শুরুর_কবিতা

“আপনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েন?”

“নাহ।”

“রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন?”

“না।”

“শুনতে ভালোবাসেন?”

“একদম না।”

“তাহলে প্রেম করবেন কেমন করে?”

“কেন? রবীন্দ্রনাথ বুঝি প্রেমের টিউটোরিয়াল?”

“অনেকটা তাই। আমার সাথে প্রেম করতে হলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে হবে, গাইতে হবে.. কবিতা পড়তে হবে। “

এ কী জ্বালা রে বাবা! সুমিত মনে মনে ভাবছিলো। অনেকদিন ধরেই সে চেনে লাবন্যকে। তার এক সমবয়সী কাজিনের ননদ। তার বিয়েতেই পরিচয়। এরপর পারিবারিক অনুষ্ঠানে অনেক লোকের ভীড়ে দেখা হয়েছে বেশ কয়েকবার। এমনিতে সুমিত এসব ফ্যামিলি প্রোগ্রাম এড়িয়ে চলে। গান বাজনা নিয়ে মেতে থাকে সে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাওয়াত খাওয়া, ঠাসাঠাসি করে কারো একজনের বেডরুমে বসে থাকা, ছোট ভাইবোনদের সাথে সবার আগে খেতে বসিয়ে দেয়া, একই মানুষজন, একই গল্প…এসব তার ভালো লাগে না। তার থেকে বরং সময় পেলেই ব্যান্ড মেম্বারদের নিয়ে খালি বাড়িতে জ্যামিং করতে ভালোবাসে সে। তাছাড়া বেশিরভাগ ছুটির দিনেই তার শো থাকে। শুধুমাত্র লাবন্যর সাথে দেখা হওয়ার লোভেই সে এসব পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাওয়া আসা শুরু করে। সুমিত লক্ষ্য করে, যতক্ষণ লাবন্য তার আশেপাশে থাকে, ততক্ষণ সে অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিতে পারে না।

টুকটাক একটু আধটু কথা বলতে বলতে তাদের পরিচয় হয়। কিন্তু হুট করে ফোন নাম্বার চেয়ে ফেলার মতো সাহস বা অযুহাত কোনোটাই জুগিয়ে উঠতে পারছিলো না। ব্যান্ড করা ছেলেরা সাধারণত খুব বোল্ড পারসোনালিটির হয়। সুমিত একেবারেই তার উলটো। তার সব বোল্ডনেস তার মিউজিক কে ঘিরে। একদিন একটা প্রোগ্রামে ঘটনাচক্রে সুমিত তার মোবাইলে লাবণ্য আর তার পরিবারের কিছু ছবি তুলে দেয়ার চান্স পায়। ব্যাস.. তাতেই কাজ হয়ে গেলো। বিদায় নেয়ার আগে লাবন্য এসে বলে,

“আমার ফেইসবুক আইডি লাবন্য রহমান। ছবিগুলো যদি পাঠিয়ে দিতেন, খুব ভালো হতো।”

সুমিত সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে বলে,

“ম্যাসেঞ্জারে ছবি সেন্ড করলে পিকচার কোয়ালিটি নষ্ট হয়। শেষে ম্যাসেঞ্জারের পিন্ডি আমার ঘাড়ে চাপাবেন।”

“মানে?”

“বুঝলেন না। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবেন আর কি। বলবেন আমি ভালো ছবি তুলিনি। তারচেয়ে বরং হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা দিন। সেখানে সবকিছুর গুনগত মান বজায় থাকে।”

“কথাটার মধ্যে কি যেন একটা ইঙ্গিত আছে। সে যাই হোক, ফেইসবুকে অ্যাড করে নেবেন। ম্যাসেঞ্জারে নাম্বার দিয়ে দেবো।”

সেই থেকে তাদের ভার্চুয়াল যোগাযোগ শুরু। কোনো ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে না গিয়ে কিছুদিন কথা হবার পর সুমিত জানায়.. লাবন্যকে তার ভালো লাগছে। লাবন্য হেসে এড়িয়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় সুমিত যখন লাবন্যর সাথে দেখা করতে চায়, তখন সে কোনো আপত্তি করেনি। সুমিত বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে তার জীবনের ফার্স্ট ডেট এ এসে প্রথমেই এমন রাবীন্দ্রিক গ্যাড়াকলে আটকে যাবে, একদম ভাবতে পারেনি। কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবে… আজকালকার দিনেও এমন আঁতেল আছে নাকি? ডেট এ এসেও রবীন্দ্রনাথ কপচায়!

