প্লেট দুটো সেন্টার টেবিলটায় রাখতে রাখতে মিনুর নরম মোলায়েম কন্ঠের ডাকটা রাহেলা বেগমের অন্তর ছুঁয়ে দিলেও সাড়া দিলেন না ইচ্ছে করেই। আবার শোনবার অপেক্ষায় রইলেন।
দুহাতে আনা পানির গ্লাসদুটো ঠক্ করে টেবিলে রেখে তাকালো মিনু অদূরে খাটে বসা রাহেলা বেগমের দিকে।
—– আন্টি, জলদি জলদি। এই মহা ভোজ ঠান্ডা হলে কিন্তু আর গলা দিয়ে নামবে না।
কল কল হাসির আবেশে মিনুর মুখটা কি উচ্ছল যে লাগছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত পায়ে পায়ে এগিয়ে আসেন রাহেলা বেগম। বেসিনে হাত ধুয়ে টেবিলের দিকে এগুতেই মিনু চেয়ারটা টেনে বসিয়ে দিল পরম যত্নে।
সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাতের প্লেট টা এগিয়ে দেয় মিনু। প্লেটের এক কোনে পুঁই চচ্চড়ি আর মসুর ডালের ভর্তা।
মুখোমুখি আর একটা চেয়ারে বসে অন্য প্লেটটা টেনে নেয় মিনু নিজের দিকে।
রাহেলা বেগমের দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টটা মিনুর কাছে ধরা পড়ার ভয়ে গ্লাসে মুখ লাগিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে নেন প্রথমেই।
——শুরুতেই পানি খেলে ভাত খাবেন কি করে ? গলা শুকিয়ে আসছে বুঝি। আসলে দিনকাল যেন কেমন হয়ে গেলো। হাট বাজার বন্ধ, বাইরে যাওয়া বন্ধ। এসব শাক পাতা আর কতদিন খাওয়া যায়।
রাহেলা বেগম ভাতের প্রথম লোকমা মুখে তুলেছেন সবে। মিনুকে হাত ইশারায় থামতে বলে আঁচলে মুছতে মুছতে বললেন,
——- মাগো, তুমি এমন করে বললে যে আমি আমার কাছেই ছোট হয়ে যাই। দুনিয়াটাকে যে আমি অনেক খারাপ ভাবতাম তোমার দেখা না পেলে।
একটু হাসি খেলে যায় মিনুর সারল্যমাখা মুখ খানিতে।
——- দুনিয়ার সবাই খারাপ হলে আমি আপনার মত ভালো মানুষ আন্টিকে কি করে পেলাম। হা হা হা…..
খাওয়া শেষ করে আমরা আজ অনেক গল্প করবো আন্টি। ভালো ভালো মানুষদের ভালো মনের।
গতরাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি, দিনে খানিকটা গড়িয়েছিলাম বলে। আপানাকেও উশখুশ করতে দেখেছি, ঠিক না আন্টি?
——- সত্যি মাগো ঠিক, এক্কেবারে ঠিক। খাওয়া তবে শেষ করি। আহা কি চমৎকার রেঁধেছো মা। পুই চচ্চড়ির এই স্বাদ মাছ মাংসকেও হার মানায়।
——- আসলে ব্যাপারটা হলো কি জানেন আন্টি, ক্ষুধায় সবই অমৃত। জিভও বুঝে এটা দুর্দিনের সময়। হা হা হা……
রাহেলা বেগমও সে হাসিতে সংক্রমিত হোন।
আজ গুনে গুনে এক মাস হতে চললো রাহেলা বেগমের এখানে পদার্পনের। অথচ মনে হয় যেন কত যুগ ধরে তাঁর মিনুর সংগে সম্পর্ক। যে সম্পর্ক রক্তের বাঁধনকেও হার মানিয়েছে।
কি সুক্ষনেই যে রাহেলা সেদিন ছোট্ট ব্যাগটায় দুখানা কাপড় ভরে আর ঘরে লুকোনো বেশ কিছু টাকা কোমরের পেটিতে আড়াল করে রওনা দিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। বড় ভাবী বা ছোট ভাইয়ের বউ ভাবলেশহীন হয়ে উঠোনের এক কোনে বসে যেমন সব্জি কুটছিল নির্বিকারভাবে তেমনিই রইলো। ছোট ভাই বসে ছিল বারান্দায়। রাহেলার হাতের ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে শুধু বললো, কোথাও চললি মনে হচ্ছে?
