো। যেহেতু আপনি এখানে থাকেন সেহেতু জানাতে সুবিধা হবে। রাতুল খেয়াল করলো সাংবাদিক বিষয়টা বলাতে একটু ঘাবড়ে গেছে লোকটা। আবার অভয় দিয়ে বললো, চিন্তা করবেন না। আপনাকে কোনো ঝামেলার মধ্যে আমি ফেলবো না। এই একশো টাকা রাখুন। পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে দিল রাতুল। নোটটার দিকে চোখ পড়তেই খেয়াল হলো রাতুলের। তার কারণ নোটটার পেছনে একটু রহস্য ছিল। এই নোটটা অনেকদিন আগে মায়া তাকে দিয়েছিল। এতদিন মানিব্যাগেই ছিল। যেহেতু টাকাটা বের করেই ফেলেছে সেহেতু আর দ্বিধা করলো না সে দিয়ে দিল।
লোকটা টাকাটা নিয়ে তেমন উচ্ছ্বসিত অনুভব করলো না। শুধু বললো, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
রাতুল বললো, আচ্ছা আজকে চলি আমার কিছু কাজ আছে৷ আপনার জন্য কিছু করতে পারলে আবার আসবো। রাতুল উঠে পড়লো৷

আজকে তার একটা ইন্টারভিউ আছে। দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক সে। তার কপালটা অন্যান্যদের মতো অত ভালো না। অন্যান্য সবাই ভালো ভালো কন্টেন্টে সাংবাদিকতা করে আর সে পায় এর ইন্টারভিউ নয়তো ওর ইন্টারভিউ। রাতুলের কাছে এই জিনিসটা বিরক্তিকর লাগে। শোবিজ পার্টে তাকে সাংবাদিকতা করতে দেওয়া হয়েছে। এ সবই যে আজমল সাহেবের চক্রান্ত তা সে ভালো করেই জানে। নিজের ভাতিজাকে ফ্রন্ট লাইনে রেখে কাজ করায়। মাঝে মাঝে রাতুলের মনে চায় ভাতিজা আর চাচাকে মেরে পুরো সংবাদপত্রটা হাতিয়ে নিতে। কিন্তু পুলিশের ভয়ে করে না। আজকেও তেমনই একজনের ইন্টারভিউ নিতে হবে। প্রতীয়মান লেখক ও কথা সাহিত্যিক এম কে নুরুল হুদা। তার কেমন চলছে কি করছেন এসব বোরিং বিষয় নিয়েই ইন্টারভিউ। রাতুল বিশ্বাস করে লেখকদের পুরো জীবনটা একটা বোরিং জীবন। এরা শুধু লিখালিখি করেই যায়। না পারে জীবনের কিছু শিখতে না পারে বুঝতে। মিথ্যে কিছু কল্পনা লিখে আর সেই লেখা থেকে টাকা পায় আর ভাবে যেন কত বড়ো কাজ করে ফেলেছে। তার সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ এই বই যারা কিনে পড়ে তাদের ওপর। একটু গল্প পড়ার জন্য এরা কত টাকা খরচ করে ফেলে৷ অথচ ঐ টাকা দিয়ে কত কিছু করা যায়। হাত ঘড়ি দেখলো রাতুল। দুপুর তিনটে বাজে। পাঁচটার সময় ইন্টারভিউ৷ প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক করে নিল সে। ইন্টারভিউয়ের সময় গুলিয়ে গেলে সমস্যা। প্রশ্নগুলো অবশ্য চেক করানো হয়নি৷ তেমন সমস্যা সৃষ্টি করবে এমন প্রশ্ন সে করবেও না। এমনিতে বিরক্তি লাগলেও মাস শেষে যে মাইনে পায় তাতে তার হাত খরচ বাদে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করা যায়। চাকরিটা খোয়া গেলে চোখে সরষে ফুল দেখবে রাতুল। এর জন্য বিরক্তির চরম পর্যায়ে চলে গেলেও চাকরিটা ছাড়ছে না সে। টেবিলের ওপর থেকে রেকর্ডারটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নুরুল হুদার বাসার উদ্দেশ্যে।

