আজিমপুর টু উত্তরা
“ফায়ার অন আইস”
যাবো বোনের বাসায়।উত্তরায়।বিশেষ কাজে।আজ শনিবার।অফিস বন্ধ। তাই।
আগের দিন রাতের খাবার টেবিলে যেই-না বলেছি কাল সকাল সকাল উত্তরা যাবো অমনি গিন্নী আর কন্যা এক সাথে হেসে উঠলো।এতে আমি মোটেই বিস্মিত হইনি। বরং নিজেও হেসে ফেলেছি।কারণটা আমার জানা। সকাল সকাল বলতে সকাল দশটার আগেনা। সেটা ওরা জানে।আজ ওরা কেউ যাবেনা।কারণ ড্রাইভার গেছে লম্বা ছুটিতে।
এদের ছুটির কোন উপলক্ষ্য লাগেনা। কোন নির্ধারিত উর্ধসীমাও নেই।মেজাজ মর্জ্জি মত আসে, যায়।সব দপ্তরেই ছুটির দরখাস্ত দাখিল করতে হয় আগেভাগে।তার একটা নিয়ম কানুনও আছে। জরুরত,প্রাপ্যতা আর দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ ছুটি মঞ্জুর অথবা নামঞ্জুর করেন কিংবা কাটছাঁট করে থাকেন।ড্রাইভার আর কাজের বুয়া এসব নিয়ম-নীতি’র বাইরে।
ড্রাইভার তবু সহনীয়। কিন্তু কাজের বুয়া জাস্ট পারসিকিউটার।এদের মেজাজ মর্জি আর বায়না-বাহানার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে গন্তব্য নির্ঘাত আইসিইউ।
সে তুলনায় আমাদের ড্রাইভারটা ভালই। অল্প বয়সী।বিবাহিত। এক কন্যার জনক।
তাকে আমার এখানে চাকরীর জন্য যিনি রেফার করেছিলেন তার কাছ থেকেই শোনা, স্ত্রীর সাথে তার মোটেই বনিবনা নেই। সেজন্য প্রায়ই ডিপ্রেশনের মত হয়। তবদা মেরে থাকে।রোবটের মত আচরণ করে।
কখনো কখনো মানসিক পেইনও দেয়। এসব নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত। কিন্তু ঘামালেই বিপদ। যাকগে, সেসব। আজ ড্রাইভার আট দিনের লম্বা ছুটিতে গেছে। গত সপ্তাহেই শুক্র,শনি দুই দিন নিয়েছে। ‘বুলবুল’এর এই প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়েও তারা কয়েক বন্ধু মিলে কিশোরগঞ্জ যাবে বলে খায়েশ করেছে। ছুটি চাইতে দেরি মঞ্জুর হতে বিলম্ব নেই।এর কোন বিকল্পও নেই।তাই আজ বাসই ভরসা। আজিমপুর টু উত্তরা দিয়াবাড়ী পর্যন্ত নতুন বাস সার্ভিস চালু হয়েছে।শতাব্দী পরিবহন।
এসি সার্ভিস। ভাড়া একশ’।একটু বেশিই।তবু সেটাই ভরসা।
বের হতে হতে সোয়া দশ। আরো দেরি হত। কিন্তু কন্যা আর গিন্নীর টিপ্পনীতে আর টেকা যাচ্ছিলো না।বাসার কাছেই নিউ মার্কেট।
কাউন্টারে গিয়ে বুঝলাম দুই মিনিট আগেই আগের বাস ছেড়ে গেছে।আরো পনের-বিশ মিনিট অপেক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।পাশেই বি আরটিসি’র চক্রাকার বাস সার্ভিসের কাউন্টার।সেখানে যাত্রীদের ভীড় রয়েছে।কিন্তু শতাব্দীর কাউন্টারে আমি একা।কাউন্টারে ছাতা ঝুলিয়ে প্রচন্ড রোদে বসে আসে কাউন্টার বয়। নাম ইমরান।বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। সময় ক্ষেপনের জন্য তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম।বয়সী লোক দেখে ভাঙ্গা টুলে শেয়ার করে বসার অফার দিলো। আদব কায়দা যে এখনো উঠে যায়নি তা নিজে চাক্ষুষ করলাম। আলাপে জানলাম সকাল সাড়ে সাতটা থেকে এই