নিজের ওপর কিছুটা রাগও হচ্ছিলো। এমন দুম করে এপ্রোচ করা মোটেই ঠিক হয়নি। মনে মনে নিজের ক্যাবলামোকে গালমন্দ করে… শালা, আর কাউকে পেলি না? শেষে এই ন্যাকা মেয়েটার প্রেমেই পড়তে হল তোর? নিজেকে এসএসসির হলে ফার্স্ট বেঞ্চে সিট পড়া পরীক্ষার্থী মনে হয়। এসেছে ফিজিক্স পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে, এসে দেখে বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। সব প্রশ্ন আউট অফ সিলেবাস।

“এ যুগেও আপনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পড়ে আছেন? গ্রো আপ ইয়াং লেডি। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে।”

“অবশ্যই আছে। কত ভালো ভালো গান তৈরি হচ্ছে ইদানীং। তবে.. গুড আর বেস্ট.. এ দুটো শব্দের মধ্যে পার্থক্য আছে। এখনকার গানও ভালো, তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে অন্য কিছুর তুলনা চলে না।”

এবারো নিজের উপরই খানিকটা বিরক্ত হলো সুমিত। ভালো মুশকিলে পড়া গেলো! তুলনা করতে হলে আগে তো রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জানতে হবে। সেই আগ্রহই তো কোনদিন তৈরি হয়নি। মেয়েটাকে ভালো লাগছে। ভালোবাসে কি না তাও জানে না। বেশ কয়েকদিন ধরে বলবো বলবো করেও বলতে পারছিলো না। মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাও বা বলতে এলো, ঐ বুড়ো ভদ্রলোক মাঝে চলে এলেন। ফাঁকা মাঠে গোল দিতে এসে একটার পর একটা প্যানাল্টি খেয়ে যাচ্ছে।

এমনিতে সুমিত ভীষণ স্মার্ট। কলেজ ভার্সিটিতে ব্যান্ডের মূল ভোকালিস্ট ছিল। ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গানে। প্রোগ্রামও করে টুকটাক। বেশ ভালো ফ্যান ফলোয়ারও আছে তার। তবে একটা ক্যারিয়ার তৈরির আগে কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে চায়নি সে। লাবন্যকে দেখে তার সমস্ত সন্ন্যাস ভঙ্গ হয়।ভেবেছিলো লাবণ্যকে রাজি করাতে তেমন বেগ পেতে হবে না। কিন্তু সব হিসেব গুলিয়ে দিলেন ঐ দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক।

“বুঝলাম।” বেশ বিরক্ত হয়েই বলে সুমিত।

“কী বুঝলেন?”

“কিছু না।”

সামান্য হেসে সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় লাবন্য। এরপর খানিকটা অন্যমনস্ক ভাবেই বাকিটা সময় পার করেছিল সুমিত। ভেবেছিল সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে বেসিক কিছু মিল থাকা জরুরি। সেসব বোঝার জন্য বোধহয় আরেকটু সময় দেয়া দরকার ছিল নিজেকে। মনে মনে ইংরেজির তিনটা শব্দের সাহায্য নিয়ে নিজের ওপর রাগটা ঝেড়ে চলে এসেছিলো সেদিন।

তারপর বেশ কিছুদিন লাবণ্যর সাথে আর যোগাযোগ করেনি সে। মাথাটা একটু ঠান্ডা হতেই বুঝতে পারলো, ছেলেমানুষী হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। মনের ভিতরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল তার। একবার মনে হলো, লাবন্য কি ইচ্ছে করেই অমিলগুলো তুলে ধরতে চাইছিলো? সরাসরি না বলে দেয়ার চাইতে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া বরং বুদ্ধিমানের কাজ। আর লাবণ্য যে যথেষ্ট বুদ্ধিমতি তা সে অল্প ক’দিন কথা বলেই টের পেয়ে গেছিলো।

গান গাওয়ার পাশাপাশি টুকটাক গান লেখা আর সুর করার কাজও করে সুমিত। অফিস করে খুব বেশি সময় হয়না যদিও। একান্তই মনের তাগিদে গান বাজনা নিয়ে মেতে থাকা। অনেকদিন পর পুরোনো একটা লিরিক্সে সুর বসালো সে। গানটা কম্পোজ করার পর তার মনে হলো লাবন্যকে সরি বলা উচিত। আবার যেদিন দেখা হবে, ক্ষমা চেয়ে গানটা শোনাবো সে।

