বাসায় ফিরেছি একটু আগে। মা এসেছিলেন, খাবারের জন্য ডাকতে। জানালাম, খেয়ে এসেছি। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মা আসলে ব্যস্ত কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে। যদিও সন্ধ্যার সময় হওয়ার কথা ছিল অনুষ্ঠানটা, এখন পাত্রপক্ষ বলছে, সকাল সকাল করবে।
ফলে মা এখন রীতিমত দৌড়ের ওপর আছেন। আগামীকালের নাস্তা, প্লাস দুপুরের খাবার। মা যদিও এব্যাপারে এক্সপার্ট, তারপরও হঠাৎ করে ছয় ঘণ্টা সময় কমে যাওয়ায় ঘাবড়ে গেছেন। একধরনের অস্থিরতায় পেয়ে বসেছে।
আমার উচিৎ মা কে হেল্প করা। কিন্তু ইচ্ছে করছে না। ইনফ্যাক্ট, কালের অনুষ্ঠান নিয়েও কোন এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে না। তার ওপর যোগ হল এই ফোন। একটু আগে আনিস সাহেব ফোন করেছিলেন। জানালেনছেলেটার ট্রেস পাওয়া গেছে। যে হ্যাকারকে হায়ার করা হয়েছিল, সে ক্র্যাক করে ফেলেছে। আই পি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে ছেলেটার নাম, বাসার অ্যাড্রেস আর মোবাইল নাম্বারও জানা গেছে।
জানালেন, ছেলেটাকে অ্যারেস্ট করতে চাইলে আমাদের অফিসিয়াল কমপ্লেইন করতে হবে। এরপরে জানতে চাইছিলেন, আমার সেই বান্ধবী এ ব্যাপারে কমপ্লেইন করতে চায় কি না। উত্তর আমার নিজেরও জানা নেই। যেহেতু ভুক্তোভুগী আমি না, তাই সিদ্ধান্তও আমার না। তাই শুধু বললাম, ডিটেইলটা ম্যাসেজ করতে।
ম্যাসেজটা আসার পরে প্রথম ফোনটা করলাম মিতুকে। সব কিছু খুলে বললাম। শুনে ও রীতিমত আকাশ থেকে পড়ল। এরপরে হাসতে হাসতে বলল
— কি বলেন?
— ইয়েস।
— এখন?
— সেটাই ভাবছি।
এখন সেই ভাবনাটাই চলছে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না। একবার মন বলছে, এনাফ ইজ এনাফ। আবার মনে হচ্ছে দেখি না কি হয়? সেই স্টুডেন্ট লাইফের ডেয়ারিং মেন্টালিটি আসি আসি করছে। এমন সময় সোহরাব সাহেবের ফোনটা আসল
— ডিস্টার্ব করলাম?
এই লোকটার এই ভদ্রতা কেমন যেন আনইজি ফিলিং দেয়। মানুষটা এতোটাই ফর্মাল, কেন যেন মনে হয়, কোন শপে, কোন কাস্টমার ডিল করছে। ম্যানেজার স্বভাবটা রক্তে মিশে গেছে। হেসে ফেললাম। বললাম
— না। বলুন
— তেমন কিছু না, এমনি ফোন করলাম।
এধরণের ফোন প্রতিটা সুন্দরী মেয়েই জীবনে প্রচুর পায়। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগলেও, একসময় সয়ে আসে। একসময় মজাও লাগে। কিন্তু এই লোকটাকে সেভাবে ডিল করতে মন চাইছে না। কিন্তু ওর ফোন আসলে সেভাবে ইক্সাইটেডও ফিল করি না।
কি বলব ভাবতে গিয়ে দেখলাম একটা কথাই মাথায় আসছে। সেটাই বললাম।
— আজকে গিয়েছিলাম, আপনার ভেনাস জুয়েলার্সে। মাপ দিয়ে এসেছি।
— প্রথম কথা ওটা আমার না। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ব্যাপারটা জানি, রনি ফোন দিয়েছিল।
এরপরে আরও কিছুক্ষণ বকবক করল। বেশিরভাগই আবোল তাবোল কথা হল। খুব যে মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, তা না। আসলে এরকম গল্প আমরা মেয়েরা শুনতে অভ্যস্ত। শুনতে বিরক্ত লাগলেও শুনে যাই। মাঝে মাঝে ‘তাই?’ বলে অবাক হই। কখনো বলি ‘ইন্টেরেস্টিং তো?’ আজ কি করলাম, নিজেই বলতে পারব না। মিনিট পাঁচেক পরে ভদ্রলোক নিজেও বোধহয় বুঝত পারলেন, গল্প গড়াচ্ছে না। একসময় নিজে থেকেই বললেন।
— ওকে দেন। রাখি তাহলে?