সার্ভিস শুরু হয়। চলে রাত নয়টা/সাড়ে নয়টা অবধি।জানা গেল খুব শীঘ্রই ডিজিটাল টিকেট মেশিন চালু করতে যাচ্ছে কোম্পানী।
আরো স্পষ্ট করতে বললো, ট্রাফিক সার্জনরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যে মেশিন দিয়ে জরিমানার স্লিপ কাটে তেমন মেশিন।বাসের দেখা নেই। খবর পেলাম আসবে। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছেড়েছে।কমপক্ষে আরো দশ মিনিট লাগবে। ভাঙ্গা টুলে আমি আর কাউন্টার বয় ইমরান বসে বসে আলাপ করছি। এর মধ্যে নানা রুটের নানা নামের বাস চলে যাচ্ছে শুধু শতাব্দীরই দেখা নেই। বসে বসে ধুলো খাচ্ছি। আশে পাশে মাথা গুঁজার কোন জায়গাও নেই।আলাপের এক পর্যায়ে তার মোবাইল নম্বরও পাওয়া গেলো। যদি কখনো কোন ইনফরমেশন লাগে, তাই।
অবশেষে শতাব্দী এলো।এরিমধ্যে সহযাত্রী জুটলো আরো তিন। বাসে উঠে সীটে বসেই দোয়া দরুদ পড়তে থাকলাম। আজকাল সড়ক, নৌ, আকাশ পথে যাত্রায় কোন ভরসা নেই। মৃত্যু অনিবার্য।দিন,ক্ষণ আর স্থান মেনেই মৃত্যুর পরোয়ানা কার্যকর হবে এটাই চূড়ান্ত।এর কোন অপশন নেই। তাও জানি।
তবু অবহেলাজনিত ড্রাইভিং মেনে নিতে কষ্ট হয়।যাত্রা কালে আমার ঘুম হয় না।
ড্রাইভারের সাথে আমিও সজাগ থাকি। দোয়া দরুদ পড়ার পর বাংলা সাহিত্যের “নন্দলাল” কবিতার কথা মনে পড়লো।স্কুলে পড়াকালে নন্দলাল নামের কবিতাটি আমাদের পাঠ্য ছিলো। আমরা মজা করে তা আওড়াতাম আর “ভ্যালারে নন্দ, বেঁচে থাকো চিরকাল” বলে তারস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি আর হাস্যরস করতাম।তখন অতশত বুঝিনি। এখন বুঝি।দোয়া দরুদের পর তাসবীহ জপছি। সেটাও শেষ। কিছুটা পরিশ্রান্তও। মাথায় বুদ্ধি এলো মোবাইলে ফ্রি নেট চালালে মন্দ হয়না।ওপেন করা মাত্রই গত কয়েকদিন অসংখ্য ম্যাসেজ খোপ থেকে বের হওয়া কবুতরের ডানা ঝাপটানোর মত অনবরত টুং টুং গীত গাওয়া শুরু করলো।
ভাগ্যিস আমার পাশের সীট ফাঁকা।কিন্তু ম্যাসেঞ্জারের মেশিন গানের গুলির মত এই বিরক্তিকর শব্দে নিজেরও বিরক্তবোধ হলো। অপরাধীর মত পুরো মোবাইল সেটটাই পকেটে চালান করে দিলাম।যাতে শব্দ দূষণের লজ্জায় না পড়ি।বাস সোবহানবাগ মসজিদের কাছে নির্ধারিত স্টপেজে এসে দাঁড়ালো।মোবাইলের আর্ত চিৎকার ততক্ষণে কমে গেছে।আমি সেটা বের করে ফেসবুকের টাইম লাইন ঘাটতে লেগে গেলাম।
ফেসবুক এক বিস্ময়কর বই।একে অনেকেই ভার্চুয়াল জগত বলে।এর দ্বারা কী বোঝায় জানিনা।ভার্চুয়াল আর রিয়েলের মধ্যে পার্থক্যই বা কী তাও জানিনা। সাহিত্য,
সংস্কৃতি, ক্রীড়া, হাস্যরস,কৌতুক নকশা, জোকস, চিত্র, স্থাপত্য,ভাষ্কর্য, আলোচনা,
সমালোচনা, পিন্ডি চটকানো, অডিও,ভিডিও,