লাবন্যও সেদিনের পর আর যোগাযোগ করেনি। সুমিত আসলে সেদিন নিজের বিরক্তিটা লুকাতে পারেনি। লাবন্যর না বোঝার কথা না যে, সুমিত তাদের সেই প্রথম সাক্ষাতে আশাহত হয়েছে।

নিজে থেকে কোথাও আপোষ করার ছেলে সে নয়। নিজে না চাইলেও ইতিমধ্যেই সে অনেক মেয়ের ক্রাশ। তারপরও ফোনটা সুমিতই করলো। ভেবেছিলো একটু হয়তো রেগে থাকবে তার উপরে, হয়ত কথাই বলবে না। কিন্তু লাবন্য ফোন ধরে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বললো,

“খুব ব্যস্ত ছিলেন বুঝি?”

“ঠিক ব্যস্ত না। তবে একটু স্ট্রেসড ছিলাম। আপনি বলুন, কেমন ছিলেন এ ক’দিন? কি করলেন?”

“ভালোই ছিলাম। ঘুরতে গিয়েছিলাম।”

“কোথায়?”

“আপনাকে বলবো কেন?”

“ঠিক আছে বলতে হবে না।”

“আচ্ছা আপনার যখন জানার ইচ্ছে হয়েছে, তখন বলেই ফেলি। ‘হেল’ এ ঘুরতে গিয়েছিলাম।”

“মানে?”

“বা রে…সেদিন বললেন যে, ‘গো টু হেল’। তাই ঘুরে এলাম।”

“কখন বললাম?”

“মুখে বলেননি। তবে মনে মনে যে বলেছেন সেটা অস্বীকার করতে পারবেন না।”

সুমিত হো হো করে হেসে ফেললো। তারপর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললো,

“ভালো কথা, তা কী দেখলেন সেখানে?”

“দেখলাম কয়েকটা বড় চুলওয়ালা ছেলে মাথা ঝাঁকিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে ব্যান্ডের গান করছে।”

সুমিত বুঝতে পারলো চুল আর চিৎকার… দুটোই তাকে উদ্দেশ্য করে বলা। নিজের চুলে একটু হাত বুলিয়ে বললো,

“চুল কিন্তু আমার খুব একটা বড় না। তাছাড়া আপনার রবীন্দ্রনাথেরও তো বড় চুল ছিল।”

“তা ছিল। তবে তিনি সেটা গানের সময় মাথা ঝাঁকানোর কাজে লাগাতেন না।”

আবারও সেই আউট অফ সিলেবাস কোয়েশ্চেন পেপারে পরীক্ষায় বসার ভয়ে সুমিত বললো,

“আচ্ছা যাই হোক, সেদিনের জন্য সরি।”

“সরি হওয়ার কিছু নেই। তবে আমার পিছনে সময় নষ্ট না করাই ভালো হবে আপনার জন্য। আপনি তো আর অমিত নন যে, আমাদের নিয়ে আবার একটা ‘শেষের কবিতা’ লেখা হবে। আপনি হচ্ছেন সুমিত।”

স্বাভাবিকভাবেই রসিকতাটা সুমিত এর ধরতে পারার কথা না। লাবন্য বা অমিত.. সর্বোপরি শেষের কবিতা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। সে ছোটবেলা থেকেই রক মিউজিক আর ব্যান্ডের গান নিয়ে থাকে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বরাবরই তার কাছে প্যানপানানি মনে হতো। তবু হাজার মেয়ের ক্রাশ খাওয়া ইমেজের জলাঞ্জলি দিয়ে আরেকবার লাবন্যকে বশে আনার চেষ্টা সে করবে ভেবেছিল। মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত একটা আকর্ষন কাজ করছে।

যদিও লাবন্য বেশ স্পষ্ট করেই বললো তার পেছনে সময় নষ্ট না করতে, তবু আদিখ্যেতা করে সে বলেছিল,

“আপনার জন্য একটা গান বানিয়েছিলাম। শুনবেন?”