রাহেলা দরজা ঠেলে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, দেখি কতদূর যাওয়া যায়।
” যাবার জায়গা থাকলেতো? আসবে ঘুরে ফিরে আবারো….
সামনে একটা খালি রিকশা আসতেই ভাবীর বাকি কথাগুলো আর শুনতে হলো না রাহেলাকে।
হনহন করে এগিয়ে চললো রিকশা সোজা বাস স্ট্যান্ড।
বাস মালিক সমিতি হঠাৎ ঢাকার গাড়ি বন্ধ ঘোষনা করেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। রাহেলা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে গেলে আবারো পিছিয়ে পড়বেন তাঁর লক্ষ্য থেকে। একটা মুহূর্তও আর ওখানে থাকার ইচ্ছে নেই। চাকুরী থেকে অবসরের প্রায় বছর হতে চললো, জীবনের কিনারায় এসে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না যদি ভবিষ্যৎ ভাবনাটা আগেই ভাবতেন। যাক যা হবার হয়েছে। আর একটা দিনও নষ্ট করার সময় হাতে নেই। পায়ে জোর থাকতে থাকতেই থিতু হয়ে বসতে হবে একটা ছায়াতলে নইলে চোখ কান মেলে শুধু যন্ত্রনার প্রহর গুনতে হবে চলৎশক্তিহীন হয়ে শুয়ে থেকে।
ব্রেক জার্নির সিদ্ধান্ত নিয়ে হাটিকুমরুল পর্যন্ত টিকিট নিলেন তিনি। বাস নির্ধারিত সময়েই রওনা হলো। হাতের কব্জি উল্টে হাতঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে হিসেব কষেন। চার ঘন্টা লাগলেও আবারো আর এক লোকাল গাড়িতে উঠে সন্ধ্যে নাগাদ পৌছুতে পারবেন। নোট বুকে লেখা ঠিকানা মিলিয়ে ঠিক পৌঁছুতে পারবেন”গোধুলি” র ঠিকানায়।
ভাগ্যিস অফিস সহকর্মী নিলুফার খোঁজ খবর নিয়ে তাকে সেদিন মোবাইলেই উপায়টা বলেছিলেন, ফাইনাল করার আগে নিজে এসে দেখে শুনে যাওয়াটাই ভালো।
হাটিকুমরুল আসতে তখনো দুটো স্টপেজ বাকি। ভীড় ঠেলে রাহেলার সিটের পাশে দাঁড়ালো একটি ২৫/৩০ বয়সের মেয়ে।
গাড়ির ব্রেক কষলেই বারবার হুমড়ি খেয়ে রাহেলার দিকে ঝুঁকে পড়ছে হাতের ফাইলটা সামলে নিয়ে। রাহেলার সাথে চোখাচোখি হতেই বললেন, এই মেয়ে, ফাইলটা আমাকে দিয়ে শক্ত হাতে রড ধরে দাঁড়াও, নইলে পড়ে যাবে তো।। তাই করলো মেয়েটি, কিন্তু পরের স্টপেজ আসতেই গুন্জন মোবাইলে মোবাইলে। আগামীকাল থেকে গনপরিবহন বন্ধ। কয়েকটি শহর লকডাউন। অদৃশ্য ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে লোকালয়ে।
যাত্রীদের অনেকেই নেমে গেলো। সিট খালি হওয়ায় মেয়েটি রাহেলার পাশে এসে বসলো এতক্ষনে। কন্ঠে ব্যকুলতা ঝরিয়ে বললো, আপনি কোথায় যাবেন আন্টি? মানে জানতে চাইছিলাম মাধবপুর অবধি আছেনতো?
