ক্লিপ্টোম্যানিয়াক পর্ব ১৪

১৪

সকালে ঘুম ভাঙল মায়ের আওয়াজে। জিজ্ঞেস করতে এসেছিলেন, পার্লারে যাবো কি না। জানিয়ে দিলাম, যাব না। ভেবেছিলাম কথাটা শুনে মা চলে যাবেন। গেলেন না। বিছানায় বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন

— কি হয়েছে তোর?

ঘুম বেশ ভালোমত ভেঙ্গে গেছে। হাসার চেষ্টা করলাম। বললাম

— কি হবে? কিছু না।

মা বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। জিজ্ঞেস করলাম

— বিশ্বাস হচ্ছে না?

মা বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। এরপরে বললেন

— গতকাল প্রলয় ফোন করেছিল।

— হোয়াট?

চিৎকারটা এতোটা জোরে হবে আমি নিজেও ভাবিনি। দ্রুত নিজেকে কন্ট্রোল করলাম। উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম

— কেন? কখন?

— তুই যখন আংটির মাপ দিতে গিয়েছিলি।

এবার ক্লিয়ার হল কিভাবে প্রলয় খোঁজ পেল আমি কোথায় থাকতে পারি। যে ঝড়টা প্রায় থেমে গিয়েছিল, হঠাৎ করে আবার মাথায় সে ঝড় শুরু হল। প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসল সেটাই জিজ্ঞেস করলাম

— কি বলছিল প্রলয়?

— তেমন কিছু না। বলল তুই নাকি জানিয়েছিস আজকে বসুন্ধরাতে যাবি। জিজ্ঞেস করছিল দোকানের নাম

মনে হল নিজের গালে ঠাস করে একটা চড় মারি। কি ঘটনার কি ইন্টারপিরটেশান হল। পুরো ব্যাপারটা মাকে বোঝানো এখন অসম্ভব। মা ধরেই নিয়েছে, আমি ইনডিসিশানে ভুগছি। মায়ের ভুল ভাঙ্গানো দরকার। বলতে শুরু করলাম

— তুমি যেমনটা ভাবছো, তেমন কিছু না।

বেশ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন মা। এরপরে বললেন

— তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছু করতে বলব না, শুধু বলব…

মাকে শেষ করতে দিলাম না। কি বলবে জানি। প্রলয়ের সাথে প্যাচ আপ বা বিয়ে কোনটাতেই মায়ের আপত্তি নাই। কিন্তু সেকথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আর আসল ঘটনা এতোই কমপ্লিকেটেড, বললেও মা বুঝবে না। শুধু বললাম

— ট্রাস্ট মি, এই বিয়ে আমার ইচ্ছেতেই হচ্ছে। আর প্রলয় ইজ মাই পাস্ট।

মায়ের চেহারা দেখে মনে হল না কথাটা বিশ্বাস করলেন। তবে আর কোন কথা বললেন না। আর কিছুক্ষণ পরে আমার এনেগেজমেন্ট। আর এখন যদি শোনে মেয়ে তাঁর প্রাক্তনকে ডেকেছিল আলাপ করতে, যেকোন মা ই ঘাবড়ে যাবেন। 

মা চলে যাওয়ার পরে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। মাথা গরম বলতে যা বোঝায়, এই মুহূর্তে আমার তেমন একটা অবস্থা। কি করব, বুঝতে পারছি না। শুধু ফিল করছি, ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আর সব কিছুই হতে যাচ্ছে আমার ছোট্ট একটা পাগলামির জন্য।

আসলে সব মানুষের জীবনেই বোধহয় এমন একেকটা মুহূর্ত আসে, যখন লাইফ অ্যান্ড ডেথ টাইপ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় চোখের পলক পড়বার আগেই। কিছু ভাববার সুযোগ পাওয়া যায় না। ইউ হ্যাভ টু জাস্ট গো উইথ ইয়োর ইন্সটিংক্ট। লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকেও তেমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। প্রলয় যখন এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল, প্রথম যে কাজটা করলাম, আড় চোখে সৈকতের দিকে তাকালাম। ও লিফটের ইনডিকেটরের দিকে তাকিয়ে আছে। লিফট নামছে। আই ওয়াজ জাস্ট প্যারালাইজড দেন। মুখে কোন কথাও আসছে না, নড়তেও পারছি না।  

চোখের সামনে লিফটটা আসল। কোনদিকে না তাকিয়ে সৈকত লিফটের ভেতর ঢুকে গেল। লিফটের দরজা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। একবারের জন্যও আমার দিকে তাকালো না। অভিমান করেছে? 