তখনও পনেরো মিনিট বাকি ইন্টারভিউ নেওয়ার। রাতুল দারোয়ানকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দেখায়৷ দারোয়ান সেটা ভেতরে নিয়ে গেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। বাড়িটা বেশ সুন্দর করেই গড়া। এক সময় সে স্বপ্ন দেখতো এমন একটা বাড়ির। কিন্তু জার্নালিজমে পড়াশোনা করে এখন বাড়ি ভাড়া নেওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়িটার এক পাশে কিছু টবে সুন্দর ফুল গাছ দেখা যাচ্ছে। রাতুল ভাবলো হয়তো লেখকদের ফুলের শখও থাকে। এদের জীবনটার ওপর রাতুলের বরাবরের মতো বিতৃষ্ণা। লেখালেখি করে কত বড়ো বাড়ি উঠিয়ে ফেলেছে। এই লেখককে দুদিন আগেও কেউ চিনতো না। তার কয়েকটা বই রিসেন্ট দু বছরে হিট খায় এরপর থেকেই এর কদর দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল ইন্টারভিউয়ের জন্য রিসার্চ করতে গিয়ে সে দেখে অনেকে বলাবলি করে যে ওনার লেখায় অনেকটা রিয়েলিটি রিয়েলিটি ভাব আছে। বিশেষ করে ক্যারেক্টারগুলো বেশ বাস্তবিক মনে হয়। রাতুল কয়েকবার হেসেছিল এই রিভিউগুলো পড়ে। এখন মনে পড়ায় আবার হাসি পাচ্ছে তার। একটা ক্যারেক্টার তো বাস্তবিক লাগবেই এ আর নতুন কী! একটা খুনি তো আর ভূত না যে ভূতের মতো লাগবে। মানুষের মতোই তো লাগবে। যত্তসব আজগুবি কথাবার্তা। এই এর জন্যই তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এদের ওপর। একটা বড়ো শ্বাস নিল রাতুল। এখন মেজাজ খারাপ করলে পরে ইন্টারভিউতে সমস্যা হতে পারে। এমনিতেও ইদানীং রাগ জিনিসটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে৷ এসব ভাবতে ভাবতে সে দেখলো ওপরের বারন্দা থেকে নুরুল হুদা সাহেব আরেকজন দারোয়ানকে উদ্দেশ্য করে ইশারা করছে। অর্থাৎ ভেতরে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হচ্ছে। দারোয়ান গেট খুলে দিতে রাতুল ভেতরে ঢুকলো৷ আলিশান নতুন বাড়ি। একটা পাপোশে জুতা ভালো করে মুছে নিল সে। পাছে আবার টাইলসে দাগ পড়ে যায় কি না। দোতলার রেলিং ধরে উপরে উঠতেই কয়েকজন মানুষ দেখতে পেল সে। অচেনা মানুষ। শোবিজ জগতের কেউ বলে মনে হচ্ছে না তার। তাদের দেখতে দেখতেই হুদা সাহেব ওপরে ডাক দিল তাকে। তিনতলার ছাঁদ দিয়ে দোতলার বারান্দায় যাওয়া যায়। সেখানেই ইন্টারভিউ হবে ঠিক করেছেন তিনি। রাতুলের কোনো অসুবিধা নেই তা জানিয়ে দিয়েছে সে। বারান্দাটা বেশ বড়ো। কোনো টব বা গাছ নেই৷ কয়েকটা সোফা গোল করে রাখা। মাঝখানে একটা টেবিল। হুদা সাহেব সোফায় বসে রাতুলকে তার মুখোমুখি বসতে বললেন। রাতুল সেই অনুযায়ী বসলো। রাতুল হুদা সাহেবের ইন্টারভিউ নিতে এই প্রথম আসলো। এর আগে সে হুদা সাহেব কে সামনাসামনি দেখেনি। হালকা স্বাস্থ্যের অধিকারী এই লোক প্রতি কথার পরে একটা সুন্দর হাসি দেয়। হাসিটা বেশ অদ্ভুত। অল্পস্বল্প গোঁফ রাখা মুখে। সাদা রংয়ের একটা পাঞ্জাবি পরে এসেছে।
হুদা সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মিঃ সাংবাদিক? কিছু কি জিজ্ঞেস করবেন না?
রাতুল ভুলেই গিয়েছিল যে সে ইনটারভিউ নিতে এসেছে। একটু নড়েচড়ে বসে বললো, জি জি অবশ্যই। একটু রেকর্ডারটা অন করে নেই। রেকর্ডারটা অন করে টেবিলের উপর রাখলো।
গলায় একটা ফর্মাল ভাব এনে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন আপনি? কেমন যাচ্ছে দিনকাল?
নুরুল সাহেব পায়ের উপর পা তুলে বললো, জি আল্লাহর রহমতে অনেক ভালোই আছি। দিনকাল আসলে এই টুকিটাকি লেখা নিয়েই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটু ফুল দেখাশোনা করি। আর এই তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই।
রাতুল এবার পকেট থেকে কাগজ বের করে হাতে ধরে রেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘তারাদের চাঁদ’ বইটা পাঠক সমাজে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। কেমন বোধ হচ্ছে?