হবু স্বামীর এধরণের কথার উত্তরে হতাশ হওয়াটা মোটামুটি বাধ্যতামূলক। তারপরও হলাম না। আসলে আসল না অ্যাক্টিং টা। ‘ওকে’ টাইপ সরল উত্তর দিয়ে আমিও কোন বাধা দিলাম না।
ফোনটা রাখার পর নিজেই অবাক হলাম। কেমন রিলিভড ফিল করছি। কেমন বন্দী ছিলাম মনে হচ্ছে। কেমন ভয় ভয় লাগতে শুরু করল। এটা কি সব মেয়েরই হয়? বিশেষ করে সেটল ম্যারেজে? নাকি শুধু আমার হচ্ছে? নাকি…
চোখ বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিলাম। আজ সৈকতের সাথে দেখা না হলেই বোধহয় ভালো হত। দুপুরে জুয়েলার্সের কাউন্টারের মিররে যখন ওকে দেখতে পেলাম, মনে হল সারা শরীর বোধহয় অবশ হয়ে গেল। এরপরেই বুকের ভেতর শুরু হলে হাতুড়ির বাড়ি। প্রথমবারের মত মনে হল, দিস ইজ ডেস্টিনি। দেয়ার ইজ সামথিং ইন বিটুইন আস।
চেয়ার ছেড়ে নামলাম। এরপরে ঝট করে ঘুরতেই মুখোমুখি পড়ে গেলাম। সৈকতও বোধহয় আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল। সেই স্মাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুটা সময় মুখে কোন কথা আসল না। কি বলব? আমি বলব, না ও শুরু করবে? মনে হচ্ছে ও কিছু বলবে না। নো প্রবলেম। আই ক্যান স্টার্ট।
আসলে এই ছেলেটার মুখোমুখি হলেই কেন যেন দুষ্টুমিতে পেয়ে বসে। কথা বলতে একটুও হেজিটেশান কাজ করে না। কোন ছেলের সাথে কথা বলার সময় যে অদৃশ্য ফিল্টার মনে বসিয়ে রাখতে হয়, এর ক্ষেত্রে সেটা লাগে না। মনে হয় এই ছেলেকে যা খুশি বলা যায়। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
— কি ব্যাপার?
কিলার স্মাইলটা এখন ঠোঁটে ঝুলে আছে। এরপরে মাথা দুদিকে নেড়ে বলল
— কিছু না।
— এখানে?
উত্তরে কিছু একটা হয়তো বলতো, সুযোগ পেল না। রনি সাহেব এসে হাজির হলেন।
— আসুন ম্যাডাম।
এরপরে হাত দিয়ে একটা দিক নির্দেশ করলেন, সেটা কাউন্টারের পাসের একটা প্যাসেজ। সেদিকে মনে হচ্ছে ম্যানেজারের রুম। সোহরাব সাহেব এমন হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটাবেন বুঝিনি। কেমন অস্বস্তি লাগছে এখন। সৈকত কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। আমি নড়ছি না। সৈকতকে হাতছাড়া করা যাবে না। ওকে বলার জন্য অনেক কথা জমে আছে। একবার তাকালাম ওর দিকে। এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমার মাথায় চিন্তার ঝড় চলছে।
মাথায় প্রথম যে কথাটা আসল, সেটাই বলে ফেললাম। রনি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম
— হি ইজ উইথ মি।
— ও সিওর।
এরপরে চোখের ইশারায় সৈকতকে বললাম, চলুন। কিছুটা হেজিটেট করলেও আমাদের সঙ্গে চলতে শুরু করল। ম্যানেজারের রুমে। উনার রুমের একটা দেয়াল জুড়ে আছে মনিটর। বাইরের শো রুমের সবগুলো কাউন্টারই তিনি এখান থেকে মনিটর করেন। ইতিমধ্যে সম্ভবতঃ ইন্সট্রাকশান দেয়া হয়ে গেছে। উনার মিনি সাইজের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপরে বেশ অনেকগুলো বক্স রাখা। আংটিরই মনে হচ্ছে। এক্সক্লুসিভ কালেকশান কি?