“বললাম না.. শুধু শুধু সময় নষ্ট। সত্যি বলতে আপনাদের বাদ্য বাজনাওয়ালা রক মিউজিক আমার ভালো লাগে না।”

“এটা শুনে দেখুন। এত কষ্ট করে বানালাম। ফাঁসির আসামিরও তো শেষ ইচ্ছে পূরণ করা হয়।”

লাবণ্য হেসে ফেললো। আর সেই হাসির শব্দে মুগ্ধতায় অবশ হয়ে গিয়েছিল সুমিত। সেই দোদুল্যমান কন্ঠে দুমড়ানো মোচড়ানো হৃদয় নিয়ে সে যেটুকু গাইলো, তা তার নিজের কানেই অপরিচিত লাগছিলো। গানের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা সুর যেন তার অবাধ্যতা করছে। যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, গুড আর বেস্ট… পার্থক্যটা এ দুটো শব্দের মধ্যেই।

“ভালো লাগেনি, তাই না?” গানটা শেষ করে জানতে চায় সুমিত।

“কথাগুলো ভালো। তবে সুরে তেমন প্রাণ নেই.. অনুভূতি নেই। এগুলোই আমি আপনাদের গানে খুঁজে পাই না। আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারবো না। যেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শিখবেন, অনুভব করতে শিখবেন.. সেদিন বুঝবেন। সেদিন হয়তো আপনি অনেক মেয়ের ক্রাশ না হয়ে শুধুমাত্র একটা মেয়ের ভালোবাসা হওয়ার যোগ্য হবেন।”

আবারও সেই পুরোনো আঘাত। এবার আর মনে মনে ইংরেজির সেই তিনটা শব্দ.. ‘গো টু হেল’ সে বললো না। খানিকটা গুটিয়ে গেলো নিজের মধ্যে। কী আছে এই রবীন্দ্রসঙ্গীতে যার জন্য বার বার এই মেয়েটা তাকে হারিয়ে দিচ্ছে…

“ফাঁসির আসামির শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। এবার কি আমি ফোনটা রাখতে পারি?”

“হুম।”

“আজ ‘গো টু হেল’ বললেন না?”

সুমিত কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিলো। কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট হচ্ছিল তার। মেয়েটাকে সত্যি খুব ভালো লেগেছিল। একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ব্যাপার আছে ওর মধ্যে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো সে তার আপন কেউ হোক। এমন ভদ্রোচিত ভাবে প্রত্যাখ্যান করবে, ভাবতেও পারেনি সে। বলে কিনা ভালোবাসার যোগ্য নয়। রবীন্দ্রনাথ কি ভালোবাসার লক খোলার পাসওয়ার্ড?

কিছুদিন পর লাবণ্যর সাথে আবার দেখা। তাদের কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সুমিত তার ব্যান্ড নিয়ে শো করতে গিয়েছিল। দর্শক সারিতে এতো মানুষের মধ্যে লাবন্যকে তার দেখার কথা না। শো শেষ হওয়ার পর লাবন্যই এগিয়ে এসেছিলো তার সাথে দেখা করতে। বলেছিল,

“আমার কলেজে এসেছেন। আপনার আপত্তি না থাকলে আপনাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারি।”

সুমিতের পক্ষে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। ব্যান্ডের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাবন্যর সাথে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে সে। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ায় লাবন্য।

“টং এর দোকানে চা খেলে কি আপনার ইমেজ নষ্ট হবে?”

হেসে না সূচক মাথা নাড়ে সুমিত। ফুটপাতের একটা টং দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চে বসে দুটো চায়ের কথা বলে লাবন্য বলে,

“আপনার এখনো আমার প্রতি ভালো লাগাটা আছে? নাকি কর্পূরের মতো উড়ে গেছে?”

“ভালো লাগা থাকার জন্য একটা সেতু থাকা লাগে… যেখান দিয়ে অনুভূতিরা আসা যাওয়া করে। সে সুযোগটা তো আমাদের নেই। তাই ভালো লাগাটা চাপা পড়ে আছে।”

“আমি আপনাকে আরেকটা সুযোগ দিতে চাই। আজকের এই মুহূর্তটার ওপর একটা সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত খুঁজে এনে যদি আমাকে শোনাতে পারেন, তাহলে……..”