নুরুল সাহেব মুখে একটা প্রশস্ত হাসি টেনে বললো, দেখুন আমি আমার সবটা দিয়ে ঐ বইটা লিখেছিলাম। বইটার মধ্যে অনেক সত্য ঘটনাও আমি টেনেছিলাম। তাই পাঠকরা পড়ে ভালো বলেছে। একজন লেখকের কাছে এটাই প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার জন্য ভীষণ উৎসাহ জোগায় এরকম কম্পলিমেন্ট। পাঠকদের এরকম উৎসাহ আমাকে নতুন বই লিখতে সাহায্য করে৷ আমি খুবই খুশি যে বইটা পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
রাতুল উত্তর শোনার ফাঁকে হাতে থাকা প্রশ্নটার দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিল। সেই অনুযায়ী প্রশ্ন করলো, পাঠকরা কি শীঘ্রই নতুন কোনো বই পেতে যাচ্ছে?
আবার সেই হাসি। এবারেরটা একটু বেশি উজ্জ্বল। এরকম হাসি রাতুল আগে কখনও দেখেনি। একপ্রকার উজ্জীবিত হাসি। হাসি সমেত নুরুল সাহেব উত্তর দিলেন, জি দুইটা বই বের করবো সামনে। একটা ‘পীপিলিকার পাখা’ আরেকটার নাম এখনও ঠিক করিনি। প্রকাশনী অনুমতি দিলে খুব শীঘ্রই পাঠকরা আরো কয়েকটা ভালো বই পেতে যাচ্ছে।
মনে মনে একটু খুশি হলো রাতুল৷ ইন্টারভিউটার শিরোনাম পাওয়া যাবে ধামাকা টাইপের৷ একটু হাসি মুখে এনে জিজ্ঞেস করলো, তা বিয়ে করার কথা কি ভাবছেন? না কি আরও পরে?
প্রশ্ন শুনে নুরুল সাহেব আবার হাসলেন। এবারের হাসিটায় একটু লজ্জা মিশ্রিত আছে খেয়াল করলো রাতুল। হাসি থামিয়ে নুরুল সাহেব বললেন, ইচ্ছে আছে। যদি কেউ অফার দেয় তবে বিয়ে করতে রাজী আছি। তবে আমার ফ্যানদের মধ্যে কাউকে না। আরেকবার সলজ্জ হাসি দিলো নুরুল সাহেব।
পাল্টা প্রশ্ন করলো রাতুল, কেন ফ্যানদের মধ্যে না? পছন্দের কেউ কি আছে?
আবারও একটা হাসি দিল নুরুল সাহেব। তার মুখ থেকে হাসিটা যেন যাচ্ছেই না। হাসিসহ বললো, ফ্যানদের মধ্যে হলে আমার একটা ফ্যান আর বাড়বে না। আর ফ্যানদের মধ্যে না হলে আমার আরেকটা ফ্যান তৈরী হবে। হাসিটা মুখে রেখেই উত্তর শেষ করলো। হালকা থামিয়ে বললো, না পছন্দের কাউকে খোঁজা হয়নি আসলে।
রাতুল আরও কিছু ফর্মাল প্রশ্ন করার পরে রেকর্ডার অফ করে নুরুল সাহেবকে বললো, আচ্ছা আপনাকে কিছু অফ রেকর্ড প্রশ্ন করতে পারি? যেগুলো আমার নিজের। এগুলো পত্রিকায় ছাপা হবে না।
নুরুল সাহেবের মুখে আবার একটা হাসি দেখলো রাতুল। মনে হচ্ছিল বিষয়টা সে জানতো। রাতুল একটু গলা পরিস্কার করে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা হুদা স্যার আপনাদের জীবন এত সহজ কেন? শুধু দুটো পাতা লিখে কী করে এত বিখ্যাত হয়ে যান? এটা অন্যদেরকে ঠকানো মনে হয় না আপনার কাছে?
নুরুল সাহেব প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ালেন না দেখে একটু অবাকই হলো রাতুল। সেই হাসিটা কোথাও যায়নি। বরং ঠান্ডা মাথার একটা উত্তর পেল রাতুল। নুরুল সাহেব বললেন, আপনারাও তো লিখেন। কই তাতে তো কষ্ট না হওয়ার কথা না?
