আমাদের শৈশবের জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা নাগিনা। শ্রীদেবী অভিনীত এই সিনেমাটা সুপারহিট মুভির তকমা পেয়েছিল। আজকের গল্প এই সিনেমাটি নিয়ে না, বরং সাধারণ জীবনে এই সিনেমার প্রভাব নিয়ে।
আমরা তখন আমাদের নিজেদের বাড়ীতে সিফট্ করেছি। জায়গাটা শহরের মধ্যে হলেও তখনো পর্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশ বজায় ছিল আর ছিল সাপের উৎপাত। যখন তখন এর বাড়ী অথবা ওর বাড়ীতে সাপ দেখা গেছে বা মারা হয়েছে জাতীয় খবর প্রায়ই শুনতাম। তখন আমাদের কৈশোর। আমাদের বলতে আমি আর আমার বন্ধু মিন্টু। নাগিনা সিনেমার বয়সও প্রায় পাঁচ ছয় হয়ে গেছে কিন্তু তার আবেদন একটুও কমেনি। ভিসিআর ভাড়া করে তখনো এই সিনেমা মহা উৎসাহে দেখা হতো।
একদিন আমাদের বাড়ীর পাশের প্লটটাতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। ওরা বাড়ী তৈরী করবে, এর জন্য এই খোঁড়াখুঁড়ি। খোঁড়াখুঁড়ি চলাকালীন অবস্থায় হঠাৎ সাপ সাপ করে চিৎকার। আমি আর মিন্টু দেরী না করে হাতে লাঠি নিয়ে উপস্থিত। নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শন পূর্বক দিলাম লাঠির বাড়ি। একটা সাপ মূহুর্তেই ধরাশায়ী আরেকটা পগারপার। যাই হোক একটা সাপ মেরেই আমরা হিরো হয়ে গেলাম। মরা সাপটা লাঠির ডগায় নিয়ে এলাকা ঘুরে এলাম। এবার এটার গতি করতে হবে। কেউ বলছে কবর দিতে, তো কেউ বলছে দাহ করতে। আবার অনেকের মত আগে পোড়া তারপর পুঁতে ফেল। আমি আর মিন্টু দুজন মিলে শেষের পরামর্শ টা গ্রহন করলাম। আমরা যখন দাহ করার বন্দোবস্ত করছি তখন আমাদের প্রতিবেশী তকিম মিয়া বলে উঠলো, ” এডা তো মনে হয় ন্যাগ, যেটা ভাগোছে ওড্যা ন্যাগিন আছিলো। ন্যাগিন কিন্তু তুরকেরে ছাড়বি ন্যা। সাবধানে থ্যাকিস।” এই কথা শুনে আমরা কি করবো বুঝতে পারছি না। যাই হোক আমি সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ” দুর এসব ভুয়া কথা। ঐ মিন্টু তকিম মিয়ার কথা বিশ্বাস করিস না।”
—— নারে ভোম্বল, তকিম মিয়া ঠিক কথাই বলেছে। দেখিসনি নাগিনা সিনেমাতে। ওরে বাপরে আমি গেলাম।
এই কথা বলে মিন্টু পালিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু আমি ওকে আটকালাম, ” চুপ কর, বোকার মতো কথা বলছিস কেন?”
এমন সময় তকিম মিয়ার বউ গুনবতী বিবি বলে উঠলো, ” পালালেই কি ব্যাঁচে জাভা নাকি, ওধের চোখে ক্যামেরা বসানো আছে। কঠিন ক্যামেরা, একবার ফোটো তুল্যেহ লিলে পড়ে বংশের পর বংশে ঐ ছবি থ্যাইকে জাভে। তুমাহদের ফোটো লিস্চয়ই তুল্যেহ লিয়েছে। এখন পালিয়েও ব্যাঁচতে প্যারভানা।”
এই কথা শুনে সাপের আশেপাশে যারা ছিলো তারা তাড়াতাড়ি সরে পড়লো আর আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল, যেন আমাদের চেহারায় মৃত্যুর ছায়া খেলা করছে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ” চাচি এসব কি বলছেন! সাপের চোখে আবার কিসের ক্যামেরা?”
——- ইস্পিস্যাল ক্যামেরা। তুমাহদের এসব ক্যামেরা ঐসগ ক্যামেরার কাছে কিচ্ছু লয়। বইতে দেখেছি।
—— বই? কোন বই?