আমাদের বসতে বলে উনি নিজের চেয়ারের দিকে এগিয়ে গেলেন।
— কফি বলি?
সৈকতের দিকে তাকালাম। সে সামনে রাখা আংটিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। চুরি করার মতলব করছে নাকি? করলে খারাপ হয় না। অনেকদিন পরে একটা চুরি দেখা হবে। আমার ঠোঁটের কোণে হাসি চলে এসছিল। নিজেকে সামলে নিলাম। সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললাম
— কফি?
ও এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ঘাড় নাড়ল। এবার ওর দিকে ভাল করে তাকালাম। ভ্রু কিছুটা কুঁচকে আছে। কারণ সম্ভবতঃ আংটিগুলো। কিংবা হয়তো এখানে আসবার কারণ ভাবছে। কনক্লুশান অবশ্য একটাই হয়, বিয়ের আংটি কিনতে এসেছি। শুধু প্রশ্ন হচ্ছে, কার বিয়ে। বা ঘুরিয়ে বলা যায়, নিজের জন্য, না গিফট দেয়ার জন্য।
প্রশ্নটা সৈকতের মনে আসা স্বাভাবিক। যে মেয়ে গতকাল তাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছে, সে আজ হাসতে হাসতে নিজের বিয়ের আংটি দেখতে এসেছে, একটু বেশিই অ্যাবনরমাল ঘটনা। যদি ভেবে থাকে গিফটের জন্য, তাহলে এখনই ভুল ভাঙবে। সে পরে দেখা যাবে। ফিসফিস করে সৈকতের উদ্দেশ্যে বললাম
— পরে সব বলছি।
মাথা নোড করল। ‘ওকে’ টাইপ জেস্টার। আমার নিজেরও অনেক কথা বলার আছে ছেলেটাকে। আপাততঃ এই ঝামেলা শেষ করা দরকার। এই মুহূর্তে আমার কাজ দুটো। আগামীকাল এনগেজমেন্টের জন্য একটা ছেলেদের আংটি কেনা। আর অন্যটা নিজের আঙ্গুলের মাপ দেয়া। দুটোই খুব দ্রুত সারতে হবে।
রনি সাহেব ততোক্ষণ সামনে রাখা বক্স গুলো একে একে খুলে সামনে মেলে ধরছেন। চোখ ধাঁধানো একেকটা আংটি। মনে হচ্ছে ডায়মন্ড। উনার অ্যাপ্রোচ দেখে একটু কনফিজড হয়ে গেলাম। উনি কি চাইছেন আমি আংটি পছন্দ করি? বললাম
— আমার তো শুধু মাপ দেয়ার কথা।
কথাটা কেন এতোটা কর্কশ আওয়াজে বললাম আমি নিজেই জানি না। রনি সাহেব বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। মুখে অস্বস্তির একটা হাসি। কোনরকমে বললেন
— সিওর।
এরপরে বিভিন্ন সাইজের কিছু কিছু আংটি এগিয়ে দিলেন। সেসব মনে হয় সোনারও না। কোন কারুকাজ নেই। সেসবের একটা আঙ্গুলে দিলাম। একটু টাইট হচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝে রনি সাহেব আরেকটা এগিয়ে দিলেন। এটা হল।
এরপরের ঘটনা অবশ্য ফাস্ট ফরোয়ার্ড করা যায়। কফি আসল। আমরা তিনজনেই কফি খেলাম। সেই সময়টা সৈকত আংটিগুলো নেড়েচেড়ে দেখল। প্রাইস জিজ্ঞেস করল। সবই লাখের ওপরে। একসময় বলল, একটু কম বাজেটের ভেতরে আংটি দেখাতে। রনি সাহেবের খুব একটা ইচ্ছে না থাকলেও, দেখালেন। আড় চোখে আমিও দেখলাম। সেসবের ভেতরে একটার দাম জানতে চাইল। রনি সাহেব জানালেন। এই ফাঁকে আমিও বললাম, ছেলেদের রিং দেখাতে। সেখান থেকে আমি একটা রিং পছন্দ করলাম। এরপরে পেমেন্ট দিয়ে বেরিয়ে আসলাম।
— কার জন্য নিলেন?