জীবনে প্রথমবারের মত মনে হল, আই জাস্ট মেড অ্যা ব্লান্ডার। বলেছিলাম না, জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন একটা সিদ্ধান্ত পুরো জীবনের ডিরেকশান ডিসাইড করে দেয়। এটা ছিল তেমন এক মুহূর্ত। আর কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আমি আসলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আই লস্ট হিম।

মাথা টলছে। মনে হচ্ছিল আমি পড়ে যাব। আমি ছাড়া লাইনের প্রায় সবাই লিফটে ঢুকে গেছে। আমি আর প্রলয় দাঁড়িয়ে শুধু। হতভম্ব হয়ে প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার সেই অবাক চাহনি দেখে সুন্দর করে হাসল প্রলয়। সেই কিলার স্মাইল, কিন্তু তেমন কোন অনুভূতি হল না। প্রথমবারের মত টের পেলাম, আই ডিডন’ট লাভ দ্যাট স্মাইল। অ্যাকচুয়ালি আই লাভড সামথিং এলস। প্রলয়ের ভেতর সেই ‘সামথিং এলস’ আর নেই। কিংবা থাকলেও, সেটা আর এক্সাইট করছে না। ওর উপস্থিতি বুকে আর কোন ঢিপঢিপানি তৈরি করছে না।

— কি কিনলে?

আমার হাতের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল। উত্তরে বলতে পারতাম, এনগেজমেন্ট রিং। বললাম না। ইচ্ছে করল না। কোন উত্তরই দিতে ইচ্ছে করছে না। চুপচাপ হাঁটতে থাকলাম। 

— চলো কোথাও বসি।

চোখ তুলে একবার তাকালাম প্রলয়ের দিকে। ও এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। এ প্রশ্নেরও উত্তর দিতে মন চাইছে না। একবারও বলতে ইচ্ছে করল না, মোহাম্মদপুরে চল। কোন প্রতিবাদও করতে মন চাইল না। কেবল ওর পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম। একসময় আবিষ্কার করলাম, আমরা এক তলায় নেমে এসেছি। 

— খুব খিদে পেয়েছে। চল কিছু খেয়ে নিই।

কথাটা শুনে কেবল প্রলয়ের দিকে তাকালাম। কোন রকমে বললাম

— খিদে নেই।

এবার বোধহয় প্রলয় আমার দিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করল। চোখে মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করল

— এনিথিং রং?

আমরা তখন বাইরে বেরোনোর দরজার কাছে পৌঁছে গেছি। বেরিয়ে আসবার পরে পড়লাম কড়া রোদের খপ্পরে। পাশে দাঁড়ানো প্রলয়ের দিকেও তাকাতে পারছি না। কপালের ওপর হাত রেখে কোন রকমে প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম

— আমার একটু কাজ আছে।

‘কি কাজ?’ প্রশ্নটা বোধহয় মুখে চলেও এসেছিল। করল না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বোধহয় বুঝতে পারল, আমি এই মুহূর্তে ওর সাথে আলাপে ইন্টেরেস্টেড না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল

— বাইক নিয়ে এসেছি, বললে ড্রপ করে দিতে পারি।

‘না’ উত্তরটা মুখে চলেই এসেছিল। কেন যেন বলতে পারলাম না। দুম করে আইডিয়াটা মাথায় আসল। বললাম