—— ক্যানে, নিগাহে, নাগিনা এই সগ বইয়ে। ঐযে কি যেন বুলছ্যে, শিড়ি দেবী। হেব্বী সাপের ড্যান্স পাড়ে। হেব্বি লাগে মেয়েডাকে।
আমি বিরক্ত হয়ে মিন্টুকে বললাম, ” ঐ এদের কথা শুনলে এটার কোন গতি করা যাবে না। নে হাত লাগা এটাকে মাটিতে পুঁতে ফেলি।”
——- না রে আমি পারবো না। আমি যাই।
—— চুপ, কোন কথা না বলে হাত লাগা।
যা-ই হোক কোনমতে আমরা মরা সাপ টার একটা গতি করলাম। আর এদিকে আমরা ভিলেন হয়ে গেলাম। সাপ মারার সময় যারা আমাদের খুব উৎসাহ দিয়েছিল তারা এখন আমাদের সমালোচনায় মুখর। আমরা বেয়াদব, নিজেদের অমরেশপুরি মনে করি, যখন নাগিনা এ্যাসে ছোবল ম্যারবে, তখন বুঝবে ঠ্যালা কাখে বুলে। তোরা কি মনে ক্যরেছিস, ক্যাখে ল্যাড়তে ক্যাখে ল্যাড়েছিস! এসব কথা সারাদিন ধরেই চলতে লাগলো।
এদিকে বিকেল হতেই খবর পেলাম মিন্টুর জ্বর। মিন্টুর মা আম্মাকে ডেকে কাঁদতে কাঁদতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে। আম্মা যত উনাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে, উনার কান্নার সুর তত উপরে উঠেছে। শেষে আম্মা থাকতে না পেরে, আমাকে এসে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলেন। এদিকে আমিও একটু একটু করে ভয় পেতে শুরু করেছি। আম্মা বিকেলে আর বাইরে যেতে দিলেন না। পাড়ায় কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। ছেলেমেয়েরা কেউ বাইরে নেই। জানালা দিয়ে গুনবতী বিবি কে দেখলাম মিন্টুদের বাসায় কি যেন নিয়ে গেলেন। আম্মাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ” ওটা পড়া পানি। কোন এক মহিলা পীরের কাছ থেকে পড়ে এনেছে। আমার জন্য ও নাকি দিয়ে গেছে। “
সন্ধ্যায় আব্বা ফিরে সব কিছু শুনে আমাকে ডাকলেন, ” তুই কি খুব ভয় পেয়েছিস?”
—– জ্বি, মানে….. বলে দৃষ্টি নামিয়ে নিলাম।
—– তা তুই সাপ মারতে গেলি কেন? জানিস না বিনা কারনে প্রাণী হত্যা করতে হয় না!
—— সরি আব্বা।
—— যা, হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস । আর এসব নিয়ে কিছু ভাবিস না। এসব বাজে কথা। সাপ আর পাঁচ দশটা প্রাণীর মতোই সাধারণ। এমনিতে নিরিহ তবে এদের মুখে বিষ থাকে। এরা ছোবল দিলে বিষক্রিয়া হতে পারে। তাই এদের থেকে দূরে থাকাই ভালো।
আম্মা তখন সেই পড়া পানি দেখিয়ে বললো, “এটা কি করবো?”
আব্বা বিরক্ত হয়ে বললেন, ” গুনবতী বিবি এলে, ওকে এটা দিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াইও। “
উৎকন্ঠার মধ্যে দিয়ে রাতটা পার হলো। সকালে শুনলাম মিন্টুর জ্বর টাও ছেড়ে গেছে। গুনবতী বিবির এই নিয়ে সেকি উচ্ছাস। তার আনা পড়া পানি খেয়ে মিন্টু সুস্থ আর আমি বিপদ মুক্ত। ওদিকে তকিম মিয়ার মুখটা খুব শুকনো হয়ে আছে। নাগিনার প্রতিশোধ দেখতে পারলেন না বলে।
কিন্তু এখনো, যখনই টেলিভিশনে শ্রীদেবীর নাগিনা বা সাপের সিনেমা দেখি, তখন কেমন যেন শরীর টা শির শির করে উঠে।
©শোয়াইব আহমদ (Shoaib Ahmad)
Send private message to author







দারুণ…! শৈশবের এমন স্মৃতি সত্যি অনেক রোমাঞ্চকর।
দারুন স্মৃতিচারন।