“তাহলে?” উৎকন্ঠা নিয়ে জানতে চায় সুমিত।

‘তাহলে’র সোজা উত্তর না দিয়ে লাবন্য বলেছিল,

“আগে খুঁজে আনেন। তারপর বলবো। এটা আপনার হোমওয়ার্ক।”

চা শেষ করে হুট করেই একটা রিকশা ডাক দিয়ে তাতে উঠে বসে লাবন্য। হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেও সুমিত খানিকটা সময় সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল স্থির হয়ে। ভীষণ অদ্ভূত মেয়ে তো। জীবনে একটাও রবীন্দ্রসঙ্গীত না গাওয়া একটা ছেলে তার কথায় নতুন করে গান শিখতে বসবে, সেটা সে ভাবলো কি করে? মেয়েটাকে কিছুটা খেয়ালী মনে হচ্ছে সুমিতের। সিম্পল একটা ব্যাপারকে জীবনের সাথে জড়িয়ে সে কি প্রমান করতে চাচ্ছে? সে অন্য সবার থেকে আলাদা? রবীন্দ্রনাথ ভালোবাসে বলেই সে ইউনিক? নানন্দিকতার প্রকাশ ঘটাতে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়াকে বরং তার চারিত্রিক দুর্বলতা বলেই মনে হচ্ছিলো সুমিতের।

সেদিন বাড়িতে গিয়ে অনেকটা জেদের বশেই নেট এ তন্ন তন্ন করে একটা উপযুক্ত গান খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো সে। কত গান যে লিখেছেন ভদ্রলোক! এত সময় পেতেন কী করে কে জানে। অনেক গানই তো আছে। কিন্তু সেই মুহুর্তটার ওপর কি গান হতে পারে ভেবেই পাচ্ছিলো না সে। টং এ বসে চা খাওয়া নিয়ে কি কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত আছে? অনেক খুঁজেও সেরকম কোনো গান পাওয়া গেলো না। অবশেষে হাল ছেড়ে দেয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে একটা গানের কথায় তার চোখ আটকে গেলো।

“অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি
তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি।

যে আছে মম গভীর প্রাণে ভেদিবে তারে হাসির বাণে,
চকিতে চাহো মুখের পানে তুমি যে কৌতূহলী..
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি,
অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি..
তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি।”

ইউটিউবে বেশ কয়েকবার শুনে গানটা তুলে ফেললো সে। গান তুলতে তার বেশি সময় লাগে না। ভাবলো একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে না পারা জীবনের কোনো অপূর্নতা নয়.. মেয়েটাকে এই কথা বোঝাবার জন্য হলেও একটা গান অন্তত শুনিয়ে সে তার কাছ থেকে বিদায় নেবে।

পরদিন রাতে সুমিত লাবন্যকে ফোন করলো। সে ফোন ধরেই বললো,

“হোমওয়ার্ক করেছেন?”

খানিকটা বিরক্ত হয়েই সুমিত বললো,

“হ্যাঁ। শুনবেন?”

“এখন?”

“ওহ… আপনি তো আবার সেলিব্রিটি। যখন তখন যেখানে সেখানে গান গাইতে পারেন না!”

“আমি কিন্তু তেমন কিছু বলিনি। জানতে চাইছিলাম ফোনেই শুনবেন, নাকি দেখা হবে? ঠিক আছে, এখানেই শোনাচ্ছি।”

“না, দাঁড়ান। আপনাদের গান যেখানে সেখানে গাওয়া যায়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান না। কাল বিকেলে সেদিনের জায়গাতেই আসুন।”

সেদিন কলেজ থেকে বেরিয়ে জায়গা খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছুটা পথ তারা দুজন পাশাপাশি হেঁটেছিলো। সেই পথ দিয়ে আবার হাঁটার সময় লাবন্যর ওপর বিরক্তি কিছুটা কমে আসছিলো সুমিতের। মনে হচ্ছিলো পাশাপাশি হাঁটার সেই সময়টুকু তার জীবনের প্রিয় মুহূর্তগুলোর অন্যতম। মেয়েটাকে ভেতরের ভাংচুরটা বোঝাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার বাড়াবাড়িটা সত্যি সুমিতের ভালো লাগছিলো না।