রাতুল পাল্টা উত্তর ভেবে রেখেছিল। বললো, আমরা তো সত্য জিনিসটা নিই। আপনারা তো কল্পনার একটা বস্তু তুলে ধরেন। এগুলো কি আদৌ হয়? সব তো মিথ্যা। কিন্তু আমাদেরটা তো সত্য। আমি আপনাকে এসব জিজ্ঞেস করতাম না কিন্তু অনেক রিভিউয়ারদের মতে আপনি না কি অনেক বাস্তবিক লেখা লিখেন তাই জিজ্ঞেস করছি। আদৌ কি এসবের কোনো অস্তিত্ব আছে? না কি শুধুই কাগজের ওপরে কলমের দাগ?
নুরুল সাহেব এবারও মুচকি হাসি দিলেন। তারপর হাতের পাশে থাকা কলিংবেল বাজিয়ে একজনকে ডাকলেন। রাতুলকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন চা না কফি?
রাতুল উত্তেজনায় অতিরিক্ত বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে চায়ের কথাই বললো সংক্ষেপে।
লোকটা চলে গেলে নুরুল সাহেব বললেন, আপনি অনেক উত্তেজিত হয়ে গেছেন দেখে একটু স্বাভাবিক করলাম। দেখুন আমি অন্য কারো কথা জানিনা তবে আমার লেখায় আপনি যা পাবেন তা নিশ্চয়ই হয়।
রাতুল দ্বিগুন উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করলো, আপনার প্রথম হিট বই ‘চিত্রলেখার চিঠি’তে আপনি একজন খুনির চরিত্রে লিখেছিলেন, সে তার প্রেমিকাকে খুন করে তৎক্ষনাৎ তার ছোটো বোনের সাথে প্রেমে লিপ্ত হয়। সিরিয়াসলি? এটা কখনও সম্ভব? একজন খুনি খুন করে তৎক্ষনাৎ আবার প্রেমে লিপ্ত হতে পারে? যেখানে পাশের রুমেই সেই খুনির প্রেমিকার লাশ ছিল। এমনকি সেই বোনও জানতো যে তার বোন অর্থাৎ খুনির প্রেমিকাকে খুনি খুন করেছে!
নুরুল সাহেব একটা স্মিত হাসি দিয়ে বললেন, আপনার নামটা আমার জানা হলো না। কি যেন?
রাতুল হঠাৎ টপিক পালটে যাওয়াতে মুখ থুবড়ে পড়লো। তারপর ধীর কণ্ঠে বললো, আমার নাম রাতুল আহমেদ।
নুরুল সাহেব বলা শুরু করলো, রাতুল সাহেব দেখুন আপনি আপনার পত্রিকাটা আরেকটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই দেখতে পেতেন এমন সব ঘটনা অহরহ ঘটছে। যাকগে আপনি যেহেতু পড়েননি সেহেতু আপনাকে বলছি এগুলো আসলেই হয়।
আর যদি নাও হয় আপনাদের পত্রিকা কিন্তু এ দিয়ে টাকা কামায়। আর যারা এধরনের নিউজ তৈরী করে তাদের জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবেন। আমার ঘটনায় অনেকটা বাস্তব নির্ভর কাহিনী লিখি আমি।
রাতুল কিছু বলতে চাচ্ছিলো। কিন্তু বেশি হয়ে যাবে ভেবে আর বললো না। শুধু বললো, অনেক ধন্যবাদ। আমি দেখবো এমন সত্য ঘটনা ঘটে কি না। আজ আসি। আপনার এ ইন্টারভিউ সামনের সপ্তাহে প্রকাশিত হতে পারে।
রেকর্ডারটা পকেটে ভরে উঠতে যাবে অমনি চা নিয়ে ভেতরে ঢুকলো বেয়ারা। নুরুল সাহেব পেছন থেকে বললো, চা টা অন্তত খেয়ে যান।
রাতুল জবাব দিল, আরেকদিন খাবো, ধন্যবাদ।
রাতুল গেট দিয়ে বের হতে লাগলো এমন সময় নুরুল সাহেব পেছন থেকে বলে উঠলো, রাতুল সাহেব আপনি কি ভিক্ষুক পছন্দ করেন?
হঠাৎ এমন প্রশ্নে থেমে গেল রাতুল। পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো, হঠাৎ এ প্রশ্ন?
নুরুল সাহেব সোফা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন না এমনিই করলাম। আজকে আপনাকে একটা ভিক্ষুককে কিছু টাকা দিতে দেখেছিলাম তাই জিজ্ঞেস করলাম। আপনার খুব পছন্দের বুঝি ভিক্ষুকটা?