—- মাধবপুর ছাড়িয়ে আরও দূরে আমার গন্তব্য সুবর্ণপুর।
বললেন রাহেলা।
—– যাক স্বস্তি পেলাম। আসলে আজকাল কি সব খবর শুনি। একা বাসে যেতে তাই ভয় করে।
কিছুটা ঝিমুনিমত এসেছিলো গাড়ির দুলুনিতে হয়তো।হঠাৎ মেয়েটির ডাকে তন্দ্রা কেটে যায়,
—– আন্টি, কি করা যায় বলেনতো? গাড়িতো আর যাবে না। যে কটা লোকজন ছিলো, সব নেমে পড়ছে এক এক করে।
আমার স্টপেজ এর পরেরটাই ছিলো।
রাহেলা এবার নোট বুকটা মেলে মোবাইলে নাম্বার টিপেন।
—- হ্যালো, গোধূলি থেকে বলছেন? জ্বি আমি রাহেলা বেগম। কদিন আগে আপনাদের সাথে কথা বলেছিলাম। আমি পথে একটু অসুবিধায় পড়েছি।
জ্বি, কি বললেন? বন্ধ? হঠাৎ নোটিশে? তাহলে…
রাহেলার মাথাটা দুলে ওঠে।ঝোঁকের মাথায় হুট করে বেরিয়ে আসাটা ঠিক হয় নি। তাঁদের মফঃস্বল শহরটায় থেকে, নাকি ঘরের এক কোনের বাসিন্দা হয়ে থাকায় দেশের এই পরিস্হিতির কিছুই আঁচ করতে পারেননি তিনি।
কতদিন টিভির সামনেও বসা হয় না মনে করতে পারছেন না। কি করবেন এখন? ফিরে যাবেন?
মেয়েটির ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়লো রাহেলার।
—— আন্টি, আমি নেমে যাচ্ছি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ভ্যান খুঁজে দেখি বাকি পথটুকুর জন্য।
রাহেলার মাথা ততক্ষনে চিন্তায় এলোমেলো। বললেন, আমারওতো সামনে এগিয়ে কোন লাভও নেই। তোমার সাথে নেমে বরং ফিরবার গাড়ির খোঁজ করি।
কিন্তু বিধি বাম। এমন নিরিবিলি জায়গাটায় দুটো সাইকেল মেকারের ঝুপড়ি দোকান ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলো না। সেখানকার একজন মাধবপুর যাওয়ার একটা ভ্যানের সন্ধান দিলো বটে কিন্তু অন্য কোন যাত্রী না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়ে রিজার্ভ করতে হবে। এ অবস্হায় এখান থেকে রাহেলা বেগমের শহরতো দূরঅস্ত। পরিস্হিতি যে কারো জন্যই মঙ্গল নয়, টের পেলো দুজনেই।
মেয়েটি রাহেলার মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলেই ফেললো,
—– আন্টি কিছু মনে না করলে আপনি বরং আমার সাথেই চলেন। আমারও একা কেমন ভয় লাগছে। রাতটা থেকে কাল সকালে মাধবপুর স্ট্যান্ড থেকে বাড়িতেই ফিরে যান। অফিসের কাজ কর্ম তো এখন সব বন্ধের নোটিশ দিয়েছে। চালু হলে আসবেন।
রাহলা বেগম মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলেন,
—— বড্ড বিপদে পড়ে গেলাম মনে হচ্ছে, তোমাকেও ফেল্লাম সমস্যায়। তোমার বাড়ির লোকেরা কি ভাববেন অপরিচিত আমাকে নিয়ে গেলে।
এই দুর্যোগেও একটু হাসলো মেয়েটি
—– ওসবের কোন ঝামেলা নেই আন্টি। আমি একা মানুষ। ছোট খাটো একটা চাকুরী করি। বাসে করে পাশের শহরে যাতায়াত করে অফিস করি প্রতিদিন।
চিলেকোঠার এক রুমের বাসায় ভাড়া থাকি। বাড়িওয়ালি খালাম্মা ভাড়াটা একটু বেশি নিলেও নিরাপত্তা আর স্নেহের ছায়াটা বড়ই নির্ভরতার। বছর পাঁচেক টানা আছি, নিজের বাড়িই মনে হয়।
আমাকে বিশ্বাস হলে নিশ্চিন্তে যেতে পারেন।
শুরুটা এভাবেই। লকডাউনে কাটতে লাগলো
একটা দুটো করে অনেকগুলো দিন। মাসও কেটে গেল। সম্পুর্ন অপরিচিত দুজন অসম বয়সের মানুষ একই ছাদের নীচে আপনজনের মত।
বিনিময় হতে থাকলো দুঃখগুলো। এই একটা জায়গায় দুজনের বড্ড মিল। তাই দুঃখিনী মানুষ দুটোর একাকীত্ব যেন খোলস ভেঙ্গে সরব হলো দুজন দুজনকে পেয়ে।
পিতৃ-মাতৃহীন মিনু চাচাদের করুনায় বড় হয়ে তাঁদের নির্বাচিত পাত্রের সাথেই নিজ সংসারে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু লোভী মানুষটি প্রথম থেকেই শ্বশুরের সম্পত্তির খোঁজ খবরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিরোধ বাধায় মিনুর চাচার সাথে। চাচারও সাফ কথা, লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন আর কি পাওনা থাকতে পারে?