পর্ণো, বিনোদন,বিজ্ঞাপন, রেষারেষি, ঠ্যাসাঠ্যাসি, আনন্দ,বেদনা, হতাশার বারোয়ারি পসরার প্ল্যাটফরম এই ফেস বুক।
এরি মধ্যে এক বালিকা উঠে পিছনের দিকে চলে গেলো।এক ঝলক চোখে পড়লো।মাথায় স্কার্ফ, চোখে প্রকান্ড সানগ্লাস আর কানে হেডফোন।
বাস চলছে দ্রুত গতিতে। আড়ং মোড় পার হয়ে ডানে মোড় নিয়েছে। আমি ফেবুতে গল্প পড়ছি।আজকাল অনেকেই গল্প, কবিতা লিখছে।এটা আশার কথা।যদিও কবিতা আমি পড়িনা। জীবনানন্দ দাস সেই কবে বলে গেছেন,”সবাই কবি না, কেউ কেউ কবি”।আমিও তাই বুঝে গেছি, বাঙ্গালী মাত্রই যেমন একটা বয়সে দারুণ প্রেম পত্র লিখতে পারঙ্গম তেমনি টুক করে কলম ঠুকে কবিতার দু’ চার লাইন লিখে ফেলতেও সিদ্ধহস্ত। আজকাল অনেকেই গল্প লিখছে।
বেশির ভাগই গল্পের ব্যাকরণের মধ্যে পড়ে
না।তবু লিখছে,পোস্ট করছে, শেয়ার করছে।
এরমধ্যে কিছু ভাল গল্পও পাওয়া যায়। পড়তে ভাল লাগে।ঈর্ষাও জাগে, যদি আরো ভালো লিখতে পারতাম ওরকম কিছু।বাস এখন খামারবাড়ি পেরিয়ে এরোপ্ল্যান মোড়মুখী বাম দিকে মোড় নিয়েই থেমে আছে।ঢাকা শহর জুড়ে মেট্রোরেলের খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।
শব্দ ও বায়ু দূষণ যেন কোন ব্যাকরণ মানছে না।যানজটের ফলে সৃষ্ট গগনবিদারী ভেঁপু আর কালো ধোঁয়াও কারো শাসন মানতে চাইছেনা।বসে আছি অনেকক্ষণ। যাত্রীদের এসব চিত্র গা সহা হয়ে গেছে।নানাজনের নানামত। কেউ বলছে, দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে, কেউ বলছে উন্নয়নের সার্কাস চলছে।কেউ বলছে অন্য কথা। সব ছাপিয়ে শোনা গেলো, ভি আইপি ম্যুভমেন্ট আছে। তাই এই বিলম্ব। কোনটা সত্য, কোনটা অসত্য জানিনা। জানার উপায় নেই। টানা পচিশ মিনিট পর বাস আবার যাত্রা শুরু করলো।মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। গিন্নী ফোন করে জানতে চেয়েছে, “কতদূর”?
বললাম, উন্নয়নে আটকে আছি। কি বুঝলো কে জানে? হয়ত যথার্থই ধরে নিয়েছে জ্যামে আটকা পড়ে আছি।ফোন ছেড়ে দিলো। বন্ধু তৌহিদের ফোন এলো। উত্তরায় থাকে। অপেক্ষা করছে আমার জন্য। তাকেও জানালাম, সার্কাস দেখতে দেখতে আসছি। বাস এখন দ্রুত চলেছে।সড়ক পথে চলাচলের এই এক ঝক্কি। যাত্রা পথে বিভিন্ন জায়গায় লেট করে এক সময় ড্রাইভারের মাথাতেও এই বোধ ঢুকে যে, দেরি হয়ে গেছে। তখন”দে টান, দে টান”গতিতে ছুটতে থাকে।আগে যাত্রীরা নিষেধ করতো। এখন করেনা। একে তো যানজট আর উন্নয়ন খোঁড়াখুঁড়িতে সময়ের শ্রাদ্ধ অন্যদিকে “কী আছে জীবনে” জাতীয় উপলব্ধি। বনানী কাকলীতে আটকে আছি।এমন সময় টুং করে নিরবতা ভাঙ্গলো ম্যাসেঞ্জার।
- “আপনি কোথায়”? মম’র নক।
- সাঁতরাচ্ছি।তুমি?
- আমিও
- কি?
- সাঁতরাচ্ছি
- মানে কি?
- যাচ্ছি
- কই?
- উত্তরা
- আমিও
- তাই নাকি? কত নম্বর?
- সাত নম্বর সেক্টর।তুমি?
