অনর্গল বৃষ্টি পড়ছে। শিশিরের মতো ঘন বৃষ্টি ছোটো ছোটো ফোঁটায় ঝরছে। মাঝখানে পাকা উঠোনের দুপাশে দোতলা বিল্ডিং। একপাশের দালানের নিচতলায় একটা ঘরের দরজার সামনে আশ্রয় নিয়েছে একটি বিড়াল। বারান্দা নেই, কাজেই উঠোন থেকে বৃষ্টির জল ছিটে ছিটে বিড়ালটার গায়ে লাগছে। যথেষ্ট জড়োসড়ো হয়ে একপাশের পাদুটো দরজায় ঠেসে বসেছে বিড়ালটি। তবু ছিচ্ এসে লাগছে তার ধবধবে সাদা লোমে ভরা শরীরে। মুখটা কিছুটা বোয়াল মাছের মতো ভোঁতা বিড়ালটির। কান দুটো খরগোশের মতো খাঁড়া। নাকটা চাকমাদের মতো মিশানো মুখের সাথে। চোখ দুটোই কেবল তার বিড়ালের মতো। শহুরে বলে বিড়ালটি এখনও একবারও মিউমিউ করেনি। গ্রাম্য হলে এতোক্ষণে মিউমিউ ম্যাওম্যাও করে করে একেবারে জ্বালাতন করে দিত! এ বিড়ালটা বেশ শান্ত।
অন্যপাশের দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বিড়ালটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল বুড়ো শিবু নাথ। এই আরেকটা ডিম ফাঁটল। এ নিয়ে দুপুরের বৃষ্টিতে মোট তেরোটি ডিম হলো উঠোনে। বৃষ্টির ফোঁটা উঠোনে পড়ে কীভাবে বাবলের মতো ফুলে ওঠে, তারপর স্রোতে গড়িয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ফট্ করে ফেটে যায়। বুড়ো তার চশমার ভেতর দিয়ে শুধু বিড়ালকে নয়, উঠোনে কতগুলো বৃষ্টির ডিম হচ্ছে তা-ও গুনছে। পান চিবোতে চিবোতে একফাঁকে লুঙ্গি উঁচু করে চশমাটা মুছে নিল শিবু-বুড়ো। বৃষ্টির বাষ্পে কেমন ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার ঝা চকচকা। গণিতের দাপুটে শিক্ষক শিবু-বুড়ো। যদিও তাকে ঠিক বুড়ো বলা যায় না। বয়স মাত্র পঞ্চান্ন ছুঁইছুঁই। কিন্তু শরীর তাকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে। দুবার মিনি-স্ট্রোক করে তার তাগড়া পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির দেহ নুয়ে পড়েছে। কথা বলতে গেলেই জিভ কাঁপে এখন তার। তাই সে এখন ঝটপট কিছু বলে না, থেমে থেমে খুব সাবধানে কথা বলে।
বিড়ালটা আর সেখানে নেই। দরজাটা খোলা। কেউ বোধহয় ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে, নাকি তাড়িয়ে দিল? বিড়ালটি যদিও কারো পোষা নয়, কিন্তু মাঝেমধ্যেই এ-বাড়িতে তাকে দেখা যায়। “কিন্তু বৃষ্টির মাকে ত দেখলাম না!” বুড়ো মনে মনে ভাবে। তাহলে কি চশমা মুছার ফাঁকেই বৃষ্টির মা দরজা খুলেছিল?
বৃষ্টির মা ইদানীং কেমন যেন বুড়োকে আর পাত্তা দিচ্ছে না। একটু অন্যরকম হয়ে গেছে সে। বুড়ো কি একটু বেশিই বুড়ো হয়ে গিয়েছে? নাকি অন্যকিছু? চশমাটা চোখে লাগিয়ে বুড়ো উপরে তাকিয়ে বৃষ্টি দ্যাখে। বৃষ্টি দেখতে তার আজকাল বড়ো ভালো লাগে।
এমনই এক বৃষ্টির সান্ধ্যকালে বৃষ্টি মাথায় শিশু-বৃষ্টিকে কোলে নিয়ে বৃষ্টির মা শিবুনাথ কটেজে আশ্রয় নিয়েছিল। বৃষ্টিভেজা দুপুরের ঐ বিড়ালটার মতো। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। না, বৃষ্টি না ত, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মা! বৃষ্টি তখন খুব ছোটো। তাই এ-গল্পে বৃষ্টির কোনো স্থান নাই। ভিজে চপচপ আপাদমস্তক বৃষ্টির মা। কিন্তু বৃষ্টিকে একটুও বৃষ্টিতে ভিজতে দেয়নি। এই না-হলে মা! সেদিন শূন্য সিঁথিতে বৃষ্টির মাকে যা লাগছিল, যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে বৃষ্টি বেয়ে স্বর্গের অপ্সরা। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, স্বর্গের বিধানমতে বিধবাদের স্বর্গে ঠাঁই নাই। তাই বৃষ্টির মাকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। সেই থেকে বিতাড়িত অপ্সরা বৃষ্টির মা এবং বৃষ্টি শিবুনাথ কটেজের নিচতলায় ভাড়াটে হিসেবে থাকে।
নাহ্, আজকেও বৃষ্টির মাকে সেই কথাটা বলা হলো না। বৃষ্টির মা যেন আজকাল কেমন হয়ে গেছে। আজকাল আর ভালো-ভালো রান্না করে তরকারি-ভরা-বাটি আঁচলের তলে নিয়ে দোতলায় উঠে না। শিবু যে নিচে নামতে পারে না, একথা বৃষ্টির মা কেমন করে বেমালুম ভুলে যায়! ভাবতে ভাবতে শিবু রুমে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করে তুলোর জাজিম বিছানো নরম খাটে গা এলিয়ে দেয়। চোখে নেশা দিয়ে ঘুম চলে আসে তার। হঠাৎ চশমা ছাড়া চোখ মেলে ঝাপসা দেখতে পায়— দরজার নিকট কেউ যেন দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।
“কে?”
কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢোকে সে। শিবু ডান কনুইয়ে ভর দিয়ে বাম হাতের সাহায্যে বালিশের পাশে চশমা হাতড়ায়। টেবিল থেকে চশমাটা তুলে বুড়োর হাতে দেয় সে, তারপর টেবিলে পাছা ঠেকিয়ে বসে। বাম হাত দিয়ে খোপার বেষ্টনী খুলে দিতেই মাথার সমস্ত কোঁকড়ানো চুল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার নিটোল পিঠে। সিলিংয়ে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের বাতাসে পিঠের চুল লুটোপুটি খায়। শিবুবুড়ো লুঙ্গিটাকে দুপায়ের মাঝে পুরে জবুথবু হয়ে বসে। চশমাটা নাকের ডগায় ঠেলে দেয়।
“বৃষ্টির মা!” শিবুবুড়ো বিষ্ময় খেয়ে বলে।
বৃষ্টির মা খপ করে নিচে নামে। খাটের উপর উঠে দুহাঁটু গেঁড়ে শিবুর ঠোঁট চেপে ধরে তর্জনীতে। ধীরে ধীরে আঙুল গড়িয়ে শিবুর থুতনিতে তারপর গলা ডিঙিয়ে বুকের কাছে এসে থেমে যায়। শিবুকে বিছানায় চেপে বলে, “উঁহু, বৃষ্টির মা নয়। তুমি আমাকে সেই নামে ডাক, যে-নামে ডাক না বহুদিন।”
শিবু বৃষ্টির মার চোখের দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, ” নিম্ফেট!” শিবু(বুড়ো) যেন যৌবনের বয়সে ফিরে যায়। তার মনে হতে থাকে নিম্ফেট যেন সেই অচেনা অজানা মেশিন, যা সাধারণ মানুষ কেবল বই-পুস্তক পত্র-পত্রিকা পড়ে জেনেছে। আজ সে সেই-মেশিনে চড়ে নিমিষে ল্যান্ড করল তার তিরিশ বছরের যুবক বয়সের প্লাটফর্মে।
নিম্ফেট হঠাৎ শিবুর নগ্ন বুকের উপর ঠেলে উঠল। শিবুর গাঢ় গভীর নিঃশ্বাস পড়ছে। শিবুর বুকে নাক ঘষে নিম্ফেট।
“শিবু! আমার মনে হয়, আমাদের এই সম্পর্কেটা রাখা আর ঠিক হবে না। তাছাড়া বৃষ্টিও কলেজে পা দিয়েছে। ওর ত একটা ভবিষ্যৎ থাকা দরকার। “
“চলো-না আমরা বিয়ে করে ফেলি!” পঞ্চান্ন বছরের শিবু এতোদিন ধরে বলবে-বলবে করেও না-বলা কথাটা ফস্ করে বলে দিও। কিন্তু নিম্ফেট চট্ করে কোনো উত্তর দিল না।
দেখ শিবু!
কী?
সেই বিড়ালটা।
শিবু বিরক্ত মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আহা, কোন বিড়ালটা?”
বৃষ্টির মা আঙুল দিয়ে দেখায় জানালার ওপর একটা নাক বোঁচা সাদা ধবধবা বিড়াল দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
শিবু “ধুর, বাদ দাও ত!” বলে মাথাটা একটু উঁচু করে ঝুঁকে থাকা কপালে তারপর চোখে তারপর ঠোঁটে চুমু খেতে থাকে নিম্ফেটের।
কিন্তু নিম্ফেটের চোখ সরে না বিড়ালের ওপর থেকে। হঠাৎই বিড়ালটি দোতলার জানালার ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিচে পড়ে। নিম্ফেট থতমত খেয়ে উঠে শিবুর শরীরের ওপর থেকে। তড়িঘড়ি করে কাপড় সামলে নিয়ে নিচে নেমে যায়। পাঁচিলের ওপারে গিয়ে দেখে বিড়ালটির মাথা থেঁতলে রক্ত বের হচ্ছে গলগল করে। বিড়ালটি তখনও চোখ মেলে তাকিয়ে আছে নিম্ফেটর দিকে। নিম্ফেট মনে মনে কেঁদে নিল। দুফোঁটা জলও গড়াল তার দুচোখ বেয়ে। নিম্ফেট চোখ মুছে ভাবতে থাকল, “এটা কি আত্মহত্যা? তবে কি বিড়ালরাও আত্মহত্যা করে?”
–সৌমেন মণ্ডল (Saumen Mondal)
Send private message to author