— মোহাম্মদপুর।

ওখানে কি কাজ, সেটা জিজ্ঞেস করল না। শুধু অপেক্ষা করতে বলল। এরপরে বেসমেন্টের কার পার্কের দিকে এগিয়ে গেল। কাজটা ঠিক করলাম কি না, মনে মনে একবার ভাবলাম। কোন উত্তর পেলাম না। কিছুটা স্বার্থপরের মত হল কাজটা, কিন্তু এছাড়া উপায় নেই। সৈকত যদি রিক্সায় গিয়ে থাকে, এটাই একমাত্র সলিউশান। অবশ্য সৈকত যে ওখানেই গিয়েছে, সেব্যাপারে আই অ্যাম নট দ্যাট সিওর। জাস্ট, চান্স নেয়া। 

বাইক নিয়ে চলে এসেছে প্রলয়। নতুন কিনেছে মনে হচ্ছে। কারো কাছ থেকে চেয়েও আনতে পারে। মিতুর সাথে সম্পর্কের এখন কি অবস্থা কে জানে। চাকরীতে কি রেখেছে? বাইকে প্রলয়ের পেছনে বসতে বসতে টের পেলাম বুকের ঢিপঢিপানি ফিরে এসেছে। 

বাইক এগিয়ে চলছে। অনেক অনেক দিন পরে বাইকের পেছনে বসলাম। শেষটা বসেছিলাম তিন বছর আগে। সেদিন সেই ঘটনার পরে প্রলয় বাসায় ড্রপ করে গিয়েছিল। সারা রাস্তা একটাও কথা বলেনি। ইভেন ড্রপ করার পরও না। ‘আসি’ টাইপ কিছু বলে বিদায় নেয়নি। ড্রপ করার পরে জাস্ট বাইকটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল।

— কোনদিক দিয়ে ঢুকব?

আড়ংং এর কাছাকাছি চলে এসেছি। লালমাটিয়া দিয়েও ঢোকা যায়। আবার এগিয়ে গিয়ে রিং রোড দিয়েও। বললাম

— সোজা চল।

ঠিক করলাম, শ্যামলী গিয়ে প্রলয়কে ছেড়ে দেব। ওকে সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি না। মন বলছে, ওখানে সৈকতকে পাব। যদিও তাতে এমন কিছু লাভ হবে না। হয়তো জাস্ট সুন্দর একটা ‘গুড বাই’ বলা হবে। 

— মনে আছে এখানে লেবারের খিচুড়ি খেতে আসতাম।

উত্তর দিলাম না। শুনতে পাইনি এমন ভাব করে বসে থাকলাম। বাইক এগিয়ে চলছে। আর কিছুটা। ফিল করলাম, প্রলয়ের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো ভাবতে ইচ্ছে করছে না। ঠিক করলাম, বাইক থেকে নেমে খুব স্পষ্টভাবে ওকে বুঝিয়ে বলব, দ্যা স্টোরি ইজ ওভার।

শিশুমেলার কাছে ট্রাফিক হাত দেখাল। আগারগাঁয়ের দিকের রাস্তাটা এখন ছাড়বে। সুযোগটা কাজে লাগালাম। বাইকটা থামতেই নেমে পড়লাম। 

— কি হল?

শাড়ির আচলটা গুছিয়ে নিতে নিতে বললাম

— আমি এখানেই নামব।

— এখানে?

— হ্যাঁ। এখান থেকে রিক্সা নিয়ে নেব।

— কেন বাইক যাবে না ওখানে?

একটু এগিয়ে গিয়ে প্রলয়ের মুখোমুখি হলাম। বললাম

— যাবে, কিন্তু ওখানে আমি একা যেতে চাই।

— এখনও রেগে আছো? সরি তো বলেছি, আর কি করতে পারি বলো?

