ক্লিপ্টোম্যানিয়াক পর্ব ১৯

১৯

বসুন্ধরা সিটিতে এসেছি। ইএমআই দিতে। আমার হবু বরের জন্য প্লাটিনামের আংটি কিনেছিলাম। লাখ খানেক পড়েছিল। রনি সাহেব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। জিরো ইন্টেরেস্টে, ছয় মাসের কিস্তি। গত চার মাস ধরে মাসের সাত তারিখে এখানে আসাটা আমার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেতনের টাকা পেয়েই প্রথম কাজ হচ্ছে ইন্সটলমেন্ট দেয়া। 

টাকাটা রনি সাহেবের হাতেই দিই। ক্রেডিট কার্ডেও দেয়া যেত, বাট একগাদা ফর্মালিটি। তাই…। 

এনিওয়ে, আজকে যে আসব, সেটা ফোন করে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম। রনি সাহেব অপেক্ষা করছিলেন। আমি ঢুকতেই বেশ প্রশস্ত একটা হাসি দিলেন। 

— বসুন।

মাত্র দুমিনিটের কাজ। রিসিট উনি লিখেই রাখেন। টাকাটা গুণে নেন আর রিসিটটা দেন। এক কাপ কফি খাওয়ার অনুরোধ করেন। সেটা প্রায়ই রাখি। আজও কোন ব্যতিক্রম হল না। বসুন বলার পরে যথারীতি আমি এগিয়ে গেলাম। সামনের চেয়ারে বসলাম। ব্যাগ খুলে টাকাটা বের করলাম।

— কেমন আছেন?

— চলছে। 

উনি টাকা গুনতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। এক হাজারের নোট। বেশি সময় লাগল না। রিসিট রেডি ছিল। সেটা আমার হাতে দিলেন। এরপরে আমাকে অবাক করে কথাটা বললেন।

— আপনার জন্য একটা জিনিস আছে।

ভ্রু কুঁচকে গেল। ‘জিনিস’ বলতে কি বোঝাতে চাইছেন? নিজের অজান্তেই একটা সন্দেহ মনে জেগে গেল। কেউ কি তাহলে পুরো পেমেন্ট করে দিয়েছে? সেটা হয়ে থাকলে ব্যাপারটা খুব খারাপ করেছেন রনি সাহেব। ঘটনাটা যেন না ঘটে তাই সেদিনই বার বার করে বলে দিয়েছিলাম, পুরো ইন্সটলমেন্ট আমি দেব। অন্য কাউকে জানাতে পারবেন না, আর অন্য কেউ দিলেও নেবেন না। উনি রাজী হয়েছিলেন। 

— আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন…

গলার আওয়াজ শুনলে যে কেউ বুঝবে, রেগে গেছি। তবে রনি সাহেব কথাটা শেষ করতে দিলেন না। মাঝ পথে থামিয়ে বললেন

— আপনি ভুল বুঝছেন।

‘সঠিকটা তবে কি?’ প্রশ্নটা মুখে না করলেও চোখে ঝুলিয়ে রাখলাম। কড়া চোখে তাকিয়ে আছি উনার দিকে। উনি আবার সেই প্রশস্ত হাসি হাসলেন। এরপরে ড্রয়ার থেকে একটা খাম বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।

কিছুটা সন্দেহ আর কিছুটা আগ্রহ নিয়ে খামটা হাতে নিলাম। একটু মোটা। বোঝা যাচ্ছে না ভেতরে কি আছে। আমার বিভ্রান্ত চেহারা দেখে উনি শুধু একটাই কথা বললেন

— ভেতরে একটা সারপ্রাইজ আছে।

‘সারপ্রাইজ’ কথাটার আরেকটা অর্থ হচ্ছে, আর ডিটেইল বলব না। নিজেই জানতে পারবেন বাকীটা। তর্ক করতে পারতাম, কিন্তু কেন যেন মনে হল, ভেতরে যা আছে, সে সম্পর্কে আমার আসলে কোন আইডিয়াই নেই। চিন্তাও করিনি এমন একটা কিছু আছে। সেটা আগে থেকে জিজ্ঞেস করলে, সারপ্রাইজটা মারা পড়বে। তাই ‘কি আছে?’ প্রশ্নটা করতে গিয়েও করলাম না।

— ওকে

আর কথা বললাম না। খামটা ব্যাগে ভরে নিয়ে জুয়েলার্স থেকে বেরিয়ে আসলাম। হাতে খুব একটা টাকা নেই। তাই বেরিয়ে আসা ছাড়া আর তেমন অপশান নেই। সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। 

মনটা ছটফট করছে। কি আছে খামে? কোন ডিসকাউন্ট অফার? হতে পারে। হয়তো আংটি টার দাম কমেছে। সেই অংশটা আর দিতে হবে না, এমন কোন কাগজ। কিংবা… পরের কথাটাই মাথায় ঘুরছে। কেউ বাকী পেমেন্টটা করে দিয়েছে। মেজাজ বিগড়াতে শুরু করেছে। 