রাতুল উত্তর খুঁজে পেল না। তাকেও যে কেউ দেখে চিনতে পারে এটা তার মাথায় ধরছিল না। সে আমতা আমতা করে বললো, না তেমন একটা না। এমনিই দেখে মায়া হলো তাই দিলাম। অন্তত সত্য লেখার জন্য ইনকাম করা টাকা দিয়ে দান করে শান্তি পেলাম।
নুরুল সাহেব রাতুলের কথায় একটু হাসলেন। তারপর বললেন, আপনার ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। তবে লেগে থাকেন একদিন অবশ্যই সফল হবেন। সেদিন আমার সত্য বুঝতে পারবেন।
রাতুল তার শেষ কথাগুলো না শোনার ভান ধরে নিচে নেমে গেল। অবশ্য শেষ কথাগুলো সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। তাই তার রাগ অত্যন্ত বেড়ে গেছে। বাইরে বেরিয়ে একটা বেনসন জ্বালালো সে। রাগ আর উত্তেজনায় ফোঁসফোঁস করতে লাগলো। ব্যথিত সাপ যেমন ছোবল মারতে না পেরে ছটফট করে ঠিক তেমন একটা ফিল পাচ্ছে সে।
তার চোখে অসফল, মিথ্যুক ব্যক্তিরা তাকে অসফল শুনিয়ে দিল। আর সে চুপচাপ চলে এল। কিন্তু আরেকটা বিষয় তার খটকা লাগছে। এই বিখ্যাত লোক ভিক্ষুকের সেখানে কী করছিল? অনেক ভেবেও কোনো ব্যাখ্যা না পেয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।

পরেরদিন সকালে রাতুলের ঘুম ভাঙলো আজমল সাহেবের ফোন পেয়ে। ফোন ধরতেই বিশাল এক বিবৃতি শুনিয়ে বললেন বিকেলে জয়ীতা হোটেলে নায়িকা ঈশিতা আলম আসবে তার সাথে দেখা করতে যেতে হবে। নতুন কিছু প্রজেক্টে হাত দিয়েছে সেগুলো জানাশোনার জন্য যেতে হবে। ইন্টারভিউটা আজকে বিকেলে না হলেও কালকের মধ্যে নিতেই হবে। আরও কিছু বিবরণ দিয়ে ফোন কেঁটে দিল আজমল সাহেব। রাতুল আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়লো। গতকালের বিষয়টা মাথা থেকে ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে। আজকে একটু ফ্রি থাকার চিন্তা করলো সে। যেহেতু আগামীকাল ডেড লাইন রাতে এ বিষয়ে চিন্তা করে প্রশ্ন ঠিক করা যাবে। কালকের ঘটনাটা একটু ভুলে থাকার জন্য সে একটু ঘুরতে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তেমন একটা জায়গা বা মানুষ নেই তার সাথে ঘোরার। ছোটোবেলা থেকেই একা একা থাকে সে। মায়ার কথা হঠাৎ মনে পড়লো তার। সচারাচর কাজের চাপে থাকায় আজকাল তেমন একটা মায়ার কথা মনে পড়ে না। আজ পড়লো কেন যেন। হয়তো সেই লেখক অসফল বলায় একটু বেশি করে মনে পড়ছে। এই একই কথা বলেই মায়া বিদায় নিয়েছিল, বলেছিল যেদিন সফল হবে সেদিন আমার কাছে এসো।
অবশ্য তখন চাকরি ছিল না রাতুলের। এখন থেকেও যে সে সফল তাও বলা যায় না।
বাসা থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নদীর পাড়ের দিকে রওনা দিল সে। মাঝে মাঝে মন খারাপ থাকলে এখানে আসে সে। বেশি একটা দূরে না নদীটা। নদীর পাড়ে তেমন কেউ নেই। ধীরে ধীরে মনটা হালকা হলে বাসায় ফিরে এল সে। তেমন কোনো কাজ নেই। দিনে এটা সেটা করে রাতে প্রশ্ন ঠিক করে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।

পরেরদিন এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো তার। আজকে ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা। রাতের প্রশ্ন আরেকবার দেখে নিল সে। সব ঠিক আছে সুতরাং সব কিছু রেডি করে রওনা দিয়ে দিল। হোটেলে পৌঁছানোর পনেরো মিনিট আগে হঠাৎ আজমল সাহেবের ফোন এলো তার ফোনে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আজমল সাহেব বলে উঠলো, রাতুল তুমি কি ইন্টারভিউটা নিয়েছো?