মিনুর বরও জানিয়ে দিলো, ঘটক জানিয়েছিল মৃত বাবার মোটা অংকের উত্তরাধিকারী মিনু। চাচার দ্বিতল বাড়িটিতেও মিনুর ভাগ আছে।
যাচ্ছেতাই কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে মিনু উপলব্ধি করে, পুরো বিষয়টাই লাভ লোকসান কেন্দ্রিক। মায়া মমতা রক্তের টান কিংবা বৈবাহিক সুত্রের ভালোবাসার ছিটেফোটাও নেই দুপক্ষের কারোরই তার জন্য।
জগত সংসারটাকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। একার জীবনটাকে আর কারো সাথে স্বার্থের পঙ্কিলতায় জড়াতে ইচ্ছে হয় না। দুমাসের সংসার জীবনটার ইতি টেনে ফিরে যায় না আর স্বার্থের স্বজনদের কাছেও। পরিচিতদের সহায়তায় ঢাকা ছেড়ে ছোট্ট মফস্বল শহরটিতে জুটে যায় চাকুরীটা। মাথা গোঁজার ছোট্ট ঠাঁইও সেই সাথে।
রাহেলা শুনেন আর কষ্টে ভিজে যেতে যেতে বিস্মিত চোখ তুলে বলেন, আহা এটুকু বয়সেই একাকীত্বকে বেছে নিলে? একজন লোভীর কারনে নিজেকে গুটিয়ে নিলে আমারই মত?
জীবন অনেক বড়। শেষটা আরও বড়। এত বড় যে, এ বয়সে তুমি তা ভাবতেও পারবে না মিনু।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
মিনু অবাক হয়ে শোনে রাহেলা বেগমের পিছনের গল্প। বাবাকে নিয়ে পাঁচ ভাইবোনের জমজমাট সংসার। মা সেই ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন। তেমন করে মনে পড়ে না রাহেলার। সবার ছোট সে। বড় দুবোনের যখন বিয়ে হয়, রাহেলা তখন স্কুল ফাইনালে। বড় দু ভাইও লেখাপড়ায় তেমন এগোতে না পেরে বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। বাবার ইচ্ছা ছোট মেয়েটা পড়ুক যতদূর চায়। কিন্তু কলেজ শেষ হতে না হতে বাবার হঠাৎ চলে যাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ে রাহেলার।
গ্রাজুয়েশনটা নিতে না নিতেই লেখাপড়ার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভাইয়েরা। বাবার অবর্তমানে ব্যবসাতেও মন্দা নামে। এমন সময় পত্রিকার খবরটা চোখে পড়ে। আবেদন, ইন্টারভিউ এবং চাকুরীতে জয়েন। পর পর এত দ্রুত ঘটতে থাকে যে রাহেলা নিজেও যেন ঘোরের মধ্যে চলতে থাকে। বড় শহরের কর্মজীবি হোষ্টেলে শুরু হয় চাকুরী জীবন।
ছুটি ছাটায় বাড়ি আসে। কলহ দেখে দুই ভাই ভাবীদের। একসময় উঠোনে দেয়াল ওঠে। হাঁড়ি আলাদা হয়। রাহেলা ভাগের মানুষ হয়। দুপুরে বড় ভাইয়ের বাসায় খাওয়া দাওয়া হলে রাতে ছোট ভাইয়ের বাসায় ডাক পড়ে।
নিজেকে বাড়তি মনে হতে থাকে ক্রমশ। নিজের আশৈশশব বেড়ে ওঠা ঘর দোর সব যেন অচেনা ঠেকে, টুকরো টুকরো হতে থাকে উঠোন, ঘর, কলতলা সব।
বিয়ের সমন্ধ আসে রাহেলার। ভাইয়েরা সাফ জানিয়ে দেয়, বোনকে যেহেতু টাকা পয়সা ঢেলে লেখাপড়া শিখিয়েছেন বাবা, তাই এক কানাকড়িও মেয়ের জন্য বরাদ্দ নেই বাবার সম্পত্তির।
পাত্র সরাসরি বললো, মেয়েকেতো আর খালি হাতে বিদায় করা যায় না। কিছু একটা অংকতো অবশ্যই লাগে।