বেশ অনেকক্ষন অপেক্ষা করার পর সুমিত ফিরে এসেছিল সেদিন। লাবন্য আসেনি। তার ফোনও ধরেনি আর কখনো। কেউ ইচ্ছে করে হারিয়ে যেতে চাইলে তাকে জোর করে ধরে রাখার মতো ছেলে সুমিত নয়। সে আর কখনো তাকে খোঁজার চেষ্টা করেনি। যেসব ফ্যামিলি প্রোগ্রামে লাবন্য থাকতে পারে সেসব এড়িয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে পুরো পৃথিবীটাকেই যে সেদিনের পর থেকে এড়িয়ে চলছে সে। গান বাজনাও করেছে একেবারে নিভৃতেই।

তবে ওই যে সেই মুহুর্তটার জন্য গান খুঁজতে গিয়ে যে একটা পুরো রাত তার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কেটেছে, তারপর থেকে প্রতি রাতেই তার সঙ্গী হয়ে আছে অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা শতবর্ষ পূর্বে প্রয়াত হয়েও যে সন্তর্পণে তাকে হারিয়ে দিলো, সেই চুল দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ লোকটা। তার প্রতিটা মুহুর্তের অনুভূতির সাথে মিলে যাওয়া একেকটা গান অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়ে এমন অভ্যস্ততায় পরিনত হয়েছে যে, কয়েক বছর পর সে ভুলেই গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের শুরুটা তার জীবনে একটা অধ্যায় শেষ হওয়া নিয়ে এসেছিল।

লাবন্যর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত তার সেদিনের না আসার যন্ত্রণায় চাপা পড়ে ঝাপসা হতে হতে প্রায় যখন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছিলো, আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল অনেকটা.. সেই সময় তাকে সামলে নিয়েছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। পাগলের মত তার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল ওই সময়টাতে। আর তিনি তার অজস্র গানের মাঝে, কবিতার তাকে পথ খুঁজে দিয়েছিলেন।

অনেকদিন পরে আবার লাবণ্যর মুখোমুখি হয় সুমিত। হঠাৎ একদিন সুমিতের অফিসে আসে সে। মাঝের দীর্ঘ সময়টা ছাপিয়ে আগের সেই মুহূর্তগুলো যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঝলকে ওঠে তার চোখের সামনে।

“বিয়ে করেছেন? বোধ হয় না!” টুকটাক কুশলাদি বিনিময়ের পর জানতে চায় লাবন্য।

“না। আপনি?”

“করবো। আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আর দেখতে এসেছি আমাকে মনে রেখেছেন কি না?”

“কী দেখলেন?”

“দেখলাম, আপনি আমার মত স্বার্থপর নন। মনে রেখেছেন।”

“সেটা জানা আপনার জন্য জরুরি ছিল না। আর জানতেই যদি চাইলেন, তবে বিয়ের খবরটা বয়ে না নিয়ে এলেও পারতেন।”

“আমাকে মিস করতেন আপনি?”

“প্রথম প্রথম করতাম। তারপর আর না।”

“কেন? তারপর অন্য কারো প্রেমে পড়েছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“বাব্বাহ… কার? দারুণ দেখতে নিশ্চয়ই?”

“দারুণ দেখতে কিনা জানি না। তবে জগৎকে দেখান দারুণ করে।”

“কে সে?”

“আপনার রবীন্দ্রনাথ। আপনাকে তো আর পেলাম না, তাই আপনার রবীন্দ্রনাথকেই আঁকড়ে ধরলাম।”

লাবণ্য অনেকক্ষণ চুপ করে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সুমিতের দিকে। কিছুক্ষণ সেইভাবেই তাকিয়ে থেকে বলল,

“এইবার আপনি প্রেম কি বুঝেছেন। তাই তো এতো নাম করেছেন। আপনার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সব অ্যালবাম আমার কালেকশনে আছে।”

“দেখবেন.. আমার গান শুনলে আপনার হবু বর আবার রাগ করে না যেন?”

“না। আমার হবু বরও খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। হয়ত আপনার মত না। তবে ভালো।”

“গুড? না বেস্ট?”

লাবন্য হেসে ফেললো।

“বেস্ট।”

“বুঝলাম। তো এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?”

“দেখছি, কতটা কষ্ট পান শুনে। আপনাকে কষ্ট পেতে দেখে ভালো লাগছে। নিজেকে কঠিন বিজয়ী মনে হচ্ছে।”

সুমিত ভীষণ অবাক হলো। বিয়ের নিমন্ত্রণ জানাতে এসে সে এসব কি বলছে।

“বাদ দিন। সেদিনের হোমওয়ার্কটা তো সাবমিট করেননি। কি গান শোনাতে এসেছিলেন সেদিন? আজ শোনাবেন?”