— আমার হবু বরের জন্য?
সৈকতের দিকে তাকালাম। কিছুটা কি হতাশা? না কেবল প্রশ্ন? বোঝা যাচ্ছে না। উত্তর দিতে গিয়ে টের পেলাম, আমি নিজেই প্রশ্ন করছি
— আপনি কার জন্য কিনলেন?
আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকাল। আমার চেহারায় কি ঈর্ষা ছিল? না কেবল প্রশ্ন? জানি না। শুধু পরের কথাটা শুনে ফিল করলাম, সারা শরীরে কেমন ঢেউ খেলে গেল। বলল
— খিদে পেয়েছে।
— আমারও।
— চলুন।
এখানে খাবার জায়গা বলতে তো ফুড কোর্ট। সেখানে কি যেতে বলছে? একদম ইচ্ছে করছে না। তারপরও সৈকতের পেছন পেছন এগিয়ে গেলাম।এক্সিলেটরের সামনে এসে কি ভেবে ঘুরল। আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে শুধু জিজ্ঞেস করল
— একসাথে রিক্সায় চড়তে আপত্তি আছে?
অর্থাৎ ফুড কোর্টে যাচ্ছি না। নীচে কিছু ঘুপচি দোকান আছে এবং সেখানে না। একটু দূরে কোথাও। ওকে, যাওয়া যায়। আমি মেয়ে বলে হয়তো একসাথে রিকসায় যাইয়ার ব্যাপারে হেজিটেট করছে। আমার আপত্তি নেই, কথাটা এতো দ্রুত বলব? আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এরপরে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি অদ্ভুত একটা অফার করলাম সৈকতকে
— লেবারদের খিচুড়ি খাব।
— মোহাম্মদপুরেরটা?
সারা মুখে আমার হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মনে মনে আফসোসও হল, আর কিছুদিন আগে কেন দেখা হল না। মুখে শুধু বললাম
— হ্যাঁ।
‘মোহাম্মদপুরটা’র আরেকটা মানে হয়। ওখানে ওর রেগুলার যাওয়া আসা আছে। কথাটা কি জিজ্ঞেস করব? সুযোগ পেলাম না। আমার ‘হ্যাঁ’ বলার সাথে সাথেই ‘চলুন’ বলে লিফটের দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করল। আমি এগোলাম। মনে হচ্ছে হাওয়ায় ভাসছি।
পাশাপাশি দুটো লিফট। ইনডিকেটর বলছে, একটা নীচে থেকে আসছে। অন্যটা এখন আট তলায়। লিফটের ডাউন সুইচটা টিপে অপেক্ষা করছি। আটতলারটা নড়ছে না। মনে হচ্ছে অপেক্ষা বেশ কিছুক্ষণ করতে হবে। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। মনে মনে প্ল্যান করছি। কি কি বলব খাওয়ার সময়। এখন অবশ্য হালকা আলাপ করা যায়। কি করেন, বাসায় কে কে আছে, কিংবা… । ইচ্ছে করছে না। বরং এভাবে পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে এক্সাইটমেন্টটা এঞ্জয় করতে ভালো লাগছে।
এমন সময় নীচ থেকে আসা লিফটটা খুলে গেল। নিজের অজান্তেই চোখ চলে গেল ওদিকে। মনে হল পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেল। ঠিক এই মুহূর্তে, এমন একটা ঘটনা ঘটা জরুরী ছিল? হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি আমি।
লিফটের দরজা খোলার পরে প্রথম যে মানুষটা বেরিয়ে এলো সে আমাকে দেখে সুন্দর করে হাসল। এরপরে আমার দিকে এগিয়ে আসল। ঠোঁটের কোণে কিলার স্মাইল।
— হাই।
চলবে
Razia Sultana Jeni
Send private message to author