এখানে আসবার জন্য আজকে স্কুল থেকে আগেই বেরিয়েছি। আর ফিরব না। এখান থেকে বাসায়। ইউজুয়ালি রিক্সা নিই। আজ সিএনজি নিলাম। দ্রুত বাসায় পৌঁছে খ্যামটা খুলতে হবে। আকাশ পাতাল ভাবনা মাথায় তখনও ঘুরছে।

কখন বাসায় পৌঁছে গেছি, টের পাইনি। ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত বাসায় ঢুকলাম। অন্যদিন হলে কিছুক্ষণ ফ্যানের বাতাস খেয়ে শাওয়ারে ঢুকতাম। আজ বিছানায় বসেই ব্যাগ খুললাম। খ্যামটার দিকে আরেকবার তাকালাম। উঁচু করে ধরে বোঝার চেষ্টা করলাম, কোন দিকে একটু ফাঁকা। সেদিকটা ছিঁড়লাম। লম্বা একটা বক্স। খুললাম। ভেতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ আর ছোট্ট একটা বক্স। জুয়েলারি বক্স না। সাধারণ একটা বক্স। কোনটা আগে খুলব? 

বাকীটা একটু পরে বলছি। আগে সেদিনের বাকী গল্পটা শেষ করে নিই। তো কোথায় ছিলাম? ইয়া, সৈকত লাপাত্তা। 

কথাটা শোনার পরে আমার রিয়াকশান ছিল, হতবাক হওয়া আর শম্পাদির পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাওয়া। আমার পাশে বসে আমার হাতের ওপর হাত রেখেছিলেন শম্পাদি। টের পেলাম হাতটা চেপে বসছে। সফলতার এতো কাছে এসে প্রেম কাহিনীটা বিফল হবে, মেনে নিতে পারছেন না। প্রলয় কি বলবে বুঝতে পারছে না। পুরো ঘরে সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আছে শুধু সোহরাব সাহেব। 

আমার বিভ্রান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন

— এখন?

কথাটায় কোথায় যেন একটা হিন্ট ছিল। মনে হল বলতে চাইছেন, ‘সৈকত তো এখন আর নেই, এখন কি ডিসিসান আপনার?’ শম্পাদির শার্প ব্রেন, ব্যাপারটা আগে ধরে ফেলল। তার চেয়েও বড় কথা, প্রলয়কে উনি দুচোখে দেখতে পারেন না। উনার এই মুহূর্তের কনসার্ন হচ্ছে, আমি যেন আবার প্রলয়ের দিকে বেঁকে না যাই। তাই আমার উত্তরের আগেই প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে উনি বলে বসলেন

— আমার মনে হয় ব্যাপারটা মিনু আর সোহরাব সাহেব মিলে সর্ট আউট করুক।

কথাটার হিন্ট ধরতে না পারার মত গাধা প্রলয় না। বহু কষ্টে হাসি সামলালাম। প্রলয়ের মুখ শুকিয়ে গেছে। ও বেশ কনফিডেন্ট ছিল, আমার মন জুড়ে ও আছে। ব্যাপারটা এমন বিচ্ছিরী চেহারা নেবে, ও এক্সপেক্ট করেনি। 

অবশ্য আজকের ঘটনা আমার এক্সপেক্টেশানেরও বাইরে। প্রলয়ের আসাটাও যেমন এক্সপেটেড ছিল না, তেমনি সোহরাব সাহেবের উদারতাটাও। উনাকে কেমন যেন ফেরেশতা লাগছে। এতো ভদ্রলোক কেউ হয়? হবু বউ এনগেজমেন্টের দিন ঠিক হওয়ার পরে আরেকজনকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে এসেছে। আর এটা জানার পরও উনি জানতে চাইছেন, আমি কি করব এখন?

আমার অবস্থা তখন, নাও ওর নেভার। সোহরাব সাহেব নিঃসন্দেহে একজন হাজব্যান্ড মেটেরিয়াল। উনার সাথে বিয়ে হলে বেশ সম্মানের একটা জীবন পাব। হয়তো শ্বশুর বাড়িতে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে, বাট অ্যাট দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, ইট উইল বি অ্যা নাইস প্রপোজিশান। কাগজে কলমে সুখী সংসার।

আর অন্যদিকে সৈকত। এই মুহূর্তে পলাতক। কারণ কিছুটা এক্সপেক্ট করছি। পুলিশকে দেয়া ভুল তথ্য এতক্ষণে আবিষ্কার হয়ে গেছে। পুলিশ বুঝে ফেলেছে, হি ডিচড। এখন হয়তো খুঁজছে। এবং সম্ভবতঃ পুলিশের হয়ে ফ্রি ল্যান্সিং এর ওর কন্ট্রাক্টটাও গেছে। ইন অ্যা নাট শেল, হি ইজ ইন ডিপ ট্রাবল। বাট…বিকজ অফ মি।

সোহরাব সাহেব তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। যা বলার দ্রুত বলতে হবে। হয় ইয়েস, ওর নো। শুধু তা ই না, এই মুহূর্তে হেজিটেশান মানেও আসলে ‘নো’।