“না… মুড নেই।”

“ও… আপনি তো এখন বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী! এখন কেন খালি গলায় যার তার সামনে গাইবেন?”

মেয়েটা এতদিন পরেও একটুও পাল্টায়নি!

“সে রকম কোনও ব্যাপার না।”

“তাহলে?”

“আপনার ওপর কেন জানি খুব রাগ হচ্ছে।”

“রাগ হলে ঝেড়ে ফেলেন। সেই আগের মত বলেন.. ‘গো টু হেল’।”

“আমি বললেও সেখানে আর আপনার যাওয়া হবে না। আপনি আপনার মনের মতো মানুষের কাছেই যাচ্ছেন। যিনি গুড নন… বেস্ট।”

লাবন্য হঠাৎ মাথা নিচু করে কেঁদে ফেললো। সুমিত তাকে বাঁধা দিলো না। কাঁদুক.. ছেলেদের কাঁদতে নেই। মেয়েদের তো আর সেসব বারন নেই। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় লাবন্য। নতুন জীবনে ফিরতে হবে তাকে। তার আগে না হয় চোখের জলে পুরনো স্মৃতিগুলো ধুয়ে ফেলে রেখে যাক।

“আমি যাই।”

সুমিতও উঠে দাঁড়ায় টেবিলের ওপাশে। কিন্তু কিছু বলতে পারে না সে। তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মুচকি হেসে লাবন্য বলে,

“চলে যাচ্ছি.. কিছু বলবেন না?”

সুমিত নিজেকে শক্ত করে বলল,

“গো টু হেল।”

লাবণ্য রাগ করল না। হাসল। হাতের ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে সুমিতের হাতে দিল সে। বিয়ের কার্ড!
মেয়েরা এতো নিষ্ঠুর কি করে হয় কে জানে!

“এখন খুলবেন না। আমি চলে যাই… তারপর।”

“ঠিক আছে। ফাঁসির আসামিরও তো শেষ ইচ্ছে পূরণ করা হয়।”

লাবন্য চলে গেলো। সুমিত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো লাবণ্য চলে যাচ্ছে। সে তো আর অমিত না। সে সুমিত। তাই তাদের কোনও শেষের কবিতা নেই। তাদের কোনও কবিতা কখনো শুরুই হয়নি।

তার হাতে ভালোবাসা হারানোর পাকা খবর। ইচ্ছে করছিলো না, তবু খামটা খুলল সে। দেখা যাক, লাবণ্যর অমিতের নাম কি?

কিন্তু কোথায় বিয়ের কার্ড! খামের ভেতর এক টুকরো সাদা কাগজ। তাতে লেখা…

“গাধা কোথাকার। খুঁজতেও জানে না, আবার ভালোবাসে! বিকেলে বাবা মা যাবে বিয়ের কথা বলতে। সময় মতো বাড়ি ফেরা চাই।”

মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো বুঝতে।সুমিত কাগজটা বুকের সাথে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে কাঁপা কাঁপা গলায় গাইতে লাগলো,

“আমার চোখে যে চাওয়াখানি ধোয়া সে আঁখিলোরে,
তোমারে আমি দেখিতে পাই, তুমি না পাও মোরে।
তোমার মনে কুয়াশা আছে, আপনি ঢাকা আপন-কাছে,
নিজের অগোচরেই পাছে আমারে যাও ছলি..
তোমারে তাই এড়াতে চাই, ফিরিয়া যাই চলি
অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি।”

সুমিত জানে না দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে গান শুনতে শুনতে লাবন্য চোখের জলে ভাসছে, আর মনে মনে বলছে…

“ভাগ্যিস তুমি অমিত নও। তুমি সুমিত…
রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় লাবন্য অমিতকে পায়নি। আমাদের কবিতাটা না হয় শুরুর হোক। লাবন্য পাক সুমিত কে।”

সানজিদা হোসাইন (Sanjida Hossain)

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
4
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Shibli Sayeek
Member
4 years ago

আপনার লেখার মধ্যে একটা যাদু আছে। গল্পটা এমনভাবে শুরু করেছেন যে, শুরু থেকেই পড়ার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়ে যায়। যে আগ্রহ আমাকে নিয়ে গেছে গল্পের শেষ পর্যন্ত।

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!