বড়ভাই বললেন, চলমান অর্থটাই যৌতুক। রাজী নাহলে আসতে পারেন।
পাত্র বললো—- বেশতো, এসেই যখন পড়েছি। কি আর করা।
রাহেলা বেগম বেঁকে বসলেন এবার। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন,
—- বিয়ে যদি করতেই হয় তবে চাকুরী করবেন না। হয় সংসার, নয় চাকুরী।
পাত্র আর কোন কথা বলার প্রয়োজন মনে করে নি। চটজলদি নিরাপদ দূরত্বে গমন।
বলাই বাহুল্য, কিছুদিনের মধ্যে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে বিয়ে নামক বিষয়টাকে আর আমলে না নিয়ে রাহেলা নিজের ভবিষ্যতের একটা ছক এঁকে ফেললেন নিজের মত করে।
সিদ্ধান্ত নিলেন জীবনটাকে স্বনির্ভর করার। শহরে বাসা ভাড়া নেন। বোনেরাও পরামর্শ দিলেন, বিয়ে মানেই অধীনতা। লেখাপড়া শিখে স্বনির্ভর হয়েছিস। দরকার কি অন্যের দয়ার? আমরা নিরুপায়,পেটে বিদ্যে নেই বলে।
সত্যিইতো, রাহেলাও পায়ের নীচের মাটিকে শক্ত করেন। বোনের ছেলেকে মেস থেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। লেখাপড়া শেষ করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। ওর পছন্দের মানুষের সাথে বিয়েও দেন। কটা দিন যেতে না যেতে ভাগনে বৌ আপন সংসার সাজিয়ে আলাদা হয়ে যায়।
প্রথমটায় বড় একটা ধাক্কা খেলেও বাস্তবতাকে মেনেও নিলেন একসময় রাহেলা।
এবার শুরু হলো ভাই ভাবীদের তোষামোদি। আজ বড় ভাইয়ের ছেলের চাকরীর ঘুষতো, কাল ছোট ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের যৌতুক। কারো অসুস্হতাতো, কারো দুর্ঘটনায় পড়ার বেহাল অবস্হা থেকে উদ্ধার।। সামাল দেয়ার দায় শুধুই রাহেলার।
ভাগনের দেয়া অবহেলার ক্ষতটা সামাল দিতে অন্যান্য ভাসতে ভাসতিদের দায়ভারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেতে থাকলেন দিনের পর দিন।
সহকর্মীরা অবাক বিস্ময়ে দেখে সংসারহীন মানুষটার কঠিন কঠোর বাস্তবতাকে। একটা দামী শাড়ি কিংবা সখের কিছু ভোগ করেননি নিজের জন্য। সবার প্রয়োজন মিটানোর পর যা সামান্য থাকতো তা দিয়েই চালিয়ে নিতেন নিজের জীবন ধারন কোন মতে।
অবশেষে, অবসর জীবন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা পরামর্শ দিলো, ভবিষ্যৎ এর একটা খুঁটি দরকার। এক চিলতে ঠাঁই অন্তত গড়তে, শহরের বুকে নিজের চলার জন্য গুছিয়ে নিতে।
সঞ্চিত অর্থগুলোর অপচয় ভেবে পাত্তাই দিলেন না রাহেলা ওসবে কান দিয়ে।
গাট্টি বোঁচকা নিয়ে হাজির হলেন বাবার ভিটেতে। চেনা মুখগুলি এত অচেনা হয়ে গেল রাতারাতি। মনে করিয়ে দিলো যেমনটি হয়েছিলো তাঁর বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর।
বড় ভাবী ছোট ভাবীর কথা ছোঁড়াছুড়ির এক পর্যায়ে, কোনের ছোট ঘরটিতে ঠাঁই মিললো বটে। রাতে খাবার টেবিলে মাসকাবারি প্রতিদানটাও খাওয়া খরচ বাবদ নির্দিষ্ট হলো।
অন্তরে চোটটা এবার টের পেলেন রাহেলা জোরেই। মাতৃসম দায় বহন করলেন যাদের আপদে বিপদে। আজ সন্তানসম দায়টায় তাদের এত আপত্তি কেন?