মাথায় কিছু আসছে না। এমন সময় শম্পাদি হেল্প করলেন।

— আমার মনে হয়, এই ফাঁকে আমরা খাওয়াটা সেরে নিতে পারি।

সোহরাব সাহেবের দিকে তাকালাম। উনার মুখ গম্ভীর। মনে হচ্ছে উনি ‘আমি উঠি আজকে’ বলে এক্ষুনি উঠে দাঁড়াবেন। প্রলয়ের দিকে তাকালাম। চেহারায় একটা ‘সরি’ ভাব। শম্পাদির দিকে তাকালাম। উনি ইশারায় বলতে চাইছেন, আমি যেন খাবার জন্য বলি।

— আমার কিছু বলার আছে। 

কথাটা বেরিয়ে আসল মুখ দিয়ে। টের পেলাম সাথে সাথে তিন জোড়া চোখ আমার দিকে তাকাল। বাকী দুই জোড়া উপেক্ষা করে সোহরাব সাহেবের দিকে তাকালাম। সোহরাব সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠল। আমার দিকে তাকালেন। আমিও তাকিয়ে থাকলাম উনার দিকে। ঠিক উনার উত্তরের অপেক্ষায় নেই। জাস্ট একটু সময় নিচ্ছি পরের কথাটা বলার। কিংবা হয়তো অপেক্ষায় আছি, ‘কি কথা?’ প্রশ্নটা শোনার। 

তবে উনি এবার শম্পাদির দিকে তাকালেন। এরপরে শম্পাদিকে উদ্দেশ্য করেই বলতে শুরু করলেন। 

— আই আন্ডার্স্ট্যান্ড ইয়োর কনসার্ন। এই বিয়েতে মা রাজী না, খালাকে তো দেখলেনই। আসলে উনাদের চাওয়া আর আমার চাওয়া, আলাদা। উনারা অল্প বয়সী সুন্দরী খুঁজছেন, আর আমি চাইছি সুন্দর একটা মন। মিনুকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। অ্যান্ড ডেসপাইট এভ্রিথিং।

কথাটা শম্পাদির উদ্দেশ্য বললেও, কথাগুলো আমার জন্য ছিল। যেন আমি বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিই। উনার মত উনি জানিয়ে দিয়েছেন। এবার আমার পালা। ডেসপাইট এভ্রিথিং, আমি কি সিদ্ধান্ত নিই।

— আমি বলছি না, কোন সমস্যা হবে না। আজকে যা ঘটল, এরপরও যদি আমি এনগেজমেন্ট করি এখানে, বিরাট একটা গোলমাল কিন্তু লাগবে। আবার এটাও ঠিক, ব্যাপারটা মিটেও যাবে। তবে সময় লাগবে। অভিমানের ঘা য়ে বাতাস দিতে নাই, সময়ের ওপর ছেড়ে দেয়াটাই একমাত্র সমাধান। অ্যান্ড আই থিঙ্ক, মিনু ইজ স্মার্ট এনাফ টু হ্যন্ডল ইট। নাও ইটস আপ টু ইউ। 

শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। পুরো ব্যাপারটা এখন অনেকটাই ক্লিয়ার। 

বললাম

— আমার হবু বরের জন্য আমি নিজেও একটা আংটি কিনেছি। ওটা নিয়ে আসি?

এমন সময় প্রলয় উঠে দাঁড়াল। মনে হয় চলে যাওয়ার ইচ্ছা। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম

— বসো। খেয়ে যাবে।

এরপরে আর কিছু না বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। শম্পাদিও উঠতে চাইছিলেন। ইশারায় উনাকে বসতে বললাম। নিজের ঘরে ঢুকলাম। একবার ভাবলাম, বাবা মা কে ডাকি। পরে ভাবলাম, থাক। মাকে একটু সময় দেয়া দরকার। 

আলমিরা খুললাম। ড্রয়ারে রেখেছিলাম প্যাকেটটা। কাগজের ঝোলা ব্যাগ। সেটার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট বক্সটা বের করলাম। লাল রঙের টপিক্যাল জুয়েলারি বক্স। লাল রঙের। সেটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসলাম। সোজা গিয়ে বসলাম সোহরাব সাহেবের পাশে।

ঘরে পিন পতন নিস্তব্ধতা। আমার মনেও তেমন কোন এক্সাইটমেন্ট নেই। ব্যাপারটা শেষ হচ্ছে, এই একটা অনুভূতিই কাজ করছে শুধু। বড় একটা নিঃশ্বাস নিলাম। জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি এখন। হাতটা কাঁপার কথা ছিল। কাঁপল না। বেশ স্বাভাবিকভাবেই বক্সটা খুললাম। 

অ্যান্ড… দেয়ার ওয়েটেড দ্যা সারপ্রাইজ অফ মাই লাইফ। প্লাটিনাম রিঙের বদলে সেখানে জ্বলজ্বল করছে ডায়মন্ড রিং টা। মুহূর্তে বুঝে গেলাম পুরো ঘটনা। অস্ফুটে শুধু বললাম

— হি প্রপোজড।

চলবে

Razia Sultana Jeni

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
1
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sumaiya
Guest
Sumaiya
4 years ago

আপনার কি কোন ফেসবুক পেজ আছে??

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!