রাতুল জবাব দিল, জি না স্যার। আমি প্রায় হোটেলের সামনে চলে এসেছি।
আজমল সাহেব বললেন, একটা কাজ করো ইন্টারভিউ রাখো একটা মার্ডার হয়েছে তোমার ওখানে। এখনই সেখানে ব্রিফ করো। বাকিরা সবাই বিভিন্ন জায়গায় আছে। তাড়াতাড়ি করো। সেখানে পুলিশের সাথে সবার আগে তোমার কথা বলা চাই।
রাতুল ফোন রেখে থ মেরে রইলো। কি করবে তা দুই মিনিটে পরিকল্পনা করে একটা রিকশা নিলো। জয়ীতা হোটেলের কাছাকাছিই না কি মার্ডার হয়েছে।
রিকশা নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করার সময় হুট করে একটা স্যুট বুট পড়া মোসাহেবের সাথে ধাক্কা খেল রাতুল। তার হাত থেকে রেকর্ডারটা ছিটকে পড়ে গেল। ভদ্রলোকটা তা উঠিয়ে রাতুলের হাতে দিয়ে স্যরি বললো। রাতুলও ইটস ওকে বলে তার দিকে তাকালেন। খুব সুন্দর চেহারা। সচারাচর এমন মানুষ দেখা যায় না। মেয়েদের কাছে যারা নায়কের চেয়ে কম না। লোকটা একটা হাসি দিল। রাতুলের কেন যেন মনে হলো এই হাসি সে কোথাও দেখেছে। কিন্তু মনে পড়ছে না। কোথাও সে দেখেছে এমন হাসি। কোনো একটা জায়গায়। ভীষণ অদ্ভুত মায়াবী হাসি। সে প্রশ্ন করে বসলো, আচ্ছা আমি কি আপনাকে কোথাও দেখেছিলাম এর আগে?
ভদ্রলোক মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললেন, হয়তো।
ভদ্রলোক হয়তো বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। কেন হ্যান্ডশেক করতে হবে বুঝলো না রাতুল। তারপরও কেন যেন হাত বাড়িয়ে না দিয়ে পারলো না। হয়তো সেই হাসির মায়ায় পড়ে। নয়ত মায়াবী এই চেহারার কারণে। নয়তো অন্য কোনো অজানা কারণে। যতক্ষণে তার মোহ কেঁটে গেছে ততক্ষণে টের পেল তার হাতে একটা কিছু দিয়ে গেছে লোকটা। একটা কাগজ জাতীয় কিছু। হাত খুলে কিছুক্ষণের জন্য হা হয়ে রইলো। তার চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
একটা একশো টাকার নোট। আর এটা সেই টাকা যেটা রাতুল সেদিন সেই ভিক্ষুককে দিয়েছিল। নোটটা চেনার কারণ এই একশো টাকার নোটে মায়া আর তার নাম একসাথে করে লেখা আছে। যেটা মায়া করেছিল। এই টাকা এই ভদ্রলোক কোথায় পেল? মনের মধ্যে এ প্রশ্ন যেন বারবার বাঁধ ভাঙতে লাগলো তার।
সামনের দিকে তাকাতেই রাতুল লক্ষ করলো লোকটা ভীড়ের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পেছন ফিরে একটা মুচকি হাসি দিয়েই মিলিয়ে গেল।
রাতুল এটা সেটা বোঝার আগে দৌড় লাগালো। যেভাবেই হোক লোকটার নাগাল পেতে হবে। কিন্তু এত মানুষের ভীরে তার দৌড় যেন শক্তিহীন বাঘের মতো মনে হচ্ছিল। অনেকক্ষণ দৌড়েও নাগাল পেল না লোকটার। নাগাল তো দূর আর দেখাই পেল না সে। তার মনে হচ্ছিল লোকটা তার এই অপারগতার উপরেই হেসে চলে যাচ্ছিল।
তার মনে পড়লো তাকে একটা মার্ডার কেস ব্রিফ করতে দেওয়া হয়েছিল। এই লোকের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে তার আধাঘণ্টা মাটি হয়ে গেছে। এখন গিয়ে দেখবে যে সব নিউজই চলে এসেছে শুধু সে বাদে।
আরও আধাঘণ্টা পরে গিয়ে ঠিক তা-ই দেখলো। তবে একটু অন্যরকম। কোনো সাংবাদিককেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। আটতলা একটা ভবনে মার্ডার হয়েছে। একটা তরুণীর বিবস্ত্র মৃত দেহ পাওয়া গেছে ভেতরে। এতটুকুই জানতে পেরেছে সবাই। রাতুল ব্যারিকেড দেওয়া মার্কের পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। অন্যান্য সাংবাদিকেরা তখন চা সিগারেট খেতে ব্যস্ত। রাতুল একটু আগে যা ঘটে গেল তা নিয়ে ভাবছে। হাসিটা কোথায় দেখেছে এখনও মনে করতে পারছে না সে। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো। কয়েক টান দিতেই পেছন থেকে আচমকা একটা পাগল টাইপের লোক বলে উঠলো, ভাই একটু টানবার দিবেন হ্যা হ্যা?