তবুও সয়ে নিয়েছিলেন রাহেলা।
কিন্তু যখন প্রকাশ্যেই সবাই তাঁর আগলে রাখা সঞ্চয়ে হাত বাড়ালো এবং সদুত্তর না পেয়ে মানসিক যন্ত্রনার কথা ছুঁড়তে থাকলো অহরহ,তখন নিজ ঘরে পরবাসীর মত রাহেলা বেগম ছটফট করতে লাগলেন এখান থেকে মুক্তির। সবচেয়ে কষ্টটা তখনই হতে থাকলো, যখন ওরা ওদের পারিবারিক কোন্দলগুলো ডিঙিয়ে একজোট হয়ে রাহেলাকে কোনঠাসা করলো। এক ঘরে করে রাখার মত প্রতিটা বিষয় থেকে দূরে রাখেলো।
শারিরীকভাবে অচল হবার আগেই এই মানসিক অচলতা কুরে কুরে খেতে থাকলো অনুক্ষন রাহেলাকে। ভয় জাগলো আগামীর। নিরুপায় হয়ে সময় থাকতে শেষ চেষ্টাটা করতে গিয়ে গোপনে দীর্ঘ দিনের শুভাকাঙ্খী সহকর্মীদের স্মরনাপন্ন হলেন মোবাইলে।
তাঁদের সহায়তায় কদিনেই কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানার খোঁজ খবর করে যোগাযোগ করলেন রাহেলা। অবশেষে ঢাকার অদূরে ” গোধুলি”তেই মন স্হির করলেন নিজের ভবিতব্যের। এ যাত্রাতেও বাঁধা পেয়ে সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই রাহেলার।
মিনু নিজের আঁচলে রাহেলার চোখের পানির বাঁধ ঠেকিয়ে বলে, ভাগ্যিস সেদিনই বেরিয়ে পড়েছিলেন নইলে কি যে হতো। আর একটু দেরী হলেই…….
সদ্য কান্না ধোয়া বিষন্ন মুখটিতে বিস্ময় নিয়ে রাহেলা বললেন,
—– আর কি হতে বাকি থাকলো বলোতো? গোধূলিতেতো পৌঁছুতেই পারলাম না।
—- পারলেন না বলেইতো আমার ভাগ্যটা আজ প্রসন্ন হলো। এই দুঃসময়ে আমি মাথার উপর মায়ের ছায়া পেলাম।
সেদিনের এমন যোগসাজশটার কিন্তু বড্ড দরকার ছিল আন্টি।
—– যোগসাজশ? কিসের?
—– নয়তো কি। এই যে মা মেয়ের।
একটু বুঝতে সময় লাগলো কথাটা রাহেলা বেগমের। খানিক আগের বিষন্ন মুখটায় যেন এক টুকরো আলোর ঝলকানি খেলে গেলো।
দুহাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন কাছে দাঁড়ানো জল ছলছল চোখের মিনুকে।
রাহেলার কান্নায় জড়িয়ে যাওয়া অস্পষ্ট কথাগুলো স্পষ্ট উচ্চারনে মিনুর কানে আছড়ে পড়লো এতদিনের না পাওয়া সবগুলো ভালোবাসার সংমিশ্রনে, ” তাহলে আমাকে আন্টি ডেকে আর একটা মুহূর্তও নষ্ট করিস না মিনু। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে হয়ে গেছে।
ঠিক তখুনি রাহেলার বুকের মাঝে মিনুর কান্নার দমকে ফুলে ওঠা কন্ঠে উচ্চারিত হলো”মা” ডাকটি পৃথিবীর সবটুকু সুধা নিয়ে।
– Fahmida Reea
Send private message to author