- তিন। রাজলক্ষ্মী
- বাহ
- হুম্ম।আজকাল লিখছেন না যে
- প্লট পাইনা
- অন লাইনেই তো পড়ে থাকেন,
দেখি।লিখবেন আর কখন? - তা অবশ্য ঠিক।
মম আমার ফেবু ফ্রেন্ড।আমার লেখার ভক্ত। প্রায়ই নক করে। নাটকীয়ভাবেই তার সাথে পরিচয়।ফেসবুকের প্ল্যাটফরমে।খোঁচাখুঁচি দিয়েই পরিচয়ের সূত্রপাত। লেখাপড়া জানা। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছে।
বাইরে থেকে মাস্টার্স আর পিএইচডি করা। এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সে। রাজধানীর নামকরা ভার্সিটিতে পড়ায়। তার সাথে ম্যাসেঞ্জারেই নকানকি।আমার সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে তার।বলি,” চলে আসো একদিন অফিসে”।এতেই তার আপত্তি। অফিসে বা ভার্সিটিতে না।বাইরে। অন্য কোথাও।ওপেন স্পেসে হলেও আপত্তি নেই।
কিন্তু আমার আছে। মম’র আবার নক: - আপনি এখন কোথায়, এক্সাক্টলি?বলেন তো
- ক্রসিং এয়ারপোর্ট
- আমিও তো।সাথে কে? গিন্নী?
- উহু।একা।
- প্রাইভেট কার এ ?
- উহু।
- উবারে?
- উহু।বাসে
- কেন?
- ড্রাইভার ছুটিতে
- উবার নিলেন না যে
- শতাব্দী এসি বাসে চেপেছি। নতুন সার্ভিস।
জাস্ট টু হেভ এ টেস্ট। - আমিও তো
- মানে?
- ক্যান ইউ লুক এট ব্যাক? মে বি আই’ম এট
ইওর ব্যাক।
বালিকার পাল্লায় পড়লে কত যে ঝকমারি তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। কাকতালীয় হলেও একই বাসের যাত্রী হিসেবে বিষয়টা বড়ই অদ্ভুত আর ড্রামাটিক।বাংলা সিনেমার অসংখ্য কাহিনীর শুরুই হয় নায়ক-নায়িকার এরকম কিছু টক-ঝাল-মিষ্টি পরিচয় পর্ব দিয়ে।এও যেন তেমন।
হঠাৎই মনে হলো,কী সব আজে বাজে ভাবছি।কেন আমি নিজেকে নায়ক ভাবছি? আর সেই ভার্সিটি ম্যাডামই বা কেন নায়িকা হতে যাবে। তবু কেন জানি কিছুটা লাজে কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা কৌতুহলে সীটে বসেই পেছনে তাকালাম। বেশ কয় সারিতেই অন্তত চার-পাঁচজন মহিলা বসা। কয়েকজন চোখ মেলে তাকালোও।থতমত খেয়ে আমি চোখ ফিরিয়ে আবার সোজা হয়ে বসলাম। - জসীম উদ্দীনে নামেন।মম’র নক
- কেন? তুমি না রাজলক্ষী নামবে?
- তাতে কি?
- তো?
- তো তো করবেন না।প্লিজ নামুন। জাস্ট
ওয়ানা এ কাপ অফ কফি উইথ ইউ।
কন্ডাক্টরের চিৎকারে চেয়ে দেখি সামনেই জসীম উদ্দীনের মোড়। বেশ কয়জন যাত্রী দাঁড়িয়ে গেছে নামবে বলে।আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মত দাঁড়িয়ে গেলাম। দাঁড়িয়েই ভাবান্তর হলো,আমি কেন জসীমুদ্দীনে নামবো? আমি তো নামবো আজমপুর। পৃথিবীতে অংক মেনে যেমন অনেক কিছুই হয়না তেমনি লজিক মেনে পা টিপে টিপে চলাও সম্ভব হয়না।নামার যাত্রীদের কিউতে আমিও শামিল হয়ে গেলাম।নেমেই বুঝতে পারলাম সেই স্কার্ফ, সানগ্লাস আর হেডফোনওয়ালীই হলো মম, সেই ভার্সিটি ম্যাডাম।
ঘোরের মধ্যেই হাই, হ্যালো করে গিয়ে বসলাম এক ক্যাফেতে। প্রচন্ড ইচ্ছে শক্তি থাকলেও কখনো কখনো কম্প্রোমাইজ বা এডজাস্টম্যান্টের নামই নাকি স্মার্টনেস।
এটাই নাকি স্বাভাবিকতা।এটাই নাকি ভদ্রতা।এমন সময় গিন্নীর ফোন,”তুমি কোথায়”? বললাম, ” ফায়ার অন আইস”। ‘ধ্যাত’ বলে রেখে দিলো।মম হাসলো।
যথার্থই তো। আমি তো ” ফায়ার অন আইস” এই আছি। কফি শপের নামও তো তাই।#
– আনোয়ার হাকিম
Send private message to author