লোকটার মুখ থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ বের হচ্ছিল। আর হ্যা হ্যা করে হাসিটা যেন কানে বিঁধে যাচ্ছিল তার। পুরো মুখে অজস্র দাড়ি গোঁফ। পরনে একটা ছেঁড়া প্যান্ট আর কয়েকজায়গায় তালি দেওয়া একটা টি-শার্ট। চোখগুলো বেশ উজ্জ্বল। এই চোখগুলোও কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে তার। মাথটা ঝাড়া দিয়ে সব চিন্তা বের করে দিয়ে রাতুল হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা দিয়ে দিল। লোকটা মনের সুখে কয়েক টান দিয়ে বললো, আপনে নিউজ করেন না ওস্তাদ?
রাতুল ঘাড় নেড়ে বললো, হ্যাঁ।
লোকটা বার দুয়েক সিগারেটটা টান দিয়ে আবার বললো, আমি জানি এই মার্ডার কেমনে হইছে? জানতে চান কেমনে হইছে?
জানতে চাইলে আমারে আরও দুইটা সিগারেট দিতে হইবো হ্যা হ্যা!
লোকটার হে হে করা হাসিটা অত্যন্ত বিরক্তিকর। কিন্তু হাসিটার পেছনে কেমন যেন অদ্ভুত একটা মুখ লুকিয়ে আছে মনে হচ্ছে তার। সে দুটো সিগারেট বের করে দিয়ে বললো, বলুন কী হয়েছিল।
পাগল লোকটা দুটো সিগারেট হাতে নিয়ে আবার হে হে করে উঠলো। তারপর হাতে থাকা সিগারেটটায় আবার দুই টান দিয়ে বললো, স্যার মাইয়াডা খারাপ ছিল। কয়েকজনরে ধোঁকা দিছে। এই মার্ডার কেসের একটা গোপন বিষয় জানবার চান?
রাতুল ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, কী গোপন বিষয়?
পাগলটা আবার দুটো টান দিয়ে বললো, এই মার্ডার সম্পর্কে হুদা সাহেবের একটা বই বের হবে দেইখেন হ্যা হ্যা!
রাতুল আবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, কোন হুদা সাহেব?
পাগলটা একটা জম্পেশ হাসি দিয়ে বললো, লেখক নুরুল হুদারে চিনেন না হ্যা হ্যা? সাংবাদিক হইছেন কেমনে? হ্যা হ্যা!
রাতুলের মাথায় যেন সব পরিষ্কার হয়ে গেল। সেখানের সেই ভদ্রলোকের হাসিটা সে লেখক নুরুল হুদার মুখে দেখেছিল। কিন্তু নুরুল হুদা সেই টাকা পেল কই? সেই টাকা তো ভিক্ষুককে দিয়েছিল সে।
পাগলটা হঠাৎ বলে উঠলো, কী ভাবছেন রাতুল সাহেব?
রাতুল আচমকা তার নাম শুনে চমকে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো, আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?
পাগল লোকটা হ্যা হ্যা করে হেসে বললো, আমি সব জানি। আচ্ছা আপনে নুরুল হুদার দ্বিতীয় বইটা পড়েন নাই না? হ্যা হ্যা!
রাতুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আপনি কি করে জানলেন আমি তার প্রথম বই পড়েছি?
লোকটা আবার হেসে বললো, হ্যা হ্যা বললাম না আমি সব জানি। বললেন না কিন্তু আপনি মনে হয় লেখকের ‘চিঠির অপর পাতা’ বইটা পড়েননি না?
রাতুল সব প্রশ্ন ঠেলে দিয়ে বললো, জি না আমি পড়িনি। কেন বলুন তো?