বর করে একটা নিঃশ্বাস নিলাম। ভেবেছিলাম কথাগুলো বলব না। কিন্তু সরাসরি কথাগুলো না বললেও হবে না। ও ধরেই নিয়েছে আজ হোক কাল হোক আমার অভিমান ভাঙবে। আর তখন…

— আগামীকাল আমার এনগেজমেন্ট। তাই প্লিজ, স্টপ ইট হেয়ার। 

মনে হল কথাগুলো প্রলয় জানে। অবাক হওয়া টাইপ তেমন কোন রিয়াকশান হল না। এমন সময় ট্রাফিক মশাই আমাদের যাওয়ার অনুমুতি দিলেন। থেমে থাকা গাড়িগুলো স্টার্ট দিতে শুরু করল। একটু এগোলেই বামে একটা গলি। ‘একটু সাইডে আসো।’ বলে বাইকটা এগিয়ে সেই গলির দিকে নিল। আমি পেছন পেছন হেঁটে গেলাম। প্রলয় রাস্তার এক ধারে বাইকটা দাঁড় করালো। আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি সেখানে পৌঁছলে বলতে শুরু করল

— দেখো…

ওর দিকে খুব ঠাণ্ডা চোখে তাকালাম। ও কথা খুঁজছে। মনে হচ্ছে জ্ঞান দেবে। যা হওয়ার হয়ে গেছে, কিংবা ক্ষমাই মহৎ ধর্ম টাইপ কিছু বলবে। অন্য সময় হলে সেসব একবারের জন্য হলেও শুনতাম। কিন্তু এখন উপায় নেই। আমার মন বলছে, ওখানে অপেক্ষা করে আছে সৈকত। 

— আই হ্যাভ টু গো।

বলে আর অপেক্ষা করলাম না। একটা রিক্সা যাচ্ছিল। সেটাকে থামালাম। উঠে পড়লাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রলয়। সেদিকে তাকিয়ে কোনরকমে শুধু বললাম

— থ্যাংকস ফর দ্যা লিফট।

রিক্সা এগিয়ে যাচ্ছে। বুকের ঢিপ ঢিপানি আবার বাড়তে শুরু করেছে। জ্যামে না পড়লে মিনিট পনেরর রাস্তা। 

বুঝতে পারছি না, আমি আসলে কি চাইছি? একটা সুন্দর গুড বাই? না অন্যকিছু? আমার সেদিনের সেই ‘আই লাভ ইউ’ র উত্তর? জায়গাটা যত এগিয়ে আসছে, মনে হচ্ছে বুকে হাতুড়ির বাড়ির স্পীড বাড়ছে। মনে হচ্ছে আশেপাশে সবাই শুনতে পাচ্ছে সেই আওয়াজ।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছে এখন ভ্যানটা। খুব একটা ভিড় নেই। ঘড়ির দিকে তাকালাম। পৌনে তিন। বোধহয় আজকের মত শেষ। খিচুড়ি যদিও আমার জন্য এই মুহূর্তে জরুরী কিছু না। জরুরী…

নেই। এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দোকানদার মামা নিজে খেতে বসেছেন। সামনের সবগুলো টুলগুলো ফাঁকা। মনে হল শেষ আশাটাও মিলিয়ে গেল। রিক্সাকে ঘোরাতে বলতে গিয়েও বললাম না। ওকে ভাড়া দিলাম। রিক্সা থেকে নামলাম।

রিক্সাটা চলে গেল। কেমন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাথা কাজ করছে না। কি করব এখন? রাস্তা পার হয়ে ওদিকে যাব? খিদা এখন আর একদম নেই। সামনের দিকে তাকাতে পারছি না। মনে হচ্ছে এখনই চোখ ফেটে পানি বেরোবে। নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। একটু আগে যে কথাটা প্রলয়কে বললাম, সেটা কেন লিফটের সামনে বলতে পারলাম না? কিংবা সৈকতকে কেন বললাম না…। 

কি করব ভাবছি। কখন যে নিজের অজান্তে পা বাড়াতে শুরু করেছিলাম নিজেই জানি না। হুশ ফিরল যখন কেউ একজন হাত চেপে ধরল। সাথে সাথে একটা গাড়ী সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল। আরেকটু হলেই ওটার নীচে পড়ছিলাম। এরপরে কানের পাশে আওয়াজটা হল

— এবার আসুন।

চলবে

Razia Sultana Jeni

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!