পাগল লোকটা আরেকটা সিগারেট মুখে দিয়ে লাইটার চাইলো। এবার আর লোকটাকে কেমন যেন পাগল মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল অনেক জ্ঞানী একটা লোক। রাতুল লাইটারটা এগিয়ে দিল। লোকটা সিগারেট ধরিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে বললো, আপনি বলেছিলেন না যে লেখকরা সব কিছু মিথ্যে লিখে কি না? আজকে প্রমাণ নিয়ে যান লেখকরা সত্যিটাই লেখে। অন্তত নুরুল হুদা নামের লেখক সত্য লিখে। আজকে বাসায় গিয়ে লেখকের দ্বিতীয় বই চিঠির অপর পাতাটা পড়বেন। দেখবেন বইয়ের শেষে বলা আছে সুযোগ পেলে গল্পের সেই ক্যারেক্টার তার সেই প্রেমিকার ছোটোবোনকেও মেরে ফেলবে। এবং তা নিয়ে আরেকটা সিকুয়েল বের হবে। আজকেই সেই দিন। সেই প্রেমিকার ছোটোবোন মারা গেছে। এই আটতলা ভবনের ভেতরে। সেই গল্পের ক্যারাক্টার স্যুট বুট পড়ে এসে খুন করে গিয়েছে একটু আগে। তার সাথে একটা তরুণ সাংবাদিকের ধাক্কাও লেগেছে। রাতুল সাহেব লেখকের তৃতীয় বইটা বের হলে অবশ্যই পড়বেন। বিশেষ করে একজন ভিক্ষুককে একশো টাকা দেওয়ার পার্টটা প্লিজ পড়বেন।
লোকটা সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে বললো, আর রাতুল সাহেব রেকর্ডার চালু রেখে লাভ কী? ওটার ভেতর ব্যাটারি নেই। কারণ গল্পের সেই ক্যারেক্টারের সাথে ধাক্কা খাওয়ার পর সেই তরুণ সাংবাদিকের রেকর্ডারের ব্যাটারি সে নিয়ে গেছে। আজ আসি রাতুল সাহেব। ভাল থাকবেন। লেখকের এখন অনেক কাজ বাকি আছে।
রাতুল শেষ কথাগুলোর জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে রেকর্ডার চালু করেছিল তখন যখন তার কাছে মনে হচ্ছিল বিষয়টা স্বাভাবিক না। কিন্তু ব্যাটারি যে নেই তা সে চেক করেনি। হাতের রেকর্ডার হাতেই রইলো। রাতুল সেই পাগল লোকটার চলে যাওয়ার দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইলো। লোকটা আর কেউ নয় একজন খুনি। একজন মাস্টারমাইন্ড খুনি। একজন সাইকো। এবং দিনশেষে এই খুনের বিবরণ লিখে সে একজন সফল লেখক। এরজন্যই তার গল্পে বাস্তবতার আঁচ থাকে। সব পরিস্কার। পানির মতো পরিস্কার। সেই ভিক্ষুকটা এই লেখকই ছিল। কারণ রাতুলের মনে পড়েছে এই পাগলের চোখই সেদিন সে সেই ভিক্ষুকের চোখে দেখেছিল। সে একটা ক্যারেক্টার প্লে করতেছিল সেদিন। এই হ্যা হ্যা করে হাসার লোকটাই নুরুল হুদা। কী নিখুঁত কাজ। কত সুন্দর মুখোশের আড়ালে মুখ ঢেকে এই মার্ডারটা এবং তার গল্পের সব মার্ডার সে নিজে করেছে। কিন্তু কিছু করার নেই৷ কোনো প্রমাণ নেই। চরিত্রের আড়ালে সে একজন স্বনামধন্য লেখক। সে একজন সফল লেখক। তার এই বইটাও হিট করবে। লোক আবারও মহোৎসাহে তার বই কিনবে আবার বেস্টসেলার হবে। আস্তে আস্তে লোকটা মিলিয়ে গেল রাতুলের চোখের সামনে। অলি গলিতে যেন হুংকার দিয়ে বলে গেল আমার প্রত্যেকটা বই সত্য রাতুল সাহেব আমার প্রত্যেকটা বই সত্য। মিথ্যের সেখানে রাজত্ব নেই। এই পৃথিবীতে মিথ্যের রাজত্বের চাইতে সত্যের রাজত্ব ঢের বেশি।
রাতুলের চোখে শুধু সেই মায়াবী হাসিটা দেখতে পাচ্ছে। অদ্ভুত সেই হাসি। নিষ্পাপ, প্রাণবন্ত, সারাজীবন তাকিয়ে থাকা যায় যে হাসির দিকে। কোনো ক্লান্তি আসে না। সে হাসির নাম মুখোশের হাসি। সে হাসি সবার অগোচরে কিছু জিনিস লুকিয়ে রাখে।

লেখকঃ বি.এম.পারভেজ রানা (B.M. Parvej Rana